প্রতীকবাদ ছিল উনিশ শতকের শেষার্ধে কবিতা ও অন্যান্য শিল্পকর্মে শিল্প আন্দোলন

প্রতীকবাদ বা প্রতীকীবাদ (ইংরেজি: Symbolism) ছিল উনিশ শতকের শেষার্ধে ফরাসি, রুশ এবং বেলজিয় ভাষা-উদ্ভূত কবিতা এবং অন্যান্য শিল্পকর্মে একটি শিল্প আন্দোলন। সাহিত্যে, সিম্বলিস্ট মুভমেন্ট বা প্রতীকী আন্দোলন যথার্থভাবে গড়ে ওঠে ফ্রান্সে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। বােদলেয়ারের ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত Fleurs du Mal গ্রন্থের মাধমে এর যাত্রা শুরু হয়। এডগার অ্যালান পোয়ের রচনাগুলি, যা বোদলেয়ার প্রচুর প্রশংসা করেছিলেন এবং ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। এলান পোয়ের অনূদিত সেসব রচনার একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ও উৎস ছিল অনেক সঞ্চিত বক্রোক্তি এবং চিত্ররূপের। ১৮৬০ এবং ১৮৭০-এর দশকে স্টেফেন ম্যালার্মি এবং পল ভার্লেইনের মাধ্যমের এই নান্দনিক দিকটি তৈরি করা হয়েছিল। ১৮৮০-এর দশকে, এই নান্দনিক আন্দোলন একাধিক ইশতেহার দ্বারা প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেই প্রজন্মের লেখকদের আকর্ষণ করেছিল। “প্রতীকবাদী” শব্দটি প্রথম সমালোচক জাঁ মোরেয়াস প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি সাহিত্য ও শিল্পে প্রতীকবাদীদের থেকে অবক্ষয়ীদের আলাদা করার জন্য এই শব্দটি আবিষ্কার করেছিলেন।

পূর্বসূরি এবং উৎস

প্রতীকবাদ মূলত প্রকৃতিবাদ এবং বাস্তববাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া ছিল। সেই অর্থে এই আন্দোলনটি ছিল মূলত একটি প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্য আন্দোলন, যেটি পুঁজিবাদী সমাজের মানুষের জীবনকে না ফুটিয়ে তুলে প্রতীকী উপস্থাপনায় আগ্রহী ছিল। যেহেতু এটি যৌনতা ও নিষিদ্ধ বিষয়ে আগ্রহী ছিল না, সেই হিসেবে এই আন্দোলন ছিলো নতুন পুঁজিবাদী নষ্টামোর বিরুদ্ধে এক সচেতন প্রতিবাদ।

প্রতীকবাদ নম্র ও গতানুগতিককে ভাবের উপরে স্থান দিয়েছিল। প্রতীকবাদ ছিল আধ্যাত্মিকতা, কল্পনা এবং স্বপ্নের পক্ষের একটি প্রতিক্রিয়া।[১] কিছু লেখক যেমন জরিস-কার্ল হুইসমানস প্রতীকবাদী হওয়ার আগে প্রকৃতিবাদী হিসাবে সাহিত্য চর্চা শুরু করেছিলেন; হুইসমানসের পক্ষে এই পরিবর্তনটি তাঁর ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। অবক্ষয়ীদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিষয় যেমন যৌনতা এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলির মধ্যে প্রকৃতিবাদীদের আগ্রহ প্রকাশ পেত, তবে প্রতীকবাদীদের ক্ষেত্রে এটি বায়রনিক রোমান্টিকতাবাদ এবং শতাব্দীর শেষের দশকের জগত-শ্রান্তি বৈশিষ্ট্যের সাথে মিশ্রিত হয়েছিল।

আরো পড়ুন:  Socialism as a Way to Achieve Political and Economic Freedom

প্রতীকবাদীরা থিওফিল গৌটিয়ারের “শিল্পের জন্য শিল্পের” লক্ষ্যটির প্রশংসা অব্যাহত রেখেছিলেন। স্টাফেন ম্যালার্মি এবং পল ভার্লাইনসহ অনেক প্রতীকবাদী কবি সমকালীন কবিতার দৃশ্যে (ফরাসি: Le Parnasse contemporain) তাঁদের প্রাথমিক রচনাগুলি প্রকাশ করেছিলেন, কাব্য সংকলনটি পার্ন্যাসিয়ানিজম নামটিসহ সেই চিন্তাকে ধারণ করেছিল।

প্যারিসে প্রতীকবাদের অন্যতম বর্ণিল প্রচারক হলেন শিল্পী ও সাহিত্যিক সমালোচক জোসেফিন পেলাডন, যিনি সেলুন ডি লা রোজ + ক্রিক্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেলুনটি ১৮৯০-এর দশকে শিল্প, রচনা এবং সংগীতের অগ্রদূত হয়ে ছয়টি প্রদর্শনীর একটি সিরিজ আয়োজন করেছিল, যেখানে আধ্যাত্মিকতাবাদ, রহস্যবাদ এবং ভাববাদকে আলিঙ্গনকারী শিল্পীদের কাজগুলিকে উপস্থাপনের স্থান দেওয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকটি প্রতীকবিদ সেলুনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

ইংরেজি সাহিত্যে প্রতীকবাদ

ইংরেজি সাহিত্যের অনেক কবি তাঁদের কাব্যে ব্যক্তিগত প্রতীক ব্যবহার করেছেন। যেমন, প্রভাত, সন্ধ্যাতারা, উজান ঠেলে এগিয়ে যাওয়া নৌকা, সর্পিল গুহা, সাপ ও ঈগলের সংঘর্ষ প্রভৃতি প্রতীক শেলীর কবিতায় বারবার এসেছে। তবে তাঁর সমসাময়িক আর সব কবিদের এই দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন উইলিয়াম ব্লেক। ব্লেক তার গীতিকবিতায় যেমন, তেমনি ধর্মীয় মহাকাব্যিক রচনায় ও জীবনভর প্রতীকের ব্যাপক ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিলেন। ইউরােপ ও আমেরিকার অনেক কবিও এই ভাব-আন্দোলন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।[২]

১৮৯০ এর দশক এবং পরবর্তীকালে এই প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। আর্থার সিমনস, আর্নেস্ট ডসন, ইয়েটস, এলিয়ট, পাউন্ড, ডিলান টমাস, হাট ক্রেন, ই.ই. কামিংস এবং ওয়ালেস স্টিভেন্স প্রমুখের কবিতায় সিম্বলিস্ট মুভমেন্টের পরিচয় পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র

১. Balakian, Anna, The Symbolist Movement: a critical appraisal. Random House, 1967, ch. 2.
২. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ১২৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!