ভলতেয়ার বিকাশমান পুঁজিবাদের মতাদর্শগত মুখপত্র

ভলতেয়ার বা ভলটেয়ার বা ভোলতেয়ার (ইংরেজি: Voltaire, ২১ নভেম্বর ১৬৯৪ – ৩০ মে ১৭৭৮ খ্রি.) ছিলেন অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের বহুমুখী প্রতিভা। ভলটেয়ার একাধারে, লেখক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক এবং ফরাসিদের নবজাগরণের নেতা ছিলেন। ভলটেয়ার আপোসহীনভাবে সামন্তবাদ এবং খ্রিষ্টীয় গোঁড়ামীর বিরোধী ছিলেন। তাঁর বিদ্রুপাত্মক রচনার ধার শাসকগোষ্ঠীর নিকট অসহনীয় ছিল। সামন্তবাদ বিরোধী বিদ্রুপাত্মক রচনার জন্য সরকার ভলটেয়ারকে ১৭১৭ সালে একবার এবং ১৭২৫ সালে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার করে। জীবনের প্রধান অংশ ভলটেয়ারকে দেশের বাইরে অতিবাহিত করতে হয়।

অষ্টাদশ শতকে ফরাসি চিন্তাবিদদের আর একটি অবদান ছিল জ্ঞানকোষ রচনা। দার্শনিক দিদেরোর সঙ্গে ভলটেয়ার এই জ্ঞানকোষ রচনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। ধর্মীয় এবং বৈজ্ঞানিক অভিমত পোষণের ব্যাপারে ভলটেয়ারের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। একদিকে যেমন তিনি বিজ্ঞানকে বাস্তব জীবনের নিয়ামক বলেছেন তেমনি অপরদিকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব তিনি অস্বীকার করতে পারেন নি। তাঁর মতে, বিজ্ঞান সত্য; তথাপি বিশ্বের একজন মূল পরিচালক আছেন আর তিনি হচ্ছেন ঈশ্বর। কিন্তু ঈশ্বরের ব্যাখ্যায় তিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যা অস্বীকার করতে চেয়েছেন। প্রকৃতি শাশ্বত বিধানের নিয়মে ক্রিয়াশীল। ঈশ্বর প্রকৃতি থেকে কোনো আলাদা অস্তিত্ব নয়। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ক্রিয়াশীলতা ঈশ্বর। ভলটেয়ার মন বা আত্মাকে ঈশ্বরের ন্যায় অস্তিত্বময় সত্তা হিসাবে স্বীকার করেন ন। তাঁর মতে চেতনা বস্তুরই অন্তর্নিহিত চরিত্র। কিন্তু এ চরিত্রের বিকাশ ঘটেছে সজীব দেহে, অপর কোথাও নয়।

ভলটেয়ার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে আপসহীন ছিলেন। দেকার্ত-এর আত্মা এবং জন্মগত ভাবের অভিমত ভলটেয়ার অস্বীকার করে পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের উৎস বলে অভিমত প্রকাশ করেন। জ্ঞানের প্রশ্নে ভলটেয়ার লকের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর বস্তুবাদের দুর্বলতা এখানে যে, ভলটেয়ার অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের মূল বললেও আবার তিনি বলেছেন যে, অভিজ্ঞতাই আমাদের মনে এরূপ ধারণা সৃষ্টি করে যে বিশ্বের একটা মূল কারণ বা সংগঠক কেউ আছেন।

আরো পড়ুন:  জ্যাক লাকা প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী ফরাসি দার্শনিক

ভলটেয়ার ছিলেন বিকাশমান পুঁজিবাদী শ্রেণির মতাদর্শগত মুখপাত্র। কারণ তিনি সামন্তবাদের বিরোধিতা করেছেন; আইনের চোখে সকল মানুষ সমান একথা বলেছেন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির মালিকদের ওপর কর ধার্যের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এগুলি সবই পুঁজিবাদের বিকাশের সহায়ক। ভলটেয়ার তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের, কৃষকের এবং শ্রমিকের দুরবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু সম্পদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানার তিনি পক্ষপাতী ছিলেন এবং মনে করতেন যে, সমাজে ধনী এবং দরিদ্রের বিভাগ চিরন্তন ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার প্রশ্নে ভলটেয়ার সংবিধানগত রাজতন্ত্রকে সর্বোত্তম শাসন বলে প্রথমদিকে গণ্য করেছিলেন। জীবনের শেষের দিকে অবশ্য তিনি রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের মতও পোষণ করেছেন।

ইতিহাসের উপর রচিত গ্রন্থাবলীতে তিনি ইতিহাস সম্পর্কে বাইবেল এবং খ্রিষ্টধর্মের ব্যাখ্যার সমালোচনা করেন। তিনি সমাজের বিকাশের একটি রূপরেখা অঙ্কন করেন। এতে তার ইতিহাসের দর্শন প্রকাশিত হয়। ইতিহাসেরও দর্শন আছে এ ব্যাখ্যা ভলটেয়ারই প্রথম উপস্থিত করেন। ইতিহাসের বিকাশ ঈশ্বরনিরপেক্ষভাবে ঘটে। অবশ্য এই বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করে মানুষের মতাদর্শ, বাস্তব অর্থনীতিক কারণ এবং আর্থনীতিক শ্রেণি নয়। ইতিহাসের এ ব্যাখ্যা ভাববাদী, ভলটেয়ারের রচনার প্রধান ভঙ্গি ছিল বিদ্রুপাত্মক। আর তার বিদ্রুপের প্রধান লক্ষ্য ছিল গোঁড়া যাজক সম্প্রদায়। তিনি খ্রিষ্টীয় গির্জাকে মানুষের প্রগতির প্রধান শত্রু বলে মনে করতেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব, বিশেষ করে অন্যায়ের দণ্ডদানকারী ঈশ্বরের অস্তিত্বের কল্পনা সাধারণ মানুষের জন্য তিনি আবশ্যক বলে বোধ করতেন। ভলটেয়ারের রচনা ও দৃষ্টিভঙ্গি ফরাসি বিপ্লবের পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩৮৭-৩৮৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!