আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৯o সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৯o সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকার কথাগুলো লেখার পর ইশতেহারের একটি নতুন জার্মান সংস্করণের প্রয়োজন হয়েছে এবং ইশতেহারের ক্ষেত্রে অনেক কিছু ঘটেছে যা উল্লেখ করা উচিত।

ভেরা জাসুলিচ অনূদিত একটি দ্বিতীয় রুশ সংস্করণ ১৮৮২ সালে জেনেভায় প্রকাশিত হয়েছে; এ সংস্করণের ভূমিকা মার্কস ও আমি লিখেছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত মূল জার্মান পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে গেছে; তাই রুশ থেকে তা ফের অনুবাদ করে দিচ্ছি, মূল পাঠ থেকে তা বিশেষ ভিন্নতর হবে না।[১] ভূমিকাটি এইঃ

‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’-এর প্রথম রুশ সংস্করণ, বাকুনিনের অনুবাদে, ষাটের দশকের গোড়ার দিকে (১) “কলোকোল’ (২) পত্রিকার ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। সেদিন পশ্চিমের কাছে এটা (‘ইশতেহার’—এর রুশ সংস্করণ) মনে হতে পারত একটা সাহিত্যিক কৌতুহলের বিষয় মাত্র। আজ তেমনভাবে দেখা অসম্ভব।

তখনও পর্যন্ত (ডিসেম্বর, ১৮৪৭) প্রলেতারিায় আন্দোলন কত সীমাবদ্ধ স্থান জুড়ে ছিলে, সে কথা সবচেয়ে পরিষ্কার করে দেয় ‘ইশতেহার’’-এর ‘বিদ্যমান বিভিন্ন বিরোধী পার্টির সম্পর্কে কমিউনিস্টদের অবস্থান’ শীৰ্ষক শেষ অধ্যায়টি, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখই নেই এখানে। সে যুগে রাশিয়া ছিল ইউরোপের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরাট শেষ আশ্রয়স্থল এবং যুক্তরাষ্ট্র টেনে নিচ্ছিল ইউরোপিয় প্রলেতারিয়েতের উদ্ধৃত্তি অংশটাকে অভিবাসনের মধ্য দিয়ে। উভয় দেশই ইউরোপকে কাঁচামাল যোগাত, আর সেইসঙ্গে ছিলো তার শিল্পজাত সামগ্রীর বিক্রয়ের বাজার। সে যুগে তাই দুই দেশই কোনো না কোনোভাবে ছিল ইউরোপের চলতি ব্যবস্থার স্তম্ভ।

আজ অবস্থা কত বদলে গেছে! ইউরোপিয়দের অভিবাসনের দরুনই উত্তর আমেরিকা বৃহৎ কৃষি-উৎপাদনের যোগ্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, তার প্রতিযোগিতা ইউরোপের ছোটো বড়ো সমস্ত ভূসম্পত্তির ভিত পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলেছে। তা ছাড়া এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিপুল শিল্পসম্পদকে এমন শক্তি দিয়ে ও এমন আয়তনে কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছে যে শিল্পক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপের, বিশেষ করে ইংলন্ডের যে একচেটিয়া অধিকার আজও বজায় রয়েছে, তা অচিরে ভেঙে পড়তে বাধ্য। উভয় পরিস্থিতি খোদ আমেরিকার উপরেই বিপ্লবী উপায়ে প্রতিক্রিয়া করে। গোটা রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ভিত্তিতে যে কৃষকের ছোটো ও মাঝারি ভূসম্পত্তি ছিলো, তা ক্ৰমে ক্ৰমে বৃহদায়তন খামারের প্রতিযোগিতার শিকার হয়ে পড়ছে, সেইসঙ্গে শিল্পাঞ্চলে এই প্রথম ঘটছে প্রচুর সংখ্যায় প্রলেতারিয়েত ও অবিশ্বাস্যভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবনের বিকাশ।

আর এখন রাশিয়া ! ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের বিপ্লবের সময়ে শুধু ইউরোপিয় রাজন্যবর্গ নয়, ইউরোপের বুর্জোয়া শ্রেণি পর্যন্ত সদ্যজাগরণোন্মুখ প্রলেতারিয়েতের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র উপায় দেখেছিলো রাশিয়ার হস্তক্ষেপে। জারকে ঘোষণা করা হয়েছিলো ইউরোপে প্ৰতিক্রিয়ার প্রধান সর্দার বলে। সেই জার আজ বিপ্লবের কাছে গাৎচিনায় যুদ্ধবন্দি(৩), আর ইউরোপে বিপ্লবী আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া।

আধুনিক বুর্জোয়া সম্পত্তির অনিবাৰ্যভাবে আসন্ন অবসানের কথা ঘোষণা করাই ছিলো ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’—এর লক্ষ্য। কিন্তু রাশিয়াতে দেখি, দ্রুত বর্ধিষ্ণু পুঁজিবাদী জুয়াচুরি ও বিকাশোন্মুখ বুর্জোয়া ভূসম্পত্তির মুখোমুখি রয়েছে দেশের অর্ধেকের বেশি জমি জুড়ে চাষিদের যৌথ মালিকানা। এখন প্রশ্ন হল, অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেলেও জমির উপর যৌথ মালিকানার আদি রূপ এই রুশ অবশ্চিনা (obshchina)[৪] কি কমিউনিস্ট সাধারণ মালিকানার উচ্চতর পর্যায়ে সরাসরি রূপান্তরিত হতে পারে? না কি পক্ষান্তরে তাকেও প্রথমে যেতে হবে ভাঙনের সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যা পশ্চিমের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে?

এর একমাত্র যে-উত্তর দেওয়া আজ সম্ভব তা এই: রাশিয়ার বিপ্লব যদি পশ্চিমে প্রলেতারিয় বিপ্লবের সংকেত হয়ে ওঠে যাতে দুই বিপ্লব পরস্পরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে রাশিয়ার ভূমির বর্তমান যৌথ মালিকানা কাজে লাগতে পারে কমিউনিস্ট বিকাশের সূত্রপাত হিসেবে।

কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

লন্ডন, ২১ জানুয়ারি, ১৮৮২

প্রায় একই সময়ে জেনেভায় প্রকাশিত হয় একটি পোলীয় সংস্করণঃ Manifest Komunistryczuny. তাছাড়া Social-demokratisk Bibliothek, Kjobenhavn 1885, থেকেও একটি নূতন ড্যানিশ সংস্করণ বেরিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এটি খুব সুসম্পূর্ণ নয়; অনুবাদকের কাছে সম্ভবত দুরূহ বোধ হওয়ায় কতকগুলি জরুরি অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাছাড়া স্থানে স্থানে অযত্নের লক্ষণ আছে; সেটা চোখে লাগে আরো বেশি এই কারণে যে অনুবাদ থেকে বোঝা যায়, অনুবাদক আর একটু কষ্ট করলে চমৎকার কাজ করতে পারতেন।

১৮৮৫ সালে প্যারিসের Le Socialiste-এ প্রকাশিত হয়েছে একটি নতুন ফরাসী অনুবাদ; আজ পর্যন্ত এইটেই সেরা সংস্করণ।

এই ফরাসী থেকে একটি স্পেনীয় অনুবাদ প্রকাশিত হয় ঐ বছরেই; প্রথমে মাদ্রিদের E। Sicolista-তে, পরে পুস্তিকাকারেঃ Manifesto del Partido Comunista por Carlos Marx y F. Engels, Madrid. Administracion de El Socialista, Hernan Cortes 8.

একটা মজার ব্যাপার হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে আর্মেনিয়ান অনুবাদের একটি পাণ্ডুলিপি দেওয়া হয়েছিলো কনস্ট্যান্টিনোপল-এর একটি প্রকাশকের কাছে কিন্তু মার্কসের নামাঙ্কিত কোনো কিছু প্রকাশের সাহস এই সুবোধ ব্যক্তিটির হয় নি, তিনি বলেন লেখক হিসাবে অনুবাদকের নামটাই দেওয়া হোক, অনুবাদক কিন্তু তাতে আপত্তি করেন।

ইংল্যান্ড থেকে প্রথমে একটি ও পরে আর একটি নৃত্যুনাধিক অযথার্থ আমেরিকান অনুবাদের বারম্বার সংস্করণ প্ৰকাশিত হবার পর অবশেষে ১৮৮৮ সালে একটি প্রামাণ্য অনুবাদ বেরিয়েছে। অনুবাদ করেন আমার বন্ধু স্যামুয়েল মুর এবং প্রেসে পাঠাবার আগে আমরা দুজনে মিলে তা দেখে নিই। নাম দেয়া হয়: Manifesto of the Communist Party, by Karl Marx and Frederick Engels. Authorised English Translation, edited and annotated by Frederick Engels. 1888. London, William Reeves, 185 Fleet st, E. C. তার কতকগুলি টীকা আমি বর্তমান সংস্করণটিতেও যোগ করেছি।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

‘ইশতেহারের’ একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। সংখ্যায় তখন পর্যন্ত বেশি নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের এহেন অগ্ৰণীদের কাছ থেকে এর প্রকাশকালে জুটেছিলো সোৎসাহ অভ্যর্থনা (প্রথম ভূমিকায় উল্লিখিত অনুবাদগুলিই তার প্রমাণ), কিন্তু ১৮৪৮ সালের জুনে প্যারিস শ্রমিকদের পরাজয়ের পর যে প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়, তার চাপে বাধ্য হয়ে একে পশ্চাদপসারণ করতে হলো; এবং ১৮৫২ সালের নভেম্বরে কলোন কমিউনিস্টদের দন্ডাজ্ঞার পর শেষ পর্যন্ত ‘আইন অনুসারে’ তাকে আইন বহির্ভূত করা হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব থেকে যে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছিলো, লোকচক্ষু থেকে তার অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে ‘ইশতেহার’ও অন্তরালে যায়।

শাসক শ্রেণীদের ক্ষমতার উপর নতুন আক্রমণের পক্ষে পর্যাপ্ত শক্তি যখন ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণি আবার সংগ্রহ করতে পারল তখন ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতি’র উদয় হয়। তার লক্ষ্য ছিলো ইউরোপ ও আমেরিকার গোটা জঙ্গী শ্রমিক শ্ৰেণিকে একটি বিরাট বাহিনীতে সুসংহত করা। সুতরাং ইশতেহারে লিপিবদ্ধ নীতি থেকে তা শুরু হতে পারে না। এমন কর্মসূচি তাকে নিতে হয় যা ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়ন, ফরাসী, বেলজীয়, ইতালীয় ও স্পেনীয় প্রুধোঁবাদী এবং জার্মান লাসালপন্থীদের[২] কাছে যেন দরজা বন্ধ না করে। এই কর্মসূচি—আন্তর্জাতিকের নিয়মাবলীর মুখবন্ধ[৩] মার্কস রচনা করলেন এমন নিপুণ হাতে যে বাকুনিন ও নৈরাজ্যবাদীরা পর্যন্ত তা স্বীকার করে। ‘ইশতেহারে’ বর্ণিত নীতিগুলির শেষপর্যন্ত বিজয়ী হবার ব্যাপারে মার্কস পুরোপুরি ও একান্তভাবে নির্ভর করেছিলেন শ্রমিক শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তিগত বিকাশের উপর, মিলিত লড়াই ও আলোচনা থেকে যার উদ্ভব অনিবার্য। পুঁজির সঙ্গে লড়াই-এর নানা ঘটনা ও বিপৰ্যয়, সাফল্যের চাইতে পরাজয়ই বেশি করে, সংগ্রামীদের কাছে প্রমাণ না করে পারে না যে তাদের আগেকার সর্বরোগহর দাওয়াইগুলি অকেজো, শ্রমিকদের মুক্তির সঠিক শর্তগুলির সম্যক উপলব্ধির পক্ষে তাদের মনকে তৈরি না করে পারে না। মার্কস ঠিকই বুঝেছিলেন। ১৮৬৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার সময়কার শ্রমিক শ্রেণির তুলনায় ১৮৭৪ সালে আন্তর্জাতিক উঠে যাবার সময়কার শ্রমিক শ্রেণি সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে ওঠে। ল্যাটিন দেশগুলিতে প্রুধোঁবাদ ও জার্মানির স্বকীয় লাসালপন্থা তখন মরণোন্মুখ; এমন কি চরম রক্ষণশীল ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নগুলি পর্যন্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিলো এমন একটা পৰ্যায়ে যখন ১৮৮৭ সালে তাদের সোয়ানসি কংগ্রেসের সভাপতি তাদের তরফ থেকে বলতে পারলেন যে: ‘ইউরোপীয় ভূখন্ডের সমাজতন্ত্র আমাদের কাছে আর বিভীষিকা নেই।’ অথচ ১৮৮৭ সালের ইউরোপীয় ভূখন্ডের সমাজতন্ত্র প্রায় পুরোপুরিই ‘ইশতেহারে’ ঘোষিত তত্ত্ব মাত্র। সুতরাং কিছুটা পরিমাণে ‘ইশতেহারের’ ইতিহাসে ১৮৪৮ সালের পরবর্তী আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের ইতিহাসটাই প্রতিফলিত। বর্তমানে সমগ্র সমাজতন্ত্রী সাহিত্যের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে বেশি প্রচারিত, সর্বাধিক আন্তর্জাতিক সৃষ্টি, সাইবেরিয়া থেকে কালিফোর্নিয়া পর্যন্ত সকল দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের সাধারণ কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে তা।

তবুও প্রথম প্রকাশের সময় আমরা একে সমাজতন্ত্রী ‘ইশতেহার’ বলতে পারতাম না। ১৮৪৭ সালে দুই ধরনের লোককে সমাজতন্ত্রী গণ্য করা হত। একদিকে ছিল বিভিন্ন কল্পলৌকিক মতবাদের সমর্থকেরা, বিশেষ করে ইংলন্ডে ওয়েন-পন্থী ও ফ্রান্সে ফুরিয়ে-পন্থীরা, অবশ্য ততদিনে উভয়েই সংকীর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছিল। অন্যদিকে ছিলো অশেষ প্রকারের সামাজিক হাতুড়ে যারা সামাজিক অবিচার দূর করতে চাইত নানাবিধ সর্বরোগহর দাওয়াই ও জোড়াতালি প্রয়োগ করে—পুঁজি ও মুনাফার বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে। উভয় ক্ষেত্রেই এরা ছিল শ্রমিক আন্দোলনের বাইরের লোক এবং সমর্থনের জন্য তাকিয়ে ছিলো বরং ‘শিক্ষিত’ সম্প্রদায়ের দিকে। নিতান্ত রাজনৈতিক বিপ্লব যথেষ্ট নয় এ বিষয়ে স্থিরনিশ্চয় হয়ে শ্রমিক শ্রেণির যে অংশটি সেদিন সমাজের আমূল পুনর্গঠনের দাবি তোলে, তারা সে সময় নিজেদের কমিউনিস্ট বলত। তখন পর্যন্ত এটা ছিল অমার্জিত, নিতান্ত সহজবোধের, প্রায়শই অনেকটা স্থূল কমিউনিজম মাত্র। তবুও কল্পলৌকিক কমিউনিজমের দুটি ধারাকে জন্ম দেবার মতো শক্তি এর ছিলো—ফ্রান্সে কাবে-র ‘আইকেরীয়’ (Icarian) কমিউনিজম এবং জার্মানিতে ভাইতলিং-এর কমিউনিজম। ১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্র বলতে বোঝাত একটা বুর্জোয়া আন্দোলন, কমিউনিজম বোঝাত শ্রমিক আন্দোলন। ইউরোপীয় ভূখন্ডে অন্তত তখন সমাজতন্ত্র ছিলো বেশ ভদ্রস্থ, আর কমিউনিজম ছিল ঠিক তার বিপরীত। ততদিন আগেই যেহেতু আমাদের অতি দৃঢ় মত ছিলো যে, ‘শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি হওয়া চাই শ্রমিক শ্রেণীরই নিজস্ব কাজ, তাই দুই নামের মধ্যে কোনটি বেছে নেব সে সম্বন্ধে আমাদের কোনও দ্বিধা ছিল না। পরেও কখনো নাম বর্জন করার কথা আমাদের মনে আসেনি।

‘দুনিয়ার মজুর এক হও!’ বেয়াল্লিশ বছর আগে, প্রথম যে প্যারিস বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত তার নিজস্ব দাবি নিয়ে হাজির হয় ঠিক তারই পূর্বক্ষণে আমরা যখন পথিবীর সামনে এই কথা ঘোষণা করেছিলাম, সেদিন অতি অল্প কণ্ঠেই তার প্রতিধ্বনি উঠেছিল। ১৮৬৪ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশের প্রলেতারিয়রা আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতিতে হাত মেলায়, এ সমিতির স্মৃতি অতি গৌরবজনক। সত্যকথা, আন্তর্জাতিক বেঁচে ছিল মাত্র নয় বছর। কিন্তু সকল দেশের শ্রমিকদের যে চিরন্তন ঐক্য এতে সৃষ্টি হয়েছিলো, সে ঐক্য যে আজও জীবন্ত এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, বৰ্তমান কালটাই তার সর্বোত্তম সাক্ষ্য। কেননা ঠিক আজকের দিনে যখন আমি এই পংক্তিগুলি লিখছি তখন ইউরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত তাদের লড়বার শক্তি বিচার করে দেখছে, এই সর্বপ্রথম তারা সংঘবদ্ধ, সংঘবদ্ধ একক বাহিনী রূপে, এক পতাকার নিচে, একটি উপস্থিত লক্ষ্য নিয়ে: ১৮৬৬ সালে আন্তর্জাতিকের জেনেভা কংগ্রেসে ও আবার ১৮৮৯ সালে প্যারিস শ্রমিক কংগ্রেসে যা ঘোষিত হয়েছিলো সেইভাবে আইন পাশ করে সাধারণ আট ঘণ্টা শ্রমদিন চালু করতে হবে। আজকের দিনের দৃশ্য সকল দেশের পুঁজিপতি ও জমিদারদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে আজ সকল দেশের শ্রমিকেরা সত্যই এক হয়েছে।

নিজের চোখে তা দেখবার জন্য মার্কস যদি এখনও আমার পাশে থাকতেন!

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

লণ্ডন, ১লা মে, ১৮৯o

টীকাঃ

১. ইশতেহারের রুশ সংস্করণের জন্য মার্কস ও এঙ্গেলসের লেখা ভূমিকার হারিয়ে যাওয়া জার্মান পাণ্ডুলিপিটি খুঁজে পাওয়া গেছে ও মস্কোর মার্কসবাদ লেনিনবাদ ইন্সটিটিউটের মহাফেজখানায় তা রক্ষিত হয়েছে।– সম্পাদকের টীকা  

২. লাসাল আমাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সর্বদাই স্বীকার করতেন যে তিনি মার্কসের ‘শিষ্য’ এবং সেই হিসাবে ‘ইশতেহারই’ তাঁর মতের ভিত্তি। তাঁর যে ভক্তরা রাষ্ট্ৰীয় ক্রেডিটের সাহায্যে উৎপাদক সমবাদ্য সম্বন্ধে তাঁর দাবির চেয়ে এগিয়ে যেতে চায়নি, যারা গোটা শ্রমিক শ্রেণীকে রাষ্ট্রীয় সাহায্যের সমর্থক এবং স্বাবলম্বনের সমর্থক এই দুই ভাগে ভাগ করতে চাইত, তাদের কথা অবশ্য সসম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (এঙ্গেলসের টীকা।)

৩. কাল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, রচনা-সংকলন, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ দ্রষ্টব্য।– সম্পাদকের টীকা

আরো পড়ুন:  বিবর্তন প্রসঙ্গে
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page