আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > লেনিনবাদ > মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান

মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান

(প্রথম মার্কিন শ্রমিক প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃত অংশ)

৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২৭

১.
প্রতিনিধিদল কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নাবলী ও কমরেড স্তালিনের জবাব

প্রথম প্রশ্ন: মার্কসবাদের প্রয়োগের ক্ষেত্রে লেনিন ও কমিউনিস্ট পার্টি নতুন কি কি নীতি সংযোজন করেছেন? এটা বলা কি সঙ্গত হবে যে, লেনিন বিশ্বাস করতেন “সৃজনশীল বিপ্লবে”, আর মার্কস অনুরক্ত ছিলেন অর্থনেতিক শক্তিগুলোর বিকাশের পরিণতির জন্য বিলম্ব করার পক্ষে?

উত্তর: আমার মতে, মার্কসবাদের ক্ষেত্রে লেনিন কোনো “নতুন নীতি” “সংযোজনও” করেননি, মার্কসবাদের “পুরানো” নীতিমালার কোনোটির বিলোপও ঘটাননি। লেনিন ছিলেন মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সবচেয়ে অনুগত ও বিশিষ্ট শিক্ষার্থী, আর সে অবস্থায় তিনি বহালও রয়েছেন, এবং তিনি পুরোপুরিভাবেই নিজেকে স্থাপিত করেছেন মার্কসবাদের নীতিমালার উপর।

কিন্তু লেনিন নিছক মার্কস্ ও এঙ্গেলস-এর শিক্ষাকে কার্যকরীই করেননি। একই সময়ে তিনি ছিলেন সেই শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী (continuer)।

এর অর্থ কি?

এর অর্থ হলো এই যে, বিকাশের নতুন অবস্থার সাথে, পুঁজিবাদের নতুন পর্যায়ের সাথে, সাম্রাজ্যবাদী যুগের সাথে, সামঞ্জস্যপূর্ণ করে মার্কস ও এঙ্গেলস-এর শিক্ষাকে তিনি আরো বিকশিত করেছেন। এর অর্থ হলো এই যে, শ্রেণী সংগ্রামের নতুন অবস্থাধীনে মার্কস-এর শিক্ষাকে আরো বিকশিত করতে গিয়ে, মার্কস ও এঙ্গেলস্ কর্তৃক যা সৃষ্ট হয়েছিলো, পুঁজিবাদের প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী আমলে যা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব ছিলো, তার সাথে তুলনায়, মার্কসবাদের সাধারণ ভান্ডারে লেনিন নতুন কিছু অবদান রাখেন। একই সময়ে মার্কসবাদের জ্ঞান ভান্ডারে লেনিনের নতুন অবদান হলো সমগ্রভাবে ও পুরোপুরিভাবেই মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক স্থাপিত নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত।

এই অর্থেই লেনিনবাদকে আমরা সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ বলে বর্ণনা করে থাকি।

নিম্নোক্ত কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ে লেনিন নতুন কিছু অবদান রাখেন, মার্কস-এর শিক্ষাবলীকে আরো বিকশিত করে তুলেন।

প্রথমত: পুঁজিবাদের নতুন পর্যায় হিসেবে একচেটে পুঁজিবাদের-সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন।

পুঁজি” গ্রন্থে, মার্কস ও এঙ্গেলস পুঁজিবাদের মুল ভিত্তিগুলোর বিশ্লেষণ প্রদান করেন। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস বাস করতেন প্রাক একচেটে পুঁজিবাদের আধিপত্যের আমলে, পুঁজিবাদের স্বচ্ছন্দ বিবর্তনের ও সমগ্র বিশ্বের উপর তার “শান্তিপূর্ণ” বিস্তার সাধনের আমলে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ আর বিংশ শতাব্দীর সূচনার দিকে পুঁজিবাদের সেই পুরানো পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে, যখন মার্কস ও এঙ্গেলস ইতিমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এটা বোধগম্য যে মার্কস ও এঙ্গেলস পুঁজিবাদের বিকাশের নতুন অবস্থাগুলোকে কেবল অনুমানই করতে পারতেন যা পুরানো পর্যায়ের পরম্পরাক্রমে আসা পুঁজিবাদের নতুন পর্যায়ের ফলশ্রুতিতেই, বিকাশের সাম্রাজ্যবাদী তথা একচেটে পর্যায়ের ফলশ্রুতিতেই উদ্ভুত হয়েছিল, যখন পুঁজিবাদের স্বচ্ছন্দ বিবর্তনের অনুবর্তী হয়ে এসেছিল পুঁজিবাদের আকস্মিকতাপূর্ণ (Spasmodic), প্লাবন-সৃষ্টিকারী (Cataclysmic) বিকাশ, যখন বিকাশের অসমতা ও পুঁজিবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো বিশেষভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, আর যখন, বিকাশের চুড়ান্ত অসমতাজনিত পরিস্থিতিতে, বাজারের জন্যে এবং পুঁজি রপ্তানীর ক্ষেত্রের জন্যে সংগ্রাম অনিবার্য করে তোলে বিশ্বের ও প্রভাবাধীন অঞ্চলের পর্যায়ক্রমিক (periodic) পুনর্বন্টনের জন্যে পর্যাবৃত্তিক সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ।

লেনিন এখানে যে সহায়তাটি প্রদান করেন সেটি, আর ফলশ্রুতিস্বরূপ তাঁর নতুন অবদানটি হলো এই যে, “পুঁজি” গ্রন্থের মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে তিনি পুঁজিবাদের শেষ পর্যায় হিসাবে সাম্রাজ্যবাদের এক মূল্যবান মার্কসবাদী বিশ্লেষণ উপস্থিত করেন এবং তার ক্ষতচিহ্নগুলো ও তার অনিবার্য পতনের শর্তগুলোকে উদ্ঘাটিত করেন। এই বিশ্লেষণই লেনিনের এই তত্ত্বমতের ভিত্তিটি গঠন করছে যে, সাম্রাজ্যবাদের অবস্থাধীনে, আলাদাভাবে ধরলে, স্বতন্ত্র পুঁজিবাদী দেশসমূহে সমাজতন্ত্রের বিজয় সম্ভব।

দ্বিতীয়ত: সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের প্রশ্ন।

সর্বহারা শ্রেণির রাজনৈতিক শাসন হিসেবে এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুঁজির ক্ষমতাকে উচ্ছেদ করার পদ্ধতি হিসেবে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের মৌলিক চিন্তা-ভাবনাটি মার্কস ও এঙ্গেলসই সামনে তুলে ধরেন।

এই ক্ষেত্রে লেনিনের নতুন অবদান ছিল এই যে:

ক) তিনি সোভিয়েত ব্যবস্থাকে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় রূপ হিসেবে আবিষ্কার করেন, এর জন্যে প্যারি কমিউন ও রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান।

খ) তিনি সর্বহারাশ্রেণীর মিত্রের সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের সূত্রের ব্যাখ্যা দান করেন, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বকে সংজ্ঞায়িত করেন পরিচালক হিসেবে সর্বহারাশ্রেণী আর পরিচালিত হিসেবে অ-সর্বহারা শ্রেণীসমূহের (কৃষক ইত্যাদি) শোষিত জনগণের মধ্যেকার শ্রেণি-মৈত্রীর বিশেষ রূপ হিসেবে।

গ) তিনি এই বাস্তব ঘটনার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন যে, সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব হলো শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ ধরণ, সর্বহারা গণতন্ত্রের রূপ যা-সংখ্যালঘিষ্ঠের (শোষকদের) স্বার্থকে অভিব্যক্ত করে যে-পুঁজিবাদী গণতন্ত্র তার সাথে তুলনায়-সংখ্যাগরিষ্ঠের (শোষিতদের) স্বার্থকেই অভিব্যক্ত করে।

তৃতীয়ত: সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের আমলে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দেশে সাফল্যের সাথে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার রূপ ও পদ্ধতির প্রশ্ন।

মার্কস ও এঙ্গেলস সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের আমলকে কম-বেশি দীর্ঘকালীন, বৈপ্লবিক সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে পরিপূর্ণ আমল বলেই বিবেচনা করেছেন, যার গতিধারায়, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে, সর্বহারা শ্রেণি পুরানো পুঁজিবাদী সমাজের স্থলে নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ, শ্রেণি-বিহীন ও রাষ্ট্র-বিহীন সমাজ সৃষ্টি করার জন্যে আবশ্যক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করবে। মার্কস ও এঙ্গেলসের এই মৌলিক নীতিমালার উপরই লেনিন সমগ্রভাবে ও পরিপূর্ণভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এই ক্ষেত্রে লেনিনের নতুন অবদান ছিল এই যে:

ক) তিনি প্রমাণ করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক পরিবেষ্টিত সর্বহারা একনায়কত্বাধীন একটি দেশে পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা যেতে পারে, আর তা এই শর্তে যে চর্তুপার্শ্বস্থ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপ দ্বারা দেশটির টুটি ধরা হবে না।

খ) তিনি খুঁজে বের করেন অর্থনৈতিক কর্মনীতির সুনিদিষ্ট লাইনগুলো (‘নয়া-অর্থনৈতিক নীতি’) যার দ্বারা সর্বহারা শ্রেণি অর্থনৈতিক মূল অবস্থানগুলোর (শিল্প, জমি, পরিবহন, ব্যাংক ইত্যাদি) অধিকারী হওয়ার সুবাদে সমাজতান্ত্রিক শিল্পকে কৃষির সাথে সংযুক্ত করে (‘শিল্প ও কৃষক অর্থনীতির মধ্যকার যোগসূত্র’) এবং এভাবে সমগ্র জাতীয় অর্থনীতিকে সমাজতন্ত্রের দিকে পরিচালিত করে।

গ) তিনি খুঁজে বের করেন সমবায়ের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের গতিপথে কৃষক সমাজের মূল অংশকে ক্রমান্বয়ে পরিচালনা করার ও টেনে নিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট পস্থা, যে-সমবায় হলো সর্বহারা একনায়কত্বের হাতে ক্ষুদে-কৃষক অর্থনীতির রূপান্তর সাধনের ও সমাজতন্ত্রের ভাবধারায় কৃষক সমাজের মূল অংশকে পুনর্শিক্ষিত করে তোলার কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

চতুর্থত: বিপ্লবে, প্রতিটি জনপ্রিয় বিপ্লবে, জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব-উভয় ক্ষেত্রেই, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে-আধিপত্যের (Hegemony) প্রশ্ন।

মার্কস ও এঙ্গেলস সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বের ধারণার মূল রূপরেখাগুলি তুলে ধরেন। এই ক্ষেত্রে লেনিনের নতুন অবদান হলো এই যে, তিনি এসব রূপরেখাকে আরো বিকশিত ও বিস্তৃত করেন সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বের এক সুসমন্বয়পূর্ণ পদ্ধতিতে, কেবলমাত্র জারতন্ত্র ও পুঁজিবাদের উচ্ছেদেই নয়, বরং সর্বহারা একনায়কত্বাধীনে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক শহর ও গ্রামের শ্রমজীবি জনগণের উপর নেতৃত্বের এক সুসমন্বয়পূর্ণ পদ্ধতিতে।

আমরা জানি, লেনিন ও তাঁর পার্টির কল্যাণে, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বের ধারণাটি রাশিয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে প্রযুক্ত হয়। প্রসঙ্গত এটাই তুলে ধরছে, কেন রাশিয়ার বিপ্লব সর্বহারাশ্রেণীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে।

অতীতে, ঘটনাবলী সাধারণত নিম্নোক্ত গতিপথ ধারণ করতো: বিপ্লবের কালে শ্রমিকরা ব্যারিকেড গড়ে লড়াই করতো, তারাই বুকের রক্ত ঢেলে দিত এবং পুরানো ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটাতো, কিন্তু ক্ষমতা চলে যেতো বুর্জোয়াদের হাতে, যারা তখন শ্রমিকদের শোষণ ও নিপীড়ণ করতো। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ঘটনা ছিল এটাই। জার্মানীর ক্ষেত্রে ঘটনা ছিল এটাই। এখানে, রাশিয়াতে কিন্তু ঘটনাবলী ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। রাশিয়ার শ্রমিকরা নিছক বিপ্লবের ঝটিকা শক্তিই ছিল না। বিপ্লবের ঝটিকা শক্তি হওয়ার সাথে সাথে রুশ সর্বহারাশ্রেণী একই সময়ে নেতৃত্ব অর্জনের জন্যে, শহরে ও গ্রামের সকল শোষিত জনগণকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানের, তাদেরকে নিজের চতুর্দিকে সমাবেশ করার, বুর্জোয়া শ্রেণির কবল থেকে তাদেরকে টেনে বের করার ও বুর্জোয়া শ্রেণীকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্যেও চেষ্টিত হয়। আর শোষিত জনগণের নেতা হওয়ার কারণে সর্বহারা শ্রেণী লড়াই চালায় নিজের হাতে ক্ষমতা ধারণের জন্যে এবং বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সে ক্ষমতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাবার জন্যে। বাস্তবত, এটাই দেখিয়ে দিচ্ছে, ১৯০৫ সালের অক্টোবরে আর ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রতিটি শক্তিশালী আবির্ভাবের ঘটনাই। সর্বহারাশ্রেণীকে দমন করা যার কাজ, সেই বুর্জোয়া পার্লামেন্টের, রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরানো যন্ত্রের বিপরীতে দৃশ্যপটে হাজির করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন যন্ত্রের ভ্রুণ হিসেবে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত, বুর্জোয়াশ্রেণীকে দমন করাই হলো যার কাজ।

রাশিয়ায় দুই দুইবার বুর্জোয়া শ্রেণি চেষ্টা করেছিল বুর্জোয়া পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে এবং সোভিয়েতসমূহের অবসান ঘটাতে: ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রাক পার্লামেন্টের সময়, বলশেভিকদের দ্বারা ক্ষমতা দখলের পূর্বে, আর ১৯১৮ সালের জানুয়ারীতে, সর্বহারা শ্রেণি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের পর, সংবিধান পরিষদের সময় আর এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রেই তারা পরাজয় বরণ করে। কেন? কারণ, বুর্জোয়া শ্রেণি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল কারণ বিপুল ব্যাপক শ্রমজীবী জনগণ সর্বহারা শ্রেণিকে বিপ্লবের একমাত্র নেতা হিসেবে মনে করেছিল, এর কারণ নিজেদের শ্রমিক সরকার হিসেবে জনগণ কর্তৃক সোভিয়েতগুলো ইতিমধ্যেই পরীক্ষিত ও উৎকৃষ্ট প্রমাণিত হয়েছিল, যেটিকে বুর্জোয়া পার্লামেন্ট দ্বারা বিনিময় করা হলে তার অর্থ হতো সর্বহারাশ্রেণীর জন্যে আত্মঘাতী। সুতরাং, এটা বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার নয় যে, বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদ রাশিয়ায় শেকড় গাড়তে পারে নাই। সে-কারণেই, রাশিয়ার বিপ্লব সর্বহারাশ্রেণীর শাসনের দিকেই চালিত করে।

বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব সম্পর্কিত লেনিনের পদ্ধতির প্রয়োগের ফলাফল হলো এই রূপই।

পঞ্চমত: জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন।

মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের সময়কালে আয়ারল্যান্ড, ভারত, চীন, মধ্য-ইউরোপীয় দেশসমূহ, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরীর ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জাতীয় ঔপনিবেশিক প্রশ্নে মৌলিক, প্রাথমিক ধারণাগুলো তুলে ধরেন। লেনিন তাঁর রচনাবলীতে ঐসব ধারণার উপরই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এই ক্ষেত্রে লেনিনের নতুন অবদান হলো:

ক) তিনি সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয় ও ঔপনিবেশিক বিপ্লব সম্পর্কিত সেসব ধারণাগুলোকে একটি একক সুসমন্বয়পূর্ণ পদ্ধতির মতামতে একত্রীভূত করেন।

খ) তিনি জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নকে সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত করেন।
গ) তিনি জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের সাধারণ প্রশ্নের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করেন।

সর্বশেষে, সর্বহারা শ্রেণির পার্টি সম্পর্কিত প্রশ্ন।

মার্কস ও এঙ্গেলস সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে পার্টি প্রসঙ্গে মূল রূপরেখাগুলি তুলে ধরেন, যা (পার্টি) ছাড়া সর্বহারা শ্রেণি ক্ষমতা দখলের অর্থেই হোক, কিংবা পুঁজিবাদী সমাজের রূপান্তর সাধনের অর্থেই হোক নিজের মুক্তি অর্জন করতে পারে না।

এই ক্ষেত্রে লেনিনের নতুন অবদান হলো এই যে, সাম্রাজ্যবাদের আমলে সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রামের নতুন অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তিনি এসব রূপরেখাকে আরো বিকশিত করেন এবং দেখিয়ে দেন যে:

ক) সর্বহারা সংগঠনসমূহের অন্যান্য রূপের (ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায়, রাষ্ট্র সংগঠন) সাথে তুলনায় পার্টি হলো সর্বহারা শ্রেণির শ্রেণি-সংগঠনের সর্বোচ্চ রূপ, পার্টির কাজ হলো সেসব সংগঠনের কাজের সাধারণীকরণ ও দিক-নির্দেশনা প্রদান;

খ) সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব কেবলমাত্র পার্টির মাধ্যমে, একনায়কত্বের পরিচালক শক্তি হিসেবে পার্টির মাধ্যমেই কার্যকরী হতে পারে;

গ) সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব সুসম্পূর্ণাঙ্গ হতে পারে কেবল যদি তা একটিমাত্র পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত হয়, যে-পার্টি অন্যান্য পার্টির সাথে নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে না, এবং অবশ্যই করবে না।

ঘ) পার্টির মধ্যে যদি লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা না থাকে তা হলে শোষকদের দমন করা এবং শ্রেণী-বিভক্ত সমাজকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর সাধনের ব্যাপারে সর্বহারশ্রেণীর একনায়কত্বের কর্তব্য সুসম্পন্ন হতে পারে না।

মূলত, লেনিন তাঁর রচনাবলীতে এসব নতুন অবদানই রাখেন, মার্কস-এর শিক্ষাবলীর সুনির্দিষ্ট রূপ দান করেন এবং সাম্রাজ্যবাদের আমলে সর্বহারাশ্রেণীর সংগ্রামের নতুন অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে তাকে আরো বিকশিত করেন।

সে-কারণেই আমরা বলি, লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। এ থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, লেনিনবাদকে মার্কসবাদ থেকে আলাদা করা যায় না, মার্কসবাদের বিপরীতে দাঁড় করানো তো দূরের কথা।

প্রতিনিধিদল কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নে জিজ্ঞেস করা হয়েছে:

“লেনিন বিশ্বাস করতেন ‘সৃজনশীল বিপ্লবে’ আর অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের বিকাশের পরিণতির জন্যে মার্কস অপেক্ষামান থাকার দিকে অনুরক্ত ছিলেন-এটা বলা কি সঠিক হবে?”

আমি মনে করি একথা বলা সম্পূর্ণ বেঠিক হবে। আমার মতে, প্রতিটি লোকায়ত বিপ্লবই হলো সৃজনশীল বিপ্লব, যদি তা প্রকৃতই লোকায়ত বিপ্লব হয়ে থাকে, কারণ তা পুরানো ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় এবং সৃষ্টি করে নতুন ব্যবস্থা।

অবশ্য, কোনো কোনো পশ্চাদপদ দেশে, এক গোত্রের বিরুদ্ধে আরেক গোত্রের খেলনা-সুলভ “উত্থানের রূপে” কোনো কোনো সময় যেসব বিপ্লব ঘটে-আদৌ সেগুলোকে যদি বিপ্লব বলা যায়- সেগুলোর মধ্যে সৃজনশীল কিছুই নেই। আর মার্কসবাদীরা কখনোই এরূপ খেলনা-সুলভ “উত্থানকে” বিপ্লব হিসাবে গণ্য করে না। এটা স্পষ্টতঃ এরূপ “উত্থানের” প্রশ্ন নয়, বরং তা হলো গণ-বিপ্লব লোকায়ত বিপ্লব, যা নিপীড়ক শ্রেণির বিরুদ্ধে নিপীড়িত শ্রেণিকে জাগ্রত করে। এরূপ বিপ্লব সৃজনশীল না হয়ে পারে না। মার্কস ও এঙ্গেলস যথার্থতঃ এরূপ বিপ্লব, একমাত্র এরূপ বিপ্লবকেই উর্দ্ধে তুলে ধরতেন। এটা বলার অপেক্ষ রাখে না যে, সকল অবস্থায়ই এরূপ বিপ্লব উত্থিত হয় না, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রকৃতির নিদিষ্ট অনুকূল অবস্থাধীনেই তা কেবল সংঘটিত হতে পারে।

প্রাভদা, ২১০ নং; ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯২৭। (স্তালিন রচনাবলী, ১০ম খন্ড রুশ সংস্করণ)

জোসেফ স্তালিনের এই লেখাটি সেরাজুল আনোয়ার অনূদিত গণপ্রকাশন প্রকাশিত পুস্তিকা ‘লেনিন ও লেনিনবাদ প্রসঙ্গে’ এপ্রিল, ১৯৮৯ থেকে নেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন স্তালিনের চারটি প্রবন্ধ:

০১. লেনিনবাদের ভিত্তি পুস্তকের ভূমিকা — জে ভি স্তালিন

০২. নারী পুরুষ ও শ্রমবিভাগ — জে. ভি. স্তালিন  

০৩. কর্মীদের উপর সব নির্ভর করে — জে. ভি. স্তালিন

০৪. পুঁজিবাদী দেশগুলিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বর্ধমান উত্তেজনা – জে. ভি. স্তালিন

আরো পড়ুন:  বুর্জোয়া বা বুর্জোয়াজি বলতে কি বুঝায়?
যোসেফ স্তালিন
জোসেফ ভিসারিওনোভিচ স্তালিন বা যোসেফ স্তালিন বা জোসেফ স্ট্যালিন (১৮ ডিসেম্বর, ১৮৭৯- ৫ মার্চ ১৯৫৩) সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মানে এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দীর্ঘতম সাফল্যের ইতিহাস রচনা করে গেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপ তথা বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রকৃত নাম যোসেফ ভিসারিওনোভিচ সোসো, স্তালিন নামটি তিনি ১৯১০ সালে ‘লৌহমানব’ অর্থে ধারণ করেন। তাঁকে মানবেতিহাসের মহত্তম নেতা ও জনগণের শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page