নির্দয় ধর্মীয় বিচার ধর্মান্ধতার যুগে প্রশ্ন উত্থাপনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার ব্যবস্থা

নির্দয় ধর্মীয় বিচার বা ‘ইনকুইজিশন’ (ইংরেজি: Inquisition) শব্দের অর্থ ‘বিচারের জন্য অনুসন্ধান’ হলেও ইউরোপের ইতিহাসে ইনকুইজিশন বলতে ধর্মান্ধতার যুগে ধর্মীয় প্রতিপক্ষ বা ধর্মীয় গোড়া সংস্কার ও বিশ্বাসের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও নির্দয় বিচার ব্যবস্থাকে বুঝায়।

নির্দয় ধর্মীয় বিচার বা ইনকুইজিশনের সূচনা ঘটে ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে। খ্রিষ্টীয় জাযকগণ যাদেরকে অবিশ্বাসী বা খ্রিষ্টীয় ধর্মবিরুদ্ধ বলে ঘোষণা করত তাদের বিচার করার জন্য অনুসন্ধানকারী এবং একদল বিচারক নিযুক্ত করত। খ্রিষ্টীয় যাজকদের এই বিচারব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের খ্রিষ্টান সম্রাটগণ অনুমোদন করেন। যারা খ্রিষ্টানধর্ম পরিত্যাগ করে অপর কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করত তাদের বিরুদ্ধেও ‘ইনকুইজিশন’ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হত। গোড়ার দিকে ধর্মত্যাগী কিংবা অবিশ্বাসীদের নিকট থেকে স্বীকারোক্তি আদায় এবং ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া দৈহিক নিপীড়ন প্রয়োগ করা না হলেও ক্রমান্বয়ে কারাগারে বন্দী করে রাখা, নির্মম অত্যাচার ও অভিযুক্তকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করা ‘ইনকুইজিশনের’ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিচার ব্যবস্থায় অভিযোগ প্রমাণের জন্য কোনো সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন হতো না। দুজন লোকের গোপন অভিযোগের ভিত্তিতে যে কোনো নাগরিককে এই ধর্মান্ধ বিচারকদের নিকট সোপর্দ করে তাকে দন্ডিত করা যেত।

নির্দয় ধর্মীয় বিচার বা ইনকুইজিশনের চরম রূপ গ্রহণ করে স্পেনে পঞ্চদশ শতকে। স্পেনীয় ইনকুইজিশনের প্রধান লক্ষ্য ছিল খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত কিংবা ইহুদী ধর্মে বিশ্বাস করত তারা। স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলা যাকে প্রথম ইনকুইজিটার বা প্রধান বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন সে তার কার্যকালে দুই হাজার লোককে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করেছিল। ইনকুইজিশনের আতঙ্কে মধ্যযুগের ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষকগণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে কিংবা মতামত প্রকাশ করতে সাহস পেত না। এই সময়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায়।

অনেক চিন্তাবিদ ও মুক্তবুদ্ধির মানুষকে এই ধর্মীয় বিচারের যূপকাষ্ঠে প্রাণ দিতে হয়। এঁদের মধ্যে ইউরোপীয় পুনর্জাগরণের অন্যতম পুরোধা জর্দানো ব্রুনোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর যুক্তিবাদী ও স্বাধীন মতামতের জন্য তাঁকে ইনকুইজিশনের হুকুমে ১৬০০ সনে রোম শহরে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

আরো পড়ুন:  সর্বপ্রাণবাদ বা আত্মাবাদ কাকে বলে

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২২৭-২২৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!