লেভ তলস্তয় এবং তাঁর যুগ

লেভ তলস্তয় যে-যুগের মানুষ, যে-যুগ এমন বলিষ্ঠ রেখায়-রেখায় ফুটে উঠেছে তাঁর দেদীপ্যমান সাহিত্যিক রচনাবলিতেও এবং তাঁর মতবাদেও, সেটা ১৮৬১ সালের পরে শুরু হয়ে চলেছিল ১৯০৫ সাল অবধি। তলস্তয়ের সাহিত্যিক কর্মজীবন শুরু হয়েছিল আরও আগে, সেটা শেষ হয়েছিল আরও পরে, তা ঠিক, কিন্তু এই যে-কালপর্যায়ের উত্তরণকালীন প্রকৃতি তলস্তয়ের রচনাবলি এবং তলস্তয়বাদের সমস্ত বৈশিষ্ট্যসূচক উপাদানের উদ্ভব ঘটিয়েছিল, সেই সময়েই তিনি সম্পূর্ণত সুপরিণত হয়ে উঠেছিলেন শিল্পী হিসেবেও, চিন্তাবীর হিসেবেও।

এই অর্ধ-শতকে রাশিয়ার ইতিহাসে যে-গতিপরিবর্তন ঘটেছিল তার প্রকৃতিটাকে ল. তলস্তয় একেবারে ছবির মতো ফুটিয়ে তুলেছেন ‘আন্না কারেনিনা’র অন্যতম চরিত্র লেভিনের মারফত।

‘…ফসলতোলা, জন-লাগানো, ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ, যাকে লেভিন জানত খুবই নিচ বলে গণ্য করা রেওয়াজ ছিল… তাকে এখন লেভিনের কাছে একমাত্র গুরুত্বসম্পন্ন জিনিস বলে মনে হলো। “এটা হয়ত গুরুত্বহীন ছিল ভূমিদাসপ্রথার আমলে, কিংবা ইংলণ্ডে। উভয় ক্ষেত্রে অবস্থা সুনির্দিষ্ট, কিন্তু যখন সবকিছু, গেছে উলটে-পালটে এবং সবেমাত্র রূপধারণ করছে, সেক্ষেত্রে এখানে এখন এইসব অবস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে সেই প্রশ্নটাই রাশিয়ায় একমাত্র গুরুত্বসম্পন্ন প্রশ্ন” মনে-মনে তোলাপাড়া করে লেভিন।’ (রচনাবলি, ১০ম খণ্ড, ১৩৭ পঃ)

‘এখানে এখন সবকিছু, গেছে উলটে-পালটে এবং সবেমাত্র রূপধারণ করছে’ – ১৮৬১–১৯০৫ সালের কালপর্যায় সম্বন্ধে এর চেয়ে উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য নির্দেশ ভেবে পাওয়া কঠিন। ‘উলটে-পালটে গিয়েছিল’ কী, সেটা প্রত্যেকটি রুশীর কাছে সুপরিচিত, কিংবা অন্তত সুবিদিত। সেটা হলো ভূমিদাসপ্রথা এবং তার আনুষঙ্গিক সমগ্র ‘পুরনো ব্যবস্থাটা। ‘সবেমাত্র রপধারণ করছে’ কী, সেটা জনসাধারণের বিস্তৃত অংশের একেবারেই অজানা, বিজাতীয় এবং ধারণাতীত। ‘সবেমাত্র রূপধারণ করছিল’ বুর্জোয়া ব্যবস্থা, সে-সম্বন্ধে তলস্তয়ের ধারণা আবছা, একটু জুজুর রূপে – ইংলণ্ড। সত্যিই একটা জুজু, কেননা এই ‘ইংলণ্ডে’ সমাজব্যবস্থার উপাদানগুলো, এই ব্যবস্থা আর পুঁজির আধিপত্যের মধ্যে সম্পর্ক, অর্থের ভূমিকা, বিনিময়ের উদ্ভব আর বিকাশ, এসব বিচারবিশ্লেষণের যে কোনো চেষ্টা তলস্তয় প্রত্যাখ্যান করেছেন, বলা যেতে পারে নীতি হিসেবে। রাশিয়ায় যা ‘রূপধারণ করছে’ সেটা যে বুর্জোয়া ব্যবস্থা ছাড়া কিছু নয়, তা তিনি দেখতে নারাজ, সে-দিক দিয়ে তিনি চোখ বুজে থেকেছেন, সে-চিন্তাটাকে তিনি বাদ দিয়ে রেখেছেন নারোদনিকদেরই [১] মতো।

এই ব্যবস্থা, এই বুর্জোয়া ব্যবস্থা, যা ‘ইংলণ্ড’, জার্মানি, আমেরিকা, ফ্রান্স, ইত্যাদি দেশে খুবই বিভিন্ন বিচিত্র রূপধারণ করেছিল, সেটা ‘কোন রূপ ধারণ করবে’, সেটা ১৮৬১–১৯০৫ সালের কালপর্যায়ের (এবং আমাদের কালেও) রাশিয়ায় যাবতীয় সামাজিক আর রাজনীতিক ক্রিয়াকলাপের আশু করণীয় কাজগুলির দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বসম্পন্ন’ না-হলেও নিশ্চয়ই অন্যতম গুরুত্বসম্পন্ন প্রশ্ন ছিল, তা ঠিক। কিন্তু, প্রশ্নটার এমন যথাযথ, মূর্ত-নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উপস্থাপনা তলস্তয়ের পক্ষে একেবারেই পরক। তাঁর বিচার বিমূর্ত, তিনি মানেন শুধু নৈতিকতার ‘শাশ্বত’ নীতিসমূহের, ধর্মের শাশ্বত সত্যের দৃষ্টিকোণ; এই দৃষ্টিকোণ যে পুরনো (‘উলটে-পালটে ফেলা’) ব্যবস্থার, ভূমিদাসভিত্তিক ব্যবস্থার, প্রাচ্যের জাতিসমূহের জীবনযাত্রাপ্রণালীর ব্যবস্থার মতাদর্শগত প্রতিবিম্বমাত্র, তা উপলব্ধি করতে তিনি অপারগ।

আরো পড়ুন:  আমাদের সংবাদপত্রগুলির চরিত্র

‘ল্যুসার্নএ (১৮৫৭ সালে লেখা) ল. তলস্তয় বলেছেন, ‘সভ্যতাকে’ একটা আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করাটা ‘অলীক ধারণা’, যা ‘মানব-প্রকৃতিতে মঙ্গলের জন্যে আদিম, সাহজিক, পরম-সুখকর আবশ্যকতাকে বিনষ্ট করে’। তলস্তয় বলে ওঠেন, ‘আমাদের আছে একটিমাত্র অভ্রান্ত পথপ্রদর্শক : আমাদের মধ্যে পরিব্যাপ্ত পরমাত্মা’ (রচনাবলি, ২য় খণ্ড,১২৫ পঃ)।

১৯০০ সালে লেখা ‘আমাদের একালের দাসত্ব’এ তলস্তয় ‘পরমাত্মার উদ্দেশে এইসব আবেদনের আরও বেশি উদ্দীপনাময় পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, অর্থশাস্ত্র একটা ‘অপবিজ্ঞান’, কেননা এতে ‘আদর্শ’ হিসেবে ‘সমগ্র-ইতিহাসব্যাপী সমগ্র জগতে মানুষের পরিবেশকে’ না-ধরে ধরা হয় ‘ছোট ইংলণ্ডকে, যেখানে পরিবেশ অতি ব্যতিক্রমী’। এই ‘সমগ্র জগৎটা’ কী রকমের, সেটা আমাদের কাছে উঘাটিত হয়েছে ‘প্রগতি এবং শিক্ষার সংজ্ঞা’ (১৮৬২) প্রবন্ধে। প্রগতি হলো ‘মানবজাতির একটা সাধারণ নিয়ম’, এই মর্মে ‘ইতিহাসকারদের’ অভিমতের বিরোধিতা করে তলস্তয় ‘প্রাচ্য বলে যা পরিচিত তার সমগ্রটার’ (৪; ১৬২) উল্লেখ করেছেন। তলস্তয় বলেছেন, ‘মানব-প্রগতির কোনো সাধারণ নিয়ম নেই; প্রাচ্যের জাতিগুলির শান্ত অবস্থা থেকে সেটা প্রমাণিত হচ্ছে।’

আসল ঐতিহাসিক মর্মবস্তুর দিক থেকে তলস্তয়বাদ একটা প্রাচ্য রীতির, এশীয় রীতির মতাদর্শ। তারই থেকে এসেছে কৃচ্ছসাধনা, অমঙ্গলের বিরুদ্ধে না-প্রতিরোধ, প্রগাঢ় দুঃখবাদের সুর, ‘সবকিছুই নাস্তি, সবকিছুই একটা ভৌত নাস্তি’ (জীবনের অর্থ, ৫২ পঃ) এই প্রত্যয়, এবং ‘আত্মার’ প্রতি বিশ্বাস, ‘সবকিছুর আদিতে’ বিশ্বাস, এই আদির সঙ্গে সংস্রবে মানুষ নিছক ‘মজুর’, ‘যার উপর ন্যস্ত হয়েছে নিজ আত্মাকে রক্ষা করার কাজ’ এই বিশ্বাস, ইত্যাদি। ‘ক্রয়টজার সোনাটায়’ও নিজ মতাদর্শে অটল থেকে তলস্তয় বলেছেন, ‘নারীর মুক্তি কলেজে নয় এবং পার্লামেন্টে নয়, সেটা শয়নকক্ষে’, আর ১৮৬২ সালে লেখা প্রবন্ধেও তিনি নিজ মতাদর্শে অটল থেকেছেন, তাতে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তালিম দিয়ে গড়ে তোলা হয় কেবল ‘খিটখিটে, দুর্বল-করে-ফেলা উদারপন্থীদের’, যারা ‘মানুষের জন্যে আদৌ কোনো কাজেরই নয়’, যারা ‘নাহক তাদের আগেকার প্রতিবেশ থেকে ছিন্ন হয়ে’ ‘জীবনে কোনো স্থান পায় না’, ইত্যাদি (৪; ১৩৬-১৩৭)।

দুঃখবাদ, না-প্রতিরোধ, ‘পরমাত্মার’ উদ্দেশে আবেদন মিলিয়ে একটা মতাদর্শ, যা সেই যুগে অবশ্যম্ভাবী, যখন গোটা পুরনো ব্যবস্থা ‘উলটে পালটে গেছে’, যখন এই পুরনো ব্যবস্থার অধীনে লালিত এবং এই ব্যবস্থার নীতি, অভ্যাস, ঐতিহ্য আর বিশ্বাসগুলোকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে আত্মভূত-করা জনগণ দেখে না এবং দেখতে পারে না ‘রূপধারণ করছে’ কোন রকমের নতুন ব্যবস্থা, কোন-কোন সামাজিক শক্তি সেটাকে ‘রূপদান করছে’ কীভাবে, আর ‘আলোড়নের’ যুগের বিশেষক অপরিমেয় এবং অসাধারণ তীব্র দুর্দশা থেকে মুক্তি আনতে সক্ষম কোন-কোন সামাজিক শক্তি।

১৮৬২-১৯০৪ সালের কালপর্যায়টা রাশিয়ায় ছিলো ঠিক এই রকমেরই আলোড়নের কালপর্যায়, যে-কালপর্যায়ে সবার চোখের সামনে পুরনো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ল, যা কখনও পুনঃস্থাপিত হবার নয়, যখন নতুন ব্যবস্থাটা রূপধারণ করছিল সবেমাত্র; নতুন ব্যবস্থার রূপদানকারী সামাজিক শক্তিগুলো অতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ্য গণ-ক্রিয়াকলাপের মধ্যে বিস্তৃত দেশব্যাপী পরিসরে প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল সবে ১৯০৫ সালে। আর রাশিয়ায় ১৯০৫ সালের ঘটনাবলির পরে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল ঠিক সেই ‘প্রাচ্যের’ই কতকগুলি দেশে, যে-প্রাচ্যের ‘শান্ত অবস্থার’ কথা তলস্তয় উল্লেখ করেছিলেন ১৮৬২ সালে। ১৯০৫ সালে ‘প্রাচ্যের’ শান্ত অবস্থার অবসানের সুচনা হলো। ঠিক এই কারণেই সেটা হলো তলস্তয়বাদের ঐতিহাসিক অবসানের বছর, সেই যুগের অবসান, যা তলস্তয়ের মতবাদের উদ্ভব ঘটাতে পেরেছিল, যখন সেটার উদ্ভব ছিল অনিবার্য, আর সেটা কিছু, একক হিসেবে নয়, উৎকল্পনা কিংবা খোশখেয়াল হিসেবে নয়, কোটি-কোটি মানুষ কিছুকালের জন্যে বাস্তবে যার মধ্যে পড়েছিল জীবনের সেই পরিবেশের মতাদর্শ হিসেবেই তার উদ্ভব ঘটেছিল।

আরো পড়ুন:  আবশ্যিক রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজন আছে কি?

তলস্তয়ের মতবাদ নিশ্চয়ই স্বপ্নরাজ্যের ব্যাপার এবং মর্মবস্তুর দিক থেকে সেটা প্রতিক্রিয়াশীল – কথাটার অতি যথাযথ এবং অতি প্রগাঢ় অর্থেই। কিন্তু, তার অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে, এই মতবাদ সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের নয় কিংবা অগ্রসর শ্রেণিগুলির জ্ঞানালোক প্রাপ্তির মূল্যবান উপচার যোগাতে পারার মতো বৈচারিক উপাদান তাতে ছিল না।

সমাজতন্ত্র আছে নানারকমের। উৎপাদনের পুঁজিবাদী প্রণালীর যেখানে প্রাধান্য সেই সমস্ত দেশে যে-সমাজতন্ত্র আছে তাতে বুর্জোয়াদের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে যে-শ্রেণি তার মতাদর্শ প্রকাশ পায়; তেমনি, আর-একরকমের সমাজতন্ত্র আছে, যাতে প্রকাশ পায় সেইসব শ্রেণির মতাদর্শ যাদের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে বুর্জোয়ারা। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সামন্তবাদী সমাজতন্ত্র হলো ঐ পরে-উল্লিখিত ধরনের সমাজতন্ত্র; দীর্ঘকাল আগে, ষাট বছরের বেশি কাল আগে মার্কস[২] অন্যান্য ধরনের সমাজতন্ত্রের মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে এই সমাজতন্ত্রের প্রকৃতির মূল্যায়ন করেছিলেন [৩]।

তার উপর, ল, তলস্তয়ের স্বপ্নরাজ্যের মতবাদে বিভিন্ন বৈচারিক উপাদান নিহিত আছে – সেটা ঠিক যেমনটা নিহিত আছে বহু, স্বপ্নরাজ্যের তন্ত্রের মধ্যে। তবে, স্বপ্নরাজ্যের সমাজতন্ত্রের বৈচারিক উপাদানগুলোর মূল্য ‘ঐতিহাসিক বিকাশের সঙ্গে বিপরীত-সম্পর্কযুক্ত’, এই মর্মে মার্কসের প্রগাঢ় মন্তব্যটি আমরা কিছুতেই ভুলতে পারি নে। যেসব সামাজিক শক্তি নতুন রাশিয়ার ‘রূপদান করছে’ এবং এখনকার দিনের সামাজিক অমঙ্গলগুলো থেকে মুক্তি নিয়ে আসছে সেগুলির ক্রিয়াকলাপ যত বেশি বিকশিত হচ্ছে এবং স্পষ্ট-নির্দিষ্ট চরিত্র পাচ্ছে ততই বেশি দ্রুত বৈচারিক-স্বপ্নরাজ্যের সমাজতন্ত্র ‘হারাচ্ছে সমস্ত ব্যবহারিক মূল্য এবং সমস্ত তত্ত্বগত প্রতিপন্নতা’।

প্রতিক্রিয়াশীল আর স্বপ্নরাজ্যের উপাদানগুলি সত্ত্বেও তলস্তয়ের মতবাদের বৈচারিক উপাদানগুলি জনসমষ্টির কোনো-কোনো অংশের পক্ষে কখনও-কখনও ব্যবহারিক মূল্যসম্পন্ন হতে পারত সিকি শতক আগে। তা কিন্তু হতে পারত না, যেমন ধরা যাক, গত দশকে, কেননা নবম দশক এবং গত শতকের শেষ অবধি সময়ের মধ্যে ঐতিহাসিক বিকাশে বিস্তর অগ্রগতি ঘটে গিয়েছিল। আমাদের একালে যেহেতু উপরে উল্লিখিত ঘটনাগুচ্ছ ‘প্রাচ্যের’ শান্ত অবস্থার অবসান ঘটিয়েছে, আমাদের একালে যখন ‘ভেখিপন্থীদের’ সচেতনভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ভাব-ধারণাগুলো (সংকীর্ণ-শ্রেণিগত, আত্মসার-শ্রেণিগত, অর্থে প্রতিক্রিয়াশীল) উদারপন্থী বুর্জোয়াদের মধ্যে এমন বিপুল প্রসারলাভ করেছে, যখন যারা ছিল প্রায়-মার্কসবাদী এমনকি তাদেরও একটা অংশে ঐসব ভাব-ধারণা সংক্রামিত হয়ে ‘লুপ্তিপন্থী’[৪] মতধারা সৃষ্টি করেছে – আমাদের একালে তলস্তয়ের মতবাদকে আদর্শ স্থানীয় করে তোলা, তাঁর ‘না-প্রতিরোধ’, ‘পরমাত্মার’ উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ‘নৈতিক আত্মশুদ্ধির’ জন্যে তাঁর উপদেশ, তাঁর ‘বিবেক’ আর বিশ্ব-‘প্রেমের’ উপদেশ, তাঁর কৃচ্ছসাধনা আর শান্ত-ভাবের প্রচার [৫], ইত্যাদিকে ন্যায্য প্রতিপন্ন কিংবা সহনীয় করে তোলার প্রত্যেকটা চেষ্টার ফলে অতি প্রত্যক্ষ এবং অতি প্রগাঢ় ক্ষতি হয়।

আরো পড়ুন:  ল. ন. তলস্তয়

৬ নং ‘জভেজদা’, ২২ জানুয়ারি, ১৯১১[৬]

টিকা:

১. নারোদনিক ১৯শ শতকের অষ্টম ও নবম দশকে রাশিয়ায় আবির্ভূত নারোদবাদ নামক একটি ভাবাদর্শগত রাজনীতিক মতবাদের অনুগামী। নারোদনিকরা বিপ্লবী আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃভূমিকা অস্বীকার করত; তাদের ভ্রান্ত মতে বিপ্লব ঘটাতে পারে ক্ষুদে মালিক, কৃষক; সমাজতন্ত্র বিকাশের ভিত্তি বলে তারা ধরত গ্রামগোষ্ঠীকে, যা আসলে ছিলো রুশ গ্রামে সামন্তবাদের জের, ইত্যাদি। নারোদনিক সমাজতন্ত্র ছিল ইউটোপীয়, কেননা সমাজের বাস্তব বিকাশের ওপর তার ভিত্তি ছিলো না, শুধু ফাঁকা বুলি, অলীক কল্পনা, শুভেচ্ছাই ছিল তার সার।

নবম-দশম দশকে নারোদনিকরা জারতন্ত্রের সঙ্গে আপসের পন্থা অবলম্বন করে, কুলাকদের স্বার্থ প্রকাশ করে, মার্কসবাদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর সংগ্রাম চালায়।

২. মার্কস, কার্ল (১৮১৮-১৮৮৩) – মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতা মহান দার্শনিক।—সম্পাদকের টিকা

৩. এখানে এবং নিম্নে ভ. ই. লেনিন বলতে চাইছেন ও উদ্ধৃত করছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের’ তৃতীয় অধ্যায়ের কথা।

৪. লুপ্তিপন্থা – রাশিয়ায় ১৯০৫-১৯০৭ সালের বিপ্লব দমনের পর রুশ মেনশেভিক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ছড়িয়ে-পড়া একটি সুবিধাবাদী ধারা। এই ধারার প্রতিনিধিরা প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক অবৈধ পার্টি তুলে দিয়ে তার পরিবর্তে এমন একটি বৈধ সুবিধাবাদী সংগঠন গড়ার দাবি করত যা শুধু জার কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কাজটুকুই চালাবে।

লেনিন এবং অন্যান্য বলশেভিকরা অক্লান্তভাবে বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতক লুপ্তিপন্থীদের সঙ্গে লড়ে যান। শ্রমিকদের মধ্যে লুপ্তিপন্থার প্রচার কোনো সমর্থন পায় নি। ১৯১২ সালে প্রাগে অনুষ্ঠিত রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির সম্মেলন লুপ্তিপন্থীদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করে।

৫. শান্ত-ভাবের প্রচার হচ্ছে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি যা বিশ্বের প্রতি মানুষের ধ্যানধারণাগত নিষ্ক্রিয় সম্পর্কের কথা প্রচার করত। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানুষের ভাগ্য নাকি পুরোপুরি ‘ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন’।

৬. লেখাটি ভি. আই. লেনিনের সংকলিত গ্রন্থ সাহিত্য প্রসঙ্গে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ৩৮-৪২ থেকে সঙ্কলিত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!