গৃহযুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য শ্রেণি, ধর্ম, জাতি, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ

গৃহযুদ্ধ (ইংরেজি: Civil War) হচ্ছে কোনো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য সে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, জাতি অথবা রাজনৈতিক দল কিংবা গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ।[১] একটি গৃহযুদ্ধ, যা যুদ্ধবিদ্যায় একটি অন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ (ইংরেজি: intrastate war) হিসাবেও পরিচিত, হচ্ছে একই রাষ্ট্র বা দেশের মধ্যে সুশৃঙ্খলিত গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি যুদ্ধ।

গৃহযুদ্ধ শুরু হয় কোনো এক পক্ষ বা কোনো এক শ্রেণি কর্তৃক একটি দেশ বা একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ, একটি অঞ্চল বা এলাকার স্বাধীনতা ঘোষণা অথবা ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি-নির্ধারণ পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করবার উদ্দেশ্য।

গৃহযুদ্ধের এক পক্ষে থাকে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নাগরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিবাদ, অশান্তি  বা সংঘর্ষ থেকেও গৃহযুদ্ধের উৎপত্তি হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্য গৃহযুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করতে হতাহতের বিষয়টি নিয়ে মতভিন্নতা দেখা গেছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বলেছেন যে, ১০০০-এর অধিক হতাহত হলে সেটি গৃহযুদ্ধ হবে, তবে অন্যরা আরো বলেছেন যে অন্তত প্রতি পক্ষে শতাধিক নিহত হলে তা গৃহযুদ্ধ বলা যেতে পারে। প্রতি বছর যুদ্ধের ফলে ১০০০-এর অধিক যুদ্ধ-সংক্রান্ত ঘটনায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে সেসব সংঘর্ষকে বুদ্ধিজীবীরা গৃহযুদ্ধ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেন। এরকম হতাহতের হার দ্বিতীয় সুদানের গৃহযুদ্ধ, ইরাক গৃহযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোকের হত্যাকাণ্ডকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করে তেমনি বহুল প্রচারিত সংঘাত যেমন উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংঘাত এবং দক্ষিন আফ্রিকার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বর্ণবাদ-যুগের সংগ্রামকে বাদ দেয়।

প্রতি বছর ১০০০ হতাহতের মাপকাঠির ভিত্তিতে, ১৮১৬ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ২১৩টি গৃহযুদ্ধ লেগেছিল, যার ভেতরে ১০৪টি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে।[২]

প্রাচীন রোম, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের ইতিহাসে গৃহযুদ্ধের অনেক নজির আছে। ল্যাটিন ভাষায় বেলাম সিভিল শব্দ থেকে সিভিল ওয়ার শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে। খ্রীষ্ট-পূর্ব ১ম শতকে রোমান গৃহযুদ্ধে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি ভাষায় সিভিল ওয়ার শব্দটি ইংরেজ গৃহযুদ্ধে প্রথম প্রচলন হয় ১৬৫১ সালে।

আরো পড়ুন:  একে-৪৭ হচ্ছে সাম্প্রতিক বিশ্বের জনপ্রিয়তম গ্যাস পরিচালিত স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে উত্তর ও দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ঘটে (১৮৬১-৬৫); প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন নিহত হন। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের মাঝে ঘটেছে স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধের পরে যুগোস্লাভিয়া, আফগানিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘকাল যাবৎ গৃহযুদ্ধ চলে।

মার্কসবাদী দৃষ্টিতে শ্রেণিসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় সামাজিক সংকটের ফলে গৃহযুদ্ধ সূচিত হয়। আধুনিককালে রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে শ্রেণিসমূহের সামাজিক দলগুলোর মধ্যে সংগঠিত হয় সশস্ত্র যুদ্ধ যা আসলে শ্রেণিসংগ্রামের সবচেয়ে তীব্র রূপ।[৩] সময়বিশেষে গৃহযুদ্ধ আন্তর্জাতিক স্তরে এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে বিস্তৃত হয়। ১৯১৭ খ্রি রাশিয়ায় অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রতিবিপ্লবী শ্রেণি ও শোষক শক্তিগুলির যোগসাজসে অন্যান্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে তীব্র গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত শাসন ব্যবস্থার বিজয় ঘটে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা হয়।[১]

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১০০।
২. Ann Hironaka, Neverending Wars: The International Community, Weak States, and the Perpetuation of Civil War, Harvard University Press: Cambridge, Mass., 2005, p. 3, ISBN 0-674-01532-0
৩. সোফিয়া খোলদ, অনু. ড. মুস্তাফা মাহমুদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৪৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!