আধুনিকতাবাদী সাহিত্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহে নিরীক্ষামূলক কিছু করার প্রবণতা

আধুনিকতাবাদী সাহিত্য বা আধুনিকবাদী সাহিত্য বা সাহিত্য আধুনিকতাবাদ বা সাহিত্য আধুনিকবাদ (ইংরেজি: Literary modernism, বা modernist literature) হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক নতুন সাহিত্য আন্দোলন। প্রচলিত নিয়মনীতি, রীতি, প্রভাব, ঐতিহ্য পরম্পরা থেকে সরে যাওয়াই সাহিত্যে আধুনিকতা রূপে চিহ্নিত হয়েছে। ইউরোপে গণতন্ত্রের উদ্ভবের সংগে আধুনিকতাবাদের উদ্ভবের যোগ আছে। সামন্তবাদী মূল্যবোধ ও ধ্যানধারণাকে বিসর্জন দিয়ে আধুনিকতা সাধারণভাবে ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ, স্বতন্ত্র বিচার ও মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দেয়।[১]

সমাজ রূপান্তরের বিশেষ একটা পর্বকে যদি বলা হয় আধুনিক, তাহলে সেইসব লক্ষণকে আমরা আমাদের সামাজিক সাহিত্য বিশ্লেষণে যেভাবে ব্যবহার করি, তাকে বলা যেতে পারে সাহিত্যের আধুনিকতাবাদ। সেই অর্থে আধুনিকতাবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী যুগের সৃষ্টি। সেই অর্থে, আধুনিকতাবাদ মূলত একচেটিয়া পুঁজিবাদী সমাজগুলিতে বিকাশ লাভ করেছে, যদিও এর সমর্থকরা প্রায়ই ভোক্তাবাদকেই প্রত্যাখান করে। তবে উচ্চ আধুনিকতাবাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ভোক্তা সংস্কৃতির সাথে মিশতে শুরু করে, বিশেষত ১৯৬০-এর দশকের বছরগুলোতে।[২]

আধুনিকতাবাদী সাহিত্য নিজে কোনো একদেশদর্শী বা একমুখী শিলীভূত বস্তু নয়। সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বেশ কয়েকটি আন্দোলনকে আধুনিকবাদের পরিসীমার মধ্যে সনাক্ত করা হয়ে থাকে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রতীকবাদ, ভবিষ্যবাদ, প্রকাশবাদ, চিত্রকল্পবাদ, ইমেজিজম, দাদাবাদ, পরাবাস্তববাদ, আঙ্গিকবাদ, ইম্প্রেশনিজম, অভিব্যক্তিবাদ, ভবিষ্যবাদ, ভর্টিসিজম প্রভৃতি আন্দোলন আধুনিকবাদের পরিসীমার মধ্যে পড়ে। এই আন্দোলনগুলোর চরিত্রে ভিন্নতা আছে, এমনকি পরস্পরবিরুদ্ধও আছে। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে আধুনিকবাদ সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অনস্বীকার্য পর্যায়।[৩]

উৎস এবং পূর্বসূরীরা

সাহিত্য আধুনিকতাবাদ বা আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের সূত্রপাত মূলত ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাতে ১৯ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে। এই সাহিত্য আন্দোলন বিকশিত হবার কারণ হচ্ছে ভিক্টোরিয় যুগের দৃঢ়তা, রক্ষণশীলতা এবং নৈর্বক্তিক সত্যের ধারণায় বিশ্বাসের প্রতি এক সাধারণ মোহমুক্তির বোধ।[৪]

সাহিত্য আধুনিকতাবাদ কবিতা ও গদ্যগল্প উভয় ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যবাহী লেখন পদ্ধতির সাথে একটি স্ব-সচেতন বিচ্ছেদ চিহ্নিত করে। আধুনিকতাবাদীরা সাহিত্যের রূপ এবং অভিব্যক্তি নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, যেমনটি ইজরা পাউন্ডের নীতিবচন “এটিকে নতুন বানাও” উদাহরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।[৫] এই সাহিত্যিক আন্দোলনটি প্রতিনিধিত্বের ঐতিহ্যগত পদ্ধতিগুলিকে উল্টানোর সচেতন আকাঙ্ক্ষায় চালিত হয়েছিল এবং এই আন্দোলন তাদের সময়ের নতুন সংবেদনশীলতা প্রকাশ করেছিল।[৬] প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীভৎসতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে, সমাজ সম্পর্কে বিদ্যমান অনুমানগুলিকে পুনরায় বিবেচনা করার প্রয়োজন হয়েছে।[৭]

আরো পড়ুন:  দাদাবাদ বিশ শতকের ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতরকার শিল্প আন্দোলন

আধুনিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন কখন শুরু হয়েছিল তা এটি বিতর্কযোগ্য বিষয়। যদিও কেউ কেউ ১৯১০ সালকে মোটামুটিভাবে আধুনিকতাবাদের সূচনা এবং উপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসকে চিহ্নিত করেছিলেন তার প্রকাশ হিসেবে। উলফ ঘোষণা করেছিলেন যে মানব প্রকৃতি “১৯১০ সালের ডিসেম্বরে বা প্রায় তখনই” একটি মৌলিক পরিবর্তন লাভ করেছে।[৮] তবে আধুনিকতাবাদ ১৯০২-এর মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল, যেমন ইতিমধ্যে প্রকাশিত জোসেফ কনরাডের (১৮৫৭–১৯২৪) হার্ট অফ ডার্কনেস, আলফ্রেড জেরির (১৮৭৩–১৯০৭) অবাস্তব নাটক, উবু রুই এরও আগেও ১৮৯৬ সালে হাজির হয়েছিল।

আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরীরা হলেন শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১–৬৭) এবং অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ (১৮৪৯–১৯১২); বিশেষত স্ট্রিন্ডবার্গের পরবর্তী ত্রিনাটক যেমন টু দামেস্ক (১৮৯৮-১৯০১), আ ড্রিম প্লে (১৯০২), দ্য ঘোস্ট সোনাটা (১৯০৭) আধুনিকতাবাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আধুনিকতাবাদ

১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে মার্সেল প্রুস্ত, ভার্জিনিয়া উলফ, রবার্ট মুসিল এবং ডরোথি রিচার্ডসনের উপন্যাসগুলি সহ উল্লেখযোগ্য আধুনিকতাবাদী রচনাগুলি লিখিত হতে থাকে। আমেরিকান আধুনিকতাবাদী নাট্যকার ইউজিন ও’ নিলের লেখালেখি শুরু হয় ১৯১৪ সালে, তবে তাঁর প্রধান রচনাগুলি ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকে এবং ১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে আবির্ভূত হয়েছিল। ডি এইচ লরেন্সের লেডি চ্যাটারলির প্রেমিকা ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯২০-এর দশক আধুনিকতাবাদী কবিতায় সন্ধিক্ষণের সময় হিসাবে প্রমাণিত হবে। এই সময়কালে, টি এস এলিয়ট তাঁর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্য রচনা প্রকাশ করেছিলেন, যার মধ্যে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড, দ্য হলো মেন এবং অ্যাশ ওয়েডনেসডে রয়েছে।

হৃতসর্বস্ব প্রজন্ম

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেয়া অগণিত তরুণ এবং প্রাণে বেঁচে থাকা কিন্তু নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং অন্যান্য দিক থেকে পঙ্গু, উদ্দেশ্যহীন, ভেসে বেড়ানো প্রজন্ম সম্পর্কে যুদ্ধের পর লস্ট জেনারেশন বা হৃতসর্বস্ব প্রজন্ম অভিধাটি নিয়মিত প্রযুক্ত হতো। কথাটির উদ্ভাবক সেই সময়ের ‘আভাঁ-গার্দ’ শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক গারট্রুড স্টেইন (১৮৭৪-১৯৪৬)। হৃতসর্বস্ব প্রজন্মের জীবনযাত্রা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচার আচরণের চমৎকার চিত্র পাওয়া যায় কতিপয় মার্কিন উপন্যাসিকের সাহিত্যকর্মে, বিশেষভাবে স্কট ফিটজিরাল্ড ও আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসে।[৯]

আরো পড়ুন:  অস্তিত্ববাদ আধুনিক দর্শনের একটি চিন্তাধারা

যুদ্ধদীর্ণ ইউরােপে নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর নিদারুণ অভাব এবং তার জন্য জীবনযাত্রার মানের অবনমন, যুদ্ধে বিরাট সংখ্যক তরুণের আত্মাহুতিতে সমাজের বিরাট গহ্বর, যারা যুদ্ধসামগ্রি সরবরাহ ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল তাদের বিপুল ঐশ্বর্য, এই সমস্তই মানুষের মনকে বিষাক্ত করিয়া তুলেছিল। যুদ্ধোত্তর ইউরােপে নৈতিক মানেরও বিশেষ অধোগতি হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেই যুগের চিন্তাশীল লেখকদের লেখায় এই মােহভঙ্গ ও অবসন্নতার রূপটি করুণভাবে ফুটিয়া উঠিছিল।[১০]

তথ্যসূত্র:

১. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোষ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ২০-২১।
২. সৌরীন ভট্টাচার্য, বুদ্ধিজীবীর নোটবই, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, “আধুনিকতা ও আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে” নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৮-৫৬।
৩. খোন্দকার আশরাফ হোসেন, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি মোস্তফা আহাদ তালুকদার সম্পাদিত, “আধুনিকবাদ”, ভাষাপ্রকাশ, তৃতীয় সংস্করণ অক্টোবর ২০১৭, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৪৬।
৪. M. H. Abrams,A Glossary of literary Terms (7th edition). (New York: Harcourt Brace), 1999), p. 167.
৫. Pound, Ezra, Make it New, Essays, London, 1935.
৬. Childs, Peter (2008). Modernism. Routledge. p. 4. ISBN 978-0415415460.
৭. Morley, Catherine (1 March 2012). Modern American Literature. EDINBURGH University Press. p. 4. ISBN 978-0-7486-2506-2. Retrieved 20 April 2013.
৮. Virginia Woolf. “Mr. Bennett and Mrs. Brown.” Collected Essays. Ed. Leonard Woolf. Vol. 1. London: Hogarth, 1966. pages 319-337.
৯. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ৮৭।
১০. কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানী, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৬৭, পৃষ্ঠা ২৪৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!