আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাহিত্য > কবিতা > শ্রমিকের বেদনা গীত

শ্রমিকের বেদনা গীত

শ্রমিকের গীত

রাষ্ট্রের কর্তা নই, আমরা আছি গৃহকর্তা,
খবরদারি মাতব্বরি সব ঘরের মধ্যেই,
ফেমেলি, পোলাপান, ঝগড়া,
গালাগাল যে শিল্প তা আমাদের গ্রামে এলে দেখবেন;
এখন নজর টাকার উপর,
স্বপ্নে হলেও দেখি সদর দরজায় দারোয়ান,
ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে খেলনা পুতুল,
ঘোরানো সিঁড়ি, আকাশে আলোকিত গ্রহ, আমাদের নগর,
পরিশ্রম, দৈনন্দিন ঘাম, নাইট ডিউটি, ওভারটাইম,
মনে নয়, দেহেই বেশি ক্লান্তি,
বাদল দিনে হিন্দি গানে,
পত্রিকা, টিভিতে খবর আসে প্রতিদিন আমার অফিসে,
ছোটোবেলার চড় থাপ্পড়, সন্তানের জন্য কান্না, চম্পা বকুলের গন্ধ,
শিশুর ওষুধ, মায়ের শাড়ি,
ছোটোখাটো চুরি, খুঁজে পাওয়া স্কুলের ঘর
পাখির গানে স্মৃতি দেখা,
বিড়ির সংগে বন্ধুত্ব, সিগ্রেট প্রত্যাশি,
স্বপ্ন এবং কয়লাখনি,
কবে ঘরবাড়ি সব উধাও হলো নদী ভাঙনে,
ঘরবাড়ি নিলো সরকার, ক্ষতিপুরণবিহীন;
পুরোনো ঘাট কোথায় হারিয়েছে, কে আর জল আনতে যায়,
রাধারা সব বোতলে বোতলে মিনারেল ওয়াটার খায়
এখন মালখালাসকারি জল আনে কার্ভাড ভ্যানে
পাইপে জল আসে শহরে,
মূল্য দিয়ে কিনতে হয় বোতলে খাবার পানি।

আমার অন্য বন্ধুরা হাঁটে মাঠে ঘাটে সমুদ্রবন্দরে
ওইখানে তারা মাল খালাসকারি
ভাবনা আর চাহিদা অনেক কম তাই এই বেশ ভালো থাকা
মজুরি বাড়লে ভালো হত;
অনেক দিন ভালো ঘুমাইনি,
আমার সমবয়সি বন্ধুরা উপশহরে কাজ করে
টিভি সিনেমা দেখে, ভাত খায়, সিটি মেরে গান গায়
মেয়েরা বড় হয়, বিয়ে দেয়,
মা হয়, মায়েরা বুড়ায়,
বুড়া-বুড়ির যত্নআত্তি পথ্য, মেলা কষ্ট,
আপনার লগে বিড়ি আছে, ধরাইতাম,
মেলা গল্প, পরে শুনবেন, সব অভাবের গল্প একই রকম,
বাঁচার নিয়মে ফুর্তি, মাঝে মাঝে পালাইতে মন চায়,
পাখির মতো ছোট্ট মেয়েটা চিড়িয়াখানায় যেতে চায়,
ওর হাতি খুব পছন্দ, ও মানুষজন অপছন্দ করে।

বুঝলেন নিজে ভাল হলে বিপদ বেশি,
অন্যকেও ভাল করা লাগে,
নীতি চাই, মাইর দিয়া খুব কম কাজই হয়,
তদুপরি শক্তি প্রদর্শন এক বিশাল ফ্যাক্টর,
আমার প্রথম টার্গেট শিশুরা সুন্দর হবে,
ওরা ভুলপথে যাবে না,
দাস ক্যাপিটাল, মানে শোষণবিহীন দুনিয়া, কার্ল মার্কস,

আরো পড়ুন:  মাওবাদ ও জনগণের আমরা

পৃথিবীর সারা শরীরে ব্যথা,
মলম দেবে কে,
কষ্টের কাজ পৃথিবীকে মাথায় বহন,
তার চেয়ে ভালো হয় এটিকে কোনো ভাগাড়ে ফেলে দিলে।

মাটি কাটার জটিল কাজে শ্রমিকের জীবন অন্তহীন,
সত্যকে মাটির গভীরে পাওয়া যায় না,
পোড়া সত্য পোড়া মাটিতেই থাকে,
অর্ধসত্য মিথ্যাবাদির ঘরে ইট বালু পাথরের সংগে মিশে যায়
রিক্সাঅলা, ফেরিঅলার জীবনের অর্থ এবং
আলকাতরা জ্বালিয়ে হয় নতুন শহর,
পুড়ে যায় দেহের স্বাদ,
আমার পড়শি চাকার গতি বাড়াতে ব্যস্ত মানুষ
অথচ তাদের জীবনের চাকা ঘোরে না,
গতিহীন আরো অনেকের সাথে আমরা থেমে যাই,
শুধু বাড়ে উপরতলার লিফটের গতি,
উপরে বিশাল ছাদ, নিচে আমি চিহ্নহীন
চিহ্ন রাখি ভালোবাসার,
মৃৎশিল্প গড়ে কেউ, ফুল রাখে কেউ ফুলদানিতে,
হাতে হাত রেখে কয়েকজন হলো শক্তিশালি,
প্রতিবাদি হতে গিয়ে কেউ হলো সুবিধাভোগি,
কেউ আদম ব্যবসার দালাল,
দাদাগিরি চোরাচালানি নারী পাচারকারি,
আজকাল মেপে মেপে দেহ বিক্রি হয় গজ ও ফিতায়,
বিক্রি হয় হৃদপিন্ড, পাপড় ভাজা, নতুন মিস্ত্রি,
কে বেশি ভাত খায়; — আধুনিক দাস না গৃহের দাসি
কে বলে আরাম নাই, আরো আরাম চাই;
কে জিগায়, কোথায় চলেছো বাজান।
উত্তরে কে বলে আশা নগরে আশা কেনা যায় কেজি দরে
কে ভাবে, কীভাবে হবে শ্রমদাসের অবস্থার উন্নতি।

এখন তাই শহরের সবাই শক্ত পাথরে খোদাই করে লেখে
দুই সম্রাজ্ঞীর নাম।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায়
আগামির মানুষেরা গণতান্ত্রিক হবে কী হবে না এই নিয়ে বক্তৃতা,
পত্রিকা বিক্রি লাল অক্ষরে,
শেষকালে ঝাড়ুমিছিল,
একটা ছেঁড়া টাকা বা ভাঙা কয়েন,
শেষমেষ দাদা, সাদা কাগজে মাতলামি,
রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রধর্ম, হিন্দু ট্রেন, মুসলমান বাস, পাদ্রী রাষ্ট্র
এইসব নিয়ে কবিতা!

দাদা, কবির কী দোষ,
স্নেহ আর চর্বি, তেল আর পিচ্ছিল বিপ্লবের
পার্থক্য কবি কতটুকু আর বোঝে,
কুলি আর বেলির প্রেম,
শেলির কবিতা আর গীতবিতানের গান,
জলে ডোবা নদী,
পানি খায় পানকৌড়ি সকাল থেকে সন্ধা অবধি,
ডুবে কোনো ক্লান্তি নাই,
মাথার খুলিতে মগজ নাই,
আর একবার সামলালেই
সব ঠিক হয়ে যাবে,
ভরসা চাই ভরসা দাও, সুযোগ আর সম্ভাবনা
তাহলেই এসে যাবে নতুন কবিতা
নতুন বিপ্লব

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page