আপনি যা পড়ছেন

ভাব প্রসঙ্গে

‘ভাব’ বা ধারণা (ইংরেজি: Idea) বলতে সাধারণত কোনো কিছু সম্পর্কে মানুষের মনের ধারণা বুঝায়। এই শব্দ বা পদটি বহুল পরিচিত এবং ব্যবহৃত হলেও দর্শন এবং মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ভাব’ এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা দেখতে পাওয়া যায় না। ‘ভাব’ মনের ব্যাপার;_ একথা স্বীকার করলেও ভাব কিভাবে তৈরি হয় এবং ‘ভাব ও ভাবের উৎস’-এ দুয়ের মধ্যে কি পার্থক্য, কি সম্পর্ক এবং কে প্রধান, এ প্রশ্নে বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।

ভাবের আলোচনা দুভাবে করা যায়। একটি হচ্ছে মনোবিজ্ঞানের দিক হতে অন্যটি দর্শনের, বিশেষ করে জ্ঞানতত্ত্বের দিক থেকে। মনোবিজ্ঞানে ভাব দ্বারা মানসিক ক্রিয়া বুঝানো হয়। জ্ঞানতত্ত্বে ভাব হচ্ছে জ্ঞানের মাধ্যম। ভাবের মাধ্যমে আমরা জগতকে জানি। এজন্যই আমরা বলি, এই বস্তুটি বা ঐ বস্তুটি সম্পর্কে আমার ধারণা বা ভাব হচ্ছে ইত্যাদি। অর্থাৎ কোনো বস্তু সম্পর্কে আমাদের মন যখন চিন্তা করে তখন বস্তু দৈহিকভাবে আমাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করে তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। বস্তু থেকে আমাদের ইন্দ্রিয় যে সমস্ত বোধ বা অনুভূতি লাভ করে সেই অনুভূতিসমূহের মাধ্যমে মন বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি করে। যুক্তিবিদ্যায় ভাব বা পদকে ব্যক্তিবাচক, সাধারণ, বস্তুবাচক, গুণবাচক প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়।

দর্শনের ইতিহাসে ভাবের তিনটি ব্যাখ্যা বা তত্ত্ব বিশেষভাবে পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রাচীন তত্ত্ব হচ্ছে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর তত্ত্ব (৪২৭-৩৪৭ খ্রি.পূ.); দ্বিতীয় হচ্ছে অভিজ্ঞতাবাদী এবং বিশেষ করে ইংরেজ দার্শনিক জন লকের ব্যাখ্যা, তৃতীয়টি জার্মান দার্শনিক হেগেলের।

প্লেটো ভাব বলতে মনের সৃষ্টি বুঝিয়েছেন। বস্তু ভাবকে মনের মধ্যে তৈরি করে কিংবা ভাবের উৎস হচ্ছে বস্তু, সাধারণ এই মতকে অস্বীকার করে প্লেটো বলেন, এতে মনে হতে পারে যে, বস্তু হচ্ছে প্র্রধান, ভাব অপ্রধান এবং ভাব বস্তুর উপর নির্ভরশীল। প্লেটোর মতে মনের বাইরে ভাবের নিজস্ব একটি সত্তা আছে। ভাবের সেই সত্তাই মনের সব ভাবের উৎস। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, জ্যামিতিক ‘ত্রিভুজ’ সম্পর্কে মানুষ কথা বলে। ত্রিভুজের ভাব সে মনে ধারণ করে। ত্রিভুজ মানুষের বস্তুজগতের একটি মাধ্যম। কিন্তু বস্তুজগতে ‘ত্রিভুজ’ এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কাজেই একথা বলা চলে না যে, ত্রিভুজ নামক কোনো বস্তু মানুষের মনে ত্রিভুজ ধারণার সৃষ্টি করে।

আরো পড়ুন:  নিরপেক্ষ এবং সাপেক্ষ কাকে বলে

প্লেটোর মতে ত্রিভুজ হচ্ছে একটি স্বাধীন অস্তিত্বসম্পন্ন ভাব। এই ভাবই মানুষের মনে ত্রিভুজ ভাবনার সৃষ্টি করে। কাগজের পৃষ্ঠায় কিংবা মাটির বুকে অঙ্কিত কোনো ত্রিভুজের সম্পূর্ণতা অসম্পূর্ণতা এই স্বাধীন ‘ত্রিভুজ’ ভাবের সঙ্গে তুলনাক্রমেই মানুষ স্থির করে। প্লেটোর এই ব্যাখ্যা বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যানুযায়ী কেবল জ্যামিতিক ত্রিভুজ নয়, বস্তুজগতের সমস্ত কিছুরই মূল হচ্ছে ভাব। দার্শনিক যদি বিশ্বচরাচরের তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে চায় তবে তাকে এই ভাবের ‍উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে; ভাবের তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে হবে। প্লেটোর এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে দর্শনের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ভাববাদ। বস্তুত ভাববাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিভূ হিসাবেই প্লেটোর পরিচয়।

অভিজ্ঞতাবাদী জন লকের মতে মানুষ যা কিছু সম্পর্কে চিন্তা করে তাই তার মনের ভাব। একটি টেবিল সম্পর্কে যখন আমি চিন্তা করি তখন ‘টেবিল’টা আমার মনের ভাব; একটা ‘চেয়ার’ সম্পর্কে যখন চিন্তা করি তখন ‘চেয়ার’টা মনের ভাব। এই অর্থে পৃথিবীর সমস্ত বস্তুপুঞ্জই আমার মনের ভাব। এবং বস্তুপুঞ্জ বা অভিজ্ঞতাই হচ্ছে ভাবের উৎস। কিন্তু তাই বলে চেয়ার নামক ভাবটাই বস্তু নয়। চেয়াররূপ ভাব বস্তু নয়, কিন্তু তার উৎস। বস্তু-ভাবের এই দ্বৈত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে যে ভাববাদ উদ্ভূত হয় তাকে অনেক সময় অভিজ্ঞতাবাদ বা ব্রিটিশ ভাববাদ নামে অভিহিত করা হয়।

ভাবের তৃতীয় প্রধান ব্যাখ্যা দেন হেগেল। হেগেলের মতের সঙ্গে এ ব্যাপারে প্লেটোর ব্যাখ্যার সাদৃশ্য আছে। হেগেল বলেনঃ বস্তুপুঞ্জের কোনো একটি তাৎপর্য বস্তুপুঞ্জের অপর সকল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। অংশের সাথে অংশের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত সমগ্রের উপলব্ধির মাধ্যমেই এই সমগ্রের কোনো অংশবিশেষেরও তাৎপর্য উপলব্ধি সম্ভব। দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক সংখ্যা ‘৩’ কে। সংখ্যা ‘৩’ এর নিজস্ব কোনো অনন্য নির্ভর অর্থ নেই। ‘৩’, ২ এবং ৪ এর সাথে সম্পর্কিত এবং এ সম্পর্ক বুঝার মাধ্যমেই ‘৩’ এর তাৎপর্য বুঝা সম্ভব। কিন্তু এই সমগ্রের উপলব্ধি ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্ভব নয়। এই সমগ্র হচ্ছে মনের উপলব্ধি। অন্য কথায় এই সমগ্র বস্তুপুঞ্জ হলেও কেবলমাত্র বস্তুপুঞ্জ নয়। এই সমগ্র হচ্ছে মনের ভাব এবং আমাদের উপলব্ধ বস্তুপুঞ্জ হচ্ছে এই ভাবেরই সংবদ্ধ প্রকাশ। বাস্তব জগত ভাবের প্রকাশমাত্র নয়, বাস্তব জগতই ভাব এর এরূপ অর্থ প্রকাশ পায় বলে হেগেল এর এই ভাববাদকে অনেকে বাস্তব ভাববাদ বা অবজেকটিভ আইডিয়ালিজম বলে অভিহিত করেন।

আরো পড়ুন:  সহজাত ধারণা হচ্ছে মানুষের মনের ভেতরের জন্মগত ধারণা

মনের ভাবের সৃষ্টি এবং বস্তুজগতের সাথে তার সম্পর্কে প্রশ্নটি বিশেষ জটিল প্রশ্ন। দর্শনের ইতিহাসে যে সকল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার কোনোটিতে ভাব প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অন্য কোনোটিতে বিশেষ করে বস্তুবাদের ব্যাখ্যায়, ভাব ও মন অস্বীকৃত হয়ে সবকিছু অনড় বস্তুপুঞ্জে পর্যবসিত হয়েছে। মার্কসবাদ বা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে মন এবং বস্তু উভয়ের স্বীকৃতিসহ একটি সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই মত অনুযায়ী ভাব এবং বস্তুর মধ্যে বস্তু অবশ্যই প্রধান। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এবং মষ্তিষ্কের কোষে বস্তুর আঘাতজনিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মনে বস্তুর ছবি বা ভাব সৃষ্টি হয়। মানুষের মনও গতিময় বস্তুর বিকাশের ফলশ্রুতি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বস্তু প্রধান হলেও বস্তুপুঞ্জ এবং মনের যে পারস্পরিক ও দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান সেখানে বস্তু যেমন মনের উপর ক্রিয়াশীল হয়ে ভাবের সৃষ্টি করে, ভাবও তেমনি বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল হয়ে বস্তু এবং পরিবেশকে পরিবর্তনে মানুষের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২০৬-২০৮।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page