ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো প্রসঙ্গে

সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রনৈতিক, ধর্মীয় এবং অন্যান্য অংশের সম্পর্কের ব্যাখ্যায় মার্কসবাদী দর্শন ‘ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো’ (ইংরেজি: Base and Superstructure) নামক দুটি শব্দ ব্যবহার করে। মার্কসবাদের মতে যে-কোনো সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদই হচ্ছে সমগ্র সমাজের মূল বুনিয়াদ। সমাজ বিকাশের যে-কোনো বিশেষ পর্যায়ে উৎপাদনের উপায় অর্থ্যাৎ জীবিকা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় হাত-পা, মস্তিস্ক এবং যন্ত্রপাতির মালিকানার ভিত্তিতে গঠিত হয় সেই পর্যায়ের অর্থনেতিক বুনিয়াদ। সংক্ষেপে একে বলা হয় ‘উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদনের সম্পর্ক’। উৎপাদনের উপায় এয সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত মূল বুনিয়াদের উপরই রচিত হয় সে সমাজের আইন-কানুন, নিয়ম-নিষেধ, মতামত, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর রচিত এই কাঠামোকে মার্কসবাদ বহির্গঠন, উপরি-কাঠামো বা সুপার স্ট্রাকচার বলে অভিহিত করে।

অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বা সমাজের মূল কাঠামো অনুযায়ী তার বহিঃকাঠামো গঠিত হয়। যে সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ হচ্ছে দাসের দৈহিক শ্রমের মালিকানার ভিত্তিতে প্রভুদের সম্পদ সৃষ্টি সে সমাজের বহিঃকাঠামোর মধ্যে অবশ্যই এই মূল কাঠামোর রাষ্ট্রনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অপরাপর ভাবগত প্রয়োজন প্রতিফলিত হবে। আবার মূল কাঠামোর অন্তর্নিহিত বিরোধও বহিঃকাঠামোর ভাবদর্শের ক্ষেত্রে প্রকাশ পাওয়ার চেষ্টা করবে। এই বিচারে কোনো সমাজের বহিঃকাঠামোর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটলে তার সঠিক প্রকৃতি বিচারে সে সমাজের মূল কাঠামোর বিশ্লেষণ আবশ্যক।

সমাজ বিকাশের মূল কাঠামোর পরিবর্তনের পরে উপরি-কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। একারণে মূলকাঠামোর পরিবর্তন ব্যতীত ইচ্ছা করলেই কেউ উপরিকাঠামোতে স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। সমস্ত সমাজের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো যখন পরিবর্তিত হয়ে পুঁজির মালিকানা-ভিত্তিক নতুনতর অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তৈরি হয়েছে তখনি সামন্ত সমাজের ভাবনা-চিন্তা, আইন-কানুন, বিশ্বাস-অবিশ্বাস বিলুপ্ত হয়ে নতুন বহিঃকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কসবাদের মতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বুনিয়াদের পরিবর্তনের মাধ্যমেই মাত্র তার পুঁজিবাদী বহির্গঠন পরিবর্তিত হয়ে সমাজবাদী বহির্গঠন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

মার্কসবাদের মূল দর্শন দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মতে সমাজের মূল কাঠামো এবং বহিঃকাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ক কেবল একমূখী নয় এ সম্পর্কের চরিত্রও দ্বন্দ্বমূলক এবং দ্বিমূখী। কেবল যে মূল কাঠামো সমাজের বহিঃকাঠামোকে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবান্বিত করে, তাই নয়। বহিঃকাঠামো গঠিত হওয়ার পরে তার মধ্যকার বিভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থা, আইন-কানুন, অর্থনৈতিক শ্রেণীসমূহের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারাও মূল গঠনকে প্রভাবান্বিত করে। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের বিকাশ ও ক্রিয়াশীলতার ক্ষেত্রে তার বহিঃকাঠামোর বিভিন্ন অংশও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মাও সেতুং লিখেছেন,

ইতিহাসের সাধারণ বিকাশে যখন আমরা স্বীকার করি যে, বস্তুগত ব্যাপার নির্ধারণ করে মানসিকতাকে এবং সামাজিক বাস্তবতা নির্ধারণ করে সামাজিক চেতনার, তখন আমরা বস্তুগত জিনিসের উপর মানসিকতার, সামাজিক বাস্তবতার উপর সামাজিক চেতনার এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর উপরিকাঠামোর প্রতিক্রিয়াকেও স্বীকার করি—এবং তা অবশ্যই করতেও হবে। এটা বস্তুবাদের বিপরীতে যায় না, বরং বিপরীতভাবে এটা যান্ত্রিক বস্তুবাদকে পরিহার করে, এবং দৃঢ়ভাবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে তুলে ধরে।[২]

একটি ভাব বস্তু বা বাস্তব অবস্থা থেকে উদ্ভূত হয়। কিন্তু একবার উদ্ভূত হলে সে ভাব বাস্তব অবস্থাকেও পরিবর্তত করতে পারে। মার্কসবাদের এ্‌ই অভিমতটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মার্কসবাদের মতে ব্যক্তিগত মালিকানা-ভিত্তিক সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বা মূল কাঠামোর সঙ্গে তার বহিঃকাঠামোর সম্পর্কের অপর দিকটি হচ্ছে বিরোধাত্মক। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের মধ্যকার শ্রেণীগত বিরোধ বহিঃকাঠামোর মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। কালক্রমে এই বিরোধ মূল কাঠামো পরিবর্তনের আন্দোলনের রূপ লাভ করে।

আরো পড়ুন:  উৎপাদিকা শক্তি হচ্ছে উৎপাদনের যন্ত্র, যন্ত্র ব্যবহারের দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ এবং শ্রমের আগ্রহ

অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলো ভিত্তি, আর ভিত্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হলো উপরিকাঠামো। মার্কসবাদী রাজনীতি অনুসারে, আগে ভিত্তি, পরে উপরিকাঠামো; আগে অর্থনীতি, পরে সংস্কৃতি। মানুষের জীবন চর্চার ক্ষেত্রে ভিত্তিটাই হলো প্রাথমিক বা মুখ্য উপাদান, আর উপরিকাঠামো হলো গৌণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অবশ্য এখানে উল্লেখ্য যে, ভিত্তি-উপরিকাঠামোর সম্পর্কটা যান্ত্রিক নয়, পরন্তু দ্বান্দ্বিক। অর্থাৎ ভিত্তি উপরিকাঠামোকে গড়ে তোলে, আবার উপরিকাঠামোও ভিত্তির উপর ক্রিয়া করে_এরা পরস্পরকে যুগপৎ দ্বান্দ্বিকভাবে প্রভাবিত করে।[৩]

একটি সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো বিভাগ ও বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক। মার্কসবাদের মত অনুযায়ী এই উভয় দিকের পারস্পারিক সম্পর্কের বিরোধাত্মক চরিত্র সমাজতান্ত্রিক সমাজে আর থাকতে পারে না। কারণ সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের শ্রেণীতে শ্রেণীতে মারাত্মক বিরোধের অবকাশ নেই। এ কারণে তার উপরি-কাঠামোর মধ্যেও আপসহীন বিরোধের উদ্ভব ঘটে না। তখন সমাজের মূল গঠন এবং বহির্গঠন সংযুক্তভাবে সমগ্র সমাজের অধিতকর অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সুসমঞ্জস সভ্যতা বিকাশের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে।

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৭৮।

২. মাও সেতুং দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে, ১৯৩৯।

৩. সুজিত সেন, মার্কসবাদ তাত্ত্বিক রূপরেখা, মিত্রম, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ জুন, ২০০৯, পৃষ্ঠা ১০, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৮০০৩৬-০০৭.

Leave a Comment

error: Content is protected !!