আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > ইতিহাস > কমিউনিস্ট লীগের ইতিহাস

কমিউনিস্ট লীগের ইতিহাস

‘কমিউনিস্ট লীগ’ হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের প্রথম আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংগঠন। এটি প্রতিষ্ঠার আগে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রী ও অগ্রণী শ্রমিকদের মতাদর্শ ও সংগঠনের দিক থেকে জমায়েত করার জন্য মার্কস ও এঙ্গেলসকে প্রচুর খাটতে হয়েছিল। এই লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা ১৮৪৬ খ্রীস্টাব্দেই ব্রাসেলসে কমিউনিস্ট করেসপন্ডেন্স কমিটি গঠন করেন। বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠায় মার্কস ও এঙ্গেলস তীব্ৰ বিতর্ক চালান ভাইতলিং-এর স্কুল সমবাদী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে, ‘খাটি সমাজতন্ত্র’ এবং প্রুধোঁর পেটি বুর্জোয়া কল্পলৌকিকতার বিরুদ্ধে, — শ্রমিক ও কারিগর নিয়ে গঠিত গুপ্ত সমিতি ‘ন্যায় লীগের’ সদস্যদের ওপর প্রুধোঁর প্রভাব ছিলো। জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে সংগঠন ছিলো এ লীগের। ‘ন্যায় লীগের’ লন্ডন নেতৃত্ব মার্কস ও এঙ্গেলসের ভাবাদর্শের সঠিকতায় নিশ্চিত হয়ে ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারির শেষ দিকে আমন্ত্রণ জানান তাঁদের সংগঠনে যোগ দিতে ও তাঁদের প্রদত্ত নীতির ভিত্তিতে লীগের একটি কর্মসূচি প্রণয়ন ও লীগের পুনঃসংগঠনে অংশ নিতে। মার্কস ও এঙ্গেলস আমন্ত্রণ গ্ৰহণ করেন ।

‘ন্যায় লীগের’ কংগ্রেস হয় ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসের গোড়ার দিকে, লন্ডনে। ‘কমিউনিস্ট লীগের’ প্ৰথম কংগ্রেস বলে এটি ইতিহাসে খ্যাত। এঙ্গেলস ও ভিলহেলম ভলফ কংগ্রেসের কাজকর্মে অংশ নেন। কংগ্ৰেসে ‘ন্যায় লীগের’ পুনর্নামকরণ হয় ‘কমিউনিস্ট লীগ” এবং ‘সব মানুষই ভাই’ এই পুরনো ঝাপসা শ্লোগানের বদলে দেওয়া হয় প্রলেতারীয় পার্টির সংগ্ৰামী আন্তর্জাতিক ধ্বনি: “দুনিয়ার মজুর এক হও!” কংগ্রেসে ‘কমিউনিস্ট লীগের’ নিয়মাবলীও বিচার করা হয়— এটির রচনায় সক্রিয় সাহায্য করেন এঙ্গেলস। নূতন নিয়মাবলীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যগুলি পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট হয় ও যেসব শর্তে সংগঠনটির চেহারা দাঁড়িয়েছিল গুপ্ত সমিতির মতো, তা বর্জন করা হয়, লীগের কাঠামো গড়া হয় গণতান্ত্রিক নীতির ওপর। নিয়মাবলী চূড়ান্ত রূপে অনুমোদিত হয় কমিউনিস্ট লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে। এ কংগ্রেস হয় ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দের ২৯শে নভেম্বর থেকে ৮ই ডিসেম্বর, লন্ডনে, এবং মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই তাতে অংশ নেন। সুদীর্ঘ বিতর্কে তাঁরা বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের নীতিগুলিকে রক্ষা করেন ও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস তা সর্ববাদীসম্মতরূপে গ্ৰহণ করে। কংগ্রেসের অনুরোধে মার্কস ও এঙ্গেলস লেখেন ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার‘—এই দলিল-কর্মসূচিটি প্ৰকাশিত হয় ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ।

লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ছিলো লন্ডনে; ফ্রান্সে বিপ্লব শুরু হওয়ায় ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির শেষে কেন্দ্রীয় কমিটি তার নেতৃত্ব তুলে দেয় ব্রাসেলস্ জেলা কমিটির হাতে, যার নেতৃত্বে ছিলেন মার্কস। মার্ক্স ব্রাসেলস থেকে নির্বাসিত হয়ে প্যারিসে আসায় নূতন কেন্দ্রীয় কমিটিও মার্চের গোড়ার দিকে ফরাসী রাজধানীতে স্থানান্তরিত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটিতে এঙ্গেলসও নির্বাচিত হন। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের মার্চের শেষ ও এপ্রিলের গোড়ায় কেন্দ্রীয় কমিটি কয়েক শত জার্মান শ্রমিককে দেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করে। এদের অধিকাংশই ‘কমিউনিস্ট লীগের’ সভ্য। জার্মানিতে তখন যে বিপ্লব শুরু হয়েছিলো তাতে এরা অংশ নেবে স্থির হয়। এ বিপ্লবে ‘কমিউনিস্ট লীগের’ কর্মসূচি দেওয়া হয় ‘জার্মানিতে কমিউনিস্ট পাটির দাবি’তে মার্চের শেষের দিকে। মার্কস ও এঙ্গেলস তা রচনা করেন।

১৮৪৮ খ্ৰীস্টাব্দের এপ্রিলের গোড়ায় জার্মানিতে এসে মার্কস ও এঙ্গেলস এবং তাঁদের অনুগামীরা বোঝেন যে পশ্চাৎপদ জার্মানিতে যেখানে শ্রমিকদের ঐক্য নেই, রাজনৈতিক সচেতনতা কম, সেখানে সারা দেশে ছড়ানো ‘কমিউনিস্ট লীগের’ শ’ দুইতিন সদস্য জনগণকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারবে না। তাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চরম বামপন্থী, বস্তুত প্রলেতারীয় অংশটার সঙ্গে যোগ দেওয়া উচিত বিবেচনা করেন। কলোন গণতান্ত্রিক সমিতিতে যোগ দেন তাঁরা এবং বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের মত তুলে ধরার জন্য, পেটি বুর্জেয়া গণতন্ত্রীদের অসঙ্গতি ও দোদুল্যমানতা সমালোচনা এবং তাদের সংগ্রামে প্ররোচিত করার জন্য গণতান্ত্রিক গ্রুপগুলিতে যোগ দিতে তাঁরা অনুগামীদের পরামর্শ দেন। সেইসঙ্গে শ্রমিক সমিতি সংগঠন, প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক শিক্ষার ওপর মনোনিবেশ এবং একটা গণপ্রলেতারীয় পার্টির ভিত্তি গড়ার জন্যও মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের তাগিদ দেন। ‘কমিউনিস্ট লীগের’ সদস্যদের পরিচালক কেন্দ্র ছিলো মার্কস সম্পাদিত Neue Rheinische Zeitung পত্রিকা। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের শেষ দিকে লন্ডনে লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করে ও লীগ পুনর্গঠনের জন্য জাসেফ মালকে জার্মানিতে পাঠায় দূত হিসাবে। লন্ডন সংস্থাটি ইতিমধ্যে ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দের নিয়মাবলী সংশোধন করে তাদের রাজনৈতিক তাৎপৰ্য কমিয়ে ফেলে। ‘কমিউনিস্ট লীগের’ প্ৰধান লক্ষ্য হিসাবে বুর্জোয়ার উচ্ছেদ, প্রলেতারীয় শাসন প্রতিষ্ঠা ও শ্রেণিহীন কমিউনিস্ট সমাজ নির্মাণের কথা আর তাতে ছিল না। তার বদলে বলা হয় কেবল একটা সামাজিক প্রজাতন্ত্রের কথা। ১৮৪৮-১৮৪৯ খ্রীস্টাব্দের শীতে মল-এর দৌত্য ব্যর্থ হয় ।

১৮৪৯ খ্ৰীস্টাব্দের এপ্রিলে মার্কস, এঙ্গেলস ও তাঁদের অনুগামীরা গণতান্ত্রিক সমিতি ত্যাগ করেন। শ্রমিক জনগণ তখন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ও পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের ওপর ভয়ানক আস্থা হারিয়েছে, তাই একটা স্বাধীন প্রলেতারীয় পাটি স্থাপনের কথা ভাবার সময় এসেছিলো তখন। কিন্তু পরিকল্পনা কার্যকরী করতে ব্যর্থ হন মার্কস ও এঙ্গেলস। দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানিতে একটা অভ্যুত্থান ঘটে ও তার পরাজয়ে জার্মান বিপ্লবের অবসান হয়।

বিপ্লবের ঘটনাধারা থেকে বোঝা যায় যে ‘কমিউনিস্ট ইশতেহারে’ যা লিপিবদ্ধ করা হয়েছিলো ‘কমিউনিস্ট লীগের’ সেসব মতামতই একান্ত সঠিক, বিপ্লবী কৌশলের একটা চমৎকার স্কুল হিসাবে কাজ করে লীগ। তার সদস্যেরা সতেজে অংশ নেয় আন্দোলনে, সর্বাধিক বিপ্লবী শ্রেণি প্রলেতারিয়েতের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে যায় সংবাদপত্রে, ব্যারিকেডে, যুদ্ধক্ষেত্রে।

বিপ্লবের পরাজয়ে কঠিন ঘা খায় ‘কমিউনিস্ট লীগ’। তার বহু সদস্য কারারুদ্ধ হয়, নয় দেশত্যাগ করে। ঠিকানা-পত্ৰ যোগাযোগ সব নষ্ট হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় স্থানীয় শাখাগুলির কাজ। জার্মানির বাইরেও প্রচুর ক্ষতি সইতে হয় লীগকে।

১৮৪৯ খ্রীস্টাব্দের শরতে লীগের অধিকাংশ নেতা লন্ডনে সমবেত হন। মার্কস ও এঙ্গেলসের নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত নূতন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচেষ্টার দৌলতে পূর্বের সংগঠন পুনরুদ্ধার হয় ও লীগের কাজকর্ম ফের শুরু হয় ১৮৫০ খ্রীস্টাব্দের বসন্তে।

১৮৫০ খ্রীস্টাব্দের মার্চে মার্কস ও এঙ্গেলস লেখেন ‘কমিউনিস্ট লীগের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির বক্তব্য’। এতে ১৮৪৮-১৮৪৯ খ্রীস্টাব্দের বিপ্লবের ফলাফল নির্ণয় করা হয় ও পেটি বুর্জোয়াদের কাছ থেকে স্বাধীন একটি প্রলেতারীয় পার্টি গঠনের কর্তব্য হাজির করা হয়। ‘বক্তব্যে’ই প্রথম চিরস্থায়ী বিপ্লবের ভাবনা নির্দিষ্ট হয়। ১৮৫০ খ্রীস্টাব্দের মার্চে নূতন একটি কমিউনিস্ট মুখপত্র প্রকাশিত হয়। এটি হলো Neue Rheinische Zeitung, Politisch-okonomische Revue.

১৮৫০ খ্রীস্টাব্দের গ্ৰীষ্মে রণকৌশল নিয়ে ‘কমিউনিস্ট লীগের’ কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে একটি নীতিগত বিতর্ক দেখা দেয়। আগস্ট ভিল্লিখ ও কার্ল শাপার ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ বিকাশ ও বাস্তবতা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অবিলম্বে একটা বিপ্লব বাধাবার সংকীৰ্ণপন্থী ও বেপরোয় কর্মনীতির প্রস্তাব করে। মার্কস ও এঙ্গেলসের নেতৃত্বে অধিকাংশ তার সুদৃঢ় বিরোধিতা করে। মার্কস ও এঙ্গেলস প্রধান জোর দেন বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের প্রচারে ও আসন্ন বিপ্লবী সংঘাতের জন্য প্রলেতারীয় বিপ্লবীদের তৈরি করে তোলায়। তাঁরা বলেন, প্রতিক্রিয়াশীলরা যখন আক্রমণ শুরু করেছে তখনকার কালে ‘কমিউনিস্ট লীগের’ প্ৰধান কর্তব্য হল এইটে । ১৮৫০ খ্ৰীস্টাব্দের মধ্য সেপ্টেম্বরে ভিল্লিখ-শাপারের বিভেদপন্থী ক্রিয়াকলাপের ফলে তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৫ই সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে মার্কসের পরামর্শমতো কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষমতা কলোন জেলা কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়। লন্ডন কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের এই মত জার্মানিতে সর্বত্র ‘কমিউনিস্ট লীগের’ শাখাগুলি অনুমোদন করে। মার্কস ও এঙ্গেলসের নির্দেশে কলোনে নূতন কেন্দ্রীয় কমিটি ১৮৫০ খ্ৰীস্টাব্দের ডিসেম্বরে নূতন একদফা লীগ নিয়মাবলী রচনা করে। ১৮৫১ খ্ৰীস্টাব্দের মে মাসে পুলিশী নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের ফলে জার্মানিতে ‘কমিউনিস্ট লীগের’ কাৰ্যকলাপ বস্তুতপক্ষে থেমে যায়। কলোন কমিউনিস্ট বিচারের অনতিপরেই মার্কস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ তুলে দেবার কথা ঘোষণা করতে বলেন। সে ঘোষণা করা হয় ১৮৫২ খ্ৰীস্টাব্দের ১৭ নভেম্বরে।  

প্রলেতারীয় বিপ্লবীদের একটা স্কুল হিসাবে, প্রলেতারীয় পার্টির একটা বীজকেন্দ্র হিসাবে, এবং প্রথম আন্তর্জাতিক—শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির পূর্বসূরী হিসাবে ‘কমিউনিস্ট লীগ’ তার ঐতিহাসিক কৰ্তব্য করে গেছে।

তথ্যসূত্র:

প্রবন্ধটির বেশিরভাগ তথ্য সংঘ প্রকাশন, ঢাকা জানুয়ারি ২০১৪ থেকে প্রকাশিত কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস লিখিত কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার গ্রন্থের ৬০-৬২ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page