আমাদের সংবাদপত্রগুলির চরিত্র

বড় বেশি জায়গা দেওয়া হচ্ছে সাবেকী বিষয়বস্তু নিয়ে রাজনীতিক আলোড়নের জন্যে — রাজনীতিক-চমকপ্রদ উচ্চরবের জন্যে, আর নতুন জীবন গড়ার বিষয়ে, সে সম্বন্ধে তথ্যাদির জন্যে জায়গা দেওয়া হচ্ছে বড্ড কম।

কেন, বুর্জোয়াদের পা-চাটা মেনশেভিকদের জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা, পুঁজির পবিত্র অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে ইং-জাপানী আক্রমণ অভিযান, জার্মানির বিরুদ্ধে নখ-দন্তবিকাশ করছে মার্কিন বহু কোটিপতিরা, ইত্যাদি, ইত্যাদি সহজ-সরল, সাধারণ্যে জ্ঞাত, স্পষ্ট প্রসঙ্গ, যেগুলো সম্বন্ধে লোকে ইতিমধ্যে একরকম ওয়াকিবহাল, এমনসব বিষয়ে ২০০-৪০০ লাইন রচনা করার বদলে আমরা বিশ কিংবা এমনকি দশ লাইনই লিখি নে কেন? এইসব জিনিস সম্বন্ধে আমরা নিশ্চয়ই লিখব এবং এক্ষেত্রের প্রত্যেকটা নতুন তথ্যের উল্লেখ করব, কিন্তু আমাদের লম্বা-লম্বা প্রবন্ধ লেখার এবং পুরনো যুক্তিতর্কের পুনরাবৃত্তি করার দরকার নেই; পুরনো, জ্ঞাত, ইতিমধ্যে মূল্যায়ন-করা রাজনীতির সর্বসাম্প্রতিক অভিব্যক্তিকে মাত্র কয়েক লাইনে, ‘টেলিগ্রাফিক কায়দায়’ ধিক্কার দেওয়াই দরকার।

‘আহা, সেই কতই সুখের বুর্জোয়া আমলে’ বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকাগুলো ব্যক্তিগত-মালিকানাধীন কল-কারখানাগুলোয়, ব্যক্তিগত কারবারগুলোয় অবস্থা সম্বন্ধে – সেই ‘পরম পবিত্র বস্তু’ সম্বন্ধে – কখনও উল্লেখ করে নি। বুর্জোয়াদের স্বার্থের সঙ্গে এই রেওয়াজটা মানানসই ছিল। তার থেকে আমাদের একেবারে মূলগতভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে আসতে হবে। আমরা তার থেকে বিচ্ছিন্ন হই নি। পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটছে যে-সমাজের সেখানে যেমনটা হওয়া উচিত তেমনভাবে আমাদের সংবাদপত্রের ধরন এযাবত বদলায় নি।

রাজনীতি সম্বন্ধে একটু কম হোক। রাজনীতি পুরোপুরি ‘বিশদ করা হয়েছে’ এবং সেটাকে দুই শিবিরের মধ্যে সংগ্রামে পরিণত করা হয়েছে: বিদ্রোহী প্রলেতারিয়েত এবং মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি দাস-মালিক (গোটা দঙ্গল সমেত, একেবারে মেনশেভিক এবং অন্যান্যেরা অবধি)। এই রাজনীতি সম্বন্ধে আমরা বলতে পারি, এবং আমি আবার বলছি, আমাদের অবশ্যই বলতে হবে খুবই সংক্ষেপে।

অর্থনীতি সম্বন্ধে আরও বেশি হোক। তবে, সেটা সাধারণ আলোচনা, বিদগ্ধ পর্যালোচনা, বুদ্ধিকুশল পরিকল্পনা আর অনুরূপ বাজে আলাপের অর্থে নয়, কেননা আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি, সেগুলো সবই খুব ঘনঘনই নিছক বাজে আলাপ, তার বেশি কিছু নয়। অর্থনীতি বলতে বুঝাতে চাইছি, নতুন জীবনের বাস্তব সংগঠন সম্বন্ধে তথ্যাদি জড় করা, সেগুলোকে সযত্নে যাচাই করা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করা। নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড়-বড় কল-কারখানা, কৃষি কমিউন, গরিব কৃষক কমিটি[১] এবং স্থানীয় আর্থনীতিক পরিষদগুলির বিভিন্ন সত্যিকারের সাফল্য অর্জিত হয়েছে কি? এইসব সাফল্য ঠিক কী? সেগুলিকে যাচাই করা হয়েছে কি? সেগুলো নয় কি গালগল্প, বড়াই, বুদ্ধিকুশল প্রতিশ্রুতি (‘সবকিছু নড়ে উঠেছে’, ‘পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়ে গেছে’, ‘আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করছি’, ‘এখন আমরা জোর করে বলতে পারি’, ‘উন্নতি হয়েছে সন্দেহাতীত’ এবং অন্যান্য ফাঁকা বুলি, যাতে ‘আমরা’ এত ওস্তাদ)? সাফল্যগুলি অর্জিত হয়েছে কীভাবে? সেগুলিকে সম্প্রসারিত করার জন্যে কী করা চাই?

আরো পড়ুন:  গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশ এবং যাদুকরী প্রচারমাধ্যমের বিরামহীন মিথ্যাচার

যেসব পিছিয়ে-পড়া কল-কারখানা রাষ্ট্রীয়করণের পর থেকে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, ময়লা, গুণ্ডামি আর পরজীবিতার আদর্শস্বরূপ হয়ে রয়েছে সেগুলোর নামের দাগী তালিকা কই? তা কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু, এমনসব কল-কারখানা তো রয়েছে। এইসব ‘পুঁজিবাদী ঐতিহ্যের তত্ত্বাবধায়কদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ না-চালালে আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারব না। এমনসব কল-কারখানাকে আমরা যতকাল বরদাস্ত করব ততকাল আমরা হয়ে থাকব জড়ভরত – কমিউনিস্ট নয়। সংবাদপত্রে শ্রেণিসংগ্রাম বুর্জোয়ারা যেমন দক্ষতার সঙ্গে চালাত তেমনটা আমরা শিখি নি। মনে করুন কী দক্ষতার সঙ্গে তারা পত্রপত্রিকায় তাড়া করত তাদের শ্রেণি-শত্রুদের, এদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত, অপদস্থ করত, ঝেটিয়ে ফেলার চেষ্টা করত। আর আমরা? অল্পকিছু, লোক, শ্রমিকদের কোনো-কোনো বর্গ আর অংশ একগুঁয়ে হয়ে পুঁজিবাদী রীত-রেওয়াজ আঁকড়ে ধরে আছে, সোভিয়েত রাষ্ট্রকে তারা গণ্য করে চলেছে সেই পুরনো ধাঁচেই: তারা কাজ করে যথাসম্ভব কম আর খারাপ, আর রাষ্ট্রের কাছ থেকে পয়সা হাতিয়ে নেয় যত বেশি সম্ভব, — পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যুগে শ্রেণিসংগ্রাম কি তাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ নিরাপদ করার রূপধারণ করে না। এমনকি সোভিয়েত ছাপাখানাগুলির কম্পোজিটরদের মধ্যে, সোরমভো আর পুতিলভ, ইত্যাদি কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে এমন বহু, পাজি-বদমাশ নেই কি? আমরা তাদের ক’জনকে বের করেছি, ক’জনের মুখোশ খুলে ধরেছি, মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছি তাদের ক’জনের?

পত্র-পত্রিকাগুলি চুপচাপ। তারা বিষয়টার আদৌ উল্লেখ করলেও তা করে মামুলি, সরকারী কায়দায়, — বৈপ্লবিক পত্র-পত্রিকার ধাঁচে নয়, যে শ্রেণি তার কাজ দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পুঁজিপতিদের আর পুঁজিবাদী রীত-রেওয়াজের জিম্মাদার পরজীবীদের প্রতিরোধ চূর্ণ করা হবে কঠোরহস্তে, তার একনায়কত্বের মুখপত্রের ধাঁচে নয়।

যুদ্ধের ব্যাপারেও সেই একই। কাপুরুষ কিংবা অপটু অফিসারদের আমরা হয়রান করি কি? যথার্থই খারাপ রেজিমেন্টগুলোকে আমরা সারা রাশিয়ার সামনে ধিক্কত করেছি কি? যেসব খারাপ লোককে অনুপযোগিতা, অসতর্কতা, গড়িমসি, ইত্যাদির জন্যে সবচেয়ে বেশি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ফৌজ থেকে অপসারিত করা উচিত, তাদের আমরা ‘ধরেছি’ কি যথেষ্ট সংখ্যায়? বিশেষ-নির্দিষ্ট অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে আমরা এখনও কার্যকর, নির্মম, যথার্থ বৈপ্লবিক যুদ্ধ চালাচ্ছি নে। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্র থেকে নেওয়া জীবন্ত, মূর্ত-নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত আর আদর্শ তুলে ধরে মানুষকে শিক্ষাদীক্ষা দেবার কাজ আমরা করি সামান্যই – যদিও, পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উত্তরণের সময়ে সেটাই পত্র-পত্রিকার প্রধান কাজ। কল-কারখানার ভিতরে, গ্রামে-গ্রামে, রেজিমেন্টগুলোতে দৈনন্দিন জীবনের যে-দিকটায় অন্য যে কোনো ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি মাত্রায় গড়ে তোলা হচ্ছে নতুনকে, যেখানে যা খারাপ সে-সম্বন্ধে মনোযোগ, প্রচার, প্রকাশ্য সমালোচনা, ধিক্কার এবং যা ভাল তার থেকে শিখবার জন্যে আহ্বানের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেদিকে আমরা মনোযোগ দিই সামান্যই।

আরো পড়ুন:  Democracy and the Press Media

রাজনীতিক-চমকপ্রদ উচ্চরব একটু কম হোক। পণ্ডিতী ঢঙের আলোচনা আরও কম। বাস্তব জীবনের আরও কাছাকাছি। শ্রমিক আর কৃষকেরা তাদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে কীভাবে বাস্তবিক গড়ে তুলছে নতুনকে, সেদিকে আরও মনোযোগ, আর নতুনটা কী পরিমাণে কমিউনিস্ট ধরনের সেটা নির্ধারণের জন্যে আরও বেশি যাচাই।

২০২ নং ‘প্রাভদা’, ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯১৮

স্বাক্ষর: ন, লেনিন[২]

টিকা:

১. গরিব কৃষক কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয় সারা-রুশ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ১৯১৮ সালের ১১ জুনের ডিক্রি অনুসারে। কৃষক জোতগুলির খাদ্য ভাণ্ডারের হিসাব, কুলাকদের মজুদ ও উদ্বৃত্ত খাদ্য আবিষ্কার এবং সে উদ্বৃত্ত আদায়ে সোভিয়েত খাদ্য সংস্থাগুলিকে সাহায্য করার ভার দেওয়া হয় এদের ওপর। কুলাক জোত থেকে আদায় করে গরিব কৃষকদের খাদ্য জোগান, বীজ বপন ও ফসল তোলার ব্যাপক কাজকর্ম, বীজ রক্ষা ইত্যাদির ভারও তারা পায়। গরিব কৃষক কমিটিগুলি হয়ে ওঠে গ্রামে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র ও সংস্থা, এগুলোর সংগঠন গ্রামেও নিয়ে আসে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জোয়ার। ১৯১৮ সালের শরৎ নাগাদ কমিটিগুলি তাদের উপর ন্যস্ত কর্তব্য সম্পাদন করে; পরে এদের ভোলস্ত ও গ্রামীণ সোভিয়েতসমূহের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়।

২. লেখক অনুপ সাদি সম্পাদিত ভি. আই. লেনিনের প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য প্রসঙ্গে, টাঙ্গন ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা ৭৮-৮০ থেকে এই লেখাটি রোদ্দুরে ডট কমে সংকলন করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!