মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান

সভ্য দুনিয়ার সর্বত্র বুর্জোয়াবিজ্ঞানের (সরকারি এবং উদারনীতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে মার্কসের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়। মার্কসবাদকে তা দেখে একধরনের ‘বিষাক্ত গোষ্ঠী’ হিসেবে। অবশ্যই অন্য মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা, শ্রেণিসংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে ‘নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। সব রকমের সরকারি ও উদারনৈতিক বিজ্ঞানেই কোনো না কোনোভাবে মজুরি দাসত্বের সমর্থন করে থাকে, আর সেই মজুরি দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা করেছে মার্কসবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কী―এই প্রশ্নে মিল মালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা আর মজুরি দাসত্বের সমাজে বিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা মাত্র।

কিন্তু এইটুকুই সব নয়। ‘গোষ্ঠীবাদ’ বলতে যদি বোঝায় একটি আত্মবদ্ধ, শিলীভূত মতবাদ, যার উদয় হয়েছে বিশ্বসভ্যতার বিকাশের রাজপথ থেকে বহুদূরে, তবে দর্শন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে অতি পরিষ্কার করে দেখা যায় যে, মার্কসবাদের মধ্যে তেমন কোনো কিছুই নেই। বরং, মার্কসের সমগ্র প্রতিভাটাই এখানে যে মানবসমাজের অগ্রণী ভাবনায় যেসব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল মার্কস তারই জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতবাদের উদ্ভব হয়েছে দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মহাচার্যেরা যে শিক্ষা দান করেছিলেন, তারই প্রত্যক্ষ ও অব্যবহিত অনুবর্তন হিসেবে।

কার্ল মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান; কারণ, তা সত্য। এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমঞ্জস, এর কাছ থেকে মানুষ একটি সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করে, যা কোনো রকম কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া অথবা বুর্জোয়া জোয়ালের কোনো রূপ সমর্থনের সঙ্গে আপোস করে না। উনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজি অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসী সমাজতন্ত্র রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হচ্ছে মার্কসবাদ।

মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস এবং সেই সংগে তার তিনটি উপাদান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

১.

মার্কসবাদের দর্শন হচ্ছে বস্তুবাদ। ইউরোপের সমগ্র আধুনিক ইতিহাস থেকে এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ফ্রান্সে যখন সব রকমের মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠান ও ধ্যান-ধারনায় নিহিত সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বদ্ধপরিকর সংগ্রাম জ্বলে উঠেছিল, তখন থেকে বস্তুবাদই দেখা দিয়েছে একমাত্র সংগতিপরায়ণ দর্শন হিসেবে, যা প্রাকৃতিকবিজ্ঞানের সমস্ত সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভণ্ডামি প্রভৃতির শত্রু। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই বস্তুবাদকে ‘খণ্ডন’ করার জন্যে, তাকে ধূলিসাৎ ও নিন্দিত করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টাকরেছে এবং সমর্থন করেছে নানা ধরনের দার্শনিক ভাববাদ, যা সর্বদাই পর্যবসিত হয় কোনো না কোনো ভাবে ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা সমর্থনে।

কার্ল মার্কসফ্রিডরিখ এঙ্গেলস অতি দৃঢ়তার সঙ্গে দার্শনিক বস্তুবাদের সমর্থন করেছেন এবং এই ভিত্তি থেকে প্রত্যেকটি বিচ্যুতিই যে কী দারুণ ভুল তা বারবার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের এই মতামত সবচেয়ে পরিষ্কার করে এবং বিশদে ব্যক্ত হয়েছে এঙ্গেলসের ‘ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ’ এবং ‘অ্যান্টি দ্যুরিং’ বইতে, ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের’ মতো এই গ্রন্থ দুটোও প্রত্যেকটি সচেতন শ্রমিকের নিত্য পাঠ্য।

অষ্টাদশ শতাব্দীর বস্তুবাদেই কিন্তু কার্ল মার্কস থেমে যাননি, দর্শনকে তিনি অগ্রসর করে নিয়ে গেছেন। এ দর্শনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান চিরায়ত দর্শনের সম্পদ দিয়ে, বিশেষ করে হেগেলিয় তত্ত্ব দিয়ে, যা আবার পৌঁছেছে ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এইসব সম্পদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে দ্বান্দিক তত্ত্ব, অর্থাৎ পূর্ণতম, গভীরতম, একদেশদর্শিতা বর্জিত বিকাশের তত্ত্ব, যে মনুষ্যজ্ঞানে আমরা পাই নিরন্তর বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। জরাজীর্ণ ও পুরনো ভাববাদে ‘নব নব’ প্রত্যাবর্তনের সমস্ত বুর্জোয়া দার্শনিক শিক্ষা সত্ত্বেও, রেডিয়াম, ইলেকট্রন, মৌলিক পদার্থের রূপান্তর, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিষ্কার থেকে মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ চমৎকার সমর্থিত হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। — লেনিন

দার্শনিক বস্তুবাদকে গভীরতর ও পরিবিকশিত করে কার্ল মার্কস তাকে সম্পূর্ণতা দান করেন, প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞানকে প্রসারিত করেন মানবসমাজের জ্ঞানে। বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকীর্তি হচ্ছে কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক মতামতে যে বিশৃঙ্খলা ও খামখেয়াল এ যাবত চলে আসছিল তারসমাপ্তি ঘটিয়ে এগিয়ে এলো এক আশ্চর্য রকমের সর্বাঙ্গীন ও সুসমঞ্জস বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখাল কী করে উৎপাদনশক্তিগুলোর বিকাশের ফলে সমাজ জীবনে একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভব হয় উচ্চতর ব্যবস্থার―দৃষ্টান্ত স্বরূপ, কী করে সামন্তবাদ থেকে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ।

আরো পড়ুন:  ঐতিহাসিকতাবাদ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মৌলিক পদ্ধতি

মানুষের জ্ঞান যেমন মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক জগতের, অর্থাৎ বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হলো মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ বিভিন্ন দার্শনিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বিভিন্ন মতামত ও তত্ত্ব)। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপরিকাঠামো। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যাবে যে, আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর রূপ যত বিভিন্ন হোক, তার কাজ হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের উপর বুর্জোয়া প্রভুত্ব সংহত করা।

কার্ল মার্কসের দর্শন হচ্ছে সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ―তা থেকে মানবসমাজ এবং বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি তার জ্ঞানাঞ্জনশলাকা লাভ করেছে।

২.

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এক উপরিকাঠামো যা একটি অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর দণ্ডায়মান―একথা উপলব্ধির পর মার্কস তাঁর সবখানি মনোযোগ ব্যয় করেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পর্যালোচনায়। মার্কসের প্রধান রচনা ‘পুঁজি’তে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে।

মার্কসের পূর্বে চিরায়ত অর্থশাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশে―ইংল্যান্ডে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুসন্ধান করে অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো মূল্যের শ্রম-তত্ত্বের সূত্রপাত করেন। মার্কস তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি এ তত্ত্বকে আমূলরূপে সুসিদ্ধ এবং সুসংগতরূপে বিকশিত করেন। তিনি দেখান যে, পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যক যে শ্রম সময় ব্যয় হয়েছে, তাই দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়।

বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখছিলেন দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের বিনিময়) মার্কস সেখানে উদ্ঘাটন করলেন মানুষে মানুষে সম্পর্ক৷পণ্য বিনিময়ের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে বাজারের মাধ্যমে ভিন্নভিন্ন উৎপাদকদের পারস্পরিক সম্পর্ক৷ মুদ্রা থেকে সূচিত হচ্ছে যে সেসম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, বিভিন্ন উৎপাদকদের সমস্ত অর্থনৈতিক জীবনবাঁধা পড়ছে একটি অবিচ্ছিন্ন সমগ্রতায়৷ পুঁজির অর্থ এই সম্পর্কের আরো বিকাশ: মানুষের শ্রমশক্তি পরিণত হচ্ছে পণ্যে৷ জমি, কলকারখানা ও শ্রমের হাতিয়ারপাতির মালিকের কাছে শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে। শ্রমদিনের এক অংশ সে খাটে তার সপরিবার ভরনপোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরি), বাকি অংশটা সে খাটে বিনা মজুরিতে এবং পুঁজিপতির জন্য উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে যা পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফা ও সম্পদের উৎস৷

আরো পড়ুন:  কার্ল মার্কস ও নিউ রাইনিশ গেজেট

মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূল কথা হলো এই উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব

শ্রমিকের মেহনতে গড়া এই পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, ক্ষুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে: বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রাপুঁজির ফাঁসে আটকে যাচ্ছে, নিজের পশ্চাৎপদ টেকনিকের বোঝা নিয়ে ভেঙে পড়ছে ও ধ্বংস পাচ্ছে। কৃষিতে ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনের যে ভাঙন তার রূপগুলো অন্যরকম, কিন্তু ভাঙনটা তর্কাতীত সত্য।

ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের ধ্বংস সাধনের ম্যাধমে, পুঁজি সুচনা করে শ্রমের উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি এবং বৃহৎ পুঁজিপতিদের সঙ্ঘগুলির (associations) জন্যে একচেটিয়া অবস্থানের সৃষ্টি। উৎপাদন খোদ হতে থাকে উত্তরোত্তর সামাজিক- লক্ষ লক্ষ এবং কোটি কোটি শ্রমিক একত্রে বাঁধা পড়ে এক সুসংবদ্ধ অর্থনৈতিক সত্তায় (regular economic organism)- কিন্তু এই যৌথ শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে নেয় মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিরা। উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্যে উন্মক্ত ছোটাছুটি এবং ব্যাপক জনসাধারণের জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা হয়ে উঠে তীব্র।

পুঁজির উপর শ্রমিকদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সৃষ্টি করে সম্মিলিত শ্রমের বিশাল শক্তি।

পুঁজিবাদের বিকাশকে মার্কস অনুসন্ধান করেছে ভ্রূণাকারের পণ্য-অর্থনীতি থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুর করে তার সর্বোচ্চ রূপ, বৃহদায়তন উৎপাদন পর্যন্ত।

আর পুরানো ও নতুন- সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতা প্রতি বছরেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শ্রমিকদের কাছে স্পষ্টত প্রদর্শন করছে এই মার্কসীয় মতবাদের সত্যতা।

পুঁজিবাদের বিজয় কেবলমাত্র পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমের বিজয়েরই প্রারম্ভিকা — লেনিন

সমস্ত বিশ্বজুড়েই পুঁজিবাদ বিজয় লাভ করেছে, কিন্তু এই বিজয় হলো শুধু পুঁজির উপর শ্রমের বিজয়েরই ভূমিকা স্বরূপ।

৩.

সামন্তবাদের পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সংগে সংগেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, মেহনতি মানুষদের উপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হলো এ মুক্তির অর্থ। সে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদ স্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু আদিম সমাজতন্ত্র ছিলো কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নততর এই ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনিদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।

কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পারেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি কোন সামাজিক শক্তি নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।

ইতোমধ্যে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ যে বিপ্লবসমূহ ইউরোপের সর্বত্র, বিশেষ করে ফ্রান্সে, সাথে নিয়ে আসে সামন্তবাদের, ভূমিদাস প্রথার পতন, সেগুলো উত্তরোত্তর স্পষ্টরূপে উদ্ঘাটন করে দেয়- শ্রেণিসমূহের সংগ্রামই হলো সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্রের বিকল্প হচ্ছে সমাজতন্ত্রই, অন্য কিছু বিকল্প হিসেবে প্রযোজ্য নয়

সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোন একক বিজয়ও অর্জিত হয়নি তাদের প্রতিরোধ চুর্ণ না করে। পুঁজিবাদী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যকার জীবন-মরণ সংগ্রাম ছাড়া কম বা বেশি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে কোনো একটি পুঁজিবাদী দেশেরও ঘটেনি উদ্ভব।

বিশ্ব ইতিহাস যে শিক্ষা তুলে ধরেছে তা থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেই শিক্ষাকে সুসঙ্গতরূপে প্রয়োগ করায় সর্বাগ্রগামী হওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মার্কসের প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্তটি তিনি গ্রহণ করেন তা হল শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদ।

সবকিছু নৈতিক ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারনার নির্বোধ বলি হয়ে ছিলো এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি না তারা একথা বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সব শ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায়ই আছে: যে শক্তি পুরনোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থানহেতু যা তাকে করতে হবে- তেমন শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে শিক্ষিত ও সংগ্রামের জন্য সংগঠিত করে তোলা।

যে মানসিক দাসত্বের মধ্যে আজ অবধি সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণীসমূহ হতাশায় মনমরা হয়ে পড়েছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ সর্বহারাশ্রেণীকে দেখিয়ে দিয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ। মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বই একমাত্র ব্যাখ্যা করছে পুঁজিবাদের সাধারণ ব্যবস্থাটির মধ্যে সর্বহারাশ্রেণীর সত্যিকার অবস্থান।

আমেরিকা থেকে জাপান আর সুইডেন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা- সমস্ত বিশ্বজুড়েই সর্বহারা শ্রেণির স্বাধীন সংগঠনসমূহ বহুগুণে বেড়ে চলেছে। শ্রেণীসংগ্রাম পরিচালনা করে সর্বহারা শ্রেণি আলোকপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত হয়ে উঠছে; বুর্জোয়া সমাজের কুসংস্কার থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করছে; আরো ঘনিষ্ঠভাবে তারা নিজেদের সারির মধ্যে সমবেত হচ্ছে আর নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান মাপতে শিখছে; নিজেদের শক্তিকে তার ইস্পাতদৃঢ় করছে আর বেড়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্যভাবে।

মার্চ, ১৯১৩

বি. দ্র.: লেনিনের লেখা ‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান’ প্রবন্ধটি এখানে সংকলিত। প্রবন্ধটি লেনিন লেখেন কার্ল মার্কসের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৫ পুস্তক থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!