আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাক্ষাতকার > আমি নতি স্বীকার করিনা — ঋত্বিক ঘটক

আমি নতি স্বীকার করিনা — ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক ঘটকের সাক্ষাতকার

সাপ্তাহিক চিত্রালী, ২৭ জুলাই ১৯৭৩, চিত্রালী প্রতিনিধি

যুগের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার শ্রী ঋত্বিক কুমার ঘটক এখন ঢাকায়। মার্কসীয় দর্শনে আলোকিত তার মন, চলচ্চিত্রের সাধনায় নিবেদিত তার জীবন। ভারতের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের তিনি একজন পুরোধা ব্যক্তি। পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। অর্থহীন চটুল প্রমোদ ছবি এবং গিমিক্স-এর গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে না দিয়ে যারা চলচ্চিত্রের ভাষায় জীবনের ছবি পর্দায় তুলে ধরার অভিলাষী শ্রী ঋত্বিক ঘটক তাদেরই একজন। বস্তুত স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যে কয়জন মুষ্টিমেয় জীবনবাদী চলচ্চিত্রকারের সাধনায় বাংলা ছবি আজ গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত, তাদের প্রথম সারিতে নির্দিষ্ট রয়েছে তার স্থান। তার প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন পদ্মশ্রী ভূষণ।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তাঁর ছবি মুক্তি পেয়েছে মাত্র একটি — ‘মেঘে ঢাকা তারা’। এবং এই একটি ছবির মাধ্যমেই এদেশে বেশ কিছু সংখ্যক ভক্ত সৃষ্টি হয়েছে তাঁর। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অদ্বৈত মল্ল বর্মণের কাহিনী অবলম্বনে চিত্রায়িত করছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ছবিটির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। এ ছবি সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য শোনার জন্য গত সপ্তাহে তাঁর সাথে দেখা করেছিলাম।

হোটেল গ্রীনে বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন। তাঁর রুমে গিয়ে দেখতে পেলাম একটা লুঙ্গি পরে খালি গায়ে বসে আছেন তিনি। আমরা যাওয়ার পর একটা বিছানার চাদর টেনে তিনি গায়ে জড়ালেন। বসতে বললেন। চা এলো। চা খেতে খেতে আমাদের আলোচনা শুরু হলো।

… বলুন কি জানতে চান? প্রথমে প্রশ্ন করলেন ঋত্বিক বাবু নিজেই। “আপনার ছবি সম্পর্কে কিছু জানতে এসেছি।” বললাম আমি। “ছবির কাটিং, এডিটিং ও ডাবিং প্রায় শেষ। রি-রেকর্ডিং শেষ হয়নি এখনো।” বললেন ঋত্বিক বাবু।

… এ ছবিতে কি বক্তব্য আপনি তুলে ধরতে চাইছেন? আমরা প্রশ্ন করলাম। উত্তর দিতে গিয়ে ঋত্বিক বাবু ছবির কাহিনী মোটামুটি সংক্ষেপে ব্যক্ত করলেন:

তিতাস এবং তিতাসের তীরবর্তী একটি জেলে গ্রামের পটভূমিতে গড়ে উঠেছে এ ছবির কাহিনী। তিতাস একটি বহমান নদী। তার তীরবর্তী গ্রামের জেলেদের ভাগ্য তিতাসের সঙ্গে জড়িত। তিতাসকে কেন্দ্র করেই তার তীরে গড়ে উঠেছে একটা সভ্যতা, একটা সংস্কৃতি। ধীরে ধীরে সে তিতাস একদিন শীর্ণ হয়ে গেলো। জেলেদের জীবনে নেমে আসলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়। তিতাসের তীরে গড়ে উঠেছিলো যে সভ্যতা, নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেটাও ক্রমশঃ বিলুপ্ত হয়ে যেতে লাগলো। নদী শুকাচ্ছে। চর জেগে উঠেছে। সেই চরের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পুঁজিপতি ভূস্বামীদের। তারা এ চক্রান্ত করে জেলেদের সেখান থেকে উৎখাত করে সে চর দখল করার জন্যে। কিন্তু ১ ভাগ্য বিপর্যয় দেখা দিলেও জেলেদের ঐক্য অটুট। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মহাজনেরা ১ নতুন ফন্দি বের করে। জেলেদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে হলে তাদেরকে র্নীতিপরায়ণ করে তুলতে হবে, মহাজনরা তাই যথাচিতভাবে টাকা ছড়ায়। টাকা দিয়ে ডিঙ্গি ভাসিয়ে বহুদূরে জেলেরা মাছ ধরতে যায়। তারা এখন বাবুদের গুণগানও গায়। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরে। একে একে সবাই গ্রাম ছেড়ে দূরে বহু দূরে চলে যায়। তিতাস মরে যাওয়ার সাথে সাথে তার তীরবর্তী গ্রামের সভ্যতাও একদিন নিশ্চিহ্ন হয়। কিন্তু সভ্যতা কি সত্যি নিশ্চিহ্ন হয়? সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয় না। তার রূপান্তর ঘটে। ছবিতে এ বক্তব্যকে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে মৃত তিতাসের। বুকে যে চর গজিয়ে উঠেছে তাতে জেগে উঠেছে সবুজ ঘাসের ক্ষেত। একটা উলঙ্গ শিশু হেঁটে যাচ্ছে তার বুক চিরে । সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয় না— তার রূপান্তর ঘটে, এ দৃশ্যের মাধ্যমেই তার ইঙ্গিত ফুটে উঠবে।

আরো পড়ুন:  আমরা সর্বত্রই দেখতে পাচ্ছি অর্থের দাপট --- খোন্দকার আশরাফ হোসেন

… এ কাহিনী আপনাকে আকৃষ্ট করলো কেন ? আবার প্রশ্ন রাখলাম।

উত্তরে ঋত্বিক বাবু জানালেন কাহিনীর সততা ও আন্তরিকতা তাকে এর প্রতি আকষ্ট করেছে। কাহিনীকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন জেলে পরিবারেরই ছেলে। তবে জেলে পরিবারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও তিনি বি.এ. পাশ করেছিলেন। তিনি সাংবাদিকতা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সাতচল্লিশ-আটচল্লিশের দিকে তিনি কলকাতার এক খালাসী পাড়ায় থাকতেন। সে সময় কলকাতার আশেপাশে জেলেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিলো।[১] এত মর্মান্তিক বিপর্যয় যে তাদের অন্ন সংস্থানের সুযোগও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। নিজে জেলে পরিবারের ছেলে… তাই জেলেদের দুঃখে কেঁদে উঠেছিলো তার মন। তাদেরকে সাহায্য করার জন্য অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিন চারটে চাকরি শুরু করলেন। যা রোজগার করতেন তা সবই বিলিয়ে দিতেন জেলেদের মাঝে। শেষে তার এক বন্ধু তাকে পরামর্শ দিলেন এভাবে কোনো সাহায্য করা হবে না। তার চেয়ে বরং বই লেখ। বই লিখে টাকা বেশি পাবে সেটা জেলেদের মাঝে বিলিয়ে দিও। বন্ধুর পরামর্শ মনঃপূত হলো তার। জেলে জীবনের কাহিনী নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৫৬)। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর লেখার কাজ শেষ হলো।
কিন্তু সে পাণ্ডুলিপি নিয়ে যেদিন তিনি প্রকাশকের কাছে যাচ্ছেন সেদিন মনের ভুলে সেটা দোতলা বাসে রেখে দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লেন। এত দিনের পরিশ্রম সবই বৃথা হয়ে গেল। তবে কাজ ছাড়লেন না। তিনি আবার নতুন করে লিখতে লাগলেন সে কাহিনী। এ যে কত দরূহ কাজ সেটা যারা লেখেন তারা অনুভব করতে পারবেন।
যাই হোক দীর্ঘ দিনের পরিশ্রমে দ্বিতীয় বারের লেখাও সমাপ্ত করলেন তিনি। বইটি প্রকাশকের কাছে দেবার পরই আক্রান্ত হলেন যক্ষ্মায়। ব্যারাকপুরের এক ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো তাকে। তবে শেষ পর্যন্ত বইটি তিনি দেখে যেতে পারেন নি। বই প্রকাশিত হবার পূর্বেই তিনি দেহত্যাগ করেন। বইটি প্রকাশিত হবার পর প্রচণ্ড সাড়া পড়ে।
আমি এ কাহিনী পড়ে একেবারে অভিভূত হয়ে যাই এবং তখনই স্থির করি যে, বইটি নিয়ে ছবি করবো। ঋত্বিক বাবু বলেন, জেলে জীবনের কাহিনী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও লিখেছেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। সে কাহিনীও অনবদ্য। তবে অদ্বৈত মল্লবর্মণের কাহিনী তার চেয়েও বেশী সততা, বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতাপূর্ণ। জেলে জীবনকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেন ‘বাবুর চক’ থেকে। আর অদ্বৈত মল্লবর্মণ দেখেছেন একেবারে ভেতর থেকে। কাহিনীর এই সততা এবং আন্তরিকতাই আমাকে এর প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

আরো পড়ুন:  একুশ একটি জনবিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান, সাক্ষাতকারে আহমদ রফিক

তিনি আরও বলেন, কোলকাতার আশেপাশে জেলে গ্রাম এবং নদীগুলোকে আমার কাছে ঠিক এ-কাহিনী চিত্রায়ণের জন্য উপযুক্ত পটভূমি বলে মনে হয়নি। তাই এতদিন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এর চলচ্চিত্রায়ণ থেকে বিরত ছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশে এ ছবি করবো। আজ সুযোগ পেয়েছি। তাই তার সদ্ব্যবহার করেছি।

আমাদের আলোচনার মাঝখানে চিত্রালীর আলোকচিত্র শিল্পী মনোয়ার আহমদ ক্যামেরা নিয়ে তার কক্ষে ঢুকলেন। ঋত্বিক বাবুর একটা ছবি তোলার দায়িত্ব তার ।। যতক্ষণ ঋত্বিক বাবু কথা বলছিলেন ততক্ষণ তিনি চুপচাপ বসেছিলেন । কথা শেষ করতেই বললেন, ‘দাদা একটা ছবি নেব আপনার’। ঋত্বিক বাবু বললেন ‘তা নিতে পারেন। তবে এ অবস্থাতেই। একটা আধময়লা পাঞ্জাবি আছে। যদি বলেন তবে সেটা পরতে পারি। নইলে এ চাদর গায়েই । কোন রকম গ্লামারাইজ করতে চেষ্টা করবেন না যেন’। মনোয়ার বললেন, ‘বেশ তাই হবে’। বিছানার চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থাতেই মনোয়ার আহমদ ঋত্বিক বাবুর ছবি তুললেন কয়েকটা। মনোয়ার আহমদের কাজ শেষ হলো। আরেক প্রস্ত চা এলো । আমরা আবার আলোচনায় ফিরে গেলাম।

… এ ছবি করতে গিয়ে আপনাকে কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছি কি? প্রশ্ন করলাম তাকে।

উত্তরে ঋত্বিক বাবু জানালেন, ‘আর সবাইকে যে সকল সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় আমাকেও তাই করতে হয়েছে। আমার ছবিতে ইনডোরের কাজ নাই। তাই সেই সংক্রান্ত ঝামেলা আমাকে পোহাতে হয়নি। তবে শিল্পীর ডেট, যন্ত্রপাতি—এসব অংক করার ঝামেলা পোহাতে হয়েছে’। ঋত্বিক বাবু আরও জানালেন ‘অবশ্য এটি স্বাভাবিকই। কারণ এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের এখন যা অবস্থা তাতে যে এদেশে ছবি তৈরি হচ্ছে—সেটাই তো বেশি’। তিনি বললেন ‘স্যুটিং করার খরচাপাতির ব্যাপারে কোন সমস্যা আমাকে পোহাতে হয়নি। ছবির প্রযোজকরা আমার চাহিদানুযায়ী সব কিছু যোগাড় করে দিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি কোলকাতায় আমি ছবি তৈরি করছি প্রায় সাতাশ বছর ধরে। তবে এরকম উদ্যোগী প্রযোজকের দেখা সেখানে বড় একটা পাইনি।’

এ ছবিতে বাংলাদেশের শিল্পী ও কুশলীদের নিয়ে আপনি কাজ করেছেন। তাদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

কোলকাতার শিল্পী ও কুশলীদের চেয়ে বাংলাদেশের শিল্পী ও কুশলীদের গুণগত মান কোনো অংশেই খারাপ নয়। ভাঙ্গা যন্ত্রপাতি নিয়ে এখানকার কুশলীরা যা করছেন তা বলতে গেলে একটা মিরাকল। শিল্পীদেরকেও লক্ষ করে দেখেছি যে, জানার জন্য, শেখার জন্য তারা ব্যাকুল। খাটতে তারা প্রাণপণ প্রস্তুত। তবে বাজারী ছবির চাহিদা মেটাতে গিয়ে তাদের কান্না, হাসি, কথা বলার ঢং ইত্যাদি একটা বিশেষ সুরে বাঁধা হয়ে গেছে। তবে এর জন্য সবটুকু দোষ তাদেরকে দেয়া যায় না। এখানকার শিল্পীরা অভিনয় করতে জানেন না এটা আমি স্বীকার করি না। শিল্পীদের দোষ না দিয়ে কর্তা ব্যক্তিদের। উচিত তাদের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং কি করতে হবে সেটা বলে দেওয়া। তবে আমার মনে হয় ভুলত্রুটি দেখার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা খুব বেশি একটা নেই।

আরো পড়ুন:  মার্কসবাদের একটা বৃহত্তর আখ্যান দরকার যা পুঁজিবাদকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে --- অরুণ গুপ্ত

.. আপনি কি আপনার ছবির কুশলী ও শিল্পীদের স্বাধীনতা দেন? আবার প্রশ্ন রাখলাম তার কাছে।

… স্বাধীনতা দেয়ার কথা উঠে তখন, যখন কারও কাজের প্রতি আমি আস্থাবান হতে পারি। শুধু আমার বেলায় নয়, সব পরিচালকের বেলাতেই একথা প্রযোজ্য। আমার কি প্রয়োজন সেটা আমি শিল্পীদের কাছে ব্যাখ্যা করি, বুঝিয়ে দেই। যদি দেখি এর পর তাঁরা ঠিক আমাকে অনুকরণ করেছেন তাহলে তাদেরকে আমি আবার সতর্ক করে দিই। কারণ আমাকে অনুকরণ করলে তো আর সেটা শিল্পীর অভিনয় হলো না। আমার অভিনয় হলো। তাতে স্বাভাবিকতা ক্ষুন্ন হয়। আমি অভিনয়ে স্বাভাবিকতার পক্ষপাতী।

… ছবি করার ব্যাপারে আপনি কি কখনো কোনো কম্প্রোমাইজ করেছেন বা করেন? আমার প্রশ্ন।

.. আপনি যে কথাটা বলেছেন সেটা কম্প্রোমাইজ নয়। সারেন্ডার। না, আজ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছে ছাড়া অন্য কোনো দাবির কাছে আমি নতি স্বীকার করিনি। আমার যা ভালো লাগে আমি তাই করি । আমি বিশ্বাস করি আমার ভাল লাগাটাই আর দশজনের কাছেও ভালো লাগবে। কারণ আমি শিল্পী। সমাজের আর দশ জনের মন ও দৃষ্টি নিয়ে আমি সবকিছু প্রত্যক্ষ করি। যদি আমার ভালো লাগাটা আর দশজনের কাছে ভালো না লাগে তাহলে আমি শিল্পী নামের যোগ্য হতে পারি না।

এ প্রসঙ্গে ঋত্বিক বাবু আরও বলেন, ছবি যাতে বাজার পেতে পারে সেজন্য অনেকে ছবিতে বিশেষ একটি কায়দায় সেন্টিমেন্ট প্রয়োগ করেন। সেই ‘সেন্টিমেন্ট’ ফুটিয়ে তোলার জন্য শিল্পীদেরকে বিশেষ রকমভাবে ‘মুড’ আনতে হয়, বিশেষ এক ভঙ্গিতে অভিনয় করতে হয়। আমি এই প্রয়োগকৃত বাজারী সেন্টিমেন্টে বিশ্বাস নই। আমার বিশ্বাস মানুষের গভীরতম উপলব্ধি, অনুভূতি, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদিকে অলঙ্কার পরিয়ে উপস্থাপিত করার প্রয়োজন হয় না। এ সবের স্বাভাবিক প্রকাশই মানুষের মনকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও দর্শকদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে বলে আমি আশা রাখি।[২]

টিকা:

১. এই জেলেদের অধিকাংশই ছিল সম্ভবত উদ্বাস্তু । তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের। ভূমিকায় লেখা হয়েছে: তিতাস পারের অনেক মালাে পরিবার উদ্বাস্তু হইয়া পশ্চিমবঙ্গে আসিয়াছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে অদ্বৈত কলিকাতার বাহিরে গিয়া তাহাদের দেখিয়া আসেন,— তাহাদের যৎসামান্য সুবিধার জন্য ‘দেশ’-এর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বভারতী’-তে কাজ জুটাইয়া লন, আর দুই কাজের পারিশ্রমিক হইতে নিজের শাকানুমাত্রের বন্দোবস্ত রাখিয়া বাকি সব তাহাদের মধ্যে বিলাইয়া দেন।
২. রোদ্দুরেতে প্রকাশের জন্য লেখাটি নেয়া হয়েছে সাজেদুল আউয়াল সম্পাদিতঃ ঋত্বিকমঙ্গল, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ২০০১, পৃষ্ঠা, ৩১-৩৫ থেকে।

ঋত্বিক ঘটক
ঋত্বিক ঘটক (জন্ম : ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ - মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page