আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > সাহিত্যকোষ > রোমান্টিসিজম হচ্ছে ইউরোপের শিল্প-সাহিত্যে একধরনের আন্দোলন

রোমান্টিসিজম হচ্ছে ইউরোপের শিল্প-সাহিত্যে একধরনের আন্দোলন

রোমান্টিসিজম

জয়িতা বাগচী,
প্রাবন্ধিক ও লেখক

কাকে বলে রোমান্টিকতা তা নিয়ে মতভেদের সীমা নেই। তাই রোমান্টিকতাবাদের কোনো আঁটোসাটো সংজ্ঞা অসম্ভব। আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি ইউরোপের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শিল্প-সাহিত্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া হলো রোমান্টিকতাবাদ।

রোমান্টিকতাবাদ সব দেশে একসঙ্গে কিংবা কোনো একধরনের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঘটেনি। তবে সাধারণভাবে কয়েকটি লক্ষণীয় সূত্র ছিল : ক. ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার বদলে বাজারের আবির্ভাব অতএব লেখক / লেখিকা পাঠক / পাঠিকার মধ্যে নতুন সম্পর্ক স্থাপন, খ. ‘জনসাধারণ’ নামক এক নতুন ধারণার প্রতিষ্ঠা, গ. শিল্পকে এক বিশেষ রকমের উৎপাদন হিসেবে চিহ্নিত করা, ঘ. কল্পনার জগৎ হলো ‘উচ্চতর বাস্তব’- এ নিয়ে শিল্পের নতুন তত্ত্ব সৃষ্টি, ঙ. শিল্পীকে স্বতন্ত্র ও অভিনব প্রতিভা ভাবার নিয়ম।

ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির যুগের বিপুল কর্মকাণ্ড চলাকালীন জার্মানিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর সাতের দশকে শুরু হয় ‘স্টর্ম এন্ড ড্রাং’ ঝড় ও চাপ (এটি ক্লিংগারের ১৭৭৬ সালের নাটকের উপশিরোনাম) আন্দোলন, ঘোষিত হয় কঠোর নিয়ম ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে জেহাদ। গ্যেটের উপন্যাস তরুণ ওয়ের্থরের দুঃখ (১৭৭৪) ইউরোপে মুক্তির আধিক্যের বদলে কল্পনার ভাবালুতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই আন্দোলনের প্রথম পর্ব প্রতিষ্ঠা করে। তৈরি হলো রোমান্টিক ‘শিল্পী’র ধারণা, যেখানে ‘শিল্পী’ হলো নির্বাচিত প্রাকৃতিক দৈবিক শক্তি এবং শিল্পকর্ম স্বতন্ত্র ও অভিনব। প্রাপ্তবয়স্কদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিপরীতে প্রকৃতি, শিশু, অসভ্যতা আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত হলো, না পাওয়ার বেদনায় সার্থক হলো রোমান্টিক প্রেম।

এরপরে ক্লাসিক’ পর্বে গ্যেটে ছাড়াও লিখছেন হোল্ডারলিন, শিলার প্রমুখ। নোফালিস, টিক, শ্লেগেল ভ্রাতৃদ্বয়, একেরনাম-রা ১৮০০ নাগাদ শুরু করেন শেষ ‘রোমান্টিক’ পর্ব। জার্মানিতে রোমান্টিক আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কয়েক দশক আগে থেকেই ক্লপস্টক, উইলাভ, হার্ডার বা ফ্রান্সের রুশো, দিদেরো প্রমুখ। তারাই প্রথম এনলাইটেনমেন্টের একরৈখিক প্রগতি সম্পর্কে সন্দেহ ও প্রশ্ন করা শুরু করেন। জার্মানিতে দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, সংগীত, সাহিত্য-শিল্পকলার সমস্তক্ষেত্রেই এ-আন্দোলনের বিশাল প্রভাব পড়েছিল।

আরো পড়ুন:  পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি

ইংল্যান্ডে কিন্তু রোমান্টিক আন্দোলন প্রধানত সাহিত্য এবং বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৭৯৮-তে ওয়ার্ডসওয়ার্থকোলরিজের লিরিকাল ব্যালাড়স রোমান্টিক আন্দোলনের উর্বরপর্বের উদ্বোধন করে। প্রতিভাবান ইংরেজ কবি ব্লেক অবশ্য অনেক আগে থেকেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ‘শিল্পী-পরিত্রাতা’-কে নতুন যুগের আহ্বায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ইংল্যান্ডে রোমান্টিক আন্দোলন খানিকটা স্থানীয় রীতি অনুসারে গড়ে উঠেছিল। এছাড়া শিল্প-বিপ্লবের ফলে শহরের দূষিত পরিবেশের সৃষ্টি হলে তার বিরুদ্ধে প্রকৃতি প্রেমকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠা করা রোমান্টিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে উঠেছিল। ধর্মের প্রতাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য খ্রিষ্টপূর্বযুগে অথবা ‘অজানা’ আফ্রিকা বা প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে মাহাত্ম আরোপ করাও ছিল রোমান্টিক তত্ত্বের অংশ বিশেষ। তার উপর ইংল্যান্ডে পড়েছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবও। রোমান্টিক আন্দোলনের প্রথম পর্বে (১৭৯৮-১৮০৬) ওয়ার্ডসওয়ার্থের নেতৃত্বে কোলরিজ, ক্র্যাব, ক্লেয়ার প্রমুখ লেখা শুরু করেন। ১৮০৫-১৮১০কে বলা যায় স্কট ও ক্যাম্ববেল, মুর, সাদে প্রমুখের সময় এবং শেষপর্ব (১৮১৮-১৮২২) হল শেলি, কিটস, বায়রন প্রমুখের যুগ। (এ যুগ-গোষ্ঠী বিভাগ নিয়ে মতান্তরের সীমা নেই)। মোট কথা বিখ্যাত ইংরেজ কবিরা যখন প্রায় সকলেই মৃত, তখনই প্রতিবেশী রাজ্য ফ্রান্সে রোমান্টিক আন্দোলনের ঢেউ গিয়ে পড়ল।

১৮২০-তে লামারতিন-এর মেদিতাসয় পোএতিক প্রকাশিত হয়। বলা যায় এ বইই রোমান্টিক আন্দোলনের সূচনা করে। ফ্রান্সে সাহিত্যকে নব্য ধ্রুপদী নিয়মের কবল থেকে মুক্ত করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। জার্মান কবিদের সঙ্গে মিশে মাদাম দ্য স্কাইল লেখেন দ্য ল আলেমন (১৮১০)। শুধু তাই-ই নয়, ওঁর সালোঁয় আড্ডার নির্দিষ্ট কার্যাবলিতেই ছিল তরুণ কবিদের নতুন চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ করা। ফ্রান্সে সাধারণ পাঠক পাঠিকারাও নব্য ধ্রুপদী রুচিতে এতটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে লামারতিন ভিনি, শাতোব্রিয়া দ্য মুসে প্রমুখের পক্ষে প্রতিভার জোরে জায়গা করে নেওয়া মোটেই সহজ ছিল না। ১৮৩০-এ ভিক্টর হুগো-র হেননানি নাটককে ঘিরে যে যুদ্ধ হলো তাতে অবশেষে রোমান্টিক যুগ স্বীকৃতি পেল। প্রখ্যাত ফরাসি রোমান্টিক কবি বোদলেয়ারের লে ফ্লর দু মাল (১৮৫৭) রোমান্টিক ধারাকে অবলম্বন করেও সম্পূর্ণ নতুন এক পথের দিশা দিলে জন্ম হয় প্রতীকীবাদের। এক অর্থে রোমান্টিকতার মধ্যেই ছিল আধুনিকতার বীজ। স্তাদাঁল লিখেছেন সব আধুনিক সাহিত্যই রোমান্টিক, অর্থাৎ সব সাহিত্যিকই তার নিজের যুগে রোমান্টিক (এ অবশ্য নেহাতই অত্যুক্তি)। ফ্রান্সেও রোমান্টিক আন্দোলন কেবলমাত্র সাহিত্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল।

আরো পড়ুন:  ফ্যাবিয়ান সমিতি বা ফ্যাবিয়ানবাদ হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজবাদী সমিতি

রোমান্টিকতাবাদ প্রধানত ত্রিদেশীয় হলেও ইতালিতে লিওপার্দি (১৭৯৮-১৮৩৭), যানজোন (১৭৮৫-১৮৭৩) ও ফোসকোলো (১৭৭৮-১৮২৭); পোল্যান্ডে মিকিউইক্স (১৭৯৮-১৮৮৫) ও স্লোওয়াকি (১৮০৯-৪৯); স্পেনে এস প্রোনসেডা (১৮০৮-৪২); রুশদেশের পুশকিন (১৭৯৯-১৮৩৭) ও লেরমেনতভ (১৮১৪-৪১); যুক্তরাষ্ট্রে মেলভিল (১৮১৯-৯৯) প্রমুখও এর অংশীদার ছিলেন।

রোমান্টিকতাবাদের যে অজস্র ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব তার একটা কারণ হলো নতুন চিন্তাকে অধিষ্ঠিত করবার জন্য শিল্প, শিল্পী ও শিল্পের আধুনিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একাধিক ঘোষণাপত্র লেখার প্রচলন। ১৯৪৮ সালে লুকাচ ১১, ৩৯৬টি রোমান্টিকতাবাদের সংজ্ঞা পেয়েছিলেন। অনেক সংজ্ঞাই সেখানে বাদ পড়েছিল নিশ্চয়। অসংখ্য অর্থ হলেও রোমান্টিকতাবাদ মূলত ইউরো-কেন্দ্রিক। ইউরোপের খুব স্পর্শগ্রাহ্য পরিবেশ থেকে একটি বিশেষ যুগে তার জন্ম এবং বিবর্তন।

পেইন্টিঙয়ের ইতিহাসঃ নিবন্ধে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি ইউজিন দেলাক্রোয়ার (১৭৯৮-১৮৬৩) আঁকা মুক্তি, যেটি আঁকা হয়েছিল ১৮৩০ সালে।

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. জয়িতা বাগচীর এই প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০,পৃষ্ঠা ৫৬৫-৫৬৭ থেকে। সুধীর চক্রবর্তীর বইয়ে নিবন্ধটির নাম রোমান্টিসিজম ছিল। রোদ্দুরে ডট কমে প্রকাশের সময় বর্তমান শিরোনামটি দেয়া হয়েছে।

অতিথি লেখক
রোদ্দুরে ডট কমে অতিথি লেখক হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কলাম, অনুবাদ, নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লেখায় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন পূরবী সম্মানিত, ইভান অরক্ষিত, রনো সরকার এবং রণজিৎ মল্লিক। এছাড়াও আরো অনেকের লেখা এখানে প্রকাশ করা হয়।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page