গতিশীল কালের জননী

ও নদী,

তোমার বুকে আজ

ধ্বংসের বিশুষ্ক ঝিলিক,

শাখা প্রশাখায় উড়ছে মৃত্যু আগমনি

বাঁশির ধূলা, পাহাড় তোমার চলার পথে গড়েছে

পাথুরে  প্রতিবন্ধকতা, শুখা মরুভূমি মারীভূমি বানিয়েছে ধূধূ

বালিয়াড়ি; গুমোট শীত রাত্রি এনেছে চলমান হিংসুটে হাড় কাঁপানো হিংস্রতা,

তোমার প্রবহমানতা কী থামিয়ে দেবে তুমি? ঘৃণায় কি জল দেবে না

আমাদের, তরুণ তরল জল, সেই জলের জীবনও তো উচ্ছ্বল

যেন স্বচ্ছ পুকুরে মিঠে রোদ্দুরে নাচতে থাকা

বাঙলার ইলিশের পোনা; আর আমরা

তৃষিত শরীর মাথায় নিয়ে কীভাবে

টিকে থাকি চলচ্ছক্তিহীন

ভংগুর নিঃস্বার্থ বন্ধু

ক’জন।

 

ও নদী,

তুমি জেনে যাও

আমরা পশুর মতো বেঁচে আছি

বোধহীন বুদ্ধিহীন, চর্তুদিকে অজস্র কাঁটাময় দেয়াল,

জলহস্তি ও গন্ডারের চামড়াঅলা অতীতের প্রভুর আদেশ

পালনকারি বাজপাখির শত শত চোখ বেয়নেট

বুট বুলেট বাইবেল নিয়ে আমাদেরকে গ্রাস

করছে, তোমাকেও করবে গ্রাস সহস্র

ভয়ংকর থাবা, শাসনের বেড়ি

মৃত্যুপ্রকল্প ও ভাটার মতো

আগুনঝড়।

 

ও নদী,

তুমি জল দাও, শুকনো

গলায় গাইবো না আর নতুন বসন্তের

কালজয়ি কোকিলার আগমনি সময়ের গান। হে নদী,

যারা লাঙল চষতে চষতে মুখে ক্লান্তির ফেনা তোলে, রিকসার  

প্যাডেলে মমতার মলম লাগায় পরম আদরে, যারা জীবন বাঁচাতে সাধের

বাস্তুভিটা ত্যাগ করে, জীবন সাজাতে শহরতলির খুপরিতে মা বোন ভাইয়ের

মানকে মিশিয়ে দিয়েছে সভ্যতার নানা শিরা উপশিরায়, যারা মধ্যরাতে

মধ্যযুগীয় র্ববরতা সহ্য করে কারাগারে শ্লোগান তোলে পাগলা

ঘন্টির মতো, তাদের কান্নার পাশে, ব্যথার চর্তুদিকে

প্রত্যুষের সুখময় খবরের মতো

উন্মাতাল ঢেউ হয়ে

তুমি এসো।

 

ও নদী,

যারা স্বপ্নের সৌধ

গড়েছে এশিয়া ও আফ্রিকায়,

লাতিন আমেরিকায়, সৌরমন্ডলের ভিতরে

সৌরমন্ডলের বাইরে, নীহারিকা ও ছায়াপথে;

তাদের সাথে মিতালি গড়ে নির্মাণ হতে চলেছে গেরিলার

ভাঙা বুকে প্রেমিকার দংশিত ঠোঁট, স্ফটিকের মতো ঝকঝকে

সুগভীর সুন্দর রঙের সীমানাবিহীন উষ্ণতা। নক্ষত্রের মতো যারা উজ্জ্বল হতে

আরো পড়ুন:  বাঁশিঅলা

শিখেছে, যারা ভালোবেসেছে জেলির মতো নরোম এবং পাহাড়ের মতো

সুঠাম আর ইটের গাঁথুনির মতো অপরাজেয় কবিতা, যারা

ভালোবেসেছে পাখির প্রাণবন্ত উৎফুল্ল কিচির মিচিরের

মতো বাক্যস্রোত, যারা ভালেবেসে সকালের রোদ

ও বিকেলের কুয়াশা ধরতে জানে, প্রতিদিন

মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও যারা বাঁচাতে

জানে, ডুবতে জানে প্রাণের স্পন্দনে

দক্ষ সাঁতারুর মতো গভীরতম

সমুদ্রে, তাদের কাঁধে, ও নদী,

তুমি আগুন ছন্দের

মালা পরিয়ে

দিও।

 

ও নদী,

আমরা অপেক্ষায়

আছি তোমার ভয়ংকর কমনীয়

রূপ দেখার জন্য, তুমি আসবে; তোমার

অশান্ত আবেগ আছড়ে পড়বে শীতল সুন্দর বেলনাকার

তুষারাবৃত্ত অঞ্চলের উপর; তারপর উষ্ণ হতে থাকবে নিউইর্য়ক লন্ডন

কায়রো দিল্লি ইজরায়েল প্যালেস্টাইন অশান্তিনগর শান্তি নিকেতন,

ডাকবে বান তোমার দরজার তীরে, টেমস গঙ্গা ভাগিরথি

নীল কংগো ইয়াংসি ব্রহ্মপুত্র টাঙনের বুকের উপরে,

আমাদের বুকের মধ্যখানে বয়ে চলা জলহীন

নদীটির গভীরে, আর আমরা কজন

সময় বদলের সামনের সারিতে

তরতাজা জীবন আবৃত্তি

করে দেখাতে

চাই।

 

৩০.০৭.২০০২-০৭.০৮.২০০২

চিত্রের ইতিহাস: কবিতায় ব্যবহৃত অংকিত চিত্রটি এডউইন লর্ড উইকসের (১৮৫৯-১৯০৩) আঁকা গঙ্গা থেকে জল বহন (Water Carriers of the Ganges)। এখানে চিত্রটিকে নিচে সামান্য ছেঁটে ব্যবহার করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!