আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > লেনিনবাদ > মার্কসবাদী বলশেভিক ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

মার্কসবাদী বলশেভিক ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

মার্কসবাদী বলশেভিক ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিন গুরুত্ব দিয়েছিলেন খুব বেশি। লেনিন মার্কসবাদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহকে খুঁজে বের করেন, সার সংকলন করেন এবং একটি পরিকল্পনা পেশ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বলশেভিক ধরনের পার্টি গঠনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। লেনিন ‘অর্থনীতিবাদীদের’ সুবিধাবাদী নীতির সমালোচনা করেন। লেনিনের পরিকল্পনার স্বপক্ষে ‘ইসক্রা’র সংগ্রাম দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত হয়। ফলশ্রুতিতে আমরা পাই লেনিনের বই কী করতে হবে? যা  মার্কসবাদী পার্টির মতাদর্শগত বুনিয়াদ।

লেনিনের পার্টি গঠন চেষ্টার শুরুর দিকে পার্টির নাম ছিলো রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি। যদিও ১৮৯৮ সালে এই পার্টির প্রথম কংগ্রেস বসে এবং সেখানে গঠিত হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তখনও পার্টি গড়ে ওঠে নাই। তখন পার্টির কোনো কর্মসূচি বা নিয়ম-কানুন ছিল না। প্রথম কংগ্রেসে যে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হয় তাহারা গ্রেফতার হওয়ার পর তাহাদের স্থানে আবার কেহ নির্বাচিত হয় নাই, তাহাদের স্থান লইবার মতো কেহ ছিল না। ইহার চেয়েও খারাপ কথা এই যে, প্রথম কংগ্রেসের পর দলের নীতি সম্বন্ধে ও সংগঠন সম্বন্ধে ঐক্যবোধের অভাব আরও বেশি লক্ষ্য করা যায়।

১৮৮৪-৯৪ সালের মধ্যে নারোদনিক মতবাদের ওপর বিজয় লাভ ও সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি গঠনের মতাদর্শমূলক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। ১৮৯৪-৯৮ সালে ভিন্ন ভিন্ন মার্কসবাদী সংস্থাগুলিকে একটি সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিতে গ্রথিত করার চেষ্টা হয়, অবশ্য তাহা ব্যর্থ হয়। কিন্তু ১৮৯৮ সালের ঠিক পরবর্তি সময়ে পার্টির মধ্যেই মতাদর্শ ও সংগঠনমূলক বিভ্রান্তি বাড়িতে থাকে। নারোদনিজমের ওপর মার্কসবাদের জয়লাভ ও শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী কার্যাবলী মার্কসবাদীদের নীতির যথার্থতাকে প্রমাণ করে এবং মার্কসবাদের প্রতি বিপ্লবী যুব সমাজের সহানুভূতি আকৃষ্ট হয়। এমনকি মার্কসবাদ একটা ফ্যাসানে পরিণত হয়। ফলে মার্কসবাদী সংগঠনগুলিতে এমন সব তরুণ বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী দলে দলে প্রবেশ করিতে লাগল যারা মার্কসবাদ ভাল জানিত না, রাজনৈতিক সংগঠন সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ ছিল এবং আইনি মার্কসবাদীদের যে সব সুবিধাবাদী লেখায় সংবাদপত্রগুলি বোঝাই থাকত সেগুলি হইতে মার্কসবাদ সম্বন্ধে ভাসা-ভাসা ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল ধারণা পোষণ করত। এতে মার্কসবাদী সংগঠনগুলির তত্ত্বগত ও রাজনৈতিক মানের অবনতি ঘটল, আইনি মার্কসবাদীদের সুবিধাবাদী ঝোঁকগুলি সংক্রামিত হতে লাগল এবং মতাদর্শগত ব্যাপারে বিভ্রান্তি রাজনীতির ক্ষেত্রে দোলায়মান ভাব এবং সংগঠন বিষয়ে অরাজকতা বেড়ে চলছিল।

শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রবাহ এবং অদূরবর্তী বিপ্লবের অনিবার্যতা শ্রমিক শ্রেণীর একটি সুসংহত ও কেন্দ্রীভূত পার্টি গঠনের দাবিকে জরুরি করে তুলেছিল। সেই সময়ে লেনিন এমন একটা পার্টির কথা ভাবছিলেন যা বিপ্লবী আন্দোলনকে পরিচালিত করবার ক্ষমতা রাখিবে। কিন্তু স্থানীয় পার্টি সংগঠনগুলি, স্থানীয় কমিটি, দল বা চক্রগুলি এমনই শোচনীয় অবস্থায় ছিল, এবং তাহাদের সংগঠনগত অনৈক্য ও মতাদর্শগত বৈষম্য এত গভীর ছিল যে ঐরূপ পার্টি সৃষ্টির কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

প্রায়ই জার সরকার বিভিন্ন সংগঠনের শ্রেষ্ঠ কর্মীদের ধরে নিয়ে যেত; তাদের নির্বাসনে পাঠাত, শাস্তিমূলক কারাদন্ডে দন্ডিত করত; জার সরকারের নৃশংস অত্যাচারের আগুনের মধ্যেই পার্টিকে গড়ে তুলবার বিপদ তো ছিলই, কিন্তু আরও বিপদ হইল এই যে অনেকগুলি স্থানীয় কমিটি ও তাহাদের সদস্যরা ছোটখাট স্থানীয় দৈনন্দিন কাজ ছাড়া কিছুই করিত না, পার্টির ভিতর সংগঠনগত ও মতাদর্শগত বিভ্রান্তিতে তাহারা অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল; তাহারা বিশ্বাস করিত যে, ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীভূত পার্টি ছাড়াও কাজ চালানো বেশ সম্ভব।

কেন্দ্রীভূত পার্টি গঠন করতে হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলির এই পশ্চাৎপদতা, এই নিশ্চেষ্টতা ও সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ঘুরাবার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইহাই সব নয়, পার্টির মধ্যে একটা বেশ বড় উপদল ছিল যাহাদের নিজেদের ছাপাখানা ছিল- রুশদেশে ‘রাবোচায়া মিসল’ (শ্রমিকদের চিন্তা) এবং বিদেশে ‘রাবোচায়া দেলো’ (শ্রমিকদের লক্ষ্য)। তারা মতের দিক হইতে পার্টির মধ্যে সাংগঠনিক ঐক্যবোধের অভাব আর মতাদর্শগত বিভ্রান্তির প্রশংসা করিত, এবং শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত পার্টি গঠনের পরিকল্পনাকে অপ্রয়োজনীয় ও কৃত্রিম বলিত।

ইহারাই হলো মার্কসবাদী এবং তাদের অনুবর্তী দল। সর্বহারা শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক পার্টি গঠনের পূর্বে ‘অর্থনীতিবাদীদের’ পরাজিত করা প্রয়োজন ছিল।

এই কাজে ও শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি গঠনের কাজে লেনিন নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কিভাবে শ্রমিক শ্রেণির মিলিত পার্টি গঠন করার কাজ আরম্ভ করতে হবে, এই সমস্যা নিয়ে নানা মত প্রচারিত ছিল। কেউ কেউ ভাবত যে, পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস আহ্বান করিয়া পার্টি গঠনের কাজ আরম্ভ হোক। সেই কংগ্রেস স্থানীয় সংগঠনগুলিকে সম্মিলিত করিয়া পার্টি গড়তে পারবে। লেনিন এই মতের বিরোধিতা করেন। তার মত ছিল এই যে কংগ্রেস ডাকবার পূর্বে পার্টির লক্ষ্য ও আদর্শ সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা দরকার, কি ধরনের পার্টি চাই তা নির্ধারিত হওয়া দরকার, ‘অর্থনীতিবাদীদের’ সঙ্গে যে অনৈক্য আছে তাকে নীতির দিক হইতে পরিষ্কার দেখিয়ে দেওয়ার দরকার; পার্টির লক্ষ্য ও আদর্শ সম্বন্ধে ‘অর্থনীতিবাদী’ ও বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাটদের মধ্যে মতের অনৈক্য যে আছে তাহা গোপন না করে পার্টিকে সোজাসুজি জানিয়ে দেওয়া দরকার; স্থানীয় সংগঠনগুলিকে এই দুটি মতের মধ্যে সুচিন্তিতভাবে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার। এই অপরিহার্য কর্তব্য প্রথমে সমাধা করার পরই পার্টি কংগ্রেস আহ্বান করা সঙ্গত ছিল।

লেনিন ব্যাপারটিকে সোজাসুজি এইভাবে প্রকাশ করলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ হবার পূর্বে এবং ঐক্যবদ্ধ হবার উদ্দেশ্যেই আমাদের অবশ্য কর্তব্য হবে প্রথমেই আমাদের পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট পার্থক্যের রেখা টেনে দেওয়া।’ ( লেনিন, সিলেক্টড ওয়ার্কস, ইংরেজি সংস্করণ মস্কো, ১৯৪৭, প্রথম খণ্ড পৃ ১৬২)।

আরো পড়ুন:  সমাজতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্যসমূহ

এই মত অনুসারে লেনিন বললেন যে, শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি গঠনের কাজ শুরু করতে হলে সারা রুশদেশ জুড়ে একটি জঙ্গি রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত। এই সংবাদপত্র বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাসির মতবাদের স্বপক্ষে প্রচার আন্দোলন চালাবে; এই সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে পার্টি গঠনের প্রথম ধাপ।

কোথায় আরম্ভ করতে হবে ? নামে বিখ্যাত প্রবন্ধে লেনিন পার্টি গঠন সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ছক এঁকে দেন, পরবর্তীকালে এই পরিকল্পনাকে তাঁর প্রসিদ্ধ ‘কি করিতে হইবে? (‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’) গ্রন্থে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করেন।

এই প্রবন্ধে লেনিন লেখেন ঃ- ‘আমাদের মতে সারা রুশদেশের উপযোগী রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হইবে আমাদের কাজের আরম্ভ, আমাদের আকাক্সিক্ষত সংগঠন সৃষ্টির প্রথম ধাপ; সর্বোপরি এই সংবাদপত্রই হইবে প্রধান সূত্র যাহা অবলম্বন করিয়া আমরা আমাদের সংগঠনকে বাড়াইতে পারিব, গভীরতর করিতে পারিব এবং অবিচলিতভাবে বিস্তৃত করিত পারিব …..। নীতির দিক হইতে সুসঙ্গত সর্বব্যাপক প্রচার ও আন্দোলন চালাইয়া যাওয়া সাধারণভাবে সোস্যাল ডেমোক্রাটদের প্রধান ও নিরন্তর কর্তব্য; জনসংখ্যার ব্যাপকতম অংশের মধ্যে রাজনীতি ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে উৎসুক্য জাগিবার ফলে আজ তাহা হইয়া উঠিয়াছে বিশেষভাবে জরুরি অথচ এই প্রচার ও আন্দোলন পরিচালনাও সম্ভব নয় যদি একখানি সংবাদপত্র না থাকে।’ (লেনিন, সিলেকটেড ওয়ার্কস, রুশ সংস্করণ, ৪র্থ খ-, পৃষ্ঠা ১১০)।

লেনিনের বিবেচনায় এই ধরনের সংবাদপত্র যে কেবল মতাদর্শের দিক হতে পার্টিকে সুসংহত করবে তাই নয়, স্থানীয় সংগঠনগুলিকেও সাংগঠনিকভাবে পার্টির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করিবে। স্থানীয় সংগঠনগুলির পক্ষ হইতে সংবাদদাতা ও এজেন্টদের দল মিলিয়া এমন একটি কাঠামো খাড়া করিবে যাহার চারিপাশে পার্টি গড়িয়া উঠিতে পারিবে। কারণ, লেনিনের ভাষায় ‘সংবাদপত্র কেবল যৌথ প্রচারক ও আন্দোলনকারীই নয়, সংবাদপত্র যৌথ সংগঠকও বটে।

ঐ একই প্রবন্ধে লেনিন লেখেন ঃ- ‘জালবুনানির মতো এই এজেন্টদের দল ঠিক এমনই একটা সংগঠনের কাঠামো তৈয়ার করিবে যাহা আমরা চাই। সে সংগঠন হইবে গোটা দেশব্যাপী বিরাট সংগঠন- কড়াকড়িভাবে ও পুঙ্খানুপুঙ্খ কর্মবিভাগের উপযোগী যথেষ্ট ব্যাপক ও বহুমুখী; যে কোনো অবস্থাতে, যে কোনো বিপাকে ও যে কোনো আকস্মিক পরিস্থিতিতে নিজের কাজ চালাইতে সক্ষম এমনিভাবে পরীক্ষিত ও ইস্পাতদৃঢ়; শত্রু যখন বিপুল উদ্যোগে একই স্থানে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করিয়া আক্রমণ করিবে তখন তাহার সুযোগ লইয়া যখন ও সেখানে শত্রু আক্রমণ করে না তখন ও সেখানে তাহাকে আক্রমণ করিবার মতো নমনীয়তার ক্ষমতাসম্পন্ন’ (ঐ, পৃষ্ঠা ১১২)।
ইসক্রাকে এই ধরনের কাগজই হইতে হইবে।

পার্টির মতাদর্শগত ও সংগঠনগত সংহতির পথ প্রস্তুত করিয়া নিতে ইসক্রা বাস্তবিকই এই ধরনের নিখিল-রুশ সংবাদপত্র হইয়া দাঁড়াইল। পার্টির কাঠামো ও গঠন সম্বন্ধে লেনিনের মত ছিল এই যে, পার্টির দুইটি অংশ থাকিবে ঃ (ক) পার্টির নেতৃস্থানীয় নিয়মিত কর্মীদের লইয়া একটি ঘনিষ্ঠ চক্র- এখানে প্রধানত সেই ধরনের কর্মীরা থাকিবেন যাঁহারা পেশাদার বিপ্লবী, অর্থাৎ এমন পার্টি কর্মী যাহারা পার্টির কাজ ছাড়া আর কিছু করেন না এবং যতটুকু থাকা দরকার অন্তত ততটুকু মার্কসবাদী জ্ঞান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনের অভ্যাস এবং জারের পুলিসের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ও এড়াইয়া যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন, (খ) স্থানীয় পার্টি সংগঠগুলির সুবিস্তৃত জাল এবং বহু সংখ্যক এমন পার্টি সভ্য যাঁহারা লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন ভোগ করেন।

লেনিন লিখিয়াছিলেন ঃ- ‘আমি জোর করিয়া বলিতেছি যে, (১) ধারাবাহিকতা রক্ষা করিবার জন্য যদি নেতাদের কোনো স্থিতিশীল সংগঠন না থাকে তাহা হইলে কোনো বিপ্লবী আন্দোলনই স্থায়ী হয় না; (২) জনগণ যতই স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া অধিক সংখ্যায় সংগ্রামের দিকে আকৃষ্ট হয় ….. ততই ঐরূপ সংগঠনের প্রয়োজন আরও গুরুতর হইয়া ওঠে, এবং ততই সংগঠনকে আরও মজবুত করিবার দরকার হয়; (৩) যে সমস্ত লোক বিপ্লবকেই তাহাদের জীবনের একমাত্র পেশা বলিয়া মানিয়া লইয়াছে প্রধানত তাহারাই এই সংগঠনে থাকিবে; (৪) একটা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা এই সংগঠনের সভ্যসংখ্যা যত বেশি পেশাদার বিপ্লবী এবং যাহারা বিপ্লবী কাজ কর্মে পুলিশকে প্রতিহত করিতে অভ্যস্ত ও সুকৌশলী, তাহাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিতে পারি, ততই রাজনৈতিক পুলিশের পক্ষে এই সংগঠন ধ্বংস করা দুঃসাধ্য হইবে; এবং (৫) শ্রমিক শ্রেণী সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর জনগণ ততই বেশি সংখ্যায় আন্দোলনে যোগ দিতে ও সক্রিয়ভাবে কাজ করিতে পারিবে।’ (ঐ, পৃষ্ঠা ৪৫৬)।

এই যে পার্টি তৈরি করা হচ্ছিল তার প্রকৃতি, শ্রমিক শ্রেণীর সম্পর্কে তার ভূমিকা এবং তাহার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে লেনিন বলেন যে, পার্টিকে হইতে হইবে শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী বাহিনী, সর্বহারা শ্রেণী সংগ্রামের সমন্বয়সাধনে ও পরিচালনায় ব্রতী এই পার্টিকে হইতে হইবে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের পথ প্রদর্শক শক্তি। পুঁজিতন্ত্রের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করাই হইল পার্টির চরম লক্ষ্য। এখনই জারতন্ত্রের নিপাত ঘটাইতে না পারিলে পুঁজিতন্ত্রের উচ্ছেদ সম্ভব নয় বলিয়া বর্তমানে পার্টির প্রধান কর্তব্য হইল শ্রমিক শ্রেণী ও সমগ্র জনসমষ্টিকে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য উদ্বুদ্ধ করা, জনগণের বিপ্লবী আন্দোলন গড়িয়া তোলা এবং সমাজতন্ত্রের রাস্তায় প্রথম গুরুতর প্রতিবন্ধক যে জারতন্ত্র তাহার বিলোপ ঘটানো।

আরো পড়ুন:  রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর খসড়া কর্মসূচি থেকে ধর্ম প্রসঙ্গে

লেনিন লিখিয়াছেন ঃ ‘যে কোন দেশের সর্বহারার যে সব আশু কর্তব্য উপস্থিত, তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক বৈপ্লবিক যে কর্তব্য তাহাই ইতিহাস আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিয়াছে। এই কর্তব্য পালন করিতে পারিলে অর্থাৎ শুধু ইউরোপ নয়, (আজ বলা যায়) সমস্ত এশিয়ার বিপ্লব বিরোধী শক্তির সবচাইতে মজবুত কেল্লাকে ধ্বংস করিতে পারিলে রুশ সর্বহারা সারা দুনিয়ার বিপ্লবী সর্বহারাদের মধ্যে অগ্রণীবাহিনীতে পরিণত হইবে।’ (ঐ পৃষ্ঠা ৩৮২)।

তিনি আরও বলিয়াছেন আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ রাখিতে হইবে যে, আংশিক দাবির জন্য সরকারের সঙ্গে লড়াই বা ছোটখাটো দাবির আংশিক পূরণ শত্রুর সঙ্গে সামান্য হাতাহাতি বা শত্রু সীমান্তে খ-যুদ্ধ ছাড়া কিছু নয়; কিন্তু চূড়ান্ত সংগ্রামের এখনও বিলম্ব আছে। সমস্ত শক্তি লইয়া শত্রুদুর্গ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত রহিয়াছে, আমাদের ওপর গোলাগুলি বর্ষণ করিতেছে আমাদেরই শ্রেষ্ঠ সৈনিকদের হত্যা করিতেছে। আমাদের এই দুর্গ দখল করিতেই হইবে; এবং আমরা যদি জাগরণোম্মুখ সর্বহারাদের সমস্ত শক্তির সঙ্গে রুশ বিপ্লবীদের সমস্ত শক্তিকে এমন একটি পার্টিতে মিলাইতে পারি যাহা রুশদেশের সমস্ত প্রাণবন্ত ও অকপট লোককে আকৃষ্ট করে, তাহা হইলে আমরা নিশ্চয়ই এই দুর্গ জয় করিব। আর শুধু তখনই বিপ্লবী রুশ শ্রমিক পিওতর এলেকসিয়েভের মহৎ ভবিষ্যৎ বাণী সফল হইবে ঃ কোটি কোটি শ্রমিকের পেশীবহুল বাহু উত্থিত হইবে এবং অত্যাচারের যে যুপকাষ্ঠকে সৈনিকের তরবারি রক্ষা করিতেছে তাহা চূর্ণ হইয়া অণুপরমাণুতে পর্যবর্ষিত হইবে। (ঐ পৃষ্ঠা ৫৯)।

জারের স্বৈরতন্ত্রী আমলে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি গঠন সম্পর্কে ইহাই ছিল লেনিনের পরিকল্পনা।

অর্থনীতিবাদীরা লেনিনের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিন্দু মাত্র বিলম্ব করেনি। তাহারা ঘোষণা করল যে জারের বিরুদ্ধে সাধারণ রাজনৈতিক সংগ্রাম চালানো সকল শ্রেণীর প্রধানত বুর্জোয়া শ্রেণীর কর্তব্য; সুতরাং ইহাতে শ্রমিক শ্রেণীর গুরুতর কোন স্বার্থ নাই, কেননা উচ্চহারে মজুরি উন্নততর কাজের অবস্থা প্রভৃতি লইয়া মালিকদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংগ্রাম চালানোই শ্রমিক শ্রেণীর প্রধান স্বার্থ। অতএব জারের বিরুদ্ধে চালানো বা জারতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধন করা সোস্যাল ডেমোক্রাটদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য নয় ‘সরকার ও মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের জন্য সংগঠন সৃষ্টি করাই তাদের কাজ। সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রামের অর্থ তাহারা বুঝিত উন্নততর কারখানা আইন আদায়ের সংগ্রাম। ‘অর্থনীতিবাদীরা’ দাবি করিত যে, এইভাবে ‘অর্থনৈতিক সংগ্রামকেই রাজনৈতিক রূপ দেওয়া সম্ভব হইবে।

শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন সম্বন্ধে খোলাখুলি বিরোধিতা করার সাহস তখন আর ‘অর্থনীতিবাদীদের’ ছিল না। কিন্তু তাহাদের মত ছিল এই যে, পার্টিকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের পরিচালক করা উচিত নয়, শ্রমিক শ্রেণীর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করাই উচিত নয়, পরিচালন করা তো দূরের কথা, পার্টির উচিত আন্দোলনের পদাঙ্ক অনুসরণ করা তাহা অনুধাবন করা ও তাহা হইতে শিক্ষা লাভ করা।

অর্থনীতিবাদীরা আরও বলিত যে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে সচেতন অংশের সমাজতান্ত্রিক চেতনা ও সমাজতান্ত্রিক মতবাদের সংগঠনী ও পরিচালনী ভূমিকা উপেক্ষণীয় বা প্রায় উপেক্ষণীয়। শ্রমিকদিগের চিন্তাকে সমাজতান্ত্রিক চেতনার স্তরে উন্নীত করা সোস্যাল ডেমোক্রাটদের উচিত নয়, বরঞ্চ সোস্যাল ডেমোক্রাটদের উচিত সাধারণ মজুর কিংবা মজুর শ্রেণীর আরও পশ্চাৎপদ অংশের স্তরে নিজেদের নামাইয়া আনা ও মানাইয়া চলা। শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা বিস্তারের চেষ্টা না করিয়া বরং যতদিন না শ্রমিক শ্রেণীর স্বতঃস্ফূর্ত আপনা হইতে তাহাদের সমাজতান্ত্রিক চেতনায় পৌঁছাইয়া দেয় ততদিন অপেক্ষা করা উচিত।

পার্টি সংগঠন বিষয়ে লেনিনের পরিকল্পনা সম্বন্ধে ‘অর্থনীতিবাদীরা’ বলিত যে স্বতঃস্ফূত আন্দোলনের ওপর ইহা একটি জবরদস্তির সামিল। ‘ইসক্রার পাতায় পাতায় এবং বিশেষ করিয়া ‘কি করিতে হইবে?’ শীর্ষক বিখ্যাত পথে লেনিন ‘অর্থনীতিবাদীদের’ এই সুবিধাবাদী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে প্রচন্ড আক্রমণ চালাত এবং উহাকে বিধ্বস্ত করিয়া দেন।

(১) লেনিন দেখালেন যে শ্রমিক শ্রেণীকে সাধারণ রাজনৈতিক সংগ্রাম হইতে সরাইয়া রাখা এবং মালিক ও সরকার অটুট অবস্থায় ছাড়িয়া মালিক ও শ্রমিকদের চির দাসত্বের দন্ডে দন্ডিত করা। মালিক ও সরকার পক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের অর্থ পুঁজিদারদের কাছে নিজেদের শ্রমশক্তি বিক্রয়ের সময় দর বাড়াইবার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা লড়াই। কিন্তু শ্রমিকরা পুঁজিদারদের কাছে নিজেদের শ্রমশক্তি বেচিবার সময় দর বাড়াইবার জন্য লড়িয়াই ক্ষান্ত হইতে চায় না, যে পুঁজিতন্ত্র তাহাদিগকে শ্রমশক্তি বিক্রয় করিতে ও শোষণ সহ্য করিতে বাধ্য করিতেছে সেই পুঁজিতন্ত্রেরই উচ্ছেদ চায়। কিন্তু যতদিন পুঁজিতন্ত্রের পাহারাদার কুকুরের মতো জারতন্ত্র শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের পথ রোধ করিয়া রহিয়াছে, ততদিন শ্রমিকরা পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও পূর্ণ সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম গড়িয়া তুলিতে পারিবে না। সুতরাং পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণীর কর্তব্য হইল অবিলম্বে জারতন্ত্র অপসারিত করিয়া সমাজতন্ত্রের রাস্তা পরিষ্কার করা।

(২) লেনিন দেখালেন যে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততাকে বাহবা দেওয়া পার্টির যে ভূমিকা রহিয়াছে তাহা অস্বীকার করা, পার্টিকে কেবল ঘটনার পর্যবেক্ষকরূপে নামাইয়া আনার অর্থ হইল ‘লেজুড় নীতি’ প্রচার করা, (খভোস্তিজম) পার্টিকে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের লেজুড়ে পরিণত করা, আন্দোলনের নিষ্ক্রিয় শক্তিতে পরিণত করা, পার্টি যে কেবল স্বতঃস্ফূর্তির ধারা আলোচনা করিতে পারে এবং ঘটনাবলীকে যথানির্দিষ্টভাবে চলতে দেয় এই কথা বলা। এই প্রচারের অর্থ হইল পার্টির ধ্বংস সাধনের জন্য নিজেদের পার্টি লইয়া শত্রুতা করার জন্য হাজির রহিয়াছে, তখন শ্রমিক শ্রেণীর নিরস্ত্র অবস্থায় ছাড়িয়া দেওয়ার অর্থ হইল শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।

আরো পড়ুন:  ‘চীনের শ্রমিক’ পত্রিকার পরিচয় প্রসঙ্গে

(৩) লেনিন দেখালেন যে শ্রমিক শ্রেণীর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের স্তুতিতে মাথা নত করা, চেতনার গুরুত্বকে হেয় করা, সমাজতান্ত্রিক চেতনা বা মতবাদকে হেয় করার অর্থ হইল প্রথমত সেই শ্রমিকদেরই অপমান করা, যাহাদিগকে ঐ চেতনা আলোকের মত আকৃষ্ট করিয়াছে; দ্বিতীয়ত, পার্টির চক্ষে মতবাদের মূল্যকে হেয় করা, অর্থাৎ যে যন্ত্রের সাহায্যে পার্টি বর্তমানকে বুঝিতে পারে ও ভবিষ্যতকে দেখিতে পায় সেই যন্ত্রকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা; এবং তৃতীয়ত, সুবিধাবাদের পঙ্কে একেবারে এমনভাবে নিমজ্জিত হওয়া যে আর উদ্ধারের উপায় পর্যন্ত থাকে না। লেনিন বলিয়াছেন, ‘বিপ্লবী নীতি না থাকিলে বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়। যে পার্টি সবচেয়ে অগ্রগামী নীতি দ্বারা পরিচালিত সেই পার্টিই কেবল পারে অগ্রণী সংগ্রামী বাহিনীর ভূমিকা পূর্ণ করিতে।’ (লেনিন সিলেকটেড ওয়ার্কস, ইংরেজি সংস্করণ, মস্কো, ১৯৪৭, পৃষ্ঠা ১৬৩-৬৪)।

(৪) লেনিন দেখালেন যে, ‘অর্থনীতিবিদরা’ যখন বলে যে, শ্রমিক শ্রেণীর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হইতেই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ গড়িয়া উঠিতে পারে, তখন তাহারা শ্রমিক শ্রেণীকে প্রতারণা করে, কারণ প্রকৃতপক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হইতে নয়, বিজ্ঞান হইতেই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের উৎপত্তি হইয়াছে। শ্রমিক শ্রেণীকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করিবার প্রয়োজনকে অস্বীকার করিয়া ‘অর্থনীতিবিদরা’ বুর্জোয়া মতাদর্শের পথ পরিষ্কার করিতেছিল, সেই মতাদর্শ যাহাতে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া বিস্তার লাভ করিতে পারে তাহার ব্যবস্থা প্রশস্ত করিতেছিল এবং তাহারই ফলে শ্রমিক শ্রেণী ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে মিলনের কথাকে কবর দিয়া বুর্জোয়াদের সাহায্য করিতেছিল।

লেনিন বলেন, শ্রমিক আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততার স্তুতি ‘সচেতন অংশের ভূমিকা, সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির ভূমিকাকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার সর্ব প্রকার চেষ্টার অর্থ হইল শ্রমিকদের মধ্যে বুর্জোয়া মতাদর্শের প্রভাবকে শক্তিশালী করা- যাহারা পার্টিকে হেয় প্রমাণ করে তাহারা ইহা কামনা করুক বা না করুক।’ (ঐ, পৃষ্ঠা ১৭৩)।
লেনিন আরও লেখেন ঃ- ‘বুর্জোয়া অথবা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের মধ্যে শুধু একটাকেই আমাদের বাছিয়া লইতে হইবে। মাঝামাঝি কোন পথ নেই। সুতরাং কোনক্রমে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকে হেয় করা কিংবা সামান্যতম মাত্রায় এ পথ হতে সরিয়া আসার অর্থ হইল বুর্জোয়া মতাদর্শকে শক্তিশালী করা।’ (ঐ পৃষ্ঠা ১৭৪-১৭৫)।

(৫) অর্থনীতিবাদীদের এইসব ভুলভ্রান্তি একত্রে বিচার করিয়া লেনিন সিদ্ধান্ত করেন যে শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজিতন্ত্রের কবল হইতে উদ্ধারের জন্য সমাজ বিপ্লবের যে পার্টি দরকার তাহারা তাহা চায় নাই, তাহারা চাহিয়াছিল এমন এক ‘সমাজসংস্কারকের’ দল যাহারা পুঁজিবাদী শাসনকে কায়েম রাখে, এবং এই কারণেই ‘অর্থনীতিবাদীদের’ সর্বহারা শ্রেণীর মূল স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতক সংস্কারবাদী বলা যায়।

(৬) সর্বশেষে লেনিন দেখাইলেন যে ‘অর্থনীতিবাদ’ শুধু রুশদেশে একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়, শ্রমিক শ্রেণীর ওপর বুর্জোয়া প্রভাব বিস্তারের ইহাই একটা অস্ত্র, সুবিধাবাদী বার্নস্টাইনের যে অনুবর্তীরা মার্কসবাদকে মাজিয়া ঘষিয়া লইতেছিল পশ্চিম ইউরোপে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক দলগুলিকে সুবিধাবাদীদের শক্তিবৃদ্ধি হইতেছিল; মার্কসের ‘সমালোচনা করিবার পূর্ণ অধিকার’ সম্বন্ধে বুলি আওড়াইয়া ইহারা মার্কসবাদের পুনর্লিখন দাবি করিতেছিল (এজন্য ইহাকে বলা হয় পুনর্লিখনবাদ); বিপ্লব, সমাজতন্ত্র ও সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের নীতি পরিহার করার দাবি ইহারা করিতেছিল। লেনিন দেখাইলেন যে, রুশ ‘অর্থনীতিবাদীরা’ বিপ্লবী সংগ্রাম, সমাজতন্ত্র ও সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব পরিহার করা সম্বন্ধে অনুরূপ নীতি অনুসরণ করিতেছিল।

‘কি করিতে হইবে?’ বইটিতে লেনিন এই প্রধান তত্ত্বগত নীতিগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

এই বইটির বহুল প্রচারের ফলে, রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সময় অর্থাৎ বইটি প্রকাশের এক বৎসরের মধ্যে (১৯০২ সালের মার্চে বই প্রকাশ হয়), ‘অর্থনীতিবাদীদের’ মতাদর্শ সম্বন্ধে একপ্রকার তিক্ত স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই রহিল না এবং পার্টির অধিকাংশ সভ্যই ‘অর্থনীতিবাদী’ বলিয়া অভিহিত হওয়াকে অপমান মনে করিতে লাগিল।

‘অর্থনীতিবাদ’ সুবিধাবাদী চিন্তাধারা, ‘লেজুড় হইয়া থাকার নীতি’ স্বতঃস্ফূর্তির সম্পূর্ণ মতাদর্শমূলক পরাজয় ঘটিয়াছিল এইভাবে।

কিন্তু লেনিনের ‘কি করিতে হইবে?’ বইয়ের তাৎপর্য এইখানেই নিঃশেষ হইয়া যায় নাই।
এই বিখ্যাত গ্রন্থের যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব রহিয়াছে তাহার কারণ এই যে ইহাতে লেনিন ঃ
(১) মার্কসবাদী চিন্তাধারার ইতিহাসে সর্বপ্রথম সুবিধাবাদের মতাদর্শগত শিকড় টানিয়া বাহির করিয়া দেখান যে, সুবিধাবাদীর প্রধান স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের স্তুতি গান করে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক চেতনার ভূমিকাকে হেয় প্রতিপন্ন করে।
(২) স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক শ্রেণী আন্দোলনের বিপ্লবমুখী পরিচালক শক্তি হিসাবে চেতনা ও পার্টির বিরাট গুরুত্ব প্রমাণ করেন।
(৩) মার্কসবাদী পার্টি যে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের মিলনের প্রতীক, তাহা চমৎকারভাবে বুঝাইয়া দেন।
(৪) মার্কসবাদী পার্টির মতাদর্শমূলক ভিত্তি সম্বন্ধে চমৎকার ব্যাখ্যা দেন।

‘কি করিতে হইবে?’ বইটিতে যে সকল তত্ত্বগত নিবন্ধ পরিস্ফুট করা হয় তাহা পরবর্তীকালে বলশেভিক পার্টির মতাদর্শের ভিত্তিস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়।

এই তত্ত্বগত সম্পদের অধিকারী হইয়া ‘ইসক্রা পার্টি গঠন, পার্টির শক্তিসঞ্চয়, দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আহ্বান বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাসির স্বপক্ষে এবং অর্থনীতিবাদী সংস্কারবাদী ও সর্বপ্রকার সুবিধাবাদীদের বিপক্ষে লেনিনের পরিকল্পনার ভিত্তিতে ব্যাপক প্রচার চালাইবার শক্তি পাইয়াছিল ও কাজের ক্ষেত্রে সে প্রচার ব্যাপকভাবে চালাইয়াছিল।

সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে সব কাজ ‘ইসক্রা’ করিয়াছিল সেগুলির মধ্যে অন্যমত হইল পার্টির জন্য একটি কর্মসূচি প্রণয়ন। আমরা জানি যে শ্রমিক পার্টির কর্মসূচি হইল শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ও বিজ্ঞানসম্মত বিবৃতি।

তথ্যসূত্র: ১. সাপ্তাহিক সেবা পাঠক ফোরাম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page