আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনশৈলি > বনসাই বানানোর সঠিক পদ্ধতি, গাছ নির্বাচন এবং পরিচর্যা

বনসাই বানানোর সঠিক পদ্ধতি, গাছ নির্বাচন এবং পরিচর্যা

বনসাই

বনসাই (Bonsai) জাপানীরা দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন গাছকে বামন বা বেঁটে তৈরী করে সুন্দর এক শিল্পকলা প্রদর্শনের নিদর্শন রেখেছেন। এই জীবন্ত শিল্পকলা ক্রমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিস্তার লাভ করেছে। বনসাইর সৌন্দর্য পৃথিবীর সমস্ত রসিক ব্যক্তির হৃদয় জয় করেছে।

ভারতবর্ষে বনসাইর শিল্পকলা সম্ভবতঃ প্রথমে নতুন দিল্লীর প্রয়াত শ্রীঅগ্নিহোত্রী শুরু করেন এবং তারপর থেকে ভারতের অন্যত্র এই বনসাই কলা ছড়িয়ে পড়ে। এখন অনেকেই এই বামন গাছ চাষে (miniature trees) খুব নিষ্ঠা সহকারে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে আত্মনিয়োগ করেছেন।

উৎপত্তি

বনসাই কথাটি এসেছে দুটো জাপানী শব্দ থেকে-“বন’ (Ban) মানে অগভীর পাত্র (Shallow container) এবং ‘সাই’ (sai) মানে গাছ। অর্থাৎ এককথায় বনসাই হল অগভীর পাত্রের গাছ। মূলতঃ গাছ (trees) বা গমকে (shrubs) অপেক্ষাকৃত ছোট পাত্রের মাটিতে চাষ করে কতকগুলি বিশেষ। পদ্ধতিতে আস্তে আস্তে বেটে করে ক্রমান্বয়ে বয়স্করূপে প্রদান করাই হলো বনসাইর আসল সৌন্দর্য কলা। এটি হলো আংশিক ‘হর্টিকালচার’ এবং আংশিক ‘কলা’, সামগ্রিকভাবে আধুনিক বাগিচার জীবন্ত ভাস্কর্য শিল্প (living sculpture)। প্রুনিং বা ছাঁটাই, আকৃতি প্রদান (shaping) এবং যে পাত্রে গাছ  প্রাকৃতিকভাবে বড় হবে— এই তিনটি বিষয়ই হলো বনসাই বাগিচার মূল সাধারণ কলাকৌশল। এ বিষয়ে বনসাই উৎপাদককে সর্বদা সমতান নক্সা (harmony of design), আয়তন, আকৃতি, গাছ বসাবার পাত্র (container) এবং এদের সামঞ্জস্যপূণ শিল্পকলা প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎ প্রাকৃতিক শিল্পকলা সৃষ্টিই। বনসাইর আসল রহস্য।

তবে বনসাই সম্বন্ধে কতকগুলি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এরূপ একটি হলো, বনসাই মানে খুব বয়স্ক বিষয়ে জ্ঞানার্জন খুবই জরুরী। বিদেশের জলবায়ুতে বনসাইকরণ পদ্ধতি ভারতবর্ষের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে একরকম হতে পারে না। তাছাড়া আধুনিক নগর সভ্যতায় স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন গাছপালার বনসাই-করণ একটি বিশেষ মননশীল চিন্তা, অধ্যবসায় এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল। এটি একটি সদা-পরিবর্তনশীল জীবন্ত কলা (ever | changing living form of art)!

আরো পড়ুন:  করঞ্জা ফেবাসি পরিবারের পঙ্গামিয়া গণের ঘন ডালপালা বিশিষ্ট চিরসবুজ বৃক্ষ

গাছ নির্বাচন

দীর্ঘকাল সযত্নে গাছকে বামন করার ফলে এর পাতাগুলি ক্রমশঃ প্রায় এক-চতুথাংশ আকারে এসে যায়, কিন্তু ফুল ও ফলের আকারে খুব কম পরিবর্তন ঘটে। তাই বনসাই করার জন্য সাধারণতঃ ছোট আকারের ফুল ফলযুক্ত গাছ নির্বাচন করা উচিত। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে যে সব গাছে গ্রীষ্মকালে ফুল আসে, পাতা বেরুনোর আগে সেগুলি নিবাচন করা উচিত। পাম, পেঁপে জাতীয় গাছ বনসাইর উপযুক্ত নয়। কারণ এগুলির ডগা ছেটে দিলে গাছ বাঁচে না।

বীজ থেকেও বনসাই করা যায়। এতে অনেক সময় এবং অসীম ধৈর্য প্রয়োজন হয়। বর্ষার শেষে বা বসন্তের শুরুতে বীজের উর্বরতা পরীক্ষা করে এই কাজ আরম্ভ করা যায়। এর জন্য ১৫ সেমি গভীর বীজ (seed pan) নির্বাচন করে ভালভাবে জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও মাটি বেরিয়ে না যাওয়ার জন্য তলায় ফুটো করে তার উপর মাটির পাত্রের ছোট ছোট টুকরো বা গাছের টুকরো দিতে হবে।

একটি কম বয়সেই গাছের ডালপালা প্রথম থেকে আস্তে আস্তে ছাঁটাই করে তার মূল কাণ্ড (trunk) মোটা করিয়ে বয়স্ক বেটে গাছের রূপ প্রদান করা হয়। এমনকি এর গোড়ার কিছু শিকড় উন্মুক্ত করে বনসাইর শিল্পকলা বর্ধিত করা হয়। অন্যান্য বাহারী গাছের ন্যায় বনসাই গৃহসজ্জায় ড্রয়িংরুমে, মিটিং হলে বসিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। তবে বনসাইকে অন্যান্য ‘হাউস প্ল্যান্টের মতো ব্যবহার করা উচিত হবে না। ঘরের বাইরে বনসাই গাছগুলি রাখা উচিত।

বনসাই করার নিয়ম

আগে বনসাইকে ধনীদের বিলাস বা শখ বলে মনে করা হতো। এখন সাধারণের মধ্যে বনসাই একটি শিল্পকলা বলে জায়গা করে নিতে পেরেছে। জনবহুল নগর সভ্যতায় বনসাই এখন খুবই জনপ্রিয়। জাপানে অনেক বাড়ীতে বংশ পরম্পরায় বনসাই করে আসছেন। অন্যান্য গাছপালা চাষে যেমন ফুল, ফল ও গাছের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া হয়, বনসাই চাষে মূলতঃ প্রধান কাণ্ডের বিভিন্ন আকৃতি এবং ডালপালা, পাতা ও ফুল, ফলের আকার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন:  জারুল বাংলাদেশের নান্দনিক পথতরু

উপকরণ

বনসাই তৈরীর আগে বিভিন্ন পদ্ধতি, উপকরণ এবং অন্যান্য খুটিনাটি প্লাষ্টিকের মেস (mesh) দিতে হবে। এরপর তলা থেকে পাত্রের সিকি ভাগ মোটা দানার মাটি (coarse soil) দিয়ে ভরে দিন। এতে কোনো রূপ সার দেবার দরকার নেই।

প্রথম ধাপ

এবার এই মাটির স্তরের উপর চালনি দিয়ে ছাঁকা সরু দানার একই মাটি ২ সেমি সমান করে বিছিয়ে দিন। এর উপর বীজ রাখুন। প্রতিটি বীজ থেকে অন্য বীজের দুরত্ব হবে ৪-৫ সেমি। বীজের উপর মিহি মাটির গড়ে ১ সেমি উচু করে বিছিয়ে দিন। তার উপর খুব সাবধানে জল ছিটান যাতে উপরের মাটি ধয়ে না যায়। উপর থেকে জল চুইয়ে নীচের ফুটো দিয়ে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যাবে। এবার একটি গ্লাসের বা কাঁচের প্লেট দিয়ে ঢাকা দিয়ে ছায়ায় বীজ পাত্রটি রাখুন। নীচের জলীয় বাষ্প সংরক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।  উপরের স্তরে জল শুকিয়ে গেলে আগের মতো জল দিন। বেশী জল দেওয়া ক্ষতিকর।

দ্বিতীয় ধাপ

প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় কাঁচের ঢাকনা সরিয়ে দিন। সকালে বীজপ্যানটি সূর্যালোকে দেওয়ার আগে হালকা জল দিন। এভাবে বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়ে পাতা বেরুতে শুরু করলে কাচের আস্তরণ একেবারে সরিয়ে ফেলুন। বীজপ্যানটি এবার হালকা রোদ ও বাতাসের আবহাওয়ায় রাখুন। চড়া রোদে কখনোই রাখা উচিত নয়। চারাগাছটি এতে আস্তে আস্তে শক্ত হবে। রোগ-পোকা ও পাখির হাত থেকে চারাগুলিকে বাঁচাতে হবে। চারাগুলি বড় হয়ে পাতায় প্যানটি ভরে গেলে এবার গাছ পাতলা করা ও অন্য প্যানে রোপণ করা প্রয়োজন।

তৃতীয় ধাপ

জল দেওয়ার পর অপেক্ষাকৃত দুর্বল গাছগুলি তুলে দিন। এবার সুস্থ, সবল গাছগুলি সাবধানে শিকড়ে স্বরুপ মাটি সমেত অন্য পাত্রে লাগাতে হবে। এই দ্বিতীয় পাত্রে মাটির মিশ্রণ স্বল্প পরিমাণ সারযুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। গাছ লাগাবার অব্যবহিত পরেই ছায়া ঘেরা জায়গায় পাত্রসমেত গাছ রাখতে হবে। শিকড় মাটিতে ধরে গেলে ধীরে ধীরে রোদ খাওয়ানো ও জল দেওয়ার কাজ করতে হবে।

গাছের পরিচর্যা

বীজ থেকে তৈরী গাছেকে বনসাই করতে হলে ২-৩ বছর অপেক্ষা করতে হবে। শহরে এতদিন গাছ রাখা ও অপেক্ষা করার ধৈর্য অনেকেরই কম থাকে। এক্ষেত্রে তাঁরা যে কোনো ভাল নাসারী থেকে এই বয়সের চারা কিনে এনে বানালোর শুরু করতে পারেন। মোটা কাণ্ডযুক্ত সুস্থ, সবল শাখাপ্রশাখা এবং ফুল বা কুড়িযুক্ত গাছ বনসাই করার পক্ষে উপযুক্ত। এ কথাটা বনসাই-বিদদের সবসময় মনে রাখতে হবে।

আরো পড়ুন:  পাতা বাহার উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের আলংকারিক উদ্ভিদ

এছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো গাছ তুলে এনে পাত্রে লাগিয়েও করা যায়। যে সব গাছ বা গমের শাখা-প্রশাখা আঁকাবাঁকা, কাণ্ড বেশ সহজেই বাঁকানো যায় বা ঢেউ খেলানো করা সম্ভব, সেইসব গাছের বনসাই খুব দৃশ্যব্যঞ্জক হয়। এরূপ গাছ বা গুল্মের ভাল বাছাই চারা তুলে এনে পাত্রে লাগিয়ে বনসাই করা যাবে। বসন্তকালে বা বর্ষার প্রাক্কালে এরূপ বনসাই করা বেশ উপযুক্ত সময়। এসময় গাছের কুড়ি শুরু হয় এবং বুদ্ধি ভালো হয়।

বীজ, চারা ছাড়া বিভিন্ন কাটিং এবং গ্রাফটিং (side and top grafting) থেকে তাড়াতাড়ি চারা প্রস্তুত করে পাত্রে লাগিয়ে বনসাই শুরু করা যায়। এতে পছন্দমতো ছোট বড় যে কোনো ধরনের গাছ থেকে চারা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়।

গাছ সংরক্ষণ

বিভিন্ন স্টাইল (style) অনুযায়ী এই চারাগাছগুলি পাত্রে লাগানো হয়। সোজা, বাঁকানো, জোড়া-কাণ্ড (twin trunk style) বহু-কাণ্ড (multi trunk style), ক্যাসকেড়, ব্রুম, পাহাড়ী দৃশ্য (Roct grown), র‍্যাফট টাইল, বনবিথী (Forest or group planting style, ল্যান্ডস্কেপ, বা বিভিন্ন ধরনের গাছ, গম, লতা ও ঘাসজাতীয় গাছ একসঙ্গে লাগিয়ে বনসাই তৈরী করে বাহারী দৃশ্য ফোটান যায়।

বনসাই করতে হলে প্রধানতঃ তিনটি জিনিস খুবই গুরত্বপণ—প্যানের আকার, মাটি এবং চারাগাছ বা গুল্ম। এর সঙ্গে বিভিন্ন পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্যা, ছাঁটাই ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান, নিরলস ধৈর্য, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, ধৈর্য এবং নিখুঁত অধ্যবসায় প্রয়োজন। তবেই বনসাই একটি জীবন্ত ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। বট, অশ্বত্থ, ঝাউ, থুজা, জুনিপার, বাঁশ, চিক্কু, বগনভেলিঙ্গা, ক্রিশমাস ট্রী, লেবু, সাইকাস, জবা ইত্যাদি নানাবিধ গাছে বনসাই করা যায়।

তথ্যসূত্রঃ

১. বালাইলাল জানা: ক্যাকটাস ও ফুলচাষ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তকপর্ষৎ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৮৮, পৃষ্ঠা, ১৫৭-১৬০।

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page