স্বাধীনতার ধারণা হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতা, জাতীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি

ব্যক্তি স্বাধীনতা, জাতীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রত্যয়গুলির উদ্ভব ও বিকাশ প্রধানত আধুনিক কালে। প্রাচীনকালেও মানুষ গোত্রবদ্ধ এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রবদ্ধভাবে গোত্রপ্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজার অধীনে জীবন যাপন করছে। রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সেকালের স্বাধীনতার মধ্যে বর্তমানকালের আবেগের অস্তিত্ব দেখা যায় না। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নেও ব্যক্তি নিজেকে যতটা সমাজ ও রাষ্ট্রের অধীনে থাকার অনিবার্যতা স্বীকার করে নিত, ব্যক্তির নিজের অধিকার এবং স্বাধীনতা বোধের তত প্রকাশ ছিল না।

প্রাচীন গ্রীসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ঘটে। এথেন্সের দার্শনিকগণ বিশেষ করে প্লেটো এবং এরিস্টটল একালের রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক প্রভৃতি প্রশ্নের দার্শনিক আলোচনা করেন। কিন্তু তাঁদের দর্শনেও অধিক জোর ছিল ব্যক্তির উর্ধ্বে রাষ্ট্র বা সমাজের উপর; ব্যক্তির অধিকার এবং স্বাধীনতার উপর নয়। প্রাচীন ভারতীয় ও চীনা দর্শনে এই প্রবণতা অধিক প্রবল ছিল।

ইউরোপে রেনেসাঁ বা নব জাগরণ বলে অভিহিত যুগের সূচনা থেকে চতুর্দশ, পঞ্চদশ শতক থেকে ভূখন্ড ও ভাষাভিত্তিক কেন্দ্রীয় শাসনবদ্ধ রাষ্ট্রের উদ্ভব থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা একটি নতুন অর্থ লাভ করতে থাকে। এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্র হতে শৌর্য-বীর্যে প্রধান এবং রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবল শাসকের স্বাধীনতা এবং গৌরবের ব্যাপার নয়, রাষ্টের সকল অধিবাসীরই আরাধ্য ব্যাপার, এরূপ ধারণা বিকশিত হতে থাকে। এরূপ ধারণার ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে সমাজের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রমপ্রতিষ্ঠা। এই সময়ে ইউরোপে, ইতালি, ফরাসি, ইংল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ফরাসি বিপ্লবের পরে স্বাধীনতার এই ধারণা অধিকতর সর্বজনীনতা প্রাপ্ত হয়। এই সঙ্গে ব্যক্তির স্বাধীনতাবোধও বিকশিত হতে থাকে। কালক্রমে ভাষা, ধর্ম, ঐতিহাসিক একাত্মবোধে ইত্যাদি জাতি এবং রাষ্ট্রের প্রধান ঐক্যসূত্র হয়ে দাঁড়ায়। এই ঐক্যবোধেরই অপর নাম জাতীয়তাবাদ। এই সময় থেকেমানুষের মধ্যে এই প্রবণতা প্রবল হতে থাকে যে, ভাষা-ধর্ম ঐতিহাসিক ঐক্যবোধসম্পন্ন মানুষের অধিকার আছে স্বীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্বাধীন শাসন ও রাষ্ট্র তৈরি করার। আমেরিকার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলি অষ্টাদশ শতকে এরূপ ঐক্যবোধ থেকে ‘আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র’ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলেও এরূপ ক্ষুদ্র-বৃহৎ রাষ্ট্র তৈরি হতে থাকে।

আরো পড়ুন:  সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়তে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষার গুরুত্ব

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২১৪-২১৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!