কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সমিতি — কমিউনিস্ট লীগ, তখনকার অবস্থা অনুসারে যার অবশ্য গুপ্ত সমিতি হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না, ১৮৪৭ সালের নভেম্বরে লন্ডনে এর যে কংগ্রেস বসে তা থেকে নিম্নস্বাক্ষরকারীদের উপর পার্টির একটি বিশদ তত্ত্বগত ও ব্যবহারিক কর্মসূচি প্রকাশের জন্য রচনা করার দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। যে ইশতেহারটি এখানে দেওয়া হলো তার উৎপত্তি হয়েছে এইভাবে। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের[১]) কয়েক সপ্তাহ আগে এই পাণ্ডুলিপিটি ছাপার জন্য লন্ডনে যায়। জার্মান ভাষায় প্রথম প্রকাশের পর জার্মানি, ইংলন্ড ও আমেরিকা থেকে এটি জার্মান ভাষায় অন্তত বারটি বিভিন্ন সংস্করণে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজিতে, শ্রীমতী হেলেন ম্যাকফারলেনের অনুবাদে, এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিলো লন্ডনের Red Republican-এ ১৮৫০ সালে এবং পরে ১৮৭১ সালে আমেরিকায় অন্তত তিনটি স্বতন্ত্র অনুবাদে। ফরাসি অনুবাদ প্রথম বের হয় প্যারিসে ১৮৪৮ সালের জুন অভ্যুত্থানের[২] সামান্য আগে, আবার সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্কের Le Socialiste পত্রিকায়। আরও একটি অনুবাদের কাজ এখন চলছে। জার্মান ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হওয়ার কিছু পরেই লন্ডনে হয় এর রুশ অনুবাদ। প্রথম প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যে এটি অনুবাদ করা হয় ডেনিশ ভাষাতেও। গত পঁচিশ বছরে বাস্তব অবস্থা যতই বদলে যাক না কেন, এই ‘ইশতেহার’-এ যেসব সাধারণ মূলনীতি নির্ধারিত হয়েছিলো তা আজও মোটামুটিভাবে আগের মতোই সঠিক। এখানে-ওখানে সামান্য দু-একটি খুঁটিনাটি কথা হয়তো আরও ভালো করে লেখা যেত। সর্বত্র এবং সবসময়ে মূলনীতিগুলির ব্যবহারিক প্রয়োগ নির্ভর করবে তখনকার ঐতিহাসিক অবস্থার উপরে, ‘ইশতেহার’-এর মধ্যেই সে কথা রয়েছে, সেইজন্য দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে যেসব বৈপ্লবিক ব্যবস্থার প্রস্তাব আছে তার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় নি। আজকের দিনে হলে এ অংশটা নানা দিক থেকে অন্যভাবে লিখতে হত। গত পঁচিশ বছরে আধুনিক যন্ত্রশিল্প বিপুল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি-সংগঠন উন্নত ও প্রসারিত হয়েছে, প্ৰথমে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে, পরে আরও বেশি করে প্যারিস কমিউনে[৩] যেখানে প্রলেতারিয়েত এই সর্বপ্রথম পুরো দুমাস ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিলো, তাতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তার ফলে এই কর্মসূচির খুঁটিনাটি কিছু বিষয় সেকেলে হয়ে পড়েছে। কমিউন বিশেষ করে একটা কথা প্রমাণ করেছে যে, ‘তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রটার শুধু দখল পেলেই শ্রমিক শ্রেণি তা নিজের কাজে লাগাতে পারে না।’[৪] তা ছাড়া এ কথা স্বভাবতই স্পষ্ট যে, সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের সমালোচনাটি আজকের দিনের হিসাবে অসম্পূর্ণ, কারণ সে আলোচনার বিস্তার এখানে মাত্র ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত, তা ছাড়া বিভিন্ন বিরোধী দলের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক সম্বন্ধে বক্তব্যগুলিও (চতুর্থ অধ্যায়ে), সাধারণ মূলনীতির দিক থেকে ঠিক হলেও, ব্যবহারিক দিক থেকে অকেজো হয়ে গেছে, কেননা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে এবং উল্লিখিত রাজনৈক দলগুলির অধিকাংশকে ইতিহাসের অগ্রগতি এই দুনিয়া থেকে ঝোঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে।

আরো পড়ুন:  তুস্যাঁ লুভাতুর ছিলেন দাস বিদ্রোহের এক মহানায়ক

কিন্তু এই ‘ইশতেহার’ এখন ঐতিহাসিক দলিল হয়ে পড়েছে, একে বদলাবার কোনো  অধিকার আমাদের আর নেই। সম্ভবত পরবর্তী কোনো সংস্করণ বের করা যাবে যাতে ১৮৪৭ থেকে আজ অবধি ব্যবধানের কালটুকু নিয়ে একটা ভূমিকা থাকবে, বর্তমান সংস্করণ এত অপ্রত্যাশিতভাবে বেরোল যে আমাদের পক্ষে তার জন্য সময় ছিল না।

কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
২৪ জুন ১৮৭২

টিকা:

১. ফ্রান্সে ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে।
২. ২৩-২৬ জুন ১৮৪৮ সালের প্যারিসের প্রলেতারিয়েতের অভ্যুত্থানের কথা বলা হয়েছে।
৩. ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের কথা বলা হচ্ছে। এটি ছিল প্রথম প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী সরকার।
৪. ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির সাধারণ পরিষদের অভিভাষণ, জার্মান সংস্করণ, ১৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য, সেখানে কথাটা আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্র
১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮২ সালের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৮ সালের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা
কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার
১. বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত
২. প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্টগণ
৩. সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য
(১) প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র
ক. সামন্ত সমাজতন্ত্র
খ. পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
গ. জার্মান অথবা “খাঁটি” সমাজতন্ত্র
(২) রক্ষণশীল অথবা বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
(৩) সমালোচনী — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম
৪. বর্তমান নানা সরকার-বিরোধী পার্টির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ
টীকা

Leave a Comment

error: Content is protected !!