আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মার্কসবাদকোষ > জ্ঞান হচ্ছে কারও বা কোনো কিছু সম্পর্কে একটি পরিচিতি, সচেতনতা বা উপলব্ধি

জ্ঞান হচ্ছে কারও বা কোনো কিছু সম্পর্কে একটি পরিচিতি, সচেতনতা বা উপলব্ধি

জ্ঞান অনুসরণ

জ্ঞান হচ্ছে কারও বা কোনো কিছু সম্পর্কে একটি পরিচিতি, সচেতনতা বা উপলব্ধি; যেমন প্রত্যক্ষণ, আবিষ্কার বা শেখার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বা শিক্ষার মারফত অর্জিত ফ্যাক্ট, তথ্য, বিবরণ, বা দক্ষতাসমূহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধিই জ্ঞান। সমাজবদ্ধ মানুষের সামাজিক শ্রম বা চিন্তার মধ্যেই জ্ঞানের উদ্ভব। পরিবর্তমান বস্তুজগৎ সম্পর্কে মানুষের ভাবগত ধারণা এবং তার ভাবগত প্রকাশ-এই দুই নিয়েই জ্ঞান। এক কথায়, জ্ঞান সামাজিক ব্যাপার। সমাজের মধ্যে ব্যক্তির ক্রিয়াকান্ডের বিশ্লেষণ ব্যতীত জ্ঞান সমস্যার সঠিক উপলব্ধি সম্ভব নয়।[১] জ্ঞান হচ্ছে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরিকাঠামো আবার এই জ্ঞান ভিত্তিকে প্রভাবিত করে এবং বদলেও ফেলে। জ্ঞান অর্থনৈতিক শোষণের একটি বাইপ্রোডাক্ট।

যারা শোষণ তৈরি করতে পারেনি, তারা সভ্য হতে পারেনি, আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে থেকে গেছে। গত ১০০০ বছরে শহরগুলো কেন শোষণের কেন্দ্র হয়েছে, কেন শহরগুলোর চেয়ে রাষ্ট্র বেশি শক্তিশালী হয়েছে, এই প্রশ্নের দিকে তাকালেই আমরা দেখব জ্ঞান কেন্দ্রীভূত হয়েছে শহরে, সাথে প্রযুক্তিকেও টেনে এনেছে। এই জ্ঞানের কেন্দ্রগুলো পরস্পরের উপরে আক্রমণ চালিয়েছে। দুর্দশা আর যুদ্ধের কারণ যে দাস, সামন্তবাদী আর পুঁজিবাদী অর্থনীতির নানা ধরনের, অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তী অর্থনীতির দ্বন্দ্বের ফল তা অনেক সময় আমরা দেখি না।

সমাজের মধ্যে ব্যক্তির ক্রিয়াকান্ডের বিশ্লেষণের জ্ঞানের এই তত্ত্ব পূর্বে তেমন স্বীকৃত হতো না। বিশেষ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি হতে আহৃত সমাধান বা তত্ত্বকে জ্ঞান বলা হতো। এরূপ ধারণা করা হতো যে, বাস্তব জগত থেকে যে ব্যক্তি যত বিচ্ছিন্নভাবে সমস্যা নিয়ে আত্মনিবিষ্ট হতে পারে সেই তত জ্ঞানী। সমাজ ও বস্তুজগতের উর্ধ্বে কোথাও ‘জ্ঞান’-রূপ একটা অস্তিত্ব আছে। ব্যক্তি কেবল বিশ্লিষ্ট চিন্তা বা ধ্যানের মাধ্যমেই সেই জ্ঞানের সাক্ষাত লাভ করতে পারে। জ্ঞানের সর্বজনীন সূত্রগুলি মানুষের জন্যে বিধাতার দান বলে মনে করা হতো।[১]

কিন্তু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের একটি অবদান এই যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ জ্ঞানকে পরিবেশের সঙ্গে সমাজবদ্ধ ব্যক্তির ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এবং তার মাধ্যমে মানুষের মষ্তিষ্কের শক্তিবৃদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী চিন্তার বিকাশ ইত্যাদি মিলিয়ে একটি সামগ্রিক বিকাশমান প্রক্রিয়া হিসাবে উপস্থিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জ্ঞানের যে সার্বজনীন সূত্রগুলিকে আমরা ঈশ্বর দত্ত বলে অনুমান করেছি সে সূত্রগুলিও মানুষের দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতার ফল। এই কারণে মানুষ হিসাবে পৃথিবীতে বিকাশলাভ করার গোড়া থেকেই মানুষ জ্ঞানী হতে পারে নি। বাস্তব জগতের ঘাত-প্রতিঘাতে বিকাশের একটা পর্যায়ে পৌঁছে মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করেছে। জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ের সূচক।[১]

ইউরোপে রেনেসাঁ আরম্ভের মূল সূত্রটি লুকিয়ে আছে ক্রুসেডে খ্রিস্টানদের পরাজয়ে। ইউরোপের লাখ লাখ মানুষের জীবনহানিই তাঁদেরকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দিকে ভাবতে বাধ্য করে, ওরা বুঝে যায় জ্ঞান আর বিজ্ঞান দিয়েই পরাজিত করা সম্ভব শত্রুকে।

ফ্রান্সিস বেকনের ‘জ্ঞানই শক্তি’ কথাটার সাথে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের চিন্তার পার্থক্য কোথায়? এঙ্গেলস শোষণও দেখেন, বেকন দেখেন শুধু শ্রম, মানুষকে মৌমাছির মতো খাটাতে চান। কারণ বেকন পুঁজিবাদকে পুষ্ট করতে চান, এঙ্গেলস চান ধ্বংস করতে।

কার্ল মার্কসের গ্রুন্ডরিস গ্রন্থের বক্তব্য অনুসারে, সাধারণ বুদ্ধি (ইংরেজি: General Intellect) উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। সাধারণ বুদ্ধি হচ্ছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সামাজিক বুদ্ধি, বা সাধারণ সামাজিক জ্ঞানের একটি সমন্বয় যা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যন্ত্রপাতির গুরুত্ব বৃদ্ধি করে।

“প্রকৃতি কোনো মেশিন নির্মাণ করে না, কোন ইঞ্জিন নয়, রেলওয়ে, বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ, স্ব-কার্যকরী খাঁজ ইত্যাদিও প্রকৃতি তৈরি করে না। এগুলো মানব কারখানার দ্রব্য; প্রকৃতির উপর মানুষের অঙ্গের কর্তৃত্ব অথবা প্রকৃতিতে মানুষের অংশগ্রহণের ফলে প্রাকৃতিক উপাদান রূপান্তরিত হয়। সেসব বস্তুর বস্তুত্ব আরোপ মানব মস্তিষ্কের অঙ্গ, মানুষের হাত দ্বারা তৈরি; সেসবই জ্ঞানের শক্তি।”[২]

মার্কসের মতানুসারে, সামাজিক জীবনযাপন পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুঁজিবাদী সমাজে সাধারণ বুদ্ধির উন্নতি প্রকাশ পায়। অন্য কথায়, সাধারণ বুদ্ধির ধারণা দিয়ে, মার্কস মনোনয়ন দেন পুঁজিকে শ্রমের একত্রীকরণে পুঁজিতে রূপান্তর একটি মৌলিক পরিবর্তন, যা নির্দেশ করে শ্রমের তৃতীয় স্তরের শ্রমের বিভাগ।[৩]

হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘর্ষ বইয়ে আলোচনা হয়েছে যে সভ্যতার কেন্দ্রগুলো মানুষের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আর এই তত্ত্বই এখন মার্কিনীরা ও ইউরোপীয় গণশত্রুরা প্রচার করছে। এইগুলা বস্তাপচা রদ্দি মাল। এইটা মূলত সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের চিন্তাধারা, যখন ইউরোপীয়রা মনে করত সভ্যতা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়, সাথে সাথে জ্ঞানও। আলেকজান্দ্রিয়া, এথেন্স, রোম, বাগদাদ, লন্ডন হয়ে এখন জ্ঞান মহাশয় আছেন ওয়াশিংটনে। যারা Ralph Hodgson-এর কবিতা ‘Time, You Old Gipsy Man’ পড়েছেন তারা, সভ্যতার স্থান পরিবর্তনের কথা এখনো মনে করতে পারবেন। ইউরোপীয়রা সমাজের বিকাশের ব্যাখ্যা যতদিন দিতে পারেনি ততদিন এসব কথা খুব চলেছে। এসব আবর্জনা পড়লে দুনিয়ার ব্যাখ্যা কিছুই পাওয়া যাবে না।

সভ্যতার সংঘর্ষ তত্ত্বের মূল কথাটা হচ্ছে ইতিহাসের সামাজিক অগ্রগতিকে নাকচ করা, সামাজিক বিপ্লবগুলোকে নাকচ করা। ফলে দাস যুগ, সামন্ত যুগ ও পুঁজিবাদ, এগুলো আগেরটা থেকে পরেরটার উন্নতিকে দেখতে চাচ্ছেন না এই সাম্রাজ্যবাদের পক্ষের মতাদর্শের তাত্ত্বিকেরা। মাঝখানে খাপছাড়াভাবে শুধু যুদ্ধ ও মানুষের হত্যাগুলো দেখাচ্ছেন এবং সেগুলোকেই গ্লোরিফাই করছেন, পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর উপরে শোষণ জারি রাখছেন, পশ্চাৎপদদেরকে হত্যার আর শোষণের ন্যায্যতা তৈরি করছেন।

একটু সামাজিক অগ্রগতিকে বিবেচনা করা যাক। আদিম যুগে দুটি গোষ্ঠীর পারস্পরিক আক্রমণের পর পরাজিত পক্ষের কী হতো? পরাজিতদের খেয়ে ফেলা হতো। এটা বর্বরতা। দাস যুগে এসে পরাজিতরা বাচার অধিকার পেলো, এটা সামাজিক অগ্রগতি। এরকম প্রতিটা সমাজের অগ্রগতি আছে। সেইটা বাদ দিয়ে দেখলে যা দেখা যায় তাই হচ্ছে সভ্যতার সংঘর্ষ নয় কি? এটি চরম অসত্য নয় কি? মানুষের ইতিহাসকে মানুষের হিসেবেই দেখতে হবে, তার সাফল্য-ব্যর্থতা, অগ্রগতি-পশ্চাৎগমন ইত্যাদিসহ।

সংশোধনবাদী ধারা বা সুবিধাবাদীরা সরাসরি মার্কসবাদের কথা বলেন না। তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আগডুম ব্যাগডুম কথা বলেন। বাংলাদেশে সুবিধাবাদী আর সংশোধনবাদীরা পিচ্ছিল কথাবার্তার খনি বলা যায়। এই চর্চা দীর্ঘমেয়াদে হবার ফলে এখানে সাধারণ সহজ প্রশ্নেরও পিচ্ছিল প্যাঁচানো উত্তর দেয় অনেকে। এই ধারার মানুষ সমাজবিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের দূরবর্তী বিভিন্ন শাখার কথা বলে লোকজনকে শিক্ষিত করতে চান। কিন্তু সরাসরি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ শেখাতে চান না, এবং ভয় পান সরাসরি মার্কসবাদ শেখাতে গেলে তাঁর অনুসারীরা পালিয়ে যাবে অন্যত্র।

প্রথমত পার্টির পুস্তকনির্ভর বুলিবাগিশী পণ্ডিতি এবং দ্বিতীয়ত অভিজ্ঞতাবাদী প্রবণতা, এই উভয় রকমের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে মাও সেতুং তাঁর ‘অনুশীলন প্রসঙ্গে’ নামের দার্শনিক প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। এই উভয় বিচ্যুতির মধ্যে তিনি আবার কেতাবিপনাকে অধিক ক্ষতিকর বলেছিলেন। কিন্তু মাও সেতুংয়ের কথিত এই কেতাবিপনা অর্থ বেশি পড়া নয়, মূলত তিনি বিরোধীতা করেছেন পুস্তকনির্ভর জ্ঞানের কূপমণ্ডুকতাকে আঁকড়ে থাকা, বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দেয়ার বিচ্যুতিকে। বাস্তব অনুশীলন থেকে তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করা এবং সেই তত্ত্বকে আবার অনুশীলনের বাস্তব কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মাও সেতুং।  ‘অনুশীলন প্রসঙ্গে’ লেখায় প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি বলেছেন দেখা,

“সমস্ত সাচ্চা জ্ঞানের উৎস হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। কিন্তু একজনের পক্ষে সব কিছুর ব্যাপারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব নয়; বাস্তবিক পক্ষে, আমাদের অধিকাংশ জ্ঞানই আসে পরোক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে, উদাহরণস্বরূপ, অতীতকালের ও বিদেশ ভূমির সকল জ্ঞান। আমাদের পূর্বপুরুষ ও বিদেশীদের কাছে এই জ্ঞান ছিলো, বা হলো, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয়, আর এই জ্ঞান যদি তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গতিধারায়, লেনিনের কথা অনুসারে, ‘বিজ্ঞানসম্মত বিমূর্তকরণে’র চাহিদা পূরণ করে, এবং বস্তুগত বাস্তবতাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিফলিত করে, তাহলে সে জ্ঞান হলো নির্ভরযোগ্য, অন্যথায় তা নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং একজন মানুষের জ্ঞান কেবল দুটি অংশ নিয়েই গঠিত: একটি হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আসা, আর অন্যটি হলো পরোক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আসা।”[৪]

মূলত বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং যুদ্ধগুলোই মানুষকে অতি দ্রুত শেখাতে পারে, বদলে দিতে পারে দুনিয়াকে। নিয়ে যেতে পারে মানবজাতিকে সাম্যবাদের দিকে।

রচনাকাল ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

তথ্যসূত্র:

১ . সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৫৩।

২.  Karl Marx, The Grundrisse., 1858. The Grundrisse. Notebook VII. Fixed capital and circulating capital as two particular kinds of capital. Fixed capital and continuity of the production process. – Machinery and living labour. (Business of inventing)

৩. Carlo Vercellone. From Formal Subsumption to General Intellect: Elements for a Marxist Reading of the Thesis of Cognitive Capitalism. Historical Materialism 15 (2007) 13–36

৪. মাও সেতুং, অনুশীলন প্রসঙ্গে, ১৯৩৮।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ ব্যবস্থার বা সমাজের পার্থক্যরেখাগুলো কোথায় ও কীভাবে?
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page