আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মার্কসবাদকোষ > সংস্কারবাদ শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণিসংগ্রাম, বিপ্লব ও ক্ষমতাকে অস্বীকার করে

সংস্কারবাদ শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণিসংগ্রাম, বিপ্লব ও ক্ষমতাকে অস্বীকার করে

সংস্কারবাদ

সংস্কারবাদ (ইংরেজি: Reformism) হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলনের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ধারা, যা শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণিসংগ্রাম, রাজনৈতিক বিপ্লব ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করে। সংস্কারবাদ হলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ও প্রলেতারিয় একনায়কত্বের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারকারী একটি রাজনৈতিক ধারা। সংস্কারবাদ শ্রেণি সহযোগিতার সমার্থক এবং বুর্জোয়া আইনবিধির কাঠামোয় সাধিত সংস্কারের সাহায্যে পুঁজিবাদকে ‘সার্বিক কল্যাণমুখী’ সমাজে রূপান্তরের প্রয়াস চালায়।

অর্থাৎ সংস্কারবাদ শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত জনগণের জন্য শােষণমূলক বিদ্যমান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র অক্ষুন্ন রেখে এর কিছু চুনকাম করে সংস্কারের মাধ্যমে একে টিকিয়ে রাখার রাজনীতিকে আশ্রয় করে। সংস্কারবাদ বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করতে বলে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে সংস্কার হলাে বিপ্লবের প্রতিস্থাপন। এটা হচ্ছে একটি বুর্জোয়া ধারা, যদিও কমিউনিস্ট আন্দোলনে এটা বারবারই এসেছে। সংস্কারবাদ সম্পর্কে জোসেফ স্তালিন বলেছেন,  

“একজন সংস্কারবাদীর কাছে সংস্কারই সবকিছু, আর বিপ্লবী কার্যক্রম নিতান্ত আপতিক, কথা মাত্র, নিছক চোখের ধুলো। সেই কারণে বুর্জোয়া শাসনের পরিবেশে সংস্কারবাদী রণকৌশল নিলে সেই সংস্কারগুলি সেই শাসনকে শক্তিশালী করার এক হাতিয়ারে, বিপ্লবকে বিধ্বস্ত করার এক হাতিয়ারে অবধারিতভাবে রূপান্তরিত হয়।”

কতিপয় সংস্কারবাদি রাজনৈতিক পার্টি ও সংস্কার ট্রেড ইউনিয়ন অনেক দেশে শ্রমিক শ্রেণির জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংস্কারবাদের প্রয়োগ ও ভাবাদর্শের সমালোচনার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো শান্তি ও সমাজপ্রগতির লক্ষ্যে সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির কার্যকলাপের ঐক্যের জন্য চেষ্টা চালায়।[২]

আমাদের দেশে এনজিওগুলাে নিপীড়িত জনগণকে বিপ্লব থেকে সরিয়ে রাখার জন্য, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য কিছু অর্থনৈতিক-বৈষয়িক সুযােগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। অনেক বামপন্থি-সংশােধনবাদীরা সমাজ বদলের বিপ্লবী রাজনীতির বিপরীতে সামরিক শাসনের জায়গায় বহুদলীয় রাজনীতি, কিংবা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বদলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন- ইত্যাদির কথা বলে। এগুলাে সবই হচ্ছে সংস্কারমূলক কর্মসূচি বা সংস্কারবাদ। এ জাতীয় রাজনীতি মার্কসবাদের নামে চলমান ব্যবস্থার শােষণমূলক রাজনীতির সেবা করে, শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে।[২]

আরো পড়ুন:  বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে কোনো কিছুর গুণ বা শক্তিতে স্বকীয় সত্তা হিসাবে প্রতিপন্ন করা

প্রচন্ডের নেতৃত্বে নেপালে প্রাক্তন মাওবাদী পার্টি সংস্কারবাদী লাইনে গড়িয়ে পড়ায় রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হলেও বিপ্লব হয়নি। ফলে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার আংশিক সংস্কার হয়েছে মাত্র।

তথ্যসূত্র:

১. জোসেফ স্তালিন; লেনিনবাদের ভিত্তি, মে ১৯২৪, স্বের্দলভ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতামালা, স্তালিন রচনাবলী, ষষ্ঠ খণ্ড, নবজাতক প্রকাশন, কলকাতা; সেপ্টেম্বর, ১৯৮২; পৃষ্ঠা- ১৬৬-১৬৭।
২. সোফিয়া খোলদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ১৬৬।
৩. রায়হান আকবর, রাজনীতির ভাষা পরিচয়, আন্দোলন প্রকাশনা, ঢাকা, জুন ২০২০, পৃষ্ঠা ২৫-২৬।

রচনাকাল: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ময়মনসিংহ

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page