প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ প্রযুক্তি শিল্পবাদ এবং অস্ত্রের জন্য ব্যাপক-উৎপাদন পদ্ধতির প্রয়োগ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ প্রযুক্তি (ইংরেজি: Technology during World War I) হচ্ছে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে শিল্পবাদ এবং অস্ত্রের জন্য ব্যাপক-উৎপাদন পদ্ধতির প্রয়োগ এবং সাধারণভাবে যুদ্ধ তৎপরতার প্রযুক্তির দিকের ঝোঁককে প্রতিফলিত করে। এই প্রবণতাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর আগে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ১৮৬১- ১৮৬৫ সালের সময়ে শুরু হয়েছিল এবং সৈন্য এবং রণকৌশলবিদরা অনেকগুলি ছোট ছোট সংঘাতের মধ্যে নতুন অস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছিলেন।

আটলান্টিকের ত্রাস জার্মান ইউবোট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে ইউরােপের প্রতিটি দেশ সমীহ করে চলতে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। ১৯১৪ সালের দিকে উদ্ভাবিত জার্মান ইউবােট এক্ষেত্রে হঠাৎ করেই আটলান্টিকের অতলে ত্রাস সৃষ্টি করে। জার্মান শব্দ ‘আন্ডারসিবােটভাভি’ থেকেই এ ইউবােটের নামকরণ যা পানির তলদেশ দিয়ে আক্রমণ চালাতে অনেক কার্যকর একটি সাবমেরিন। ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার ঠিক দুদিন পর তৎপরতা শুরু করে এ ইউবােট। ১৯১৪ সালের ৬ আগস্ট হােলিগােল্যান্ডে অবস্থিত নৌঘাঁটি থেকে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির ওপর আক্রমণ শানাতে যাত্রা করে ১০টি জার্মান ইউবোট। ইতিহাসে প্রথমবারের মত সাবমেরিন টহল শুরু হলে মাইনের আঘাতে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ১৯১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সফলতার মুখ দেখে ইউবােটগুলাে। লেফটেন্যান্ট অটো হার্সিং ইউ-২১ থেকে টর্পেডাে নিক্ষেপ করে ব্রিটিশ ক্রুজার পাথফাইন্ডারকে ডুবিয়ে দেয়। এতে ২৫৯ জন ক্রুর কেউই প্রাণরক্ষা করতে পারেনি। এদিকে ২২ সেপ্টেম্বর লেফটেন্যান্ট অটো ওয়েডিগেন ইউ-৯ তিনটি ব্রিটিশ ক্রুজারে প্রাণঘাতী হামলা চালান। এতে তিনটি ব্রিটিশ ক্রুজার আবুকির, ক্রেসি ও হগ পুরােপুরি পানিতে ডুবে যায়। মাত্র আধঘণ্টার এ লড়াইয়ে প্রায় ১ হাজার ৪৬০ জন ব্রিটিশ নাবিক প্রাণ হারায়। এরপর আরাে কয়েকটি হামলা চালিয়ে এককথায় আটলান্টিকের ত্রাস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জার্মান ইউবােট। 

অন্তরীক্ষেও দুর্নিবার যুদ্ধ

প্রথম দিকে পদাতিক বাহিনী যুদ্ধ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিমান বাহিনী এর শৈশব অতিক্রম করছে মাত্র। প্রথম দিকে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যাম্বিস ও কাঠের তৈরি বিমানগুলােকে ব্যবহার করা হয়। খুবই ধীরগতির কিছু জেপেলিন ও বেলুন এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। প্রথম দিকে শুধুমাত্র শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে সংবাদ বিনিময় শুরু হলেও পরের দিকে ইট থেকে শুরু করে গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু হয় বিমান থেকে। প্রথম দিকে দুর্বল শক্তির মরিস ফারম্যান, শর্টহর্ন, লংহর্ন, ডিএফডব্লিউবি-১, র্যামপ্লার টাউব, বিই-২-এ, এইজি সেকেন্ড, ব্লেরিয়ট ইলেভেন প্রভৃতি বিমান ব্যবহার করা হয়। ধীরে যুদ্ধ এগিয়ে যাওয়া অবস্থায় বিমানের গঠন কাঠামােতে অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়। বিশেষ করে ১৯১৫ সালে জার্মানির উদ্ভাবিত ফকার বিমান মিত্রবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। প্রায় ১১০০ ফুট উচ্চতা দিয়ে ৩০০ কিলােমিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম এই বিমান বলতে গেলে মিত্রবাহিনীর জন্য মহাবিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দেয়। ১৯১৭ সালের দিকে বিমান হামলা ভয়াবহরূপ লাভ করলে ব্রিটিশ বাহিনী তাদের ২৪৫টি বিমান হারায়। এক্ষেত্রে জার্মান বাহিনীর ক্ষতি হয় ৬৬টির মত বিমান। সবমিলিয়ে আকাশপথেও চলতে থাকে ভয়াবহ যুদ্ধ।

আরো পড়ুন:  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্র এবং প্রচারণাগুলো হচ্ছে যুদ্ধের ধরন, রণক্ষেত্র এবং প্রচারণার রূপ

ট্যাংকের লড়াই 

পশ্চিম রণাঙ্গনের ব্যর্থতা ব্রিটিশদের উন্নততর প্রযুক্তির সামরিক যান ও কৌশলগত অবস্থান গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। উপনিবেশ স্থাপন থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পেছনের দরজা যে ব্রিটিশদের প্রথম পছন্দ এবারেও তারা তেমন কোনাে পদ্ধতি খুঁজতে চেষ্টা করে। তারা একইসাথে কাঁটাতারের বেড়া ধ্বংসের পাশাপাশি মেশিনগানের গুলি থেকে বেঁচে পরিখা অতিক্রমে সক্ষম যানবাহন তৈরি করে। এক্ষেত্রে কর্নেল আর্নেস্ট সুইনটনের নির্দেশনায় কাজে নেমে পড়ে ল্যান্ডশিপস কমিটি। তাদের দীর্ঘদিনের চেষ্টায় নির্মিত হয় লিটল উইলি নামক ট্যাংক। এক্ষেত্রে ব্রিটিশরা দুই মেইল ও ফিমেইল নামে দুই ধরনের ট্যাংক উদ্ভাবন করে। তারা দুইটি সিক্স পাউন্ডার গানের পাশাপাশি ৪টি মেশিনগান সজ্জিত ট্যাংকের নাম দেয় মেইল। অন্যদিকে সিক্স পাউন্ডারের পাশাপাশি ভাইকার্স মেশিনগান যুক্ত ট্যাংকে ফিমেইল নাম দেয়। বলতে গেলে পশ্চিম রণাঙ্গনের ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীর হাজার হাজার ট্যাংক এক্ষেত্রে অনেক কার্যকর হয়ে ওঠে। বলতে গেলে শুরুতে এ ট্যাংকের লড়াইতেই তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেনি শক্তিমান জার্মান বাহিনী। তবে পরিখা সুবিধা কাজে লাগিয়ে গতি শ্লথ করে দেয়ার পাশাপাশি জার্মানরাও বসে থাকেনি। তারা আবিষ্কার করে বসে ট্যাংক বিধ্বংসী নানা অস্ত্র। শেষ পর্যন্ত জার্মানরা তৈরি করে প্যাক ৪০-৭৫এমএম গান। বিশাল ক্যালিবারের এ গােলা যেকোনাে ট্যাংকর ধ্বংস করে দিত। 

অনৈতিক রাসায়নিক অস্ত্র 

পশ্চিম রণাঙ্গনের দখল নিয়ে প্রতিযােগী দেশগুলাের অনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। পরিখা তৈরি করে বছরের পর বছর নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে জার্মান বাহিনী। শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হটাতে জঘন্য রকমের গন্ধযুক্ত ক্লোরিন গ্যাসবােমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে চোখ জ্বালাপােড়া করার পাশাপাশি সৈন্যদের আরাে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। উপযুক্ত জবাব দিতে জার্মানিও চালায় মাস্টার্ড গ্যাসবােমা হামলা। চামড়ায় যন্ত্রণাদায়ক দহন ও কাপড়চোপড় ভেদ করে ভেতরে গিয়ে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দেখা এই গ্যাস। সবমিলিয়ে এই গ্যাসবােমার হামলা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও মানবতা বিবর্জিত হলেও তা শাপে বর হয়ে দেখা দেয় মিত্রবাহিনীর জন্য। বিশেষ করে বেশিরভাগ গ্যাস ছিল বাতাসের চেয়ে ভারী। এগুলাে গিয়ে বিভিন্ন জার্মান বাংকারে জমা হয়। সেখানে শুধুমাত্র যন্ত্রণাদায়ক গ্যাসের জন্য অনেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় জার্মান বাহিনী। অন্যদিকে কিছু বিষাক্ত গ্যাস পানিতে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেক প্রাণি মারা যাওয়ার পাশাপাশি পানযােগ্য পানির অভাবেও ধুকতে থাকে শক্তিশালী জার্মান বাহিনী। অন্যদিকে গ্যাসবােমায় আক্রান্ত হয়ে মিত্রবাহিনীরও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়নি। অসেক ক্ষেত্রে গ্যাসবােমার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা নির্ভর করত বায়ুপ্রবাহের ওপর। বিশেষ করে বাতাসের উল্টোদিকে গ্যাসবােমা নিক্ষিপ্ত হলে তার থেকে নিজেদের রক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে যেত। পক্ষান্তরে দূর থেকে কুণ্ডলি পাকানাে গ্যাসের মেঘ থেকে শত্রু পক্ষ সাবধান হয়ে যায়। তবে পরবর্তীকালে ফরাসিরা কামানের গােলায় ভরে ফসজেন গ্যাস নিক্ষেপ করা শুরু করে। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরাে বেড়ে যায়।

আরো পড়ুন:  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতির প্রধান প্রধান শক্তি হচ্ছে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

তথ্যসূত্র:

১. মো. আদনান আরিফ সালিম, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, [Pdf]. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জানুয়ারি ২০১৯. সানজিদা মুস্তাফিজ ও সুমা কর্মকার. সম্পা. পৃষ্ঠা ৪২-৪৫; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Leave a Comment

error: Content is protected !!