কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, সামন্ত সমাজতন্ত্র

— কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য
১. প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র
ক. সামন্ত সমাজতন্ত্র

স্বীয় ঐতিহাসিক পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের অভিজাতদের কাছে আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে পুস্তিকা লেখা একটা কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৩০ খ্ৰীস্টাব্দের জুলাই মাসের ফরাসী বিপ্লবে এবং ইংল্যান্ডে সংস্কার আন্দোলনে ঘৃণ্য ভুঁইফোঁড়দের হাতে এদের আবার পরাভব হল । এরপর এদের পক্ষে একটা গুরুতর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালানোর কথাই ওঠে না। সম্ভব রইলো একমাত্র মসীযুদ্ধ। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রেও রেস্টোরেশন (restoration)[১] যুগের পুরানো ধ্বনিগুলি তখন অচল হয়ে পড়েছে।

লোকের সহানুভূতি উদ্রেকের জন্য অভিজাতেরা বাধ্য হলো বাহ্যত নিজেদের স্বাৰ্থ ভুলে কেবল শোষিত শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থেই বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ খাড়া করতে। এইভাবে অভিজাতেরা প্রতিশোধ নিতে লাগল তাদের নূতন প্ৰভুদের নামে টিটকারি দিয়ে, তাদের কানে কানে আসন্ন প্রলয়ের ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়ে।

এইভাবে উদয় হয় সামন্ত সমাজতন্ত্রের: তার অর্ধেক বিলাপ আর অর্ধেক টিটকারি; অর্ধেক অতীতের প্রতিধ্বনি এবং অর্ধেক ভবিষ্যতের হুমকি; মাঝে মাঝে এদের তিক্ত, সব্যঙ্গ ও সুতীক্ষ্ম সমালোচনা বুর্জোয়াদের মর্মে গিয়ে বিধত; অথচ আধুনিক ইতিহাসের অগ্রগমন বোধের একান্ত অক্ষমতায় মোট ফলটা হত হাস্যকর।

জনগণকে দলে টানার জন্য অভিজাতবর্গ নিশান হিসাবে তুলে ধরত মজুরের ভিক্ষার থলিটাকে। লোকেরা কিম্ভ যতবারই দলে ভিড়েছে ততবারই এদের পিছনদিকটায় সামন্ত দরবারী চাপরাশী দেখে হো হো করে অশ্রদ্ধার হাসি হেসে ভোগে গেছে।

এ প্রহসনটা দেখায় ‘ফরাসী লেজিটিমিস্ট’দের একাংশ এবং ‘নবীন ইংল্যান্ড’ গোষ্ঠী।(২)

বুর্জোয়া শোষণ থেকে তাদের শোষণ পদ্ধতি অন্য ধরনের ছিলো এটা দেখাতে গিয়ে সামন্তপন্থীরা মনে রাখে না যে সম্পূর্ণ পৃথক পরিস্থিতি ও অবস্থায় তাদের শোষণ চলত, যা আজকের দিনে অচল হয়ে পড়েছে। তাদের আমলে আজকালকার প্রলেতারিয়েতের অস্তিত্বই ছিল না দেখাতে গিয়ে তারা ভুলে যায় যে তাদের নিজস্ব সমাজেরই অনিবাৰ্য সন্তান হলো আধুনিক বুর্জোয়া শ্রেণি।

আরো পড়ুন:  বুর্জোয়া বা বুর্জোয়াজি বলতে কি বুঝায়?

তা ছাড়া অন্য সব ব্যাপারে নিজেদের সমালোচনার প্রতিক্রিয়াশীল রূপটা এরা এত কম ঢাকে যে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে এদের প্রধান অভিযোগ দাঁড়ায় এই যে, বুর্জোয়া রাজত্বে এমন এক শ্ৰেণি গড়ে উঠছে, সমাজের পুরানো ব্যবস্থাকে আগাগোড়া নির্মূল করাই যার নির্বন্ধ।

বুর্জোয়া শ্রেণি প্রলেতারিয়েত সৃষ্টি করছে তার জন্য তত নয়, বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত সৃষ্টি করছে এটাই হলো এদের অভিযোগ।

সুতরাং রাজনীতির কার্যক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে দমনের সকল ব্যবস্থায় এরা যোগ দেয়; আর সাধারণ জীবনযাত্রায় বড় বড় বুলি সত্ত্বেও যন্ত্রশিল্পরূপ গাছের সোনার ফল কুড়িয়ে নিতে এদের আপত্তি নেই; পশম, বীট চিনি, অথবা আলুর মদের[৩] ব্যবসার জন্য সত্য, প্ৰেম, মর্যাদা বেচিতে এদের দ্বিধা হয় না।

জমিদারদের সংগে পুরোহিত যেমন সর্বদাই হাত মিলিয়েছে, তেমনি সামন্ত সমাজতন্ত্রের সঙ্গে জুটেছে পাদ্রিদের সমাজতন্ত্র।

খৃস্টানী কৃচ্ছসাধনাকে সমাজতন্ত্রী রং দেওয়ার চেয়ে সহজ কিছু নেই। খৃস্টান ধর্ম ব্যক্তিগত মালিকানা, বিবাহ ও রাষ্ট্রকে ধিক্কার দেয় নি কি? তার বদলে দয়া ও দারিদ্র্য, ব্ৰহ্মচর্য ও ইন্দ্রিয়দমন, মঠব্যবস্থা ও গির্জার প্রচার করে নি কি তারা? যে পুণ্যোদকে পুরোহিতেরা অভিজাতদের হৃদয়জ্বালাকে পবিত্র করে থাকে তারই নাম খৃষ্টান সমাজতন্ত্র।

টীকাঃ

১. ১৬৬০ থেকে ১৬৮৯ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী রেস্টোরেশন নয়, ১৮১৪ থেকে ১৮৩০ খ্রীস্টাব্দের ফরাসী রেস্টোরেশন। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা ।)
২. ফরাসী লেজিটিমিস্ট— ১৮৩০ খ্ৰীস্টাব্দে যে বুরবো রাজবংশের পতন ঘটে তাদের পক্ষপাতী, ভূস্বামী অভিজাতদের স্বার্থের প্রতিনিধি এরা। তদানীন্তন শাসক ছিলো অরলিয়েী বংশ, এদের সমর্থন করত অর্থপতি অভিজাত ও বৃহৎ বুর্জোয়ারা। তার বিরোধিতা করে কিছু কিছু লেজিটিমিস্ট সামাজিক বাগাড়ম্বরের আশ্রয় নিত, বুর্জোয়া শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতীদের স্বার্থরক্ষার ভেক ধারণ করত।
‘নবীন ইংল্যান্ড’ — টোরি রাজনৈতিক ও সাহিত্যকদের একটি গ্রুপ। এটি গঠিত হয় উনিশ শতকের পঞ্চম দশকের গোড়ায়। বুর্জোয়াদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে ভূস্বামী অভিজাততন্ত্রের অসন্তোষ প্রকাশ পেত এদের মধ্যে; শ্রমিক শ্রেণির উপর প্রভাব বিস্তার করে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাদের ব্যবহার করার জন্য এরা বাগাড়ম্বরের আশ্রয় নিত।
এই গ্রুপটির মতবাদকে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে’ সামন্ত সমাজতন্ত্র বলে বর্ণনা করেছেন। — সম্পাদকের টীকা
৩. কথাটা বিশেষ করে জার্মানি সম্বন্ধে খাটে। সেখানে অভিজাত ভূস্বামী ও জমিদাররা বড় বড় মহাল নিজেরাই গোমস্তা রেখে চাষ করায়, তা ছাড়া নিজেরাই ব্যাপকভাবে বীটচিনি ও আলুর মদ তৈরি করে। এদের চেয়ে অবস্থাপন্ন ইংরেজ অভিজাতেরা এখনও ঠিক এতটা নামে নি; কিন্তু তারাও কমতি খাজনার ক্ষতিপূরণের জন্য কমবেশি সন্দেহজনক জয়েন্ট-স্টক কোম্পানি পত্তন করার কাজে নিজেদের নাম ধার দিতে জানে। (১৮৮৮ সালের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

আরো পড়ুন:  প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নে বিপ্লবীদের কি কাজ করা উচিত?

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্র
১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮২ সালের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৮ সালের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা
কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার
১. বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত
২. প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্টগণ
৩. সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য
(১) প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র
ক. সামন্ত সমাজতন্ত্র
খ. পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
গ. জার্মান অথবা “খাঁটি” সমাজতন্ত্র
(২) রক্ষণশীল অথবা বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
(৩) সমালোচনী — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম
৪. বর্তমান নানা সরকার-বিরোধী পার্টির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ
টীকা

Leave a Comment

error: Content is protected !!