আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > সাহিত্যকোষ > রোমান্টিকতাবাদ একটি শৈল্পিক, সাহিত্যিক, সাংগীতিক এবং মনীষাগত আন্দোলন

রোমান্টিকতাবাদ একটি শৈল্পিক, সাহিত্যিক, সাংগীতিক এবং মনীষাগত আন্দোলন

রোমান্টিকতাবাদ

রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম (ইংরেজি: Romanticism) বা রোম্যান্টিক যুগ ছিল একটি শৈল্পিক, সাহিত্যিক, সাংগীতিক এবং মনীষাগত আন্দোলন যা অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে উদ্ভূত হয়েছিল এবং বেশিরভাগ অঞ্চলগুলিতে আনুমানিক ১৮০০ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে শীর্ষে ছিল। রোমান্টিকতাবাদ আবেগ এবং ব্যক্তিত্ববাদের উপর জোর দেওয়ার সাথে সাথে সমস্ত অতীত ও প্রকৃতির গৌরব দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল, যা ধ্রুপদী যুগের চেয়ে মধ্যযুগীয়তাকে বেশি পছন্দ করে। এটি আংশিকভাবে শিল্প বিপ্লবের বা আধুনিকতার সমস্ত উপাদান যথা আলোকায়নের যুগের অভিজাত সামাজিক এবং রাজনৈতিক নিয়ম এবং প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের প্রতিক্রিয়া ছিল।[১] এটি দৃশ্যকলা, সংগীত এবং সাহিত্যে সবচেয়ে শক্তিশালীরূপে মূর্ত ছিল, তবে ইতিহাসধারা, শিক্ষা, দাবা, সামাজিক বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উপর এর প্রভাব পড়েছিল। রোমান্টিক চিন্তাবিদরা উদারবাদ, আমূলসংস্কারবাদ, রক্ষণশীলবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে প্রভাবিত করে রাজনীতিতে এর উল্লেখযোগ্য ও জটিল প্রভাব ফেলেছিল।[২]

ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির যুগের বিপুল কর্মকাণ্ড চলাকালীন জার্মানিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর সাতের দশকে শুরু হয় ‘স্টর্ম এন্ড ড্রাং’ ঝড় ও চাপ (এটি ক্লিংগারের ১৭৭৬ সালের নাটকের উপশিরোনাম) আন্দোলন, ঘোষিত হয় কঠোর নিয়ম ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে জেহাদ। গ্যেটের উপন্যাস তরুণ ওয়ের্থরের দুঃখ (১৭৭৪) ইউরোপে মুক্তির আধিক্যের বদলে কল্পনার ভাবালুতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই আন্দোলনের প্রথম পর্ব প্রতিষ্ঠা করে। তৈরি হলো রোমান্টিক ‘শিল্পী’র ধারণা, যেখানে ‘শিল্পী’ হলো নির্বাচিত প্রাকৃতিক দৈবিক শক্তি এবং শিল্পকর্ম স্বতন্ত্র ও অভিনব। প্রাপ্তবয়স্কদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিপরীতে প্রকৃতি, শিশু, অসভ্যতা আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত হলো, না পাওয়ার বেদনায় সার্থক হলো রোমান্টিক প্রেম।[৩]

মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের প্রধান লেখকদের মধ্যে যে ‘রোমান্টিক’ আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষিত হয়, যা নিওক্লাসিক ধারা থেকে তাদের স্বতন্ত্র করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে গতানুগতিক প্রচলিত ধারা অনুসরণ করার পরিবর্তে রোমান্টিক সাহিত্য আন্দোলন ছিল নতুন কিছু সৃষ্টির প্রবণতা। প্রাচীন ক্লাসিকাল লেখকদের রীতির সঙ্গে মিল থাকার বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিলেন না। রোমান্টিক কবিতার যাত্রা শুরু হলো এক ধরনের প্রতিবাদী বিদ্রোহাত্মক ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজের ‘লিরিকাল ব্যালাডস’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের (১৮০০) ভূমিকায় বলা হলো যে কবিতার বিষয় হবে ‘common life’ এবং তার ভাষা হবে ‘a selection of language really used by men.’ রোমান্টিক কবিরা নিওক্লাসিক যুগের লেখকদের কাব্যিক ভাষা (poetic diction), মার্জিত সচেতন শালীনতা, নিয়ন্ত্রিত আবেগ পরিহার করলেন। তাদের কবিতায় একদিকে দেখা দিল সহজ সরল সাধারণ গ্রামীণ জীবন, অন্যদিকে অতীন্দ্রিয় অপার্থিব জগৎ এবং রহস্যময় সুদূর অতীতের আবেগঘন উপলব্ধি। 

আরো পড়ুন:  Bernard Shaw's view on War as the Coward’s Art

২. ‘লিরিকাল ব্যালাডস’-এর ভূমিকায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ বারবার ভালো কবিতাকে বর্ণনা করেছেন ‘the spontaneous overflow of powerful feelings’ বলে। এখানে জোর পড়ল স্বতঃস্ফূর্ততার উপর; নিয়ম মানা; আয়াসসাধ্য, সচেতন শিল্পসৃষ্টির উপর নয়। নিওক্লাসিক পূর্বসূরিদের সঙ্গে অন্যতম মৌল পার্থক্য এখানেই। কীটস লিখলেন: ‘If poetry comes not as naturally as the leaves to a tree, it had better not come at all.’

৩. রোমান্টিক কাব্যে বহিপ্রকৃতি, গাছপালা, ফল-ফুল-পাখী, নদী সমুদ্র আকাশ পর্বত প্রভৃতিকে দেখা গেল নিরাভরণ সৌন্দর্যের মধ্যে। এই কাব্যে প্রকৃতির চিত্র পাওয়া গেল একদিকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্যানুভূতির মধ্যে, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির মধ্যে। এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকলো মানবিক ক্রিয়াকলাপ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ উচ্চারণ করলেন যে মানুষের মনই হচ্ছে ‘my haunt, and the main region of my song’. 

৪. নিওক্লাসিক কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে অন্য মানুষ, কিন্তু রোমান্টিক কবিতার বিষয় প্রধানত কবি নিজে, সেখানে তার আপন চিন্তা, ভাবনা, আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে ওঠে। অনেক সময় এটা ঘটে প্রত্যক্ষভাবে। বহু গীতিকবিতায় আমরা তা দেখি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘প্রিলিউড’-এও তার পরিচয় স্পষ্ট। কখনো কখনো এর প্রকাশ ঘটে পরোক্ষ। কবি নিজের নামে কথা বলেন না, কিন্তু তাকে চিনে নিতে পাঠকের কষ্ট হয় না। স্মরণ করুন বায়রনের ‘চাইন্ড হ্যারল্ড’-এর কথা। তবে রোমান্টিক বিষয়বস্তু, তথা ব্যক্তি, কবি নিজে হন কিংবা অন্য কেউ হন, তিনি কোনো সুসংগঠিত সমাজের অংশ নন, বরং তাকে আমরা দেখি একাকী, নিঃসঙ্গ, সভ্য-সমাজের গতানুগতিক গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসা, প্রায়ই বিদ্রোহী রূপে। 

৫. ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে মানুষের সীমাহীন সম্ভাবনার যে প্রতিশ্রুতি ছিল তা রোমান্টিক কবিদের সুস্পষ্টভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তারা মানুষকে দেখলেন বিপুল সম্ভাবনাময়রূপে। সকল প্রকার অন্যায় অবিচারকে হটিয়ে দিয়ে, সকল কৃত্রিম বাধা ও শৃঙ্খল ছিন্ন করে মানুষ তার মহত্ত্বকে জয়যুক্ত ও প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে এই বিশ্বাসে তারা ছিলেন উজ্জীবিত। ব্যর্থ হলেও তাদের উদ্দেশ্যের নিষ্কলঙ্ক শুভ্রতা ও মহত্ত্ব মানুষকে গৌরবান্বিত করবে। রোমান্টিক যুগের কয়েকটি দীর্ঘ কবিতায় এর প্রতিফলন লক্ষণীয়। স্মরণ করুন শেলীর ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ এবং কীটস-এর ‘হাইপেরিয়ন’-এর কথা।[৪]

আরো পড়ুন:  ফ্যাবিয়ান সমিতি বা ফ্যাবিয়ানবাদ হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজবাদী সমিতি

সময়কাল

রোমান্টিকতার উদ্ভব ও বিস্তার সম্পর্কে ধারণা কিছু রাজনৈতিক ঘটনায় মনোযোগ দিতে হয়। যারা বলেন আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ (১৭৭৬) এবং ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) রোমান্টিকতার ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল, তারা এই অর্থেই বলেন—এই দুটি বিপ্লবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বহুকাল প্রচলিত, বিধিবদ্ধ ও যান্ত্রিক নিয়মাবলির শৃঙ্খল ভেঙে দেশের জনতার ক্ষোভ, প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও সংগ্রাম বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই সমগ্র জনতা গড়ে উঠেছিল এক-একজন ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে। প্রতিটি সাধারণ মানুষ যে পূর্বনির্ধারিত প্রশাসনবিধির অধীনে বাধ্যতামূলক নিপীড়িত জীবনযাপন করছিল, সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসে নিজের পৃথিবী গড়ে নিয়ে সেখানে স্বাধীন পদক্ষেপ রাখতে চেয়েছিল সাধারণ মানুষ। যে কোনো দেশেই যে কোনো বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন এভাবে প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তির মনের তরঙ্গগুলো একস্রোতে বাহিত হয়ে সৃষ্টি করে জনসমুদ্র। এই যে রাজা তথা প্রশাসক ব্যক্তি নাগরিককে মূল্য দিতে বাধ্য হলো—এখানেই নিহিত আছে রোমান্টিকতার বীজ—ব্যক্তি-অনুভবের মুক্তি এবং স্বাতন্ত্র। যদিও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে একইসঙ্গে রোমান্টিকতার প্রথম ধারণা অনুভূত হতে শুরু করেছিল তবু এ ব্যাপারে জার্মান দর্শনবিদদের কথা বলতে হবে প্রথমে। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, যখন শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে গ্রিক শিল্প ধারণার ধ্রুপদী লক্ষণসমূহ তথা ক্ল্যাসিসিজম ছিল সর্বতোস্বীকৃত তখনও কিন্তু ক্ল্যাসিসিজমের সঙ্গে রোমান্টিসিজমের বিচ্ছেদের ক্ষেত্র একেবারে অসম্ভব হয়নি।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ট্র্যাজেডির জন্ম’ নামক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে ফ্রিডরিক নিটশে রূপাবয়বের বিন্যাসগত সৃষ্টি এবং যুক্তি-বন্ধন-বিহীন প্রবল ভাবাবেগের অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছাসের পার্থক্য করে দুটিকে স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। এখান থেকেই ক্ল্যাসিকের ধারণার রূপগত এবং সংহতি-ঘন প্রাঞ্জল সৌন্দর্যের সৃষ্টিজগৎ ভেঙে অবয়ব-সংগতি বর্জিত তীব্র হৃদয়াবেগের শৈল্পিক অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া হলো। আত্মস্থ ক্ল্যাসিক নির্মাণ ভেঙে দেখা দিল রোমান্টিকের মর্মছেড়া যন্ত্রণা। নিটশের মতে চিরকালই ছিল এই সংযোগের পরিসর।[৫]

পেইন্টিঙয়ের ইতিহাস: নিবন্ধে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি উইলিয়াম ব্লেকের (২৮ নভেম্বর ১৭৫৭ – ১২ আগস্ট ১৮২৭) আঁকা ওবেরন, টাইটানিয়া এবং পাক পরীদের সাথে নৃত্যরত যেটি আঁকা হয়েছিল ১৮৩০ সালে।

আরো পড়ুন:  হৃতসর্বস্ব প্রজন্ম ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের সামাজিক প্রজন্মের সমাহার

তথ্যসূত্র

১. The Editors of Encyclopaedia Britannica, Encyclopædia Britannica. “Romanticism”, url: https://www.britannica.com/art/Romanticism সংগৃহীত ২৫ আগস্ট ২০২০.
২. Morrow, John (2011). “Romanticism and political thought in the early 19th century” (PDF). In Stedman Jones, Gareth; Claeys, Gregory (eds.). The Cambridge History of Nineteenth-Century Political Thought. The Cambridge History of Political Thought. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press. pp. 39–76. সংগৃহীত ২৫ আগস্ট ২০২০.
৩. জয়িতা বাগচী, “রোমান্টিসিজম” সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০,পৃষ্ঠা ৫৬৫।
৪. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯।
৫. সুমিতা চক্রবর্তী, “রোমান্টিসিজম: এক কূলভাঙা সাহিত্যতত্ত্ব” মোস্তফা আহাদ তালুকদার সম্পাদিত পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি, ভাষাপ্রকাশ ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা ৯১-৯২

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page