আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > অর্থনীতি > পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্র একটি শোষণমূলক সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্র একটি শোষণমূলক সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্র (ইংরেজি: Capitalism) হচ্ছে মানবেতিহাসে পণ্য সম্পর্কের সামাজিক স্তর।[১] এটি একটি শোষণমূলক সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশেষ। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের কয়েকটি দেশে এই সমাজ-ব্যবস্থার প্রথম প্রতিষ্ঠা ঘটে। মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামো যে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করছে এটি আধুনিক চিন্তাধারার একটি স্বীকৃত সত্য।[২]

পুঁজিপতি বা পুঁজিবাদী (ইংরেজি: Capitalist) শব্দটির অর্থ মূলধনের মালিক। পুঁজিপতি শব্দটির ইংরেজিতে ব্যবহার Capitalism, এই ইংরেজি শব্দটি থেকেই বাংলা ভাষায় পুঁজিবাদ শব্দটির এসেছে। মধ্য সপ্তদশ শতকে ইংরেজিতে ক্যাপিটালিজম শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

পুঁজিবাদের ইতিহাস

আদিতে মানুষ যেরূপ অসহায় ছিল তেমনি আবার মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ আদি সমাজে কোনো শ্রেণীগত বিভেদ ছিল না। জীবন ধারনের জন্য উন্নত থেকে উন্নততর জীবিকার উপায় আবিস্কারের প্রয়োজন এবং ইচ্ছা মানুষের সহজাত। এই প্রচেষ্টায় শ্রেণীহীন আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সমাজ উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিক প্রভু এবং উৎপাদনের হাতিয়ারহীন দাসের শ্রেণী সমাজে পরিণত হয়। এই দাস সমাজই আবার কালক্রমে জমির মালিকানার ভিত্তিতে সামন্তপতি এবং ভূমিহীন কৃষকের সামন্তবাদী সমাজে বিকাশ লাভ করে।[২]

সামন্তবাদী সমাজের উত্তরকালে বিজ্ঞানের উন্নতি ক্রমান্বয়ে উৎপাদনের আবিস্কার হতে শুরু করে। এ সমস্ত যন্ত্রপাতির যারা মালিক হলো তারা দেখল যে, যন্ত্রপাতি চারাবার জন্য প্রচুর সংখ্যক লোকের আবশ্যক। কিন্তু তখনো অধিকাংশ মানুষ সামন্তবাদী প্রভুর হুকমে জমির সীমানার শিকলে আবদ্ধ। তারা ভূমির মালিক নয়। ভূমির দাস। নতুন শক্তি দেখল সামন্তবাদ কেবল মানুষকেই ভূমির দাস বানিয়ে রাখে নি। তার অস্তিত্ব নতুন উৎপাদনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমির মালিক এবং ভূমির দাসের পারস্পরিক সম্পর্ক শোষক এবং শোষিতের। বিজ্ঞানের অগ্রগতি সামন্তবাদের পরিবর্তন অপরিহার্য করে তুলল। কৃষকের বিদ্রোহ এবং উৎপাদনের নতুন পদ্ধতির অজেয় শক্তি সামন্তবাদকে ক্রমান্বয়ে উৎসাদিত করে নতুনতর এক সমাজ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করল যার নাম ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।

সামন্তবাদকে উচ্ছেদ করে সাম্য ও প্রগতির ঝাণ্ডা উড়িয়ে পুঁজিবাদ পৃথিবীর মঞ্চে আবির্ভূত হয়। সামন্তযুগের ভূমিদাস ব্যবস্থার মধ্যেই পুঁজিবাদের উদ্ভব। সামন্তযুগেই দেশে-বিদেশে বাণিজ্য বাড়ল, বাড়ল পণ্য দ্রব্যের আদান-প্রদান। এই বাণিজ্য বাড়ার ফলে এবং পণ্য দ্রব্য আদান-প্রদানের ব্যাপকতার কারণে ব্যবসায়ী শ্রেণি বা বণিকশ্রেণি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলাে। এরাই শিল্প-বিপ্লবের হাত ধরে আধুনিক কল-কারখানা স্থাপন করলাে, এবং পুঁজিপতি বা বুর্জোয়ায় পরিণত হলাে।[৩]

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্রের ইতিহাস হচ্ছে কয়েক শতাব্দীব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই

নতুন উৎপাদনী যন্ত্রের মালিক পুঁজিবাদী সমাজে সমাজের প্রভু হয়ে দাঁড়ায়। যন্ত্রের মালিক নির্দিষ্ট মজুরিতে যন্ত্রহীন মানুষ দিয়ে তার যন্ত্র চালায় আর অধিক থেকে অধিকতর পরিমাণে উৎপাদন করে দ্রব্য, পণ্য যা সে দেশে-দেশান্তরে বিক্রি করতে পারে এবং বিক্রি করে অর্থ আনতে পারে, অধিক যন্ত্র তৈরি করতে পারে এবং অধিকতর সংখ্যক মজুর নিয়োগ করে অধিকতর পণ্য আবার তৈরি করতে পারে। এ এক নতুন ব্যবস্থা, নতুন সমাজ। এখানে জমির চেয়ে যন্ত্র মূল্যবান। কিন্তু এ যন্ত্র থেকে লাভ অর্জনের মূল সূত্র মজুর এবং বাঁধা মজুরিতে মালিকের জন্য তার অবাধ উৎপাদনের ক্ষমতায়। যন্ত্রের মালিকের মুনাফা আসে মজুরের মজুরির অতিরিক্ত শ্রম থেকে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদনের সম্পর্কে হলো একদিকে যন্ত্রের ব্যক্তিগত মালিকানা, অপরদিকে বহু মজুরের যৌথক্রিয়ায় উৎপাদনের যৌথপদ্ধতি।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারক বুর্জোয়া শ্রেণি গণতন্ত্রের কথা বলে কৃষকদের সংগঠিত করে সামন্তবাদী শৃংখল ভেঙ্গে বিপ্লবের মাধ্যমে যে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তাতে কিন্তু মানুষ দ্বারা মানুষের শােষণের অবসান ঘটে না। এক ধরনের শােষণের পরিবর্তে এলাে অন্য ধরনের শােষণ। ভূমি দাসত্বের পরিবর্তে এলাে মজুরি দাসত্ব।

তবে পূর্বের দাস ও ভূমিদাস এই দুই সমাজ ব্যবস্থার মত এখানে শ্রমিক পুঁজিবাদীর দাসত্ব-শৃঙ্খলে এবং জমির সাথেও আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা নয়। কিন্তু মজুরি দাসত্বের অদৃশ্য বন্ধনে বাধা। পুঁজিবাদের প্রথম দিকে শ্রমিক শ্রেণিকে ২০-২২ ঘণ্টা শ্রম করতে বাধ্য করা হলেও পরবর্তীতে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের ফলে ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস চালু করতে বাধ্য হয়। যদিও আমাদের দেশে শ্রমিকেরা এখনাে ১২-১৪ ঘণ্টা শ্রম করে থাকেন। 

মুনাফাই পুঁজিবাদী উৎপাদনের মূল চালিকা শক্তি। আর মুনাফা আসে শ্রমিকদের উদ্বৃত্ত মূল্য শােষণ থেকে। এই পুঁজিবাদী সমাজকে উচ্ছেদ করেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে ও হবে।

পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে বিকাশের পর উপনিবেশিক ও নয়া উপনিবেশিক দেশে পুঁজিবাদের ধারকরা জাতীয় বুর্জোয়া এবং আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া এভাবে বিভক্ত হয়ে যায়।

আরো পড়ুন:  শ্রেণিসংগ্রাম প্রসঙ্গে মার্কসবাদ

পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রথমে করেন কার্ল মার্কস এবং তাঁর আজীবন সঙ্গী ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। তাঁরা সামন্তবাদের সঙ্গে তুলনাক্রমে সমাজ বিকাশে ধনতন্ত্রবাদের অগ্রসর ভূমিকার কথা যেমন উল্লেখ করেন তেমনি এ সমাজেরও অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এবং বৈষম্যেরও উদঘাটন করেন। যন্ত্রের ব্যক্তিগত মালিকানা এবং তাঁর উৎপাদনের যৌথ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে এর দ্বন্দ্ব। সামাজিক ক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব হচ্ছে যন্ত্রের মালিকদের শোষণ এবং যন্ত্রের মালিকদের শোষণ এবং যন্ত্রের শোষিত শ্রমিকদের দ্বন্দ্ব। এই বৈষম্য এবং দ্বন্দ্ব পরিণামে ধনতন্ত্রীদের উৎপাদনের কারণ হয়ে নতুনতম সমাজতান্ত্রিক সমাজ বা উৎপাদনের উপায়ের যৌথ মালিকানা এবং যৌথ মালিকদের যৌথ উৎপাদনের নতুন ব্যভস্থা প্রবর্তণ করবে বলে মার্কসবাদীগণ বিশ্লেষণ করে দেখান। সমাজবিকাশের এই প্রক্রিয়ায় একাধিক দেশে ধনতন্ত্রবাদের স্থলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অপরাপর দেশের প্রধান আর্থিক ব্যবস্থা এখনো ধনতান্ত্রিক।

পুঁজিবাদের অগ্রসর ভূমিকা ইউরোপেই প্রধানত কার্যকরী হয়। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দী যখন শেষ হচ্ছে পুঁজিবাদ তখন নিজ নিজ দেশের সীমা অতিক্রম করে বিদেশকে করায়ত্ত করে নতুন সাম্রাজ্যবাদী বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে শুরু করেছে। ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং পরবর্তীকালে পুঁজিবাদী দেশ কিংবা পুঁজিবাদী গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অধিক থেকে অধিকতর উৎপাদন এবং ক্রমাধিক মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতাই হচ্ছে পুঁজিবাদের মূল চালিকাশক্তি। এ কারণেই নিজ দেশে মুনাফার বৃদ্ধি সীমিত হয়ে এলে পুঁজিবাদ অপর দেশ দখল করে মুনাফার ক্রমাধিক বৃদ্ধির প্রাণশক্তিকে জীবিত এবং সক্রিয় রাখতে চায়। ক্রমে আবার এই প্রয়াস পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের আকার গ্রহণ করে।

তথ্যসূত্র:

১. এই সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন, অনুপ সাদি, ১৯ মে ২০১৫, পুঁজিবাদ মানবেতিহাসে পণ্য সম্পর্কের সামাজিক স্তর, মার্কসবাদ, ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা ৬৮-৭৫ ।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯।
৩. রায়হান আকবর, রাজনীতির ভাষা পরিচয়, আন্দোলন প্রকাশনা, ঢাকা, জুন ২০২০, পৃষ্ঠা ৩১।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page