আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > গণতন্ত্র > নেতৃত্বের ভূমিকা ও জনগণের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে

নেতৃত্বের ভূমিকা ও জনগণের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে

প্রগতিতে জনগণের ভূমিকা সম্পর্কিত আলোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি বলতে আমরা এক্ষেত্রে সামন্তবাদ উৎখাত করে গণতান্ত্রিক বা নয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশকে বুঝাব। এই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে জনগণের কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনাকে বিবেচনা করব। গণতান্ত্রিক জীবনের অনুশীলনে জনগণ সঠিক চিন্তাধারা ধরে যেমন এগোতে পারে তেমনি ভুল পথেও তারা পরিচালিত হতে পারেন। জনগণ কি সবসময় ঠিক থাকেন নাকি জনগণও ভুল করতে পারেন? জনগণের সীমাবদ্ধতা থাকে কি বা থাকলে তা কি পরিমাণে থাকে? জনগণের চিন্তাধারা নির্ভুল হয় কী পরিমাণে—এসব প্রশ্নের উত্তর গণতন্ত্রের বিকাশের স্বার্থে আলোচনা করা প্রয়োজন।

জনগণের চিন্তাধারা যেমন ভুল হতে পারে তেমনি সঠিকও হতে পারে। জনগণ যেমন সঠিক কাজ করতে পারেন তেমনি ভুল কাজও করতে পারেন। জনগণের যেমন সীমাবদ্ধতা থাকে তেমনি সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের ক্ষমতাও থাকে। আবার সব জনগণের যেমন একই সময়ে একই রকমের ভুল থাকে না তেমনি, তেমনি সব জনগণ একই সময়ে একই সাথে সঠিকও থাকে না। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট স্থানের জনগণের চিন্তাধারায় সঠিকতা ও ভুলের মাত্রাগত পার্থক্য থাকে। এই ঠিক-বেঠিকের লড়াই মূলত প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যেকার লড়াই। 

জনগণ সামাজিক অনুশীলনে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে নানা বিষয়ে নানামুখি ধারনা অর্জন করে এবং যেসব ধারনা ও চেতনা অনুশীলনের মাধ্যমে সফল হয় এবং জনগণের পক্ষে প্রগতিতে ভূমিকা রাখে সেগুলো নির্ভুলরূপে প্রতীয়মান বলে ধরা হয়। ফলে জনগণ অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে নির্ভুল চিন্তাকে গ্রহণ করে এবং ভুল চিন্তাকে বর্জন করে। জনগণ সংগ্রাম করে মূলত পার্টির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থেকে; অর্থাৎ জনগণের কার্যক্রমে পার্টির ভূমিকা বিরাট। জনগণের রয়েছে অসীম ধৈর্য ও লড়াইয়ের অফুরন্ত শক্তি, এবং এই শক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে যায় পার্টি। এই প্রসঙ্গে মাও সেতুং বলেছেন,

“জনসাধারণের উপর অবশ্যই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, পার্টির উপর অবশ্যই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে; এ হচ্ছে দুটি মৌলিক নীতি। যদি আমরা এ দুটি নীতিতে সন্দেহ করি, তাহলে কোনো কাজই সম্পন্ন করতে পারবো না।”[১]  

জনগণ সম্পর্কিত আলোচনায় পার্টি নীতিও বোঝা দরকার। জনগণের পার্টিগুলো নির্দিষ্ট নীতি দ্বারা পরিচালিত হয় এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন লেনিন। তবে সেই আলোচনায় না গিয়ে আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি যে পার্টির কাজ হচ্ছে জনগণকে বুর্জোয়া প্রভাব থেকে অনবরত মুক্ত করা। লেনিন এই বিষয়ে বলেছেন,

“আমরা পার্টিগত নীতি [party principle] তুলে ধরি বিস্তৃত জনসাধারণের স্বার্থে, যে কোনো রকমের বুর্জোয়া প্রভাব থেকে তাদের মুক্ত করার জন্যে, শ্রেণি বিন্যাসের পূর্ণ স্পষ্টতার জন্যে, ঠিক এই কারণেই আমাদের শক্তি আর সতর্কতা সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে যাতে পার্টিগত নীতি প্রতিপালিত হয় শুধু কথায় নয়, বাস্তবিকই।”[২]

এসব বিবেচনায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, জনগণ সর্বদা সঠিক থাকেন না। জনগণ ভুল করতে পারেন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা সঠিকপথে নিজেদের পরিচালিত করতেও পারেন। জনগণ ভুল করলে তাদের ভুলকে শুধরিয়ে নিতে হয়। আর জনগণ যদি বারবার একই ভুল করে তবে ক্ষতি হয়, সম্পদনাশ হয়, উন্নতি হতে জনগণ পিছিয়ে পড়েন। তাই জনগণকে সংগঠিত করার জন্য তাদেরকে যেমন প্রশংসা করতে হবে তেমনি জনগণের সীমাবদ্ধতাসমূহকে দূর করার জন্য তাদের সমালোচনাও করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জনগণ ধোয়া তুলসিপাতা নয়; সুতরাং সর্বদাই তাদের প্রশংসা করার মানে হয় না। বাঙালির প্রধান তিনজন নেতা এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) এবং শেখ মুজিবর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) বাঙালির প্রশংসা এত বেশি করেছেন এবং বাঙালিকে এত বেশি উত্তেজিত রেখেছিলেন যে, বাঙালিরা একুশ শতকে এসেও রাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তিহীন উত্তেজনায় উত্তেজিত থাকে। রাজনৈতিক বিষয়ে এই তিন নেতার অবিমৃষ্যকারিতার কারণে বাঙালি যুক্তি-বুদ্ধি-বিচার-বিবেচনা-কাণ্ডজ্ঞানের অনুশীলন করে না; বরং তারা রাজনীতিতে হুযুগে, মাতমে, হঠকারিতায় পরিচালিত হয়।

জনগণের সাথে নেতৃত্বের সম্পর্কটি হওয়া উচিত দ্বান্দ্বিক। নেতা জনগণের চেতনা ও সংস্কৃতিকে উন্নত করবেন, জনগণকে শিক্ষিত করে তুলবেন; আবার জনগণও নেতৃত্বের ভুলত্রুটি শুধরিয়ে মহত নেতৃত্ব তৈরি করবেন। নেতা যদি সর্বদাই জনগণের প্রশংসা করেন তবে জনগণ আত্মতুষ্টিতে ভুগে নিজেদের ক্ষতি করতে পারে এবং বিশ শতকের শেষ তিন দশক এবং একুশ শতকের প্রথম দশকটিতে বাংলাদেশ অঞ্চলে তাই ঘটেছে। আমাদের আগামির নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে জনগণের ভেতরে শ্রেণিসংগ্রামকে স্পষ্ট করা, জনগণের ভেতরের বুর্জোয়া প্রভাব দূর করা এবং পার্টি ও জনগণের ভুল শুধরানোর দায়িত্ব। জনগণ এবং পার্টি, এই দুই দিক থেকেই ভুল করা হয়। ভুলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জনগণের প্রতি পার্টির দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করা যায়। এই বিষয়ে লেনিন লিখেছেন,

“একটা রাজনৈতিক পার্টি কতটা গুরুত্বমনা এবং নিজ শ্রেণি ও মেহনতি জনগণের প্রতি তার দায়িত্ব সে কার্যক্ষেত্রে কতটা পালন করছে তার একটা জরুরি ও অভ্রান্ত মাপকাঠি হলো ভুলের প্রতি তার মনোভাব। খোলাখুলি ভুল স্বীকৃতি, তার কারণ আবিষ্কার, যে-পরিস্থিতিতে ভুলের উদ্ভব তার বিশ্লেষণ, মন দিয়ে ভুল সংশোধনের উপায় বিচার — এই হলো গুরুত্বমনা পার্টির লক্ষণ, এটা তার দায়িত্ব পালন, এইভাবেই সে শ্রেণি, তৎপর জনগণকে গড়ে পিটে শিখিয়ে তোলে।”[৩]

জনগণের উপর থেকে আস্থা হারালে জনগণের সেবা করা দুরূহ হয়ে যাবে। কারণ জনগণ কখনোই সংগ্রামবিমুখ নয়। জনগণ সবসময় সংগ্রাম করেই টিকে থাকেন এবং সংগ্রাম করেই সমাজকে এগিয়ে নেন। তারা যতবারই ব্যর্থ হোন না কেন সংগ্রামের পথ থেকে সরে যান না। জনগণের প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসর সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলরা, আর জনগণ লড়াই চালায় সেসব প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে মাও সেতুং একটি মার্কসবাদী নিয়মের কথা বলেছেন, তাঁর মতে জনগণ বিপ্লব চান এবং সেটি বিজয় অবধি,

“সংগ্রাম করা, ব্যর্থ হওয়া, আবার সংগ্রাম করা, আবার ব্যর্থ হওয়া, আবার সংগ্রাম করা, বিজয় অবধি_ এটাই হচ্ছে জনগণের যুক্তি, তাঁরাও কখনো এই যুক্তি লঙ্ঘন করবেন না।”[৪]

জনগণ শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে, এবং তাদের থাকে অজস্র রকমের পুরনো অভ্যাস ও আচরণ। এই আচরণ তাদের শ্রেণিগত অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে যেমন আসে, তেমনি আসে শত শত বছরের নির্যাতন ও বাধ্যবাধকতা থেকে। লেনিন উল্লেখ করেছেন যে, ‘লক্ষ লক্ষ ও কোটি কোটি লোকের অভ্যাস অতি ভয়ংকর এক শক্তি’[৫]। সংগঠিত বুর্জোয়াকে যত সহজে পরাজিত করা যায়, ক্ষুদে মালিকদের তত সহজে যায় না, কেননা তারা থাকে লক্ষ লক্ষ এবং তাদের সাথে থেকেই সমাজতন্ত্র অভিমুখী, গণতন্ত্র অভিমুখী কাজ চালিয়ে নিতে হয়। ফলে জনগণের বিজয় নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের বৈপ্লবিক কার্যক্রমের উপর। জনগণের অভ্যাস পরিবর্তন থেকে শুরু করে বৈপ্লবিক কাজে অংশগ্রহণে অনুঘটকের ভূমিকায় নামতে হয় সংগঠিত জনগণ ও জনগণের পার্টিকে।[৬]  

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ

১. মাও সেতুং, কৃষি-সমবায়করণের সমস্যা সম্পর্কে, ৩১ জুলাই, ১৯৫৫; সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, পিকিং, প্রথম প্রকাশ,  ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৩।

২. ভি আই লেনিন, পার্টিপক্ষতা ও নির্দলীয়তা প্রসঙ্গে আরো একবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯০৯, জনসাধারণের মধ্যে পার্টির কাজ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৩, পৃষ্ঠা ৭৬।

৩. ভি আই লেনিন, কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে ১৯২০, রচনা সংকলন, চতুর্থ ভাগ, চার ভাগে সম্পূর্ণ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা ৬০।

৪. মাও সেতুং, ভ্রম ত্যাগ করো, সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হও, ১৪ আগস্ট, ১৯৪৯, সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, পিকিং, প্রথম প্রকাশ,  ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৭৭।

৫. ভি আই লেনিন, কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে ১৯২০, রচনা সংকলন, চতুর্থ ভাগ, চার ভাগে সম্পূর্ণ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা ৪১।

৬. নিবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] সম্পাদিত বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গ্রন্থের বাঙালির অগণতান্ত্রিকতা প্রবন্ধের অংশবিশেষ। প্রাণকাকলিতে ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত হয়। প্রাণকাকলি ও রোদ্দুরে ডট কমে প্রকাশের সময় পরিবর্ধন করা হয়েছে।

রচনাকাল জুন-জুলাই ২০১০, পুনর্লিখন ২০ অক্টোবর ২০১৭।

আরো পড়ুন:  আমলাতন্ত্রের ঐতিহাসিক গণতন্ত্রবিরোধিতা ও তার প্রকৃতি
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page