পশ্চিম এশিয়া সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত অঞ্চল

পশ্চিম এশিয়া (Western Asia) বলতে এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত অঞ্চল। পশ্চিম এশীয় দেশগুলিকে প্রায়ই নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের দেশ বলা হয়। এলাকাটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও এর জনসংখ্যা পূর্বোক্ত অঞ্চলগলির এক-চতুর্থাংশ মাত্র। পশ্চিম এশিয়া বলতে এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি অঞ্চলকে বোঝায়। পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। পশ্চিম এশিয়াতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ মিশর অন্তর্ভুক্ত নয়। মিসর দেশটিকে উত্তর আফ্রিকার অংশ ধরা হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য-বহির্ভূত ককেসাস অঞ্চলটিকেও পশ্চিম এশিয়ার অন্তর্গত করা হয়।

বহু শতাব্দী আগে ভূমধ্যসাগর ও লােহিত সাগরলগ্ন অঞ্চলে প্রাচীনকালের অত্যুন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে। পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকার জনগণ নিবিড় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে পরস্পর ঘনিষ্ঠ ছিল।

সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের ফলে ঔপনিবেশিকরা এই অঞ্চলের বহু দেশ ও জাতির উপর সবলে নিজেদের শাসন আরােপ করে। এই শতকের গােড়ার দিকে বিশ্বের এই অঞ্চলে মাত্র তিনটি স্বাধীন রাজতন্ত্র টিকে ছিল। এগুলি হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায় আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক।

পশ্চিম এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ সর্বদাই সাম্রাজ্যবাদীদের আকৃষ্ট করেছে। এখানকার সর্বাধিক মূল্যবান আকরিক ভাণ্ডার হলো অতিসমৃদ্ধ তৈল ও গ্যাস খনি। পুঁজিবাদী বিশ্বের মােট তৈলের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত। এই অঞ্চলের বার্ষিক তৈলােৎপাদন ১০০ কোটি টন অতিক্রম করে গেছে। এই তৈলক্ষেত্রগুলিকে ক্ষতিকরভাবে ব্যবহার করে পশ্চিমা একচেটিয়ারা কোটি কোটি ডলার মুনাফা লুটেছিল।

ভৌগােলিক অবস্থানগত সুবিধা পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান বাদে এদের সকলেরই ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণ সাগর, লােহিত সাগর বা আরব সাগরলগ্ন সীমান্ত থাকায় তারা বিশ্বের সমদ্রপথগুলির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এগুলির মধ্যে জিব্রাল্টার, সুয়েজ ও এডেন সংযােজক ভূমধ্যসাগরীয় পথটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্বের এই স্ট্রাটেজিক অঞ্চলে তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সবকিছু করা সত্ত্বেও আরব জনগণের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রচণ্ড আলােড়নের মুখে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হচ্ছে। প্রাক্তন ফরাসী উপনিবেশ সিরিয়া ও লেবানন ১৯৪৩ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ফ্যাসিবাদী ইতালীর পরাজয় ঘটলে লিবিয়া ১৯৫১ সালে স্বাধীনতা পায়। ১৯৫৬ সালে সুসদান, মরােক্কো ও তিউনিসিয়া স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। ১৯৬০ সালে সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র এবং ১৯৬১ সালে কুয়েত সদ্যস্বাধীন দেশগুলির অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬২ সালে আলজিরিয়া জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়। ১৯৬৭ সালের শেষ নাগাদ ইয়েমেন জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কাতার ও বাহরাইন ১৯৭১ সালে এবং শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বাধীনতা লাভ করে।

আরো পড়ুন:  আরব লিগ আরবের দেশ নিয়ে গঠিত পুঁজিবাদের সেবাকারী সংগঠন

পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ দেশই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পতন-উদ্ভূত নবীন জাতীয় রাষ্ট্র। কিন্তু এসব দেশে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অবশিষ্ট এখনাে টিকে আছে এবং সেখানকার জনগণ মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে।

তীব্রতর শ্রেণিসংগ্রামের পরিস্থিতিতে এই দেশগুলি পূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথসন্ধান করছে। এগুলির কোনো কোনটিতে সাম্রাজ্যবাদপন্থীরা প্রাধান্য পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রগতিশীল সরকারগুলিকে উৎখাতের জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা আরব দেশগুলির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলা সমর্থন করছে। দখলীকৃত আরবভূমি থেকে সমস্ত ইসরায়েলী সৈন্য প্রত্যাহার এবং নিজ রাষ্ট্র গঠনে পালেস্টাইন আরব জনগণের ন্যায্য জাতীয় অধিকারের দাবি সারা দুনিয়ার জনগণের সমর্থন পেয়েছে।

সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি আরব জাতির আইনসঙ্গত অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়ারশ চুক্তিবদ্ধ দেশগুলির রাজনৈতিক পরামর্শ কমিটির ঘােষণায় বলা হয়েছে: ‘কমিটির অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী সমাজতান্ত্রিক সবকটি দেশ আগ্রাসনমলক সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে, ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি, স্বাধীন বিকাশ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রগতির জন্য আরব জনগণের সংগ্রামকে অটল সমর্থন দিচ্ছে।’

আফগানিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, সাইপ্রাস, তিউনিসিয়া, মরােক্কো ও অঞ্চলটির অন্যান্য দেশ সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করছে এবং কোন সামরিক জোটভুক্ত হচ্ছে না।

গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তান, সিরিয়া, আরব প্রজাতন্ত্র, ইয়েমেন জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, আলজিরিয়া জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র সামন্তবাদ উৎখাতের জন্য ব্যাপক সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনের সঙ্গে একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও নব্য ঔপনিবেশিকতা অবদমনেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতিগত বহুবিধ অভিন্নতা সত্ত্বেও এদের কোন কোন দল আবার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যেও সুচিহ্নিত।

তথ্যসূত্র:

১. কনস্তানতিন স্পিদচেঙ্কো, অনুবাদ: দ্বিজেন শর্মা: বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূগোল, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, বাংলা অনুবাদ ১৯৮২, পৃ: ১৩৪-১৩৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!