আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বই > পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থ প্রসঙ্গে আলোচনা

পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থ প্রসঙ্গে আলোচনা

পরিবার,-ব্যক্তিগত-মালিকানা-ও-রাষ্ট্রের-উৎপত্তি

মার্কসবাদের অন্যতম মৌলিক একটি রচনা হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (ইংরেজি:The Origin of the Family, Private Property, and the State: in the Light of the Researches of Lewis H. Morgan) গ্রন্থ। ‘পরিবার’ ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ এবং রাষ্ট্রকে ধনতান্ত্রিক সমাজের সমাজবিজ্ঞানীগণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য এবং চিরন্তন সংস্থা বলে প্রচার করে আসছিল। মার্কসবাদ সর্বপ্রথম সমাজের এরূপ ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে। সমাজের বিকাশের মার্কসবাদী ব্যাখ্যার প্রকাশ ঘটেছে এঙ্গেলসের বর্তমান পুস্তকে। আমেরিকার বস্তুবাদী সমাজবিজ্ঞানী লিউস হেনরী মর্গানও তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রাচীন সমাজ’-এ মানুষের আদি অবস্থা থেকে তার সংগঠনগত বিকাশের পর্যায়সমূহকে প্রচুর তথ্য সহকারে তুলে ধরেছিলেন। উক্ত তথ্যসমূহের উপর ভিত্তি করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অপরাপর গবেষণার সাহায্যে এঙ্গেলস তাঁর এই গ্রন্থে প্রথমে মানুষের আদিম সাম্যবাদী অবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করেছেন।

এঙ্গেলসের এই রচনায় মানবজাতির বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতে মানবজাতির ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আদি গোষ্ঠীগত সমাজের পতনের প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত মালিকানার উপর স্থাপিত শ্রেণীগত সমাজের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে; এই সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখানো হয়েছে; ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পারিবারিক সম্পর্কের বিকাশের বিশেষত্ব ব্যাখ্যাত হয়েছে; রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও সারমর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে এবং শ্রেণীহীন সাম্যবাদী সমাজের চড়ান্ত বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের বিলোপের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

এই গ্রন্থের ১৮৮৪ সালের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় এঙ্গেলস তাঁর এই গ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানান যে, “মর্গান তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে আমেরিকায় ইতিহাসের সেই একই বস্তুবাদী ধারণা পুনরাবিষ্কার করেন, যা মার্কস চল্লিশ বছর আগেই আবিষ্কার করেছিলেন, এবং বর্বরতা ও সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে ঐ ধারণা থেকে তিনি প্রধান প্রধান বিষয়ে মার্কসেরই সমসিদ্ধান্তে পৌঁছন।”

নিচে এই গ্রন্থের সূচিপত্র প্রদান করা হলো। আপনারা লিংকে ক্লিক করে যেসব লেখা কম্পোজ করা হয়েছে সেগুলো পড়তে পারবেন।

পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থের সূচিপত্র

পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি — ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

১. সংস্কৃতির প্রাগৈতিহাসিক স্তরসমূহ

আরো পড়ুন:  মার্কস এঙ্গেলস মার্কসবাদ গ্রন্থের সূচিপত্র

ক. বন্যাবস্থা

খ. বর্বরতা

২. পরিবার 

৩. ইরকোয়াস গােত্রসংগঠন

৪. গ্রীক গােত্র

৫. এথেন্স রাষ্ট্রের উৎপত্তি 

৬. নােম গােত্র ও রাষ্ট্র   

৭. কেল্ট ও জার্মানদের মধ্যে গােত্র

৮. জার্মানদের রাষ্ট্রের উৎপত্তি

৯. বর্বরতা ও সভ্যতা 

মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার বিবাহ এবং পারিবারিক বন্ধনের রীতি প্রকৃতিও যে বিবর্তিত হয়েছে, সে তথ্য এঙ্গেলস এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন। প্রাচীন গ্রিক, রোমান এবং টিউটন সমাজের পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত দ্বারা এঙ্গেলস প্রাচীন গোত্রতান্ত্রিক সমাজের ক্ষয়ের ধারাকে বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের শ্রমের উৎপাদনী ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রম বিভাগের মধ্য দিয়ে সমাজে দ্রব্যের বিনিময় প্রথা এবং তার পরিণামে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে। এই বিবর্তনে কৌম সমাজের ক্ষয় ঘটে এবং অর্থনীতিক শ্রেণীরও সৃষ্টি হয়। সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদনের বিকাশে যখন পরস্পর বিরোধী স্বার্থসম্পন্ন আর্থনীতিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে, তখনি শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্থে আবশ্যক হয়েছে বিধিবিধান প্রণয়নকারী ও রক্ষাকারী এক সংস্থার। এই সংস্থার নাম রাষ্ট্র।

এঙ্গেলস এই গ্রন্থে মোট তিনটি সিদ্ধান্ত টেনেছেন। তাঁর মতে : ১. পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র – এগুলি মানুষের সমাজে কোনো চিরন্তন সংস্থা নয়। অর্থনীতির বিকাশের একটা পর্যায়ে এই সমস্ত সংস্থার উদ্ভব ঘটেছে। ২. রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রভু শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হওয়া। দ্বন্দ্বমান সমাজে প্রভু শ্রেণীর প্রয়োজন জোর জবরদস্তির মারফত শোষিত শ্রেণীকে দমিত করে রাখা। রাষ্ট্রের আইন এবং পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা-অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো হচ্ছে সেই জবরদস্তি কার্যকর করার মাধ্যম বা যন্ত্র। ৩. সমাজ অনড় এবং অপরিবর্তনীয় নয়। সমাজের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে। শোষক এবং শোষিত হিসাবে মানুষের শ্রেণীবিভাগ ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও তা অবিনশ্বর নয়। সমাজের বিকাশের পরিণামে একদিন শ্রেণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একদিন যেমন তার উদ্ভব ঘটেছিল, তেমনি আর একদিন তার বিলোপ ঘটবে। সমাজ আবার শোষক শোষিত শ্রেণীমুক্ত সাম্যবাদী সমাজে পরিণত হবে। সেদিন শোষকশ্রেণী থাকবে না এবং তার স্বার্থরক্ষার জন্য কোনো অত্যাচারমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকবে না। আর তাই সেদিন রাষ্ট্রও অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। আস্তে আস্তে অত্যাচারমূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩০০।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page