আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > দর্শনকোষ > আনন্দবাদ বা সুখবাদ হচ্ছে নীতিবাদের একটি তত্ত্ব

আনন্দবাদ বা সুখবাদ হচ্ছে নীতিবাদের একটি তত্ত্ব

আনন্দবাদ বা সুখবাদ (ইংরেজি: Hedonism) হচ্ছে নীতিবাদের একটি তত্ত্ব। মানুষের জীবনে চরম কামনা কি এবং মানুষের সামাজিক আচরণের মূল প্রেরণা কি, এই মৌলিক প্রশ্নের জবাব মানুষ বিভিন্নভাবে দেবার চেষ্টা করেছে। সুখবাদ এই সমস্ত জবাবের মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এটি একটি প্রাচীন তত্ত্ব। গ্রিসের দার্শনিক এপিকিউরাসের রচনায় এই তত্ত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আধুনিক ইউরোপের মিল, বেন্থাম প্রমুখ দার্শনিকের উপযোগবাদ বা হিতবাদ নামক নীতিতত্ত্বের উৎস হিসাবে এপিকিউরাসের অভিমতকে উল্লেখ করা হয়।

প্রেরণা বাদে মানুষ কোনো কাজই সম্পাদন করতে পারে না। আনন্দবাদের প্রতিপাদ্য হলো, আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে মানুষের সকল কাজের অন্তর্নিহিত প্রেরণা। কিন্তু আনন্দ বলতে কি বুঝবে, এ নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কেউ বলেছেন, আনন্দ হচ্ছে দৈহিক সুখ। আবার কেউ বলেছেন, দেহের আনন্দই একমাত্র সুখ নয়। ন্যায় ও ধর্মের কারণে দৈহিক আনন্দের বিসর্জনও মানুষের জন্য সুখকর এবং কাম্য হতে পারে। ব্যাখ্যার এই পার্থক্যের ভিত্তিতে আনন্দবাদকে মনস্তাত্ত্বিক এবং নীতিগত আনন্দবাদ এই দুটি উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়।

মনস্তাত্ত্বিক আনন্দবাদের মতে, মানসিক সুখ হচ্ছে সকল কাজের মূল। মানুষ যখন কোনো বিশেষ আনন্দকে বিসর্জন দেয় তখনও সে অপর কোনো আনন্দলাভের কথা মানসিকভাবে কল্পনা করে। নীতিবাদী আনন্দবাদের মতে সুখের কামনা মানুষের কেবল ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয়। আনন্দেরর কামনা মানুষের একটি দায়িত্ব বা কর্তব্য। কেননা আনন্দলাভের কামনা ব্যতীত মানুষের জীবন আদৌ ক্রিয়াশীল হতে পারে না।

আনন্দের ক্ষেত্রে আর একটি প্রশ্ন হচ্ছে: সুখ কি ব্যক্তিগত হবে, না সমষ্টিগত হবে। এ প্রশ্নে ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত আনন্দবাদ বলে দুটি উপধারার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত সুখবাদের ব্যক্তির কাছে নিজের আনন্দ হচ্ছে চরম কথা ও একমাত্র কাম্য। সমষ্টির আনন্দ যদি ব্যক্তির আনন্দের পরিপোষক হয় তবেই ব্যক্তি সমষ্টির আনন্দেরও কামনা করতে পারে। ব্যক্তির আনন্দের পরিপন্থী হলে নয়।

আরো পড়ুন:  আমলাতন্ত্রের ঐতিহাসিক গণতন্ত্রবিরোধিতা ও তার প্রকৃতি

অনেকে এপিকিউরাস এবং এরিসটিপাসকে ব্যক্তিগত আনন্দবাদের প্রবক্তা মনে করেন। কিন্তু আনন্দের ব্যাখ্যায় এপিকিউরাস এবং এরিসটিপাসের মধ্যেও পার্থক্য আছে। এরিসটিপাস যেখানে মুহুর্তের আনন্দকেই প্রধান মনে করেছেন, এপিকিউরাস সেখানে মুহুর্তের বাইরে ব্যক্তির সামগ্রিক জীবনের আনন্দকে ব্যক্তির লক্ষ্য বলে নির্দেশ করেছেন। মিল ও বেন্থামের উপযোগবাদে সমষ্টিগত আনন্দবাদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। উপযোগবাদ বা হিতবাদের একটি বহুল উল্লিখিত বাক্য হচ্ছে: ‘বৃহত্তম সংখ্যার বৃহত্তম পরিমাণ হিত হবে মানুষমাত্রের লক্ষ্য’।

জন স্টূয়ার্ট মিল অবশ্য বৃহত্তম পরিমাণ সুখ বলতে কেবল সুখের পরিমাণই বুঝাতে চান নি। তিনি সুখের ক্ষেত্রে পরিমাণ ও গুণের প্রশ্নটি বিবেচনা করেছেন এবং গুণগতভাবে যে সুখ কাম্য তাকে পরিমাণ নির্বিশেষে কাম্য বলে মনে করতেন।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৯০-১৯১।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page