আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাহিত্য > প্রবন্ধ > যাদু বাস্তববাদ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের কথাসাহিত্যের একটি শৈলী ও সাহিত্য ধারা

যাদু বাস্তববাদ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের কথাসাহিত্যের একটি শৈলী ও সাহিত্য ধারা

যাদু বাস্তববাদ

যাদু বাস্তববাদ বা জাদু বাস্তবতাবাদ বা যাদুকরী বাস্তববাদ বা বিস্ময় বাস্তববাদ (ইংরেজি: Magic realism বা magical realism বা marvelous realism ) হচ্ছে কথাসাহিত্যের একটি শৈলী ও সাহিত্য ধারা যা আধুনিক বিশ্বের এক বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিকে আঁকার পাশাপাশি জাদুকরী উপাদানকেও যুক্ত করে। যাদুকরী বাস্তবতা সম্ভবত সাহিত্যের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা সবচেয়ে প্রচলিত শব্দ যেটি প্রায়শই উপন্যাস এবং নাটকের অভিনয়ে সাধারণত দেখা যায়। সাহিত্যের এই ধারায় ভিন্নতা আশ্রয়ী বাস্তব-জগত বা জাগতিক পরিবেশকে ঐন্দ্রজালিক বা অতিপ্রাকৃত ঘটনার সাথে তুলে ধরা হয়। কিছু যাদুকরী উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা সত্ত্বেও, এটি সাধারণত অলীক-কল্পকাহিনির (Fantasy) থেকে আলাদা ধরণ হিসাবে বিবেচিত হয় কারণ যাদুকরী বাস্তববাদ বাস্তবের বিস্তৃতিটি যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করে এবং বাস্তবের বিষয়ে একটি বক্তব্য দেওয়ার জন্য যাদুকরী উপাদানগুলিকে প্রযুক্ত করে, যখন অলীক-কল্পকাহিনির গল্পগুলি প্রায়শই বাস্তবতা থেকে আলাদা হয়। যাদুকরী বাস্তববাদকে প্রায়শই বাস্তব ও যাদুকরী উপাদানগুলির সংমিশ্রণ হিসাবে দেখা যায় যা সাহিত্যিক বাস্তববাদ বা অলীক-কল্পকাহিনির চেয়ে অধিক সর্বব্যাপ্ত লেখা তৈরি করে।[১]

ম্যাজিক রিয়ালিজম শব্দটির উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় ফ্রানৎস্ রো (১৮৯০ – ১৯৫৫) নামক এক জার্মান কলা সমালোচকের বইয়ে, যার নাম নাখ এক্সপ্রেসিওনিজমুস্ : মাগিশের রেয়ালিজমুস : প্রোবলেমে ড্যের নয়েস্টেন অয়রোপেইশেন্ মালেরাই (১৯২৫; এক্সপ্রেশনিজম-এর পর ম্যাজিক রিয়ালিজম : নবীনতম ইউরোপীয় চিত্রকলার সমস্যাবলি)। পরে, ১৯২৭ সালে বইটি এস্পানিওল ভাষায় আংশিক অনুবাদাকারে রেভিস্তা দে অক্সিদেন্তে পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়। রোর মৌলিক ধারণা অনুযায়ী অবশ্য ম্যাজিক রিয়ালিজম উত্তর-এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকলা (১৯২০-২৫)-এর সমার্থক আর তাকে কুহকী মনে হওয়ার কারণ এই যে সেই সমস্ত ছবির উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন জীবনের রহস্যজনক উপাদানগুলিকে মেলে ধরা। একটি সাহিত্যশৈলী হিসাবেও ম্যাজিক রিয়ালিজমকে রো কখনো কল্পনা আর বাস্তবের মিশ্রণ বলে মনে করেননি। তার মতে শব্দটির ব্যবহারিক ভিত্তি ছিল দৈনন্দিন বাস্তবের মধ্যেই শক্তভাবে গাঁথা আর তা ছিল রোজকার জীবনের চমকের সামনে মানুষের বিস্ময়েরই অভিব্যক্তি।[২]

আরো পড়ুন:  বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্য হচ্ছে প্রধানত ইংরাজি ভাষায় রচিত সাহিত্য

লাতিন আমেরিকার লেখকদের মধ্যে ভেনেজুলেয়ার আর্তুরো উসলার পায়েত্রি তার ওম্ব্রেস ই লেত্রাস দে ভেনেজুয়েলা (১৯৪৮; ভেনেজুয়েলার মানুষ ও চিঠি) বইয়ে প্রথম ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথা বলেন যদিও রোর কোনো উল্লেখ সেখানে ছিল না। উসলার পায়েত্রির সংজ্ঞাটিকে (যা মোটামুটি রোর সংজ্ঞারই অনুরূপ) ভেনেজুয়েলার কিছু ছোটো গল্পে প্রয়োগ করা হয়। গল্পগুলি লেখা হয়েছিল আধাগদ্য-আধাকবিতা রীতিতে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নির্ভর হয়েও তাদের প্রসঙ্গ আর চরিত্র ছিল অবাস্তব। এর কিছুদিন পরেই, ১৯৯০ সালে কিউবার আলেহো কার্পেন্তিয়ের তার এল রেইনো দেল এস্তে মুনদো (এই মর্ত্যের রাজত্ব) বইয়ের সূচনায় উল্লেখ করেন লাতিন আমেরিকার লো রেয়াল মারভিয়োসো বা অলৌকিক বাস্তবতার কথা। সেই ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন বাস্তবতার বর্ণনা প্রসঙ্গে সেখানে তিনি জোর দেন আমেরিকার ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার উপর। পরে অবশ্য তিয়েন্তোস ই দিফারেন্সয়াস (১৯৬৪; স্পর্শ ও ভিন্নতা) বইয়ে তিনি স্বীকার করেন যে বাস্তবের এই অলৌকিক দিক শুধুমাত্র আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তার নিদর্শন রয়েছে। এল রেইনো দেল এস্তে মুনদো প্রকাশিত হওয়ার বছরেই গুয়াতেমালার মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের ওম্ব্রেস দে মাইজ (জনারের মানুষ) প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি ‘কুহকী বাস্তববাদ’-এর কথা তোলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কার্পেন্তিয়ারের সঙ্গে আস্তুরিয়াসের প্রথম মোলাকাত হয় পারি শহরে এমন একটা সময়ে যখন সেখানে পরাবাস্তববাদের বিপুল রমরমা। পরবর্তীকালে কার্পেন্তিয়ার এই রীতিটির সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেন পরাবাস্তববাদ হলো সেই বাস্তবের এক কৃত্রিম অনুকরণ যার ভেতরেই আসলে অনেক অলৌকিকের উপস্থিতি রয়েছে। উল্টোদিকে তিনি মনে করতেন, লাতিন আমেরিকার ‘অলৌকিক বাস্তবতা’ আসলে অলৌকিক সম্পর্কে আস্থাশীল এক মুহূর্তের সচেতনতা যা লেখককে পাঠকের কাছে বাস্তবের অবাস্তব দিকগুলি মেলে ধরতে সাহায্য করে। একথা অবশ্য মনে রাখতে হবে যে কুহকী বাস্তববাদ সম্পর্কে কার্পেন্তিয়ের আর উসলার পায়েত্রির ধারণা তাদের সাহিত্য ও সমালোচক জীবনের এক উৎক্রমণশীল পর্যায়ের সঙ্গেই যুক্ত, সমগ্র সাহিত্য জীবনের বৈশিষ্ট্য নয়।

আরো পড়ুন:  নব্যধ্রুপদীবাদ শিল্প, সাহিত্য, থিয়েটার, সংগীত ও স্থাপত্যের সাংস্কৃতিক আন্দোলন

সমালোচক আনহেল ফ্লোরেস তার বিখ্যাত রচনা Magical Realism in Latin American Fiction (১৯৫৫)-এ শব্দটিকে সমালোচক মহলে জনপ্রিয় করে তোলেন। শব্দটির মূল অর্থের পরিসরকে বাড়িয়ে তিনি হোরহে লুই বোর্হেস আর মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের রচনাকেও এই রীতির আওতায় এনে ফেলেন। ফলে ম্যাজিক রিয়ালিজমের সরলীকৃত অর্থ হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র ‘রিয়্যাল’ আর ‘মার্ভেলাস’-এর সংমিশ্রণ। মেক্সিকোর সমালোচক লুইস লিল অবশ্য ফ্লোরেসের ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে রোর মূল ব্যাখ্যায় ফিরে যান এবং বলেন শব্দটির মানে আসলে বাস্তবের প্রতি এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে রোজকার জীবনের কাব্যিক আর রহস্যজনক দিকগুলির ওপর থাকবে নজর, বাদ যাবে সমস্ত অলৌকিক উপাদান।

তথ্যসূত্র

১. সম্পাদকবৃন্দ, ইংরেজি উইকিপিডিয়া, “Magic realism“, https://en.wikipedia.org/wiki/Magic_realism সংগ্রহের তারিখ ৩১ জুলাই ২০২০
২. সৌগত মুখোপাধ্যায়, “ম্যাজিক রিয়ালিজম“, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত; বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৫২৪-৫২৬

পেইন্টিঙয়ের ইতিহাসঃ নিবন্ধে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি স্তানিস্লো বরোস্কির গামলা বা bowl. তিনি ১৯৮৭ সালে চিত্রটি অঙ্কন করেছিলেন।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page