সোভিয়েত সরকারের সাফল্য ও বিঘ্ন

সোভিয়েত সরকারের সাফল্য ও বিঘ্ন [থেকে]

সাবেকী কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্রীরা কল্পনা করত যে, সমাজতন্ত্র গঠন করা সম্ভব অন্য ধরনের লোক নিয়ে; প্রথমে তারা উৎকৃষ্ট, নিষ্পাপ, চমৎকার শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষ গড়ে তুলবে এবং পরে সমাজতন্ত্র গড়বে তাদের নিয়ে। আমরা তাতে সর্বদাই হেসেছি ও বলেছি যে, ওটা হলো পুতুল খেলা, সমাজতন্ত্র নিয়ে ওটা নবাবনন্দিনীদের বিলাস, গুরত্বপূর্ণ রাজনীতি নয়।

আমরা সমাজতন্ত্র গড়তে চাই এমন লোকেদের নিয়ে যারা মানুষ হয়েছে। পুঁজিবাদের আমলে, পুঁজিবাদ যাদের নষ্ট ও ভ্রষ্ট করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে পোক্ত করেছে সংগ্রামের জন্যে। এমন প্রলেতারিয়ান আছে যারা এমনি পোক্ত যে, যে কোনো ফৌজের চেয়ে হাজারগুণ আত্নোৎসর্গে সমর্থ; আছে কোটি কোটি নিপীড়িত কৃষক, – তমসাচ্ছন্ন, বহুবিক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রলেতারিয়েত যদি কুশলী নীতি অনুসরণ করে, তাহলে তার চারপাশে সংগ্রামে সম্মিলিত হতে তারা সমর্থ। তাছাড়া আছে বিজ্ঞান ও টেকনিকের বিশেষজ্ঞরা, সবাই তারা বুর্জোয়া বিশ্ববীক্ষায় সমূহ আচ্ছন্ন, আছে সমরবিদেরা, যারা গড়ে উঠেছে বুর্জোয়া পরিস্থিতিতে বুর্জোয়া পরিস্থিতি হলে বরং তবু ভালু হয়ত গড়ে উঠেছে জমিদারী, বেত্রধারী, ভূমিদাসমালিকী পরিস্থিতিতে। জাতীয় অর্থনীতির কথা যদি ধরি, তাহলে সমস্ত কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়র, শিক্ষক – এ সবই এসেছে সম্পত্তিবান শ্রেণী থেকে; আকাশ থেকে তো আর পড়ে নি! লেদ যন্ত্রের সম্পত্তিহীন প্রলেতারিয়ান আর হলধর কৃষক জার নিকোলাইয়ের রাজ্যে বা প্রজাতন্ত্রী উইলসনের[১] আমলে কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় পেরতে পারে নি। বিজ্ঞান ও টেকনিক – এ হলো ধনীদের জন্যে, সম্পত্তিধরদের জন্যে ; পুঁজিবাদ সংস্কৃতি যোগায় কেবল সংখ্যাল্পদের। অথচ সমাজতন্ত্র আমাদের গড়তে হবে এই সংস্কৃতিটা থেকেই; অন্য মালমসলা আমাদের নেই। এখনি অবিলবেই আমরা সমাজতন্ত্র গড়তে চাইছি সেই মালমসলা দিয়েই যা গতকালের পুঁজিবাদ রেখে গেছে আজকের জন্যে, তাদের দিয়ে নয় যারা তৈরি হবে হট-হাউসে, যদি অবশ্য আষাঢ়ে গল্পটায় কেউ মাততে চায়। বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞ আমাদের আছে, এবং তাছাড়া আর কিছুই নেই। অন্য কোনো ইট আমাদের নেই, যা দিয়ে গড়ব তেমন কিছু নেই। সমাজতন্ত্রের বিজয়ী হওয়া উচিত এবং আমাদের – সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের কার্যক্ষেত্রে দেখাতে হবে যে, এই ইটগুলো দিয়েই, এই মালমসলা দিয়েই আমরা সমাজতন্ত্র গড়ার ক্ষমতা রাখি, সংস্কৃতি যারা পেয়েছে নগণ্য মাত্রায় সেই প্রলেতারিয়ানদের নিয়ে এবং বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার ক্ষমতা রাখি।

আর এই মালমসলা দিয়েই যদি আপনার কমিউনিস্ট সমাজ না গড়েন, তাহলে আপনারা শুন্যগর্ভ বলিবাগীশ, বাক্যবীর।

পৃথিবীর পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এ-প্রশ্নটা রেখেছে এইভাবেই! আমরা যখন ক্ষমতা নিই, সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রটা যখন আমরা পেলাম, তখন এই দুরুহতাটা মতো-প্রত্যক্ষ হয়ে দেখা দেয় আমাদের সামনে!

ওটা কর্তব্যের আধখানা, কর্তব্যের বৃহৎ অর্ধাংশ। সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের অর্থ মেহনতীরা এমনভাবে সম্মিলিত যে, তাদের সমগ্র গণ সম্মিলন দিয়ে পুঁজিবাদকে তারা দমন করতে পারে। তাকে তারা দমন করেছেও। কিন্তু পুঁজিবাদকে দমন করলেই পেট ভরবে না। দরকার পুঁজিবাদ যে-সংস্কৃতিটা রেখে গেছে তাকে গ্রহণ করে তা দিয়ে সমাজতন্ত্র গড়া। দরকার সমস্ত বিজ্ঞান, সমস্ত টেকনিক, সমস্ত জ্ঞান ও শিল্পকলাকে গ্রহণ করা। এছাড়া আমরা কমিউনিস্ট সমাজের জীবন গড়তে পারব। আর এই বিজ্ঞান, টেকনিক, শিল্পকলা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের হাতে, বিশেষজ্ঞদের মস্তিকে।

সমস্ত ক্ষেত্রেই কর্তব্যটা হাজির হয়েছে এইভাবে – স্ববিরোধী কর্তব্য, যেমন স্ববিরোধী সমগ্র পুঁজিবাদটাই – কঠিনতম কর্তব্য, কিন্তু পালন করা সম্ভব। সেটা এইজন্যে নয় যে, বছর কুড়ি পরে আমরা অপাপবিদ্ধ কমিউনিস্ট বিশেষজ্ঞদের গড়ে তুলব, মালিন্যহীন ভৎর্সনাতীত কমিউনিস্টদের প্রথম প্রজন্ম; না, মাপ করবেন, সবকিছুই আমাদের গড়তে হবে এখনি, কুড়ি বছর পরে নয়, দু’মাসের মধ্যে, বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে, সারা পৃথিবীর বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও টেকনিকের বিরুদ্ধে যাতে লড়তে পারি। এখানে আমাদের জয়লাভ করতেই হবে। নিজেদের জনগণের চাপ দিয়ে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের আমাদের জন্যে কাজ করতে বাধ্য করা – এটা কঠিন, কিন্তু সম্ভব; আর তা যদি করি, তাহলে জয়লাভ করব।

আরো পড়ুন:  লেনিনবাদী সাহিত্যতত্ত্ব সাহিত্যের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নির্ধারণকারী লেনিনের চিন্তাধারা

কিছুদিন আগে যখন কমরেড ত্রৎস্কি[২] আমায় বলেন যে, আমাদের সমর দপ্তরে অফিসারদের সংখ্যা কয়েক অযুত, তখন আমার প্রত্যক্ষ ধারণা হয় আমাদের শত্রুদের কাজে লাগাতে পারার রহস্যটা কী: কমিউনিজমের যারা বিরোধী, কমিউনিজম নির্মাণের জন্যে কীভাবে বাধ্য করা যায় তাদের, আমাদের বিরুদ্ধে পুঁজিত যে-ইটগুলো গেঁথে রেখেছিল তাই দিয়েই কীভাবে কমিউনিজম গড়া যায়। অন্য কোনো ইট আমাদের নেই। এবং এই ইটগুলো দিয়েই, প্রলেতারিয়েতের পরিচালনায় আমাদের ইমারৎ গড়ার জন্যে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের বাধ্য করতে হবে আমাদের। কঠিন হলো এই জিনিসটা, এবং এইটেই আমাদের বিজয়ের গ্যারান্টি!

বলাই বাহুল্য, নতুন ও দুরুহ বলে এ পথে ভুল ঘটেছে কম নয়, এ পথে আমাদের কপালে কম পরাজয় ছিল না; সবাই জানেন যে, নিদিষ্ট কিছুসংখ্যক বিশেষজ্ঞ নিয়মিতভাবে আমাদের বিশ্বাসঘাতকতা করে: কল-কারখানার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, কৃষিবিদদের মধ্যে, প্রশাসনের ব্যাপারে প্রতি পদেই আমরা কাজের প্রতি কুটিল মনোভাব, কুটিল অন্তর্ঘাতের সম্মুখীন হয়েছি ও হচ্ছি।

আমরা জানি যে, এসবই খুবই দুরুহ, এবং একমাত্র বলপ্রয়োগেই তাদের পরাস্ত করা যাবে না,.. আমরা অবশ্যই বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে নই; যারা প্রলেতারীয় একনায়কত্বের বিরোধী তাদের দেখে আমরা হাসি ও বলি, এরা নির্বোধ, এরা এইটে বুঝতে অক্ষম যে, হয় প্রলেতারীয় একনায়কত্ব, নয় বুর্জোয়া একনায়কত্ব হতেই হবে। অন্য কথা যে বলে সে হয় বাতুল, নয় রাজনীতিক দিক থেকে এতই অশিক্ষিত যে, তাকে শুধু, বক্তৃতামঞ্চে নয়, সভাগৃহেও স্থান দেওয়া লজ্জার কথা। হওয়া সম্ভব কেবল হয় লিবক্লেখত[৩] ও লুক্সেমবর্গের[৪] ওপর বলপ্রয়োগ, শ্রেষ্ঠ শ্রমিক নেতাদের হত্যা, নয় শোষকদের সবলে দমন, মাঝামাঝির স্বপ্ন যে দেখে সে আমাদের সবচেয়ে অনিষ্টকর ও বিপজ্জনক শত্রু। সমস্যাটা বর্তমানে এই। তাই, যখন আমরা বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর কথা। বলি, তখন এক বছর ব্যাপী সোভিয়েত রাজনীতির শিক্ষাটা মনে রাখা উচিত; এই এক বছরে আমরা শোষকদের চূর্ণ ও পরাস্ত করেছি, আর এখন আমাদের বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর কর্তব্যটা সাধন করতে হবে। এক্ষেত্রে ফের বলি, কেবলমাত্র বলপ্রয়োগেই কিছু করা যাবে না। এক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের পরিপুরক হিসেবে, বিজয়ী বলপ্রয়োগের পরে, দরকার বিজয়ী প্রলেতারিয়েতের সংগঠনশীলতা, সুশৃংখলা, নৈতিক চাপ, সমস্ত বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের যারা নিজের অধীন করবে ও নিজের কাজে টেনে আনবে!

বলা হয়, বলপ্রয়োগের বদলে লেনিন নৈতিক প্রভাবের সুপারিশ করছেন। কিন্তু, কমিউনিস্ট সমাজ নির্মাণের ব্যাপারে নতুন বিজ্ঞান ও টেকনিক গড়ে তোলার সমস্যাটা কেবল বলপ্রয়োগেই সমাধান করা যায়, একথা কল্পনা করা নির্বুদ্ধিতা! একেবারে বাজে কথা! পার্টি হিসেবে,এই এক বছর ব্যাপী সোভিয়েত রাজের ক্রিয়াকলাপের ভিতর দিয়ে কিছুটা শিক্ষা-পাওয়া লোক হিসেবে আমরা এ মূর্খতায় পা দেব না এবং জনগণকে সে সম্পর্কে সতর্ক করে দেব। বুর্জোয়া, পুঁজিবাদী সমাজের গোটা যন্ত্রটাই কাজে লাগানো – এ কর্তব্যের জন্যে দরকার শুধু, বিজয়ী বলপ্রইয়োগই নয়, তদুপরি দরকার সংগঠন, নিয়মানুবর্তিতা, জনগণের মধ্যে কমরেডোচিত শৃঙ্খল, বাকি সমস্ত অধিবাসীদের ওপর প্রলেতারীয় প্রভাবপাতের ব্যবস্থা, নতুন এক গণ-পরিস্থিতির সৃষ্টি, যার ফলে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞ দেখবে যে, তার আর উপায় নেই, পুরন সমাজে ফেরা অসম্ভব, নিজের পেশাটা সে চালাতে পারে কেবল। কমিউনিস্টদের সঙ্গেই, – তারা তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, জনগণকে চালাচ্ছে, জনগণের একান্ত বিশ্বাসভাজন তারা, এবং সেই লক্ষ্যে তারা এগুচ্ছে যেখানে বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও টেকনিকের ফলশ্রুতি, সভ্যতার হাজার-বছরী বিকাশের ফলশ্রতি এমন কিছু মুষ্টিমেয় লোকের হস্তগত হবে না যারা তা কাজে লাগিয়ে নিজেরা বিশিষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, – তা যাবে প্রতিটি মেহনতীর আয়ত্তে।

আরো পড়ুন:  ল. ন. তলস্তয়

বিপুল একটা দুরুহ কর্তব্য, তার পরিপূর্ণ সমাধানে ব্যয় করতে হবে একাধিক দশক! আর তা সমাধান করতে হলে এমন একটা শক্তি সৃষ্টি করা দরকার, এমন শৃঙ্খলা, কমরেডোচিত শৃঙ্খলা, সোভিয়েত শৃঙ্খল,প্রলেতারীয় শৃঙ্খলা, যা প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়াদের শুধু, দৈহিকভাবেই দমন করবে না, পুরোপুরি তাদের বেষ্টন করে নেবে, নিজের অধীনস্থ করবে, আমাদের হাত ধরে এগুতে ও আমাদের কাজে লাগতে বাধ্য করবে।

ফের বলি, সামরিক সংগঠনের ব্যাপারে ও অর্থনীতিক নির্মাণের ব্যাপারে, প্রতিটি জাতীয় অর্থনীতি পরিষদ, প্রতিটি কারখানা কমিটি এবং প্রতিটি জাতীয়কৃত ফ্যাক্টরির কাজেই আমরা প্রতিদিন এই কতব্যের সম্মুখীন হচ্ছি। এমন প্রায় একটা সপ্তাহও যায় নি যখন এ বছর জনকমিসার পরিষদে কোনো-না-কোনোভাবে, কোনো-না-কোনো আকারে এ সমস্যা ওঠে নি ও আমরা তার সমাধান করি নি। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, রাশিয়ায় এমন একটি কারখানা কমিটি, এমন একটি কৃষি কমিউন, এমন একটি সোভিয়েতী খামার, এমন একটি উয়েজদ ভুমি বিভাগও পাওয়া যাবে না, যেখানে সোভিয়েত কাজ কর্মের এই এক বছরে বারম্বার এ প্রশ্ন দেখা দেয় নি।

এই হলো কর্তব্যটির দুরুহতা আর এইখানেই তার সত্যিকারের সার্থকতা। প্রলেতারীয় অভ্যুত্থানের শক্তিতে শোষকদের দমন করার পরদিনই এখন এই আমাদের করতে হবে। তাদের প্রতিরোধ আমরা চূর্ণ করেছি – সেটা করতেই হত – কিন্তু দরকার ছিল শুধু এইটুকু করাই নয়, নতুন সংগঠনের, মেহনতীদের কমরেড-সুলভ সংগঠনের জোরে দরকার আমাদের জন্যে কাজ করতে তাদের বাধ্য করা, দরকার সাবেকী কদাচার থেকে তাদের মুক্ত করা, তাদের শোষক সুলভ আচরণে প্রত্যাবর্তন ব্যাহত করা। সাবেকী বুজোয়াই তারা থেকে গেছে, বসে আছে অফিসার পদে, আমাদের ফৌজের স্টাফে, এই ইঞ্জিনিয়র আর কৃষিবিদরা – এরা সাবেকী বুর্জোয়া, নিজেদের অভিহিত করে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি বলে। নামে কিছুই এসে যায় না, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যাসে তারা আপাদমস্তক বুর্জোয়া।

কিন্তু করব কী, ভাগিয়ে দেব তাদের? লক্ষ-লক্ষ লোককে ভাগিয়ে দেওয়া যায় না! আর ভাগিয়ে যদি দিই, তাহলে নিজেরই ক্ষতি করব। পজিতন্ত্র যা সৃষ্টি করে গেছে তাছাড়া আর কিছু দিয়ে কমিউনিজম গড়ার উপায় নেই। আমাদের উচিত ভাগিয়ে দেওয়া নয়, প্রতি পদে তাদের ওপর নজর রেখে, মেরুদণ্ডহীন লোকেরা প্রতি মিনিটে যা করে সেভাবে কোনো রকম রাজনীতিক ছাড় না দিয়ে তাদের প্রতিরোধ চূর্ণ করা। সংস্কৃতিবান লোকেরা জোয়ার প্রভাব ও রাজনীতির সামনে নতিস্বীকার করে বসে, কারণ নিজেদের সমস্ত সংস্কৃতি তারা পেয়েছে বুর্জোয়া পরিস্থিতির কাছ থেকে এবং তার মাধ্যমে। সেইজন্যেই তারা প্রতি পদে হোঁচট খায় এবং প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়ার কাছে রাজনীতিক ছাড় দেয়।

যে-কমিউনিস্ট বলে যে, হাত নোংরা হবে এমন অবস্থায় পড়া উচিত নয়, নিষ্কলঙ্ক কমিউনিস্ট হাত থাকা উচিত তার, জঘন্য প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়া সমবায়ীদের কাজে না লাগিয়ে নিলক কমিউনিস্ট হাতে সে কমিউনিস্ট সমাজ গড়বে, সে শূন্যগর্ভ বলিবাগীশ, কেননা উল্টো – তাদের কাজে না লাগালেই বরং চলে না।

পুঁজিবাদ যাদের আমাদের বিরোধী করে গড়ে তুলেছে, তাদের আমাদের কাজে ফেরানো, প্রতিদিন তাদের ওপর দৃষ্টি রাখা, কমিউনিস্ট সংগঠনের পরিস্থিতিতে তাদের ওপর শ্রমিক কমিসার স্থাপন করা, প্রতিদিন তাদের প্রতিবিপ্লবী প্রবণতা ব্যর্থ করা এবং সেই সঙ্গেই তাদের কাছ থেকে শেখা – এই হলো বর্তমানে আমাদের সামনেকার ব্যবহারিক কর্তব্য।

সর্বোত্তম ক্ষেত্রে আমাদের আছে আন্দোলক প্রচারকদের বিদ্যা, কারখানার শ্রমিক অথবা বুভুক্ষ, কৃষকের দারুণ দুর্ভাগ্যে পোড়-খাওয়া মানুষের বিদ্যা – এ বিদ্যা আমাদের শিখিয়েছে দীর্ঘকাল রুখে থাকতে, সংগ্রামে একরোখা হতে, এতদিন পর্যন্ত এটা আমাদের বাঁচিয়েছে; এটা একান্তই আবশ্যক; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, শুধু, এই একটা বিদ্যাতেই বিজয়লাভ সম্ভব নয়; বিজয়কে পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত হতে হলে পুঁজিতন্ত্রের। মধ্যে যা-কিছু, মূল্যবান তা সবই নিতে হবে, আত্তীকরণ করতে হবে সমস্ত বিদ্যা ও সংস্কৃতি।

আরো পড়ুন:  সংবিধান সভা সম্বন্ধে থিসিস

সেটা নেব কোত্থেকে? শিখতে হবে ওদের কাছ থেকে, আমাদের শত্রুদের কাছ থেকে। আমাদের অগ্রণী কৃষকদের, শ্রেণীসচেতন শ্রমিকদের শিখতে হবে নিজ-নিজ কারখানায়, উয়েজদ ভূমি-বিভাগে বুর্জোয়া কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়র, প্রভৃতির কাছ থেকে, তাদের সংস্কৃতির ফলশ্রুতি আত্তীকরণ করে নেবার জন্যে।

এই দিক থেকে এ বছরে আমাদের পার্টির ভেতর যে-সংগ্রামটা দেখা দিয়েছে সেটা ছিল অসাধারণ ফলপ্রদ; তা থেকে তীব্র সংঘাত কম দেখা দেয় নি, কিন্তু তীব্র সংঘাত ছাড়া তো সংগ্রামই হয় না; তাহলেও যে-সমস্যাটা আমাদের সামনে আগে কদাচ আসে নি, অথচ যা-ছাড়া কমিউনিজম কার্যকরী করা সম্ভব নয়, সে সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি আমরা (৫)। বুর্জোয়া সংস্কৃতি, বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও টেকনিক যা এতদিন পর্যন্ত ছিল কেবল অল্প লোকের আয়ত্তাধীন, তার সঙ্গে বিজয়ী প্রলেতারীয় বিপ্লবকে কীভাবে মেলাতে। হবে, এ কর্তব্য, ফের বলি, সকঠিন। এক্ষেত্রে প্রধান কথাই হল মেহনতী জনগণের অগ্রণী স্তরের সংগঠন ও শৃঙ্খলা। রাশিয়ার যদি জর্জরিত, তমসাচ্ছন্ন, স্বাবলম্বী গঠন কর্মে একেবারেই অক্ষম, যুগ-যুগ ধরে জমিদারদের হাতে নিপীড়িত লক্ষ-লক্ষ কৃষকদের নেতা হিসেবে এবং তাদের পাশেই শহরে শ্রমিকদের এমন অগ্রণী স্তর না থাকত, যাদের তারা বোঝে, যারা তাদের কাছে অন্তরঙ্গ, যারা তাদের আস্থাভাজন, কৃষকেরা যাদের মেহনতী আপন জন হিসেবে বিশ্বাস করে, – মেহনতী জনকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো, উদ্বুদ্ধ করার মতো, সমস্ত বুর্জোয়া সংস্কৃতি আত্তীকরণ করার গুরুত্ব তাদের বুঝিয়ে প্রতীতি উৎপাদনের মতো এই সংগঠন যদি না থাকত, তাহলে কমিউনিজমের কোনো আশা থাকত ।

শ্রমিক ও লাল ফৌজী প্রতিনিধিদের পেত্রগ্রাদ সোভিয়েত থেকে

প্রকাশিত ১৯১৯ সালে পথক পুস্তিকাকারে মুদ্রিত।[৬] 

টিকা:

১. উইলসন, উড্রো (১৮৫৬-১৯২৪) – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯১৩-১৯২১ সময়ের প্রেসিডেন্ট, সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান সংগঠক।
২. ত্রতস্কি, ব্রনস্তেইন (১৮৭৯-১৯৪০) – লেনিনবাদের জঘন্যতম শত্রু।
৩. লিবনেখত, কার্ল (১৮৭১-১৯১৯) – জার্মান ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের বিখ্যাত কর্মী। জার্মানিতে ১৯১৮ সালের নভেম্বর বিপ্লবের সময় রোজা লুক্সেমবুর্গের সংগে জার্মান শ্রমিকদের বৈপ্লবিক অগ্রবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিবিপ্লবীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
৪. লুক্সেমবুর্গ, রোজা (১৮৭১-১৯১৯) – জার্মান ও পোলিশ শ্রমিক আন্দোলন এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বিখ্যাত কর্মী। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রতিবিপ্লবীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাশবিকভাবে হত্যা করে।
৫. ভ. ই. লেনিন বলতে চেয়েছেন বামপন্থী কমিউনিস্টদের সংগে পার্টির সংগ্রামের কথা। এরা আর্থনীতিক নির্মাণে, কলে কারখানায় এক ব্যক্তিক পরিচালনায়, শ্রম-শৃঙ্খলার প্রবর্তনে, আর্থনীতিক হিসাবের প্রচলনে লেনিনীয় পদ্ধতির বিরোধীতা করে। বামপন্থী কমিউনিস্টরা রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের নির্মাণ ও সমাজতন্ত্রের বিজয়ের অসম্ভাব্যতা সম্বন্ধে ত্রতস্কিপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করত।
৬. লেখক অনুপ সাদি সম্পাদিত ভি. আই. লেনিনের প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য প্রসঙ্গে, টাঙ্গন ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা ৮১-৮৬ থেকে এই লেখাটি রোদ্দুরে ডট কমে সংকলন করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!