আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাহিত্য > কবিতা > আধুনিক নেতাদের পচনক্রিয়া

আধুনিক নেতাদের পচনক্রিয়া

নেতারা আকৃষ্ট করেছে আলোর মতো,
তার কাছে ছুটে গেছে অনেকেই,
যেমন যায় ছোট পোকা আগুনের কাছে মৃত্যুর সাথে সখ্যতার জন্য,
আপেক্ষিক জীবনের হিসেবে কতোটুকু ভুল হলে
মৃত নক্ষত্রের আলো দেখা যায়,
যে নেতা এখনো আছে আমাদের অনুভবে,
যে বাড়েনি ভোরের আলোর মতো,
যে মিশেছে জনতার সাথে,
যে চিহ্ন রেখে চলে গেছে নিজের গন্তব্যে,
সেই তাকে আমি দেখতে চাই
হাজারো মানুষের ভিড়ে;
তিনি একক মোহনায়
এক মোড়ে এক রাস্তার মালিক।

আর আমি আর আমরা গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হাঁটি,
দেখি নীল গাই, শালিক, চিত্রল হরিণ,
কয়েকটি বাঘ খেলছে ভোরবেলা তৃনভুমিতে,
মাঘের শীতে এক ঘাটে বাঘে-মহিষে বন্ধুত্বের জল খাওয়া,
দুরে অনেক দুরে মাইকে শ্লোগান শুনছি,
বিপ্লব মহাকালীন হোক
এবং নদী তীরে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম
বাপুজি নেংটি খুলে বসেছেন গঙ্গার তীরে,
আর এক বিশালদেহী দৈত্য বলছে,
‘ছাড়ুন বাপুজি ছাড়ুন পেট উজাড় করে ছাড়ুন’,
কিন্তু বাপুজি পারছেন না, প্রচুর কোষ্ঠকাঠিন্য
অনেক কষ্টে বায়ুর গর্জন ছাড়লেন
দৈত্যের মেজাজ বিগড়ে গরম
ধমকালেন ছাড় বেটা ছাড়, তোর পুরো ভরতের উপর ছাড়,
তিনি ধমক খেয়ে আবার বায়ু ছাড়লেন,
এবার আরো রেগে ধমকের সংগে দৈত্য বললো,
শুয়োরের বাচ্চা ছাড়, ভারত জননীর উপরে ছাড়,
সাত বোনের উপরে ছাড়, গঙ্গা জলে ছাড়,
দিল্লি, আগ্রা, তাজমহল, গ্রন্থ, বন্দর;
সবকিছুর উপরে ছাড়,
বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ, অরবিন্দর উপরে ছাড়,
তেত্রিশ কোটি সন্তানের উপরে ছাড়,
দেখলাম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাপুজি একটু কালো পিণ্ড ছাড়লেন,
দৈত্য আবার ধমকালো, ঢ্যামনার পুত, ছাড়
তোর বাপ নেহেরুকে ডেকে এনে সর্বভারতের উপর ছাড়,
বাপুজি ডাকামাত্রই নেহেরু এসে
পুরো গঙ্গায় হড়হড় ভড়ভড় করে পুরো নদী বোঝাই করলেন,
আর বাপুজি, নেহেরুজীর দেখাদেখি এলেন
আরো অনেক নির্বাচিত অনির্বাচিত ছাড়নবীরেরা,
পাকিস্তানী বাঙলাদেশি জানোয়ারেলরা;
গঙ্গা নদী ও তীর পূর্ণ করলেন,
এরপর তারা যমুনা ইরাবতী, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা,
সর্বত্র সব নদীর তীরে প্রফুল্লচিত্তে ছাড়তে থাকলেন,
গোটা ভারতে কর্মযজ্ঞ শুরু হলো
রাজধানীগুলোতে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় খোলা হলো
সে বস্তু রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল
সে বস্তু ভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প
গবেষক ও বিজ্ঞানিতে গোটা দেশ ছেয়ে গেলো
পত্রিকায় সেটির কেলেঙ্কারি নিয়ে খবর বের হতে থাকল
ওই বিষয়ক বক্তৃতা বিবৃতি প্রবন্ধ সেমিনার হাততালি ইত্যাদি হলো,
অনেক মন্ত্রি ওটিকে প্রণাম করা শুরু করলো
ওটির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে অনুতাপ অনুশোচনায়
মুখ কাচুমাচু করে চোখ দুটো নামিয়ে রাখলো,
সেটি ভক্তি বিষয়ক উপাসনালয় খোলার জন্য
কতিপয় বেয়াড়া ছোকরা দুএকদিন শ্লোগান দিলো
সেটি রপ্তানি আমদানি ইত্যাদিতে জনতা কর্মমুখর হলো
আই এম এফ বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দিলো,
প্রকল্প পরির্দশনের জন্য বিদেশিদের আনাগোনা বাড়লো
ওটি বিষয়ক বিশাল বিশাল বই ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাষায়
লেখা হতে থাকলো
বিদেশি গবেষকরা
গবেষনণায় নিত্য নতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত করলো,
কালো লাল নীল সবুজ হলুদ তৈলাক্ত নরম শক্ত জলীয় পাতলা
ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বর্জ প্রক্রিয়াজাত হতে থাকলো।
মুতের দামও বাড়লো
গ্যাসের দাম বাড়লো
ফলে এসবে ভেজাল দেয়া শুরু হলো

আরো পড়ুন:  চা, ইলেকশন এবং ইতিহাস

২০০১ সালে নতুন মন্ত্রি গোয়ায় পাইপ লাগিয়ে গ্যাস রপ্তানী করতে চাইলো,
ফলে নতুন শতকে খাঁটি বর্জ ও বায়োগ্যাস পাওয়া খুব কঠিন হলো।
আমরা নিরাশ হলাম না

আমরা আশা ছাড়লাম না

আমরা কতিপয় লোক সঠিক নতুন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায়
আবাদের জন্য উদগ্রিব হলাম
মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টাতে পারে
আমরা দুএকজন অবস্থার হেরফের ঘটানোর জন্য নড়াচড়া শুরু করলাম,
কিন্তু মাঝে মধ্যেই অতীত এসে ভিড় করে, হতাশা ভিড় করে,
নেতাজির প্রেতাত্মারা ফিসফিস করে।

সুবিধাভোগিরা ধ্বংস করতে চায়;
শীতকালে একদিন ফুটবল খেলা দেখতে গেলাম
আমরা সাহস পেলাম একটি গরুর খেলা দেখে,
আহা, কী চমৎকার গরু, কী তার শক্তি, কী চমৎকার তার গোবর,
এরকম চমৎকার গরুরই দরকার খেলোয়াড় হিসেবে,
আমরা মুগ্ধ বিমুগ্ধ,
আহা হা কী আনন্দদায়ক ও মর্যাদাকর দৃশ্য
দেশের ভুলুন্ঠিত মান এরকম গরুই পারে ফেরাতে
খেলা শুরু হলো সীমান্তের সর্বত্র
আহা হা কী দারুণ আক্রমণ বিপক্ষ দলকে;
এই প্রথম দেখলাম গরু ব্যাজ পরছে, সেনানির পোশাক পরছে,
বাহবা মারহাবা এরকম যোদ্ধা গরুইতো চাই,
যুদ্ধংদেহি খোলায়াড় উপযোগি দি অক্স
কী চমৎকার লেজ, লেজের মাথায় একগোছা শক্ত চুল,
কী আনন্দদায়ক ফিতা কাটার ভংগি,
আহা কী চমৎকার! বিপক্ষের খেলোয়াড়দের সাথে হ্যান্ডশেক করে
পাশে বলদেরা হাততালি দিচ্ছে,
ষাঁড়েরা খুশিতে গদ গদ, গাভীরা আনন্দনৃত্য করছে,
বাছুরেরা লেজ উঠিয়ে লাফাচ্ছে,
আহা ওইতো জাতীয় সঙ্গীত বাজলো, কী মোহনীয় সুর
খেলা বন্দ।
জিতে গেলো গরুর টিম,
মারহাবা মারহাবা, সকলেই খুশি
পুরষ্কার বিতরণ শেষ, সুখবর সুখবর সুখবর,
ফুটবল খেলায় বিজয়িরা বিজয় উৎসব পালন করবেন,
অদ্য বিকেলে উপস্থিত থাকুন স্টেডিয়ামে।

আমরা পাড়া প্রতিবেশিরা সেন্ডেল, কোদাল ঝাড়ু হাতে
মাঠে উপস্থিত হলাম,
উপস্থিত হলেন মহামান্য শাহজাদা শাহজাদী পীরজাদা পীরজাদীরা,
তারা বিস্তর বক্তৃতা করলেন হাত পা ছুঁড়ে
মাথাহীন মানুষদের সামনে,
শ্লোগান শুরু হলো মরণবাদ জিন্দাবাদ,
সাঁই সাঁই করে আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছিলো,
পাতি নেতাদের বক্তৃতার পর
মূল নেতা বক্তৃতা শুরু করলেন
আজ যে শাহান শাহ এখানে উপস্থিত
তিনি ক্ষমতায় এলে আর কোনো মাগীর ভাতার দরকার হবে না,
আমাদের শাহজাদা ক্ষমতায় এলে আর কোনো ভাতারের মাগীর দরকার হবে না
আমাদের শাহজাদা বহুত রসালো আর তৈলাক্ত,
হের ফুঁ দেয়া পানিপড়া খাইলে সব মাগীরা গাভীন হয়ে যায়,
আর মরদেরা পোলাপানের বাপ,
আর শোন হারামজাদারা, তোরা আর একবার ভোট দে,
এইবার ভোট দিলেই নদী দিয়া আর বালু পাথর আসবে না,
কেবল সোনা রূপা আসবে,
এইবার ভোটে জিতলেই চুতরা গাছে কলা ধরবে, ধুতরা গাছে ডাব
মাকাল গাছে মূলা ধরবে, ভেন্না গাছে গাব
তোরা ভোট দিলেই আমাদের শাহ সুলতানজাদা সব ফকফকা করে দেবে,
আর গত সরকারের সময় কষ্টে যাদের পুটকি দিয়া
এখনো ধুয়া বের হইতেছে তাদের গোয়ায় ভাপা পিঠা
সিদ্ধ কইরা বিদেশে রপ্তানি করা হইবো আমরা ক্ষমতায় আইলে,
সবাই আমাগো জানের জান কলিজার আধখান হইবা,
এই বইলা শেষ করলাম
সবাই আমাগো শাহজাদা শাহজাদীদের কুর্নিশ কর, মরণবাদ জিন্দাবাদ।
(চতুর্দিকে অফুরন্ত হাততালি)

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page