আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > আন্তর্জাতিক > এশিয়া > ভারত > ভারতে বৃটিশ শাসন

ভারতে বৃটিশ শাসন

লন্ডন, শুক্রবার, ১০ জুন, ১৮৫৩

ভিয়েনার তার-বার্তায় বলা হয়েছে যে তুর্কী সার্ডিনীয় ও সুইস প্রশ্নের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা সেখানে নিশ্চিত বলে ধরা হচ্ছে (২) ।
গতরাত্রে কমন্স সভায় ভারত বিতর্ক (৩) চলতে থাকে স্বাভাবিক একঘেয়ে ধরনে। স্যার চার্লস উড ও ‘স্যার জে. হগের বিবৃতিতে আশাবাদী মিথ্যার ছাপ আছে বলে মিঃ ব্ল্যাকেট অভিযোগ করেন। মন্ত্রিসভা ও ডিরেক্টরদের (৪) একগাদা উকিল যথাসাধ্য সে অভিযোগ খণ্ডনের চেষ্টা করে এবং অপরিহার্য মিঃ হিউম এই বলে উপসংহার টানেন যে মন্ত্রীরা বিল প্রত্যাহার করুন। বিতর্ক মুলতুবী রাখা হয়।

হিন্দুস্তান যেন এশীয় আয়তনের এক ইতালি, হিমালয় তার আল্পস, বাংলার সমভূমি যেন তার লম্বার্দি সমভূমি, দাক্ষিণাত্য তার অ্যাপিনাইঞ্জ এবং সিংহল তার সিসিলি দ্বীপ। জমির উৎপন্নের সেই একই সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য এবং রাজনৈতিক চেহারায় সেই একই খণ্ড খণ্ড ভাব। বিজয়ীর তরবারির চাপে ইতালি যেমন মাঝে মাঝে বিভিন্ন জাতির সমষ্টিকে এক করেছে, তেমনি দেখা যায় হিন্দুস্তানেও মুসলমান বা মোগল বা বৃটিনদের চাপ যখন থাকেনি, তখন হিন্দুস্তানও যতগুলি বিবদমান স্বাধীন রাষ্ট্রে ভেঙে গেছে তার সংখ্যা হিন্দুস্তানের নগর এমন কি গ্রামগুলির সংখ্যার মতো। তবু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ইতালি নয়, হিন্দুস্তান হল প্রাচ্যের আয়ারল্যান্ড। এবং ইতালি ও আয়ারল্যান্ড — কামনার এক জগতের সঙ্গে দুৰ্দশার এক জগতের এই বিচিত্র মিলন — তা হিন্দুস্তানের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যেই সূচিত। এ ধর্ম যুগপৎ কামনাতিশয্য ও আত্মনিগ্রহী ব্রহ্মচর্যের ধর্ম, লিঙ্গম আর জগন্নাথদেবের ধর্ম, সন্ন্যাসী ও বায়াদেরের (দেবদাসীর) ধর্ম।

নজির দেবার জন্যে স্যার চার্লস উডের মতো কুলি খাঁর উল্লেখ না করেও আমি তাঁদের সঙ্গে একমত নই যাঁরা হিন্দুস্তানের স্বর্ণযুগে বিশ্বাস করেন (৫)। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আওরঙ্গজেবের সময়টা ধরা যাক, অথবা উত্তরে যখন মোগল এবং দক্ষিণে পর্তুগিজদের উদয় হলো সেই যুগটা, অথবা মুসলিম অভিযান ও দাক্ষিণাত্যের হেপ্তার্কি (৬)। কিংবা চাই কি, আরো অতীতে গিয়ে স্বয়ং ব্রাহ্মণদের পৌরাণিক ইতিবৃত্তটাকেই নেওয়া যাক — তাতে ভারতীয় দুর্দশার প্রারম্ভ বলে যে কাল-নির্দেশ হয়েছে, সেটা বিশ্বসৃষ্টির খৃস্টিয় ধারণারও আগে।

অবশ্য এতে কোনো সন্দেহই নেই যে বৃটিশেরা হিন্দুস্তানের উপর যে দুর্দশা চাপিয়েছে তা হিন্দুস্তানের আগের সমস্ত দুর্দশার চাইতে মূলগতভাবে পৃথক এবং অনেক বেশি তীব্র। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এশীয় স্বৈরাচারের ওপর যে ইউরোপিয় স্বৈরাচারের পত্তন ঘটিয়ে এমন এক দানবীয় জরাসন্ধ সৃষ্টি করেছে যা সালসেট মন্দিরের রোমহর্ষক স্বর্গীয় দানবদের চাইতেও বেশি দানবীয়, তার কথা আমি বলছি না। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের কোনো বৈশিষ্ট্যসূচক দিক এটা নয় — এ হল শুধুই ওলন্দাজদের অনুকরণ এবং এতখানি অনুকরণ যে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রিয়াকলাপের সংজ্ঞা দিতে হলে জাভার ইংরেজ কোম্পানি সম্পর্কে যা বলেছিলাম, তার আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি করলেই যথেষ্ট :

“ওলন্দাজ কোম্পানি শুধুমাত্র লাভের লালসায় প্ররোচিত হয়েছিল এবং আগে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার বাগানমালিক বাগানের কুলিবাহিনীকে যে দৃষ্টিতে দেখত তার চেয়েও কম শ্রদ্ধা ও কম বিবেচনার সঙ্গে তারা দেখত তাদের প্রজাদের, কারণ বাগান-মালিককে মনুষ্য-সম্পদ ক্রয় করার জন্যে টাকা দিতে হয়েছিল, এদের দিতে হয়নি। এ কোম্পানি স্বেচ্ছাতন্ত্রের সবখানি প্রচলিত যন্ত্র প্রয়োগ করেছিল লোকগুলোর কাছ থেকে যত বেশি। পারা যায় আদায় করার জন্যে, নিংড়ে নেবার জন্যে তাদের মেহনতের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত এবং এইভাবে খামখেয়ালী ও অর্ধবর্বর এক সরকারজনিত সর্বনাশ বাড়িয়ে তুলত। রাজনীতিকদের অভ্যস্ত সবখানি ধূৰ্ততা ও ব্যবসায়ীদের সবখানি একচেটিয়া স্বার্থপরতার সঙ্গে সে যন্ত্রকে পরিচালিত করে।”

হিন্দুস্তানের সমস্ত ঘটনা পরম্পরা যতই বিচিত্র রকমের জটিল, দ্রুত ও বিধ্বংসকারী বলে মনে হোক না কেন, এই সব কিছু গৃহযুদ্ধ, অভিযান, বিপ্লব, দিগ্বিজয় ও দুর্ভিক্ষ তার উপরিভাগের নিচে নামেনি। কিন্তু ইংলন্ড ভারতীয় সমাজের সমগ্র কাঠামোটাই ভেঙ্গে দিয়েছে, পুনর্গঠনের কোনো লক্ষণ এখনো অদৃশ্য। পুরনো জগতের অপহৃতি অথচ নতুন কোনো জগতের এই অপ্রাপ্তির ফলে হিন্দুদের বর্তমান দুৰ্দশার ওপর এক অদ্ভুত রকমের শোকের আবির্ভাব ঘটে। বৃটেন-শাসিত হিন্দুস্তান তার সমস্ত অতীত ঐতিহ্য, তার সমগ্র অতীত ইতিহাস থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছে।

এশিয়ায় অবিস্মরণীয় কাল থেকে সরকারের সাধারণত শুধু তিনটি বিভাগ বর্তমান ছিল, কোষাগার বা রাজস্ব অর্থাৎ অভ্যন্তর লুণ্ঠনের বিভাগ, যুদ্ধ অর্থাৎ বহির্দেশ লুণ্ঠনের বিভাগ, এবং পরিশেষে পাবলিক ওয়ার্কসের বিভাগ। আবহাওয়া ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে, বিশেষ করে সাহারা থেকে শুরু করে আরব, পারস্য, ভারত ও তাতারিয়ার মধ্যে দিয়ে সমুন্নত এশীয় মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত বৃহৎ বৃহৎ মরু-অঞ্চলের অস্তিত্বের ফলে খাল ও জলাশয় দিয়ে কৃত্রিম সেচ ছিল প্রাচ্য কৃষির ভিত্তি। যেমন মিশর ও ভারতে, তেমনি পারস্য, মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি দেশেও বন্যার জল দিয়ে ভূমির উর্বরতা সাধন করা হয়, জলের উচ্চতার সুবিধা নিয়ে সেচের খালগুলিতে জলের জোগান দেওয়া হয়। মিতব্যয়ী ও সাধারণ জল-ব্যবহারের এই প্রাথমিক যে প্রয়োজন থেকে প্রতীচ্যে যেমন, ফ্ল্যান্ডার্স ও ইতালির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলি স্বেচ্ছামূলক সমিতিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়, তার জন্যে প্রাচ্যে দরকার হয়েছিল সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তক্ষেপ – কেননা প্রাচ্যে সভ্যতা ছিল অতি নিচের স্তরে এবং অঞ্চলের ব্যাপ্তি এত বিপুল যে স্বেচ্ছামূলক সমিতি সম্ভব ছিল না। সুতরাং সমস্ত এশীয় সরকারগুলির ওপরেই একটি অর্থনৈতিক দায়িত্ব এসে বার্তায় – পাবলিক ওয়ার্কস সংগঠন করা। ভূমির এই কৃত্রিম উর্বরীকরণ যা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল এবং সেচ ও জল-নিঃসরণ ব্যবস্থার অবহেলার সঙ্গে সঙ্গে যা ক্ষয় পেতে থাকে, তা থেকেই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি এই বিচিত্র ঘটনাটির — কেন আমরা পালমিরা ও পেত্রায়, ইয়েমেনের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে এবং মিশর, পারস্য ও হিন্দুস্তানের বড়ো বড়ো প্রদেশে দেখি, একদা অতি উত্তমরূপে কৰ্ষিত জমি সবখানি আজ বন্ধ্যা ও মরুভূমি হয়ে পড়ে আছে। এ থেকেও ব্যাখ্যা করা যায় কেমন করে একটি মাত্র বিধ্বংসী যুদ্ধেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি দেশ জনশূন্য হয়ে পড়ে থাকে, তার সমস্ত সভ্যতা লোপ পায়।

এখন, পূর্ব ভারতে ব্রিটিশ তাদের পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে রাজস্ব ও যুদ্ধের বিভাগটি গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু পাবলিক ওয়ার্কসটা একেবারেই অবহেলা করেছে। সেই জন্যেই কৃষির এ অবনতি, অবাধ প্রতিযোগিতার বৃটিশ নীতি (৭) এই নীতিতে এ কৃষি পরিচালিত হতে পারে না। কিন্তু সাধারণত এশীয় সাম্রাজ্যগুলিতে কৃষি এক সরকারের আমলে অবনত হচ্ছে আবার অন্য সরকারের আমলে উন্নত হচ্ছে। ইউরোপে যেমন ভালো মন্দ ঋতু অনুসারে ফসলের অবস্থা বদলায়, ওখানে তেমনি বদলায় ভালো মন্দ সরকার অনুসারে। সুতরাং কৃষির পীড়ন ও অবহেলা যত খারাপই হোক, ভারতীয় সমাজের ওপর সেইটাই বৃটিশ অভিযানকারীদের চূড়ান্ত আঘাত বলে গণ্য করা যেত না, যদি এর সঙ্গে একেবারে অন্য রকম গুরুত্বের একটি পরিস্থিতি, সমগ্র এশীয় জগতের ইতিহাসের পক্ষেই যা অভিনব, তার সংযোগ না ঘটত। ভারতীয় অতীতের রাজনৈতিক চেহারাটা যতই পরিবর্তনশীল বলে মনে হোক না কেন, সুদূর পুরাকাল থেকে উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত তার সামাজিক অবস্থা অপরিবর্তিত থেকেছে। সে সমাজ-কাঠামোর খুঁটি হল হস্তচালিত তাঁত আর চরকা, যা থেকে তাঁতি আর সূতাকাটুনির খাঁটি অক্ষৌহিণীর সৃষ্টি। অবিস্মরণীয় কাল থেকে ইউরোপ ভারতীয় শ্রমের অপূর্ব বস্ত্ৰ পেয়ে এসেছে এবং তার বদলে পাঠিয়েছে তার বহুমূল্য ধাতু — সে ধাতু পৌঁছিয়েছে ভারতের স্বর্ণকারের কাছে, ভারতীয় সমাজের এক আবশ্যিক সদস্য সে — এ সমাজে অলঙ্কার-প্রিয়তা এত বেশি যে নিম্নতম শ্রেণির লোকেরা পর্যন্ত, যারা প্রায় নগ্নগায়ে ঘোরে তারাও সাধারণত এক জোড়া সোনার মাকড়ি আর গলায় কোনো না কোনো রকমের সোনার গহনা পরে। হাত-পায়ের আঙুলে আংটি পরাও খুব চল। নারী ও ছেলেমেয়েরা প্রায়ই পরে ভারি ভারি কঙ্কণ আর সোনারূপের মল, এবং ঘরে থাকে সোনারুপোর তৈরি দেবদেবীর মূর্তি। বৃটিশ হামলাদাররাই এসে ভারতীয় তাঁত ভেঙে ফেলে, ধ্বংস করে চরকা। ইংলন্ড শুরু করে ইউরোপের বাজার থেকে ভারতীয় তুলাবস্ত্ৰকে বিতাড়ন করতে, অতঃপর সে হিন্দুস্তানে সূতা পাঠাতে থাকে এবং পরিশেষে তুলার মাতৃভূমিকেই কার্পাস বস্ত্ৰ চালান দিয়ে ভাসিয়ে দেয়। ১৮১৮ থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত গ্রেট বৃটেন থেকে ভারতে সূতা চালানের অনুপাত বেড়ে ওঠে। ১ থেকে ৫,২০০ গুণ। ১৮২৪ সালে ভারতে বৃটিশ মসলিনের চালান ১০,০০,০০০ গজও প্রায় নয়, অথচ ১৮৩৭ সালে তা ৬,৪০,০০,০০০ গজও ছাড়িয়ে যায়। অথচ একই সময়ে ঢাকার জনসংখ্যা ১,৫০,০০০ থেকে ২০,০০০-এ নেমে আসে। বস্ত্রের জন্যে বিখ্যাত এই সব ভারতীয় শহরগুলির অবক্ষয়টুকুই কিন্তু চরম ফলাফল নয়। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে কৃষি ও হস্তচালিত শিল্পের যে বন্ধন ছিল বৃটিশ বাষ্প ও বিজ্ঞান তাকে উন্মিলিত করে দিয়েছে।

এই দুটি অবস্থা — একদিকে সকল প্রাচ্যবাসীর মতো হিন্দু কর্তৃক তার কৃষি ও বাণিজ্যের প্রাথমিক শর্তস্বরূপ বড়ো বড়ো পাবলিক ওয়ার্কসের ভার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, এবং অন্যদিকে সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এবং কৃষি ও শিল্পোদ্যোগের ঘরোয়া বন্ধনে ছোটো ছোটো কেন্দ্ৰে জোট বাঁধা — এই দুইটি অবস্থায় প্রাচীনতম কাল থেকে একটা বিশেষ চরিত্রের সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে — সৃষ্টি করেছে তথাকথিত গ্রাম-ব্যবস্থা, তাতে এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিটি সম্মিলন পেয়েছে স্বাধীন সংগঠন ও বিশিষ্ট জীবনধারা। এই ব্যবস্থার বিশিষ্ট চরিত্র বোঝা যাবে ভারত বিষয়ে বৃটিশ কমন্স সভার একটি পুরনো সরকারি দলিলের নিন্মোক্ত বর্ণনা থেকে :

‘ভৌগোলিকভাবে দেখলে একটি গ্রাম হল কয়েক শত বা কয়েক হাজার একর আবাদী বা পতিত জমির এক একটি অঞ্চল, রাজনৈতিকভাবে দেখলে তার ধরনটা কর্পোরেশন বা পৌর গোষ্ঠীর মতো। তার পরিচালক ও সেবকদের ব্যবস্থাপনা নিম্নোক্ত ধরনের : পটেল অথবা প্রধান মণ্ডল, তার ওপর সাধারণত গ্রামের অবস্থা-ব্যবস্থার তদারক করার ভার, অধিবাসীদের মধ্যেকার ঝগড়ার সে মীমাংসা করে, পুলিসের কাজ দেখে, এবং স্ব-গ্রামের অভ্যন্তর থেকে কর-সংগ্রহের কাজ চালায় — ব্যক্তিগত প্রভাব এবং গ্রামবাসীদের অবস্থা ও স্বার্থের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ পরিচয়ের ফলে এ দায়িত্বের পক্ষে সে হয় সবচেয়ে উপযোগী। কার্নম [?] চাষের হিসাব রাখে এবং চাষ সংক্রান্ত সব কিচু নথিবদ্ধ করে। তৈলার আর তোতী — প্রথম জনের কাজ অপরাধাদির সংবাদ সংগ্রহ এবং গ্রাম থেকে গ্রামান্তর গমনাগমনে লোকজনকে পৌঁছে দেওয়া ও রক্ষা করা, অপর জনের এখতিয়ার গ্রামেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়, অন্যান্য কাজ ছাড়াও তার কাজ হলো শস্য পাহারা দেওয়া এবং তার পরিমাপে সাহায্য করা। সীমানাদার — তার কাজ গ্রামে সীমানারক্ষা এবং কলহ উপস্থিত হলে সীমানা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া। জলাশয় ও জলপ্রণালীর তত্ত্বাবধায়ক কৃষির জন্যে জলের বিলি ব্যবস্থা করে। ব্রাহ্মণ করে গ্রামের পূজা-অৰ্চনা। গুরু মশায়কে দেখা যায় গ্রামের ছেলেপিলেদের বালির উপর লিখতে পড়তে শেখাচ্ছেন; পঞ্জিকা-ব্রাহ্মণ অথবা জ্যোতিষী ইত্যাদি। এই সব পরিচালক ও সেবকদের নিয়েই সাধারণত গ্রামের ব্যবস্থাপনা, কিন্তু দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে সে ব্যবস্থাপনা এত প্রসারিত নয়, উপরিকথিত দায়-দায়িত্বের কতকগুলি একই ব্যক্তি পালন করে। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে উপরিকথিত লোক ছাড়াও অনেক বেশি লোক দেখা যায়। এই সরল ধরনের পৌর-শাসনের আওতায় অবিস্মরণীয় কাল থেকে এ দেশবাসী বাস করে আসছে। গ্রামের সীমানা বদল হয়েছে কচিৎ এবং যুদ্ধ, দুৰ্ভিক্ষ বা মারীমড়কে গ্রামগুলি ক্ষতিগ্রস্ত এমন কি বিধ্বস্ত হলেও সেই একই নাম, একই সীমানা, একই স্বাৰ্থ, এমন কি একই পরিবারসমূহ চলে এসেছে। যুগের পর যুগ। রাজ্যের ভাঙাভাঙি ভাগবিভাগ নিয়ে অধিবাসীরা মাথা ঘামায় না, গ্রামটি অখণ্ড হয়ে থাকলেই হল, কোন শক্তির কাছে তা গেল, কোন সম্রাটের তা করায়ত্ত হল এ নিয়ে তারা ভাবে না। গ্রামের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতি অপরিবর্তিতই থাকে। সেই একই পটেল থাকে প্রধান মণ্ডল তথা ক্ষুদে বিচারপতি বা শাসনকর্তা এবং গ্রামের কর আদায়ের কাজ সে তখনো চালিয়ে যায়।’ (৮)

এই সব ছোটো ছোটো বাঁধাগৎ ধরনের সামাজিক সংস্থাগুলি বহুলাংশে ভেঙে গেছে ও অদৃশ্য হয়ে চলেছে, সেটা বৃটিশ ট্যাক্স-সংগ্রাহক ও বৃটিশ সৈন্যের বর্বর হস্তক্ষেপের ফলে তত নয় যতটা ইংরেজের বাষ্প ও ইংরেজের অবাধ বাণিজ্যের প্রতিক্রিয়ার ফলেই। ওই সব পারিবারিক গোষ্ঠীগুলির ভিত্তি ছিল হাতে কাটা সূতা, হাতে বোনা কাপড় ও হাতে করা চাষের এক বিশিষ্ট সমন্বয়ের কুটির শিল্প, যা থেকে তারা পেত আত্মনির্ভর শক্তি। ইংরেজের হস্তক্ষেপ সূতাকটুনির স্থান করেছে ল্যাঙ্কাশায়ারে এবং তাঁতির স্থান রেখেছে বাংলায়, অথবা হিন্দু সূতাকটুনি ও তাঁতি উভয়কেই নিশ্চিহ্ন করেছে এবং এই সব ছোটো ছোটো অর্ধবর্বর, অর্ধসভ্য গোষ্ঠীগুলিকে ভেঙে দিয়েছে তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে উড়িয়ে দিয়ে এবং এই ভাবে যে সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত করেছে সেটা এশিয়ায় যা শোনা গেছে তার মধ্যে সর্ববৃহৎ সত্যি কথা বললে একমাত্র বিপ্লব।

ওই সব লক্ষ লক্ষ শ্রমপরায়ণ পিতৃতান্ত্রিক ও নিরীহ সামাজিক সংগঠনগুলি অসংগঠিত হয়ে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ডুবছে দুর্দশার এক সমুদ্রে, সে সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে যুগপৎ তাদের প্রাচীন সভ্যতা ও জীবিকার্জনের বংশানুক্রমিক উপায় — দেখতে এটা মানবিক অনুভূতির কাছে যতই পীড়াদায়ক হোক না কেন, এ কথা যেন না ভুলি যে এই সব শান্ত-সরল গ্রাম-গোষ্ঠীগুলি যতই নিরীহ মনে হোক, প্রাচ্য স্বৈরাচারের তারাই ভিত্তি হয়ে এসেছে চিরকাল, মনুষ্য-মানসকে তারাই যথাসম্ভব ক্ষুদ্রতম পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে, তাকে বানিয়েছে কুসংস্কারের অবাধ ক্ৰীড়নক, তাকে করেছে চিরাচরিত নিয়মের ক্রীতদাস, হরণ করেছে তার সমস্ত কিছু মহিমা ও ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা। যে বর্বর আত্মপরতা এক একটা হতভাগ্য ভূমিখণ্ডের ওপর পুঞ্জীভূত হয়ে শান্তভাবে প্রত্যক্ষ করে গেছে সাম্রাজ্যের পতন, অবৰ্ণনীয় নিষ্ঠুরতার অনুষ্ঠান, বড়ো শহরের অধিবাসীগণের হত্যাকাণ্ড, প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর চাইতে একতিল বেশি বিবেচনা এদের সম্পর্কে করেনি, এবং দৈবাৎ আক্রমণকারীর লক্ষ্যপথে পড়লে যা নিজেও হয়ে উঠেছে আক্রমণকারীর এক অসহায় শিকার, সে আত্মপরতার কথা যেন না ভুলি। যেন না ভুলি যে এই হীন, অনড় ও উদ্ভিদ-সুলভ জীবন, এই নিস্ক্রিয় ধরনের অস্তিত্ব থেকে অন্যদিকে, তার পাল্টা হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে বন্য লক্ষ্যহীন এক অপরিসীম ধ্বংসশক্তি এবং হত্যা ব্যাপারটিকেই হিন্দুস্তানে পরিণত করেছে এক ধর্মীয় প্রথায়। যেন না ভুলি যে ছোটো ছোটো এই সব গোষ্ঠী ছিল জাতিভেদপ্রথা ও ক্রীতদাসত্ব দ্বারা কলুষিত, অবস্থার প্রভুরূপে মানুষকে উন্নত না করে তাকে করেছে বাহিরের অবস্থার অধীন, স্বয়ং-বিকশিত একটি সমাজব্যবস্থাকে তারা পরিণত করেছে অপরিবর্তমান প্রাকৃতিক নিয়তিরূপে এবং এই ভাবে আমদানি করেছে প্রকৃতির পুশবৎ পূজা, প্রকৃতির প্রভু যে মানুষ তাকে হনুমানদেব রূপী বানর এবং শবলদেবী রূপী গরুর অৰ্চনায় ভুলুষ্ঠিত করে অধঃপতনের প্রমাণ দিয়েছে।

এ কথা সত্য যে, ইংলন্ড হিন্দুস্তানে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে প্ররোচিত হয়েছিল শুধু হীনতম স্বার্থ বুদ্ধি থেকে, এবং সে স্বার্থসাধনে তার আচরণ ছিল নির্বোধের মতো। কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো: এশিয়ার সামাজিক অবস্থায় মৌলিক একটা বিপ্লব ছাড়া মনুষ্যজাতি কি তার ভবিতব্য সাধন করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে ইংলন্ডের যত অপরাধই থাক, সে বিপ্লব সংঘটনে ইংলন্ড ছিল ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র।
তাহলে, আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির কাছে প্রাচীন এক জগতের ভেঙে পড়ার দৃশ্য যত কটু লাগুক, ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের অধিকার রইল গ্যেটের সঙ্গে ঘোষণা করা

“Sollte diese Qual uns qualen,
Da sie unsre Lust vermehrt,
Hat nicht Myriaden Seelen
Timurs Herrschaft aufgezehr [৯]

কার্ল মার্কস কর্তৃক ১৮৫৩ সালের সংবাদপত্রের পাঠ অনুসারে ১০ই জুন লিখিতএবং New-York Daily Tribune পত্রিকার ৩৮০৪ নং সংখ্যায় ১৮৫৩ সালের ২৫শে জুন প্রকাশিত
স্বাক্ষর : কার্ল মার্কস

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ

৯. এ নির্যাতন থেকে যদি পাই এক বৃহত্তম সুখ, তবে কেন সেজন্যে মনঃপীড়া ? তৈমুরের শাসনের মধ্যেও কি হয়নি আত্মার অশেষ নির্বাণ ? গ্যেটের Westostlicher Diwan, An Sulerika থেকে – সম্পাঃ।

আরো পড়ুন:  লেনিনবাদী মতে যুদ্ধ হচ্ছে অন্যভাবে বলতে গেলে সহিংস উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা
কার্ল মার্কস
বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিজ্ঞান ও অর্থনীতির প্রতিথযশা তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) প্রুশিয়ার রাইল ল্যান্ড প্রদেশের ট্রিভ্স নামক স্থানে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪৭ সালের বসন্তে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামে একটি গুপ্ত প্রচার সমিতিতে যোগ দেন। ১৮৪৭ এ নভেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কংগ্রেস থেকে দায়িত্ব পেয়ে সুপ্রসিদ্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন। ১৮৫০-এর দশকের শেষদিক ও ৬০-এর দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন মার্কসকে আবার প্রত্যক্ষ কার্যকলাপের মধ্যে টেনে আনে। ১৮৬৪ সালে (২৮ সেপ্টেম্বর) বিখ্যাত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ— প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে। মার্কস ছিলেন এই সমিতির প্রাণস্বরূপ। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরাম কেদারায় বসে মার্কস নীরবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page