আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > আন্তর্জাতিক > সমাজতন্ত্রের দিকে যেতে ভয় পেলে এগোনো সম্ভব কি?

সমাজতন্ত্রের দিকে যেতে ভয় পেলে এগোনো সম্ভব কি?

আসন্ন বিপর্যয় এবং তা প্রতিহত করার উপায়
পুস্তিকা থেকে

এতক্ষণ যা বলা হলো তার থেকে, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি এবং মেনশেভিকদের চলতি সুবিধাবাদী ধ্যান-ধারণায় লালিত পাঠকের পক্ষ থেকে সহজেই এই আপত্তি উঠতে পারে: এখানে বর্ণিত ব্যবস্থাগুলির বেশির ভাগ বস্তুত সমাজতান্ত্রিকই, গণতান্ত্রিক নয়!

(কোনো-না-কোনো আকারে) সাধারণত বুর্জোয়া, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি এবং মেনশেভিক পত্রপত্রিকাগুলিতে উত্থাপিত এই চলতি আপত্তিটা হলো অনগ্রসর পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষসমর্থন, স্ত্রুভীয় সাজে সজ্জিত সমর্থন। এতে যেন বলা হয়, আমরা সমাজতন্ত্রের জন্য পরিপক্ক নই, সমাজতন্ত্র ‘প্রবর্তনের সময় আসে নি,আমাদের বিপ্লব বুর্জোয়া বিপ্লব, বুর্জোয়াদের প্রতি হীনানুগত্য স্বীকার করতে হবে আমাদের (যদিও ১২৫ বছর আগে[১] ফ্রান্সে বুর্জোয়া মহাবিপ্লবীরা তাঁদের বিপ্লবটিকে মহাবিপ্লব করে তুলেছিলেন ভূস্বামী হোক, পুঁজিপতি হোক সমস্ত উৎপীড়কের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস)।

বুর্জোয়াদের ঝুটা-মার্কসবাদী নোকরেরা, যাদের সঙ্গে জুটেছে সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারিরা এবং যারা ওইভাবে তর্ক তোলে, তারা জানে না (তাদের মতের তাত্ত্বিক ভিত্তি পরীক্ষা করলে যা দেখা যায়) সাম্রাজ্যবাদ কী, পুঁজিবাদী একচেটিয়া কী, রাষ্ট্র কী, আর কীই-বা বৈপ্লবিক গণতন্ত্র। কেননা সেটা যে বোঝে সে মানতে বাধ্য যে, সমাজতন্ত্রের দিকে ছাড়া কোনো অগ্রগতি হতে পারে না।

সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে প্রত্যেকে কথা বলে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ হলো স্রেফ একচেটে পুঁজিবাদ।

রাশিয়ায়ও পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদে পরিণত হয়েছে, সেটা সাব্যস্ত করতে ‘প্রোদুগোল’, ‘প্রোদামেৎ’, চিনি সিন্ডিকেট, ইত্যাদির দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। একচেটিয়া পুঁজিবাদ কিভাবে রাষ্ট্রীয়-একচেটিয়া পুঁজিবাদে পরিণত হয়, চিনি সিন্ডিকেটই তার শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্র কী? রাষ্ট্র হলো শাসক শ্রেণীর একটি সংগঠন—যেমনটি জার্মানিতে য়ুঙ্কার [২] আর পুঁজিপতিদের। তাই, জার্মান প্লেখানভরা (শাইডেমান, লেঞ্চ এবং অন্যান্যেরা) যেটাকে বলেন ‘যুদ্ধকালীন সমাজতন্ত্র’ সেটা আসলে যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রীয়-একচেটিয়া পুঁজিবাদ বা আরও সহজ ও স্পষ্ট করে বললে, শ্রমিকদের বেলায় যুদ্ধকালীন সশ্রম কারাবাস এবং পুঁজিবাদী মুনাফার যুদ্ধকালীন সংরক্ষণ।

য়ুঙ্কার-পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, ভূস্বামী-পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বদলী ধরা যাক বৈপ্লবিক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, অর্থাৎ যে-রাষ্ট্র বৈপ্লবিক উপায়ে সমস্ত বিশেষাধিকার লোপ করে এবং বৈপ্লবিক উপায়ে পূর্ণতম গণতান্ত্রিকতা প্রবর্তন করতে ভয় পায় না। দেখা যাবে, রাষ্ট্রটা সাচ্চা বৈপ্লবিক-গণতান্ত্রিক হলে রাষ্ট্রীয়-একচেটিয়া পুঁজিবাদে নিহিত থাকে সমাজতন্ত্রের দিকে একটি অবশ্যম্ভাবী, অপরিহার্য পদক্ষেপ, একটি পদক্ষেপের চেয়ে বেশি কিছু!

আরো পড়ুন:  বিস্তারবাদ বা সম্প্রসারণবাদ গঠিত হয় রাষ্ট্রের নীতিগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে

কেননা কোনো বিশাল পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া হয়ে উঠলে, তার মানে সেটা সেবা করে সমগ্র জাতির। সেটা রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া হয়ে উঠলে, তার মানে গোটা কর্মকাণ্ডটি চালায় রাষ্ট্র (অর্থাৎ জনসমষ্টির, সর্বোপরি শ্রমিক আর কৃষকদের সশস্ত্র সংগঠন, অবশ্য বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিকতা থাকার শর্তে)। কার স্বার্থে?

— হয় ভূস্বামী আর পুঁজিপতিদের স্বার্থে, সেক্ষেত্রে সেটা বৈপ্লবিক-গণতান্ত্রিক নয়, প্রতিক্রিয়াশীল-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদী প্রজাতন্ত্র;

—  নইলে বৈপ্লবিক গণতন্ত্রের স্বার্থে — তাহলে সেটা সমাজতন্ত্রের দিকে পদক্ষেপ।

কেননা সমাজতন্ত্র হলো স্রেফ রাষ্ট্রীয়-পুঁজিবাদী একচেটিয়া থেকে ঠিক পরের পদক্ষেপ। কিংবা বলা যায়, সমাজতন্ত্র হলো স্রেফ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী একচেটিয়া, যেটাকে দিয়ে সমগ্র জনগণের স্বার্থের খিদমত করানো হয়, আর যেটা সেই পরিমাণে আর পুঁজিবাদী একচেটিয়া থাকে না।

এতে কোন মধ্যপন্থা নেই। বিকাশের নৈর্বক্তিক প্রক্রিয়াটা এমনই যাতে সমাজতন্ত্রের দিকে না এগিয়ে একচেটিয়াগুলো (যুদ্ধ সেগুলোর সংখ্যা, ভূমিকা এবং গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে দশগুণ) থেকে এগোনো অসম্ভব।

হয় প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী গণতন্ত্রী হতে হবে, সেক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের দিকে পদক্ষেপ গ্রহণে ভয় পাওয়া চলে না।

নইলে সমাজতন্ত্রের দিকে পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা ভীত। আমাদের বিপ্লবটা বুর্জোয়া বিপ্লব, সমাজতন্ত্র ‘প্রবর্তন করা’ যায় না, ইত্যাদি যুক্তি তুলে প্লেখানভ, দান কিংবা চের্নোভের ধরনে সেই পদক্ষেপের নিন্দা করি, সেক্ষেত্রে আমরা নেমে যাই কেরেনস্কি, মিলিউকোভ এবং কর্নিলভের পর্যায়ে, অর্থাৎ আমরা প্রতিক্রিয়াশীল-আমলাতান্ত্রিক উপায়ে দমন করি শ্রমিক আর কৃষকদের ‘বৈপ্লবিক-গণতান্ত্রিক’ আশা-আকাঙ্ক্ষা।

কোনো মধ্যপন্থা নেই। সেখানেই রয়েছে আমাদের বিপ্লবের মূল অসংগতি।

সাধারণভাবে ইতিহাসে, আর বিশেষত যুদ্ধকালে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। এগোতে কিংবা হটতে হয়। বৈপ্লবিক উপায়ে প্রজাতন্ত্র আর গণতান্ত্রিকতা হাসিল করেছে বিশ শতকের রাশিয়া, এখানে আগুবাড়া সম্ভব নয় সমাজতন্ত্রের দিকে না এগিয়ে, সেদিকে পদক্ষেপ না করে (সে-পদক্ষেপ প্রযুক্তি আর সংস্কৃতির মাত্রা দিয়ে শর্তাবদ্ধ এবং নির্ধারিত: বৃহদায়তন যন্ত্র-উৎপাদন কৃষকের অর্থনীতিতে ‘চালু করা’ কিংবা চিনি উৎপাদনে লোপ করা যায় না)।

আরো পড়ুন:  ব্যর্থ রাষ্ট্র হচ্ছে কেন্দ্রীভূত সামরিক কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র

তবে এগোতে ভয় করা মানে হটা — যা মিলিউকোভ আর প্লেখানভদের পরমানন্দ দিয়ে কেরেনস্কিরা বাস্তবিকই করছেন সেরেতেলি আর চের্নোভদের নির্বোধ আনুকূল্যে।

একচেটিয়া পুঁজিবাদ থেকে রাষ্ট্রীয়-একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপান্তর অসাধারণ মাত্রায় ত্বরান্বিত করে যুদ্ধটা ওইভাবে মানবজাতিকে লক্ষণীয়ভাবে এগিয়ে দিয়েছে সমাজতন্ত্রের দিকে, এমনই ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতা।

সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ — এটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রাক্কাল। তার কারণ শুধু, এই নয় যে, যুদ্ধের বীভৎসতা প্রলেতারীয় বিদ্রোহ ঘটায় — সমাজতন্ত্রের জন্য অর্থনৈতিক শর্তাবলী পরিপক্ক না হলে কোনো বিদ্রোহই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না — কারণটা এই যে, রাষ্ট্রীয়-একচেটিয়া পুঁজিবাদ হলো সমাজতন্ত্রের পুরোদস্তুর বৈষয়িক প্রস্তুতি, সমাজতন্ত্রের দ্বারপ্রান্ত, ইতিহাস নামক মইখানায় সেই ধাপটা যেটা এবং সমাজতন্ত্র নামের ধাপটার মধ্যে কোনো অন্তবর্তী ধাপ নেই।

***

আমাদের সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি আর মেনশেভিকরা সমাজতন্ত্র সংক্রান্ত প্রশ্নটাকে ধরে মতান্ধ ধরনে — মুখস্থ করা কিন্তু ভাল করে না বোঝা মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে। সুদূর, অজ্ঞাত, আবছা একটা বস্তু হিসেবে তারা দেখে সমাজতন্ত্রকে।

কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদের সমস্ত জানলা দিয়েই সমাজতন্ত্র এখন তাকিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে; আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তিতে যেটা হয় অগ্রপদক্ষেপ এমন প্রত্যেকটা ব্যবস্থায় সমাজতন্ত্র ফুটে ওঠে সরাসরি, ব্যবহারিক আকারে।

সর্বজনীন শ্রমবাধ্যতা —  এটা কী?

এটা হলো আধুনিক একচেটিয়া পুঁজিবাদের ভিত্তিতে একটা অগ্রপদক্ষেপ, একটা কিছু সাধারণ পরিকল্পনা অনুসারে সমগ্র অর্থনৈতিক জীবন নিয়ামনের একটা ব্যবস্থা, জাতীয় শ্রমসাশ্রয়ের জন্য এবং জাতীয় শ্রমের মূঢ় পুঁজিবাদী অপচয় রোধের একটা ব্যবস্থা।

জার্মানিতে সর্বজনীন শ্রমবাধ্যতা চালু করছে য়ুঙ্কাররা (ভূস্বামীরা) আর পুঁজিপতিরা, কাজেই সেটা অনিবার্যভাবে হয়ে ওঠে শ্রমিকদের পক্ষে যুদ্ধের সশ্রম কারাবাসের দশা।

কিন্তু একই ব্যবস্থাটাকে ধরে কোনো বৈপ্লবিক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেটার তাৎপর্য নিয়ে ভেবে দেখুন। শ্রমিক, সৈনিক এবং কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির প্রবর্তিত, নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত সর্বজনীন শ্রমবাধ্যতা তবু নয় সমাজতন্ত্র, কিন্তু সেটা আর নয় পুঁজিবাদ। সেটা হবে সমাজতন্ত্রের দিকে এক বিপুল পদক্ষেপ; পূর্ণ গণতন্ত্র বজায় থাকলে জনরাশির বিরুদ্ধে অভূতপর্বে বলপ্রয়োগ ছাড়া সেটা থেকে পুঁজিবাদে পশ্চাদপসরণ আর সম্ভবপর হতে পারে না।

আরো পড়ুন:  লেনিনবাদের ভিত্তি পুস্তকের ভূমিকা

১০-১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭

টিকা:

১. অর্থাৎ, ১৭৮৯-১৭৯৪ সালের ফরাসি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সময়।

২. প্রুশিয়ায় উচ্চতম, অভিজাত সম্প্রদায়ের বড় জমিমালিকেরা।

৩. প্রবন্ধটি লেনিনের আসন্ন বিপর্যয় এবং তা প্রতিহত করার উপায় পুস্তিকা থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে গৃহীত অংশটুকু প্রগতি প্রকাশন, মস্কো থেকে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত দ্বিজেন শর্মা সম্পাদিত লেনিনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শিরোনামের বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলনের ২০৫-২০৮ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে এবং কিছু শব্দ বদলে দেয়া হয়েছে।

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (এপ্রিল ২২, ১৮৭০ – জানুয়ারি ২১, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page