আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > গণতন্ত্র > মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিকতা এবং যাদুকরী প্রচারমাধ্যমের নির্বোধ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা

মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিকতা এবং যাদুকরী প্রচারমাধ্যমের নির্বোধ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা

জনগণের ভেতরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা থাকতে হয় এবং গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও থাকতে হয়, তবে সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রুপদানের জন্য যৌথতা ও সম্মিলিত কার্যক্রমও লাগে। জটিল সামাজিক কাজে অতি উদারতাবাদ কাজকে বিঘ্ন করতে পারে। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিষিদ্ধ করা হলে তা ফ্যাসিবাদে রূপ নিতে পারে। কিন্তু মতপ্রকাশ করব কোথায়? মতপ্রকাশ করার একটা প্রধান উপায় হলো মিটিং, মিছিল, আলোচনা, জনসভা। গণতন্ত্রে সংগঠন করার এবং জনগণকে সংগঠিত করার অধিকার থাকতে হয়। সংগঠন করা বলতে যে কারো অনেক মানুষকে একত্রিত করা, দল গঠন করা, প্রতিবাদ করা, মতামত প্রকাশ ও মতামত গঠন করা ইত্যাদি বুঝতে হবে। এছাড়াও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলতে পত্রপত্রিকা-ম্যাগাজিন প্রকাশ করা এবং সেগুলোতে বিভিন্ন মত ও পথের লেখা প্রকাশ করা এবং সেসব লেখার মাধ্যমে জনমত গঠন ও জনমতকে প্রভাবিত করা বোঝায়।

কিন্তু বর্তমানে কী কোনো সংবাদপত্রে বা অন্যান্য প্রচারমাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন থাকে, বর্তমানে কোনো প্রভাবশালী পত্রিকা কী বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক ও প্রগতিশীল কোনো নতুন মত তৈরি করে? একুশ শতকের শুরুর দিকে দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর মালিকানা কী জনগণের হাতে আছে? পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের সংবাদপত্র এখন সে দেশের কর্পোরেট পুঁজির হাতে। দেশের প্রতিটি প্রচারমাধ্যম তথা পত্রপত্রিকা, রেডিও-টিভি, ইন্টারনেট এখন পুঁজিপতিদের দখলে। ফলে এসব প্রচারমাধ্যমে জনগণের প্রগতির পক্ষে কোনো কথা থাকে না। মানুষ এখন টিভির চোখে দেখে, খবরের কাগজের পাতা গিলে খায়, রেডিও শুনে ঘুমায়, টিভির শব্দে জেগে ওঠে।

এখন প্রচারমাধ্যম কী জনগণের কোনো কাজে লাগে, নাকি প্রচারমাধ্যম জনগণের শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে? বাস্তব অবস্থা এখন এই যে বাংলাদেশের মূলধারার প্রতিটি পত্রপত্রিকা রেডিও-টিভি এবং ইন্টারনেট এখন গণশত্রুর ভূমিকা পালন করছে। একুশ শতকের শুরুতে পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবেও এক ধরনের প্রচারমাধ্যম দেখা গেছে। এসব মাধ্যম প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার চিন্তা ও মতামত প্রচার করবার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে যে কেউ বাছবিচারহীনভাবে সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে যাচ্ছেতাই খবর তৈরি করছে। বুরকিনা ফাসোর ঘটনার ছবিকে হনলুলুর ঘটনা বলে চালানো হচ্ছে, আবার নিকারাগুয়ার ঘটনাকে বলা হচ্ছে মায়ানমারের ঘটনা। চিত্রকে বিকৃত করে অহরহ নিজস্ব স্বার্থের সাথে খাপ খাইয়ে প্রচার করা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সত্য মিথ্যার পার্থক্যরেখাগুলো মুছে ফেলেছে।

আবার এসব সামাজিক মাধ্যমের সাথে ঐতিহ্যবাহী পুরোনো প্রচারমাধ্যম যেমন বিবিসি, সিএনএন, ভয়েস অব আমেরিকা রেডিও, আল-জাজিরাসহ দেশি-বিদেশি সকল বহুচ্যানেলবিশিষ্ট টিভি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সমান্তরালে ক্রিয়াশীল আছে। আমাদের কাছে কি এই প্রশ্ন এখন জাগে যে, এসব প্রচারমাধ্যম জনগণের পক্ষের কী না। আমরা গভীরভাবে চিন্তা করলেই দেখতে পাবো যে, এসব প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনগণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে। সামাজিক প্রচার মাধ্যমগুলো কর্পোরেট পুঁজির এবং সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক শক্তি হয়েছে। যদিও প্রচারমাধ্যমের একটি ছদ্মাবরণ থাকে যে, তারা জনগণের বন্ধু হিসেবে কাজ করে।

প্রচারমাধ্যমের এমন কোনো ক্ষমতা নেই যা তারা করতে পারে না। বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশের শাসকেরা তাই প্রথমেই রেডিও-টিভি-পত্রিকার খবরকে নিয়ন্ত্রণ করে, এসবের মালিকদের হাত করে আর সাংবাদিকদের কিনে নেয়। অনেক সময় এসবের মালিকরাই রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা সেজে বসে। রেডিও-টিভি-পত্রিকার প্রভাব সম্পর্কে বিনয় ঘোষ (১৯১৭-১৯৮০) সেই ১৯৬৪ সালে লেখেন,

“কাগজের মধ্যে খবরের কাগজ চরম সত্য এবং নাগরিক জীবনের সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ের সর্বময় কর্তা। সত্যকে মিথ্যা মিথ্যাকে সত্য করার এমন যাদুকরী ক্ষমতা আদিম যুগের ম্যাজিশিয়ানদেরও ছিল না। বড় বড় কাগজ ও প্রেসের কোটিপতি মালিকরা কলকাতার মত মেট্রোপলিশ থেকে সমগ্র দেশের ‘কালচার’, ‘পলিটিক্স’ ও ‘ইকনমিক্স’ কনট্রোল করেন। কাগজ ও সেলুলয়েডের অশরীরি অবাস্তব জগতে প্রত্যেক নাগরিক আজ স্কন্ধকাটা প্রেতের মতো ঘুরে বেড়ায় আস্কন্ধ দেহাংশের নিত্যনৈমিত্তিক জৈবিক ধর্ম পালন করে, তার ওপরে মাথা বা মগজের জৈবিক ক্রিয়া বলে করণীয় কিছু থাকে না।”[১]

জনগণ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত জনগণ এসব প্রচার মাধ্যমকেই জ্ঞানার্জনের একমাত্র উৎস, খবরের প্রধান প্রবাহ মনে করে। পত্রিকা-টিভি-ইন্টারনেট মারফত জনগণ সারা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু এসব প্রচারমাধ্যম কী জনগণের সংস্কৃতিকে উন্নত করে, তাদের চিন্তাচেতনার মান বাড়ায়? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় এসব প্রচারমাধ্যম বরং জনগণের সংস্কৃতিকে ব্যর্থ করে, জনগণকে চিন্তা করার কোনো সুযোগই দেয় না, বরং লোমহর্ষক উদ্ভট ইন্দ্রিয়পরায়ণ সব খবর ও ঘটনায় জনগণকে উত্তেজিত রাখে, তাদেরকে ভোগবাদি মাংসল প্রাণিতে পরিণত করে। শিবনারায়ণ রায়(১৯২১-২০০৮) দেখাচ্ছেন,

“ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো দেশে সাধারণ লোকের ক্রয়ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি পাওয়ার সংগে সেখানে অত্যন্ত অপকৃষ্ট রচনার প্রভাবও প্রবলভাবে বেড়ে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েক সংবাদপত্র বাদ দিলে অধিকাংশ জনপ্রিয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিকের পাতা সুখ্যাত কেচ্ছাকাহিনী, মোটা রসিকতা, খুনখারাবির বিশদ বিবরণ আর নির্বোধ অশ্লীলতায় ভরা থাকে।”[২]

শিবনারায়ণ রায় ইংল্যান্ডের ‘ডেইলি মিরর’, ‘ডেইলি মেল’, ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ প্রভৃতি পত্রিকা সম্বন্ধে ম্যাথুজ নামে এক মার্কিন সাংবাদিকের উদ্ধৃতি দিয়ে জানাচ্ছেন এসব পত্রিকার চল্লিশ পঞ্চাশ লক্ষ থেকে কোটি কোটি পাঠক অর্জন করার সাফল্যের কারন কী? ম্যাথুজ এর মতে এই সাফল্যের কারনঃ

“ডেইলি মিরর’ জাতীয় জনপ্রিয় পত্রিকারা সচেতনভাবে সাধারণ পাঠকের নির্বোধ প্রত্যাশা মেটাতে উদ্যোগী। … এসব পত্রিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মস্ত চাটুকার। এরা সাধারণ পাঠকদের প্রত্যহ এই আশ্বাস জোগায় যে তারা বড় ভালো মানুষ, তাদের অন্ধ সংস্কারগুলো খুবই সঙ্গত, তাদের ভাবনাচিন্তা এবং অনুভূতি খুবই সুস্থ, যা কিছু তাদের অভিজ্ঞতা অথবা বোধবুদ্ধির বাইরে তার বিশেষ কোনো দাম নেই।”[৩]

একুশ শতকের শূন্য দশকে সকল জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা, বহু চ্যানেলবিশিষ্ট টেলিভিশন এবং জনপ্রিয় টিভি ও পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণ সম্পর্কেও এসব কথা খাটে; বরং পরিস্থিতি আরো জটিল এবং ভয়ংকর আকার ধারন করেছে। পুঁজিবাদে প্রচারমাধ্যমের ভ্রষ্ট ভূমিকা আজ এমনি সর্বগ্রাসী হয়ে দাঁড়িয়েছে যে রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি—কেউই আর নিরাপদ নয়। এসব প্রচারমাধ্যম সম্পর্কে বলা যায়, এসব পত্রিকা-টিভি-ইন্টারনেটে এমন কিছু থাকে না যা পাঠকের মনে প্রসারতা আনে, চিন্তাকে উন্নত করে, ভাবতে বাধ্য করে, অপ্রীতিকর সত্য স্বীকার করতে শেখায়, জ্ঞানার্জনে উৎসাহী করে, জাগতিকভাবে সৃষ্টিশীল করে, সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বরং অধিকাংশ অক্ষরপরিচয়সম্পন্ন মানুষের জ্ঞানচর্চার দৌড় সংবাদপত্র পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই তাদের ভেতরে চিন্তার যে অবয়বটি গড়ে তা সচেতন মানুষের পরিবর্তনকামী আকাঙ্ক্ষার সাথে খাপ খায় না।[৪]   

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ

০১. বিনয় ঘোষ; মেট্রোপলিটন মন, মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ; ওরিয়েন্ট লংম্যান; কলকাতা; পঞ্চম মুদ্রণ, এপ্রিল, ১৯৯০; পৃষ্ঠা-১২।

০২. শিবনারায়ণ রায়; গণতন্ত্র, সংস্কৃতি, অবক্ষয়; দেজ পাবলিশিং, কলকাতা; তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল, ২০০০; পৃষ্ঠা-২৮।

০৩. ঐ পৃষ্ঠা-২৯।

০৪. নিবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] সম্পাদিত বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গ্রন্থের বাঙালির অগণতান্ত্রিকতা প্রবন্ধের অংশবিশেষ। প্রাণকাকলিতে প্রকাশকাল ১৯ আগস্ট, ২০১৩ তারিখে কিছুটা সম্পাদনা ও সংযোজন করা হয়েছিলো এবং ১৮ অক্টোবর ২০১৭ কিছুটা পরিবর্ধন করা হলো।

আরো পড়ুন:  জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কর্মপদ্ধতি প্রসঙ্গে
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page