আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > সাহিত্যকোষ > ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদু বাস্তববাদ প্রসঙ্গে — সৌগত মুখোপাধ্যায়

ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদু বাস্তববাদ প্রসঙ্গে — সৌগত মুখোপাধ্যায়

ম্যাজিক রিয়ালিজম আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের কোনো নির্দিষ্ট আন্দোলন বা সময়কাল সম্পর্কিত ধারণা নয়। স্প্যানিশ আমেরিকার কিছু কথাসাহিত্যিকের রচনার গায়ে সমালোচকেরা এই বিশেষ তকমাটি লাগানোর বহু আগেই লাতিন আমেরিকায় এমন কিছু রকমারি সাংস্কৃতিক ধারণা আর দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ ঘটে যা এই সাহিত্য সংজ্ঞাটির উদ্ভব ও ব্যবহারকে প্রভাবিত করেছিল। বাস্তবতার যে আধুনিক ধারণা আজ লাতিন আমেরিকার চেতনায় পাওয়া যায়, তা আসলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর (যার মধ্যে রয়েছে ইস্পানিক দখলকারী, তার ‘ত্রেওল’ উত্তরসূরি, স্থানীয় মানুষ আর আফ্রিকান দাস) বিশ্বাস আর সংস্কারের এক অনবদ্য মেলবন্ধনের ফলশ্রুতি। স্থানীয় ও ইউরোপীয় কালপঞ্জিকারদের লেখায় আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ আর তার উপনিবেশীকরণের যে বৃত্তান্ত পাওয়া যায় তা ওই গোষ্ঠীগুলির অভিজ্ঞতার রঙে রঙিন। ‘নয়া দুনিয়া’ সম্পর্কে বেশ কিছু ভ্রান্ত প্রাকধারণা এবং অলীক চিত্রকল্প পোষণ করা ছাড়াও ইউরোপীয় কালপঞ্জিকারদের বৃত্তান্তের ছক হামেশাই নির্ভর করেছে লিব্রেস্ দে কাবায়েরিয়াস (Books of Chivalry)-এর ওপর যেখানে কাল্পনিক নায়কের অতিবাস্তব এবং অসম্ভব সমস্ত কাণ্ডকারখানার কথা বলা হত। ইউরোপীয় নবজাগরণের ইতিহাসতত্ত্ব আর বাকধারা (Rhetoric)-র পরম্পরা মেনে এক্ষেত্রেও কাহিনি আর হকিকতের মধ্যে ফারাক থাকত সামান্যই। স্থানীয় কালপঞ্জিকারেরাও তাদের মৌখিক গল্প বলার ঐতিহাকে স্বীকার করে পুরাণ আর রূপকথাকে ইতিহাসের প্রাথমিক উৎস বলে মনে করতেন এবং নিজেদের বৃত্তান্তে কল্পনা আর সত্যের সংমিশ্রণ ঘটাতেন। আজ তাই, অনেক সমালোচকের মতে, পুরাণের মতে, ম্যাজিক রিয়ালিজমও আসলে বাস্তবকে দেখবার এক বহুমাত্রিক এবং সামগ্রিক পদ্ধতি।

ম্যাজিক রিয়ালিজম শব্দটির উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় ফ্রানৎস্ রো (১৮৯০ – ১৯৫৫) নামক এক জার্মান কলা সমালোচকের বইয়ে, যার নাম নাখ এক্সপ্রেসিওনিজমুস্ : মাগিশের রেয়ালিজমুস : প্রোবলেমে ড্যের নয়েস্টেন অয়রোপেইশেন্ মালেরাই (১৯২৫; এক্সপ্রেশনিজম-এর পর ম্যাজিক রিয়ালিজম : নবীনতম ইউরোপীয় চিত্রকলার সমস্যাবলি)। পরে, ১৯২৭ সালে বইটি এস্পানিওল ভাষায় আংশিক অনুবাদাকারে রেভিস্তা দে অক্সিদেন্তে পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়। রোর মৌলিক ধারণা অনুযায়ী অবশ্য ম্যাজিক রিয়ালিজম উত্তর-এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকলা (১৯২০-২৫)-এর সমার্থক আর তাকে কুহকী মনে হওয়ার কারণ এই যে সেই সমস্ত ছবির উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন জীবনের রহস্যজনক উপাদানগুলিকে মেলে ধরা। একটি সাহিত্যশৈলী হিসাবেও ম্যাজিক রিয়ালিজমকে রো কখনো কল্পনা আর বাস্তবের মিশ্রণ বলে মনে করেননি। তার মতে শব্দটির ব্যবহারিক ভিত্তি ছিল দৈনন্দিন বাস্তবের মধ্যেই শক্তভাবে গাঁথা আর তা ছিল রোজকার জীবনের চমকের সামনে মানুষের বিস্ময়েরই অভিব্যক্তি।

লাতিন আমেরিকার লেখকদের মধ্যে ভেনেজুলেয়ার আর্তুরো উসলার পায়েত্রি তার ওম্ব্রেস ই লেত্রাস দে ভেনেজুয়েলা (১৯৪৮; ভেনেজুয়েলার মানুষ ও চিঠি) বইয়ে প্রথম ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথা বলেন যদিও রোর কোনো উল্লেখ সেখানে ছিল না। উসলার পায়েত্রির সংজ্ঞাটিকে (যা মোটামুটি রোর সংজ্ঞারই অনুরূপ) ভেনেজুয়েলার কিছু ছোটো গল্পে প্রয়োগ করা হয়। গল্পগুলি লেখা হয়েছিল আধাগদ্য-আধাকবিতা রীতিতে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নির্ভর হয়েও তাদের প্রসঙ্গ আর চরিত্র ছিল অবাস্তব। এর কিছুদিন পরেই, ১৯৯০ সালে কিউবার আলেহো কার্পেন্তিয়ের তার এল রেইনো দেল এস্তে মুনদো (এই মর্ত্যের রাজত্ব) বইয়ের সূচনায় উল্লেখ করেন লাতিন আমেরিকার লো রেয়াল মারভিয়োসো বা অলৌকিক বাস্তবতার কথা। সেই ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন বাস্তবতার বর্ণনা প্রসঙ্গে সেখানে তিনি জোর দেন আমেরিকার ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার উপর। পরে অবশ্য তিয়েন্তোস ই দিফারেন্সয়াস (১৯৬৪; স্পর্শ ও ভিন্নতা) বইয়ে তিনি স্বীকার করেন যে বাস্তবের এই অলৌকিক দিক শুধুমাত্র আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তার নিদর্শন রয়েছে। এল রেইনো দেল এস্তে মুনদো প্রকাশিত হওয়ার বছরেই গুয়াতেমালার মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের ওম্ব্রেস দে মাইজ (জনারের মানুষ) প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি ‘কুহকী বাস্তববাদ’-এর কথা তোলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কার্পেন্তিয়ারের সঙ্গে আস্তুরিয়াসের প্রথম মোলাকাত হয় পারি শহরে এমন একটা সময়ে যখন সেখানে পরাবাস্তববাদের বিপুল রমরমা। পরবর্তীকালে কার্পেন্তিয়ার এই রীতিটির সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেন পরাবাস্তববাদ হলো সেই বাস্তবের এক কৃত্রিম অনুকরণ যার ভেতরেই আসলে অনেক অলৌকিকের উপস্থিতি রয়েছে। উল্টোদিকে তিনি মনে করতেন, লাতিন আমেরিকার ‘অলৌকিক বাস্তবতা’ আসলে অলৌকিক সম্পর্কে আস্থাশীল এক মুহূর্তের সচেতনতা যা লেখককে পাঠকের কাছে বাস্তবের অবাস্তব দিকগুলি মেলে ধরতে সাহায্য করে। একথা অবশ্য মনে রাখতে হবে যে কুহকী বাস্তববাদ সম্পর্কে কার্পেন্তিয়ের আর উসলার পায়েত্রির ধারণা তাদের সাহিত্য ও সমালোচক জীবনের এক উৎক্রমণশীল পর্যায়ের সঙ্গেই যুক্ত, সমগ্র সাহিত্য জীবনের বৈশিষ্ট্য নয়।

সমালোচক আনহেল ফ্লোরেস তার বিখ্যাত রচনা Magical Realism in Latin American Fiction (১৯৫৫)-এ শব্দটিকে সমালোচক মহলে জনপ্রিয় করে তোলেন। শব্দটির মূল অর্থের পরিসরকে বাড়িয়ে তিনি হোরহে লুই বোর্হেস আর মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের রচনাকেও এই রীতির আওতায় এনে ফেলেন। ফলে ম্যাজিক রিয়ালিজমের সরলীকৃত অর্থ হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র ‘রিয়্যাল’ আর ‘মার্ভেলাস’-এর সংমিশ্রণ। মেক্সিকোর সমালোচক লুইস লিল অবশ্য ফ্লোরেসের ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে রোর মূল ব্যাখ্যায় ফিরে যান এবং বলেন শব্দটির মানে আসলে বাস্তবের প্রতি এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে রোজকার জীবনের কাব্যিক আর রহস্যজনক দিকগুলির ওপর থাকবে নজর, বাদ যাবে সমস্ত অলৌকিক উপাদান।

১৯৮২ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাষণে কলম্বিয়ার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস উল্লেখ করেন লাতিন আমেরিকার ‘বিশাল বাস্তবতা’-র কথা যা কিনা ‘এবছর সুইডেনের সাহিত্য অকাদেমির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে’ (ভাষান্তর : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)। তার মতে এই অতিকায় বাস্তবতাকে লাতিন আমেরিকার বাইরে থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় আর সেটিই এই বিশাল ভূখণ্ডের নিঃসঙ্গতার কারণ। তাই লাতিন আমেরিকার সাহিত্যিক অভিব্যক্তিতে ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এমন এক আখ্যানরীতির যা সেই বাস্তবতাকে মেলে ধরবে ইউরোপ তথা গোটা বিশ্বের কাছে। কাজেই তাঁর কালজয়ী সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ (১৯৬৭; একশ বছরের নিঃসঙ্গতা) বইয়ে যে কুহকী বাস্তববাদের প্রভাব থাকবে যথেষ্ট, এটা আশ্চর্যের কিছুই নয়। ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কল্পনা আর সত্যের সংমিশ্রণ ছাড়াও রয়েছে আঁকাবাঁকা এবং গোলকধাঁধাময় কাহিনিক্রম : দক্ষ কালপরিবর্তন; স্বপ্ন আর রূপকথার মিলিজুলি ব্যবহার; অভিব্যক্তিবাদী, কখনো বা পরাবাস্তববাদী বর্ণনা; চমক, এমনকী আকস্মিক শক, বীভৎস আর ব্যাখ্যাতীতের উপস্থিতি। সাতের দশক পর্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই আখ্যানরীতিটির প্রভাব লাতিন আমেরিকা আর ইউরোপের সাহিত্যিকদের মধ্যে আজও যথেষ্ট।

পেইন্টিঙয়ের ইতিহাসঃ নিবন্ধে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি পল ক্যাডমাসের (১৯০৪ – ১৯৯৯) দ্য ফ্লিটস ইন, যেটি আঁকা হয়েছিল ১৯৩৪ সালে।

তথ্যসূত্র:

১. সুধীর চক্রবর্তী; বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৫২৪-৫২৬।

আরো পড়ুন:  এরা শহরের পরগাছা, জনগণ বিচ্যুত। এদের দিয়ে কিছু হবে না।
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page