গোর্কির বহিষ্কার সম্বন্ধে বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকার গালগল্প

কয়েক দিন হলো বিভিন্ন বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকা — ফ্রান্সের ‘ল্য’একলের’, ‘ল্য’রাদিকাল’, জার্মানির ‘বার্লিনের তাগেব্লাৎ’, আর রাশিয়ার ‘উত্রো রসিই’, ‘রেচ’, ‘রুস্কোয়ে স্লোভো’, ‘নোভয়ে ভ্রেমিয়া’ ঠোঁটে চুমকুড়ি কাটছে অতীব চাঞ্চল্যকর একটা খবর নিয়ে: সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে গোর্কির[১] বহিষ্কার। এই বাজে রিপোর্টটাকে খণ্ডন করে ‘ফরভাৎর্স’এ[২] ইতিমধ্যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ‘প্রলেতারি’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীও একটা প্রতিবাদ পাঠিয়েছে কয়েকটা সংবাদপত্রে, কিন্তু বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকা তা তুচ্ছ করে কুৎসাটাকে রটিয়েই চলেছে।

এর উৎপত্তিটা দেখা যায় সহজেই: প্রত্যাহারপন্থা[৩] আর ঈশ্বরগড়া[৪] নিয়ে মতদ্বৈধের (সাধারণভাবে পার্টিতে এবং বিশেষত ‘প্রলেতারি’তে বিষয়টা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হয়েছে প্রায় এক বছর ধরে) ফিসফিসানি হঠাৎ শুনে ফেলেছে কোনো ভাড়াটে লেখক, তথ্যের টুকরোগুলোকে জুড়তে গিয়ে সে পাকিয়ে তুলেছে একটা শয়তানী জগাখিচুড়ি, আর কল্পিত ‘ইন্টারভিউ’ থেকে ‘কামিয়ে নিয়েছে বেশ দু’পয়সা, ইত্যাদি।

এই কুৎসা অভিযানের উদ্দেশ্যও কিছু কম স্পষ্ট নয়। গোর্কির সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ছেড়ে যাওয়াটা বুর্জোয়া পার্টিগুলোর মুনাসিব। সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে মতদ্বৈধ উসকে তুলতে এবং সেগুলোর বিকৃত চিত্র তুলে ধরার জন্যে বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলো কোনো চেষ্টার ত্রুটি করছে না।

তাদের খাটুনি বৃথা। কমরেড গোর্কি তাঁর বিরাট শিল্পকর্মগুলি দিয়ে রাশিয়ায় এবং সারা পৃথিবীতে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যা ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয়েছেন তাতে তাঁর জবাব হতে পারে শুধু অবজ্ঞাই।

৫০ নং প্রলেতারি’, ২৮ নভেম্বর (১১ ডিসেম্বর), ১৯০৯ [৫]

টিকা:

১. গোর্কি, ম্যাক্সিম (আলেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভ) (১৮৬৮-১৯৩৬) রুশ লেখক, সোভিয়েত সাহিত্যের জনক। — সম্পাদকের টিকা

২. ‘ফরভাৎর্স’ ‘Vorwarts (‘আগুয়ান’) ছিলো দৈনিক সংবাদপত্র, জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র; প্রকাশিত হয় বার্লিনে ১৮৯১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত।

৩. প্রত্যাহারপন্থা (অৎজোভিজম) — বলশেভিকদের মধ্যে সুবিধাবাদী একটি গ্রুপ, উদ্ভব হয় ১৯০৮ সালে। বিপ্লবী বুলির আড়ালে প্রত্যাহারপন্থীরা তৃতীয় রাষ্ট্রীয় দুমা থেকে সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার এবং বৈধ সংগঠনগুলিতে কাজ বন্ধের দাবি জানাত। প্রতিক্রিয়াশীলতার সময় পার্টির উচিত একমাত্র অবৈধ কাজ চালানো —এই কথা বলে প্রত্যাহারপন্থীরা দুমায়, শ্রমিক ট্রেড-ইউনিয়নে, সমবায়ে এবং অন্যান্য অসংখ্য বৈধ ও অর্ধ-বৈধ সংগঠনে অংশ নিতে অস্বীকার করত। একমাত্র গুপ্ত বেআইনী সংগঠনেই পার্টির সমস্ত কাজ কেন্দ্রীভূত করা দরকার বলে তাদের ধারণা ছিল।

আরো পড়ুন:  আবশ্যিক রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজন আছে কি?

৪. ঈশ্বর-গড়া — মার্কসবাদের বিরোধী ধর্মীয়-দার্শনিক এক ধারা। ১৯০৭ থেকে ১৯১০ সালের স্তলিপিন প্রতিক্রিয়াশীলতার সময় এই ধারাটির উদ্ভব হয় এমন কিছু, পার্টি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যাদের মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুতি ঘটে ১৯০৫-১৯০৭ সালের বিপ্লবের পরাজয়ের পর। ঈশ্বর-গড়িয়েরা নতুন ‘সমাজতান্ত্রিক ধর্ম সৃষ্টির কথা বলত, চেষ্টা করত ধর্মের সঙ্গে মার্কসবাদের আপস করাতে। ১৯০৯ সালের জুন মাসে ‘প্রলেতারি’র সম্পাদকমণ্ডলীর এক বর্ধিত সভায় ইশ্বর-গড়ার নিন্দা করে বিশেষ এক সিদ্ধান্তে বলা হয় যে, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের এমন ধরনের বিকৃত ভাবধারার সঙ্গে বলশেভিক গ্রুপের কোনো সম্পর্ক নেই।

. লেনিনের প্রবন্ধ ‘গোর্কির বহিষ্কার সম্বন্ধে বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকার গালগল্প’ প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালের ২৮ নভেম্বর (১১ ডিসেম্বর) ‘প্রলেতারি’ পত্রিকার ৫০ নং সংখ্যায়।

১৯০৯ সালের ২৬ নভেম্বর (৯ ডিসেম্বর) ‘উত্রো রসিই’ (‘রাশিয়ার প্রভাত’) পত্রিকার ৪২ নং সংখ্যায় ছাপানো হয় ‘প্রলেতারি’ সম্পাদকমণ্ডলীর একখানা চিঠি। সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে গোর্কিকে বহিষ্করণের ব্যাপারে যে মিথ্যা খবর বেরোয় এ চিঠিতে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। যেসব সংবাদপত্র মিথ্যা খবরটি প্রকাশ করেছিল ‘প্রলেতারি’র সম্পাদকমণ্ডলী তাদের এই প্রতিবাদ-পত্রটি ছাপাতে অনুরোধ করেন।— সম্পাদকের টিকা

লেখাটি ভি. আই. লেনিনের সংকলিত গ্রন্থ সাহিত্য প্রসঙ্গে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ১৯-২০ থেকে সঙ্কলিত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!