তুরস্ক প্রজাতন্ত্র পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ অনুসারী শোষণনির্ভর এশিয়ার স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্র

তুরস্ক বা তুরস্ক প্রজাতন্ত্র (ইংরেজি: Republic of Turkey) একাধারে পশ্চিম এশীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরােপীয় অঞ্চলের পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ অনুসারী শোষণনির্ভর স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্র। এশীয় এবং ইউরােপীয় তুরস্ক (পূর্ব ফ্রাকিয়া) কৃষ্ণ সাগরের প্রণালী (বসফোরাস, মর্মর সাগর ও দার্দানেলিস) দ্বারা পরস্পরবিচ্ছিন্ন। ১৯৭৩ সালে বসফোরাসের উপর ইউরােপ ও এশিয়া সংযােজক এক ঝুলন্ত সেতু স্থাপিত হয়েছে।[১]

আজকের তুরস্ক কঠিন পরিস্থিতির মুখােমুখি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ তুরস্কের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। যদিও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির নিম্নমানের প্রেক্ষিতে উদ্বিগ্ন জনগণ গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান খুঁজছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তুরস্কের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপর নির্ভরতা খুব বেশি বেড়েছে। এবং কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অবনত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে তুরস্ক ও সােভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তুরস্কের অবিসংবাদিত নেতা কামাল আতাতুতুর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যা নতুন শতাব্দীতে ভেঙে পড়েছে।

তুরস্কের ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরব, আর্মেনীয়, কুর্দি, সিরীয় ও আনাতােলীয় তুর্কি নিয়েই গঠিত হয়েছিল তাদের সেনাবাহিনী। তবে ১৯১২-১৩ সালের দিকে ঘটে যাওয়া বলকান যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। তারা সে সময়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব করে দেখে পুরাে বাহিনীকে ঢেলে সাজানাে ছাড়া আরাে কোনাে পথ নেই। তাদের বন্ধুরাষ্ট্র জার্মানি এবার সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে সাহায্যের হাত বাড়ায়। বিখ্যাত সমরবিশারদ জেনারেল লিমান ফন স্যান্ডার্স এক্ষেত্রে তুরস্কের ত্রাণকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন। এরপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় তুর্কি বাহিনী। তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনটি আর্মির অধীনে ৩৬ ডিভিশন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধমন্ত্রী আনােয়ার পাশার নেতৃত্বাধীন তুর্কি বাহিনী নানা স্থানে ইঙ্গো-ফরাসি প্রশিক্ষিত বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। বিশেষ করে গ্যালিপলির যুদ্ধে তুর্কিদের সাফল্য ইংরেজ বাহিনীর মনে ত্রাস সৃষ্টি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সব মিলিয়ে তাদের সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ সৈন্য অংশ নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।[২]

আরো পড়ুন:  ভারত পৃথিবীর বৃহৎ নয়া উপনিবেশিক পুঁজিবাদী শোষণমূলক রাষ্ট্র

তুরস্কের অর্থনীতি

সােভিয়েত ইউনিয়ন তুরস্ককে অনেকগুলি মূল শিল্পসংস্থা নির্মাণে কৃৎকৌশলগত সহায়তা দিয়েছিল। এগুলির মধ্যে উল্লেখ্য ইজিয়ান সাগরতীরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ও তৈলশােধনাগার এবং ভূমধ্যসাগর তীরের ইস্কেনদেরানের ধাতুশিল্প কারখানা, যার উৎপাদন সামর্থ্য বার্ষিক ২০ লক্ষ টনে উন্নীত হবে।

শিল্পের মূল শাখাগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই শিল্প থেকে জাতীয় আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্জিত হচ্ছে।তুরস্কের রপ্তানিকৃত আকরিকের মধ্যে ক্রোমাইটের স্থানই প্রধান। এই দেশ তামার আকরিক, ম্যাঙ্গানিজ, যৌগ ও অন্যান্য আকরিক এবং কয়লা ও তৈল উৎপাদন করে। স্থানীয় লৌহ আকরিকের ভিত্তিতে কারাবুক লৌহ ও ইস্পাত সমাহারটি নির্মিত।

দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের সামর্থ্য মূলত রেলইঞ্জিন, রেলবগি ও জাহাজ তৈরি এবং বিমান, ট্রাক্টর ও মােটর যােজন কারখানাগুলিতেই ব্যয়িত হয়। তুরস্কে অপেক্ষাকৃত উন্নত মানের সিমেন্ট শিল্পও রয়েছে। দেশে বাৎসরিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০০ কোটি কিলােওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি ইউফ্রেতিস নদীতে কেবান জলবিদ্যুৎ স্টেশনটির নির্মাণ চলছে।

তুরস্কের অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক। এ থেকেই দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষি এখনাে পরিব্যাপ্ত চাষ (এক্সটেনসিভ) এবং আধা-সামন্তবাদী সম্পর্কে শৃঙ্খলিত। দেশের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি চাষজমি জমিদার ও জোতদারদের কুক্ষিগত। অধিকাংশ কৃষকই স্বল্প জমির মালিক অথবা ভূমিহীন এবং অত্যধিক খাজনা দিয়ে জমিদারের জমি চাষবাস করে। কৃষির উৎপাদনশীলতার মান এদেশে খুবই নিচু।

গম, বার্লি, ভুট্টা ও ধানই তুরস্কের প্রধান ফসল। দেশে বার্ষিক প্রায় ২ কোটি টন শস্য উৎপন্ন হয় এবং এতে গমের অংশভাগ থাকে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ টন। চিনি-বীট, তুলা, তামাকই প্রধান শিল্পলগ্ন ফসল। তুরস্কের পশ্চিমের সমুদ্র সংলগ্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ আঙুর, লেবুজাতীয় ফল ও অলিভ জন্মে। পূর্বাঞ্চলের বাথানে মেষপ্রজননই কৃষির প্রধান শাখা। ছাগলােম থেকে তৈরি উচ্চমানের পশম এবং অন্যান্য পশুজাত সামগ্রীর অংশবিশেষ রপ্তানি করা হয়।

ভূমিবুভুক্ষ বা ভূমিহীন কৃষক খেতমজুর ও ভাগচাষীরাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। সর্বস্বান্ত কৃষকেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে যায় এবং অসংখ্য বেকার বাহিনীর সংখ্যাবৃদ্ধি করে অথবা ইউরােপের পুঁজিবাদী দেশগুলিতে জীবিকার্জনের জন্য আশ্রয় খুঁজে।

আরো পড়ুন:  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হলো পাশ্চাত্যের দ্বারা নিপীড়িত অঞ্চল

তথ্যসূত্র:

১. কনস্তানতিন স্পিদচেঙ্কো, অনুবাদ: দ্বিজেন শর্মা: বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূগোল, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, বাংলা অনুবাদ ১৯৮২, পৃ: ১৪০-১৪১।
২. মো. আদনান আরিফ সালিম, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, [Pdf]. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জানুয়ারি ২০১৯. সানজিদা মুস্তাফিজ ও সুমা কর্মকার. সম্পা. পৃষ্ঠা ৩৫; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Leave a Comment

error: Content is protected !!