দ্বন্দ্ব সম্পর্কে

২. দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা

ব্যাখ্যার সুবিধার্থে আমি প্রথমে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতার কথা আলোচনা করব এবং তার পরে দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতার কথায় আসব। দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা অপেক্ষাকৃত সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কারণ মার্কসবাদের মহান স্রষ্টারা ও উত্তরসূরীরা—মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্তালিন—বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববাদের বিশ্বদৃষ্টি আবিষ্কার করার পর বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববাদকে মানবিক ইতিহাস ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের নানা দিকের বিশ্লেষণে এবং সমাজ ও প্রকৃতির নানা দিকের পরিবর্তন সাধনে (যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে) প্রয়োগ করে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছেন; তার পর থেকে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। পক্ষান্তরে, দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা এখনও অনেক কমরেড, বিশেষ করে মতান্ধতাবাদীরা, পরিষ্কারভাবে বোঝেন না। তাঁরা বোঝেন না যে, দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতার মধ্যেই দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা নিহিত। তাঁরা এটাও বোঝেন না যে, বিপ্লবী অনুশীলনের গতিপথ নির্দেশের জন্য আমাদের সম্মুখীন মূর্ত বস্তুর মধ্যে দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা পর্যালোচনা করা কত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য, দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা পর্যালোচনার ওপর জোর দেওয়া এবং তা যথেষ্ট বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার। এই কারণে বস্তুর মধ্যকার দ্বন্দ্বের নিয়মের বিশ্লেষণে, আমরা প্রথমে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা বিশ্লেষণ করব, পরে দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ জোর দেব এবং পরিশেষে আবার দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতায় ফিরে আসব।

দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা বা অনাপেক্ষিকতার দ্বিবিধ অর্থ আছে। একটি হচ্ছে, সকল বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকে; এবং অপরটি হচ্ছে, প্রত্যেক বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিপরীতের গতি বিদ্যমান থাকে।

এঙ্গেলস বলেছেনঃ “গতি নিজেই একটি দ্বন্দ্ব।”[৫] লেনিন বিপরীতের একত্বের নিয়মের সংজ্ঞাকে “প্রকৃতির (মন ও সমাজ সহ) সমস্ত দৃশ্যমান ঘটনা ও প্রক্রিয়ার মধ্যে পরস্পর বিরোধী, পরস্পর ব্যতিরেকী ও বিপরীত প্রবণতার স্বীকৃতি (আবিষ্কার)” বলে বর্ণনা করেছেন। এইসব অভিমত কি ঠিক? হ্যা, ঠিক। সকল বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান পরস্পরবিরোধী দিকগুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং ঐ দিকগুলোর মধ্যকার সংগ্রাম সকল বস্তুর জীবনকে নির্ধারণ করে এবং সকল বস্তুর বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এমন কিছুই নেই যার মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই; দ্বন্দ্ব ছাড়া জগৎ হতে পারত না।

দ্বন্দ্ব হচ্ছে গতির সরল রূপগুলোর (যেমন যান্ত্রিক গতি) ভিত্তি এবং গতির জটিল রূপগুলোর ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি প্রযোজ্য।

এঙ্গেলস দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে:

“যদি সরল যান্ত্রিক স্থান পরিবর্তনের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে বস্তুর গতির উচ্চতর রূপের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জৈব জীবন ও তার বিকাশের ক্ষেত্রে এটা আরও সত্য। ….. জীবন হচ্ছে প্রধানত ও নিশ্চিতরূপে এই যে, কোনো জীবন্ত জিনিস প্রতি মুহূর্তে সে নিজে যা তাই, অথচ আবার অন্য কিছু। অতএব জীবনও একটি দ্বন্দ্ব যা বস্তুসমূহের ও প্রক্রিয়াসমূহের মধ্যে বিদ্যমান, এবং যা অবিরামভাবে নিজেকে উৎপন্ন ও বিশ্লিষ্ট করে; এবং যে-মুহূর্তে দ্বন্দ্ব থেমে যায়, সেই মুহূর্তে জীবনও শেষ হয়ে যায় এবং মৃত্যু আসে। অনুরূপভাবে আমরা দেখেছি যে, চিন্তার ক্ষেত্রেও আমরা দ্বন্দ্বকে এড়াতে পারিনি এবং দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখেছি যে, একদিকে মানুষের অন্তর্নিহিত সীমাহীন জ্ঞানার্জন—ক্ষমতা, অন্যদিকে যে মানুষেরা বাহ্যিক দিক দিয়ে সীমাবদ্ধ ও সীমিত জ্ঞানের অধিকারী কেবলমাত্র তাদের মধ্যে এই জ্ঞানার্জন—ক্ষমতার বাস্তব রূপায়ণ—এই দুয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তার সমাধান হয়—অন্তত আমাদের পক্ষে, কার্যত—অন্তহীন পুরুষানুক্রমিক ধারায় এবং অসীম প্রগতির রূপে।

আরো পড়ুন:  বস্তু কাকে বলে?

…..উচ্চতর গণিতের একটি মূল নীতি……দ্বন্দ্ব……..এমন কি নিম্নতর গণিতও দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ।”[৭]

লেনিনও এইভাবে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতাকে ব্যাখ্যা করেছেন:

 “গণিতে: + ও -, অন্তরকলন ও সমাকলন।

বলবিদ্যায়: ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া।

পদার্থবিদ্যায়: ধন-বিদ্যুৎ ও ঋণ-বিদ্যুৎ।

রসায়নে: পরমাণুগুলোর সংযোজন ও বিয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানে: শ্রেণীসংগ্রাম।”[৮]  

যুদ্ধে, আক্রমণ ও আত্মরক্ষা, অগ্রাভিযান ও পশ্চাদপসরণ এবং বিজয় ও পরাজয় সবই হচ্ছে পরস্পর বিরোধী ব্যাপার। একটি ছাড়া অপরটির অস্তিত্ব থাকতে পারে না। দুটি দিক একই সঙ্গে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী ও নির্ভরশীল এবং এটাই একটা যুদ্ধের সমগ্রতাকে গঠন করে, এর বিকাশকে সামনে ঠেলে দেয় এবং এর সমস্যাগুলোর সমাধান করে।

মানুষের ধারণায় প্রত্যেকটি পার্থক্যকে দেখতে হবে বাস্তব দ্বন্দ্বের প্রতিফলন হিসেবে। বাস্তব দ্বন্দ্ব আত্মমুখী চিন্তায় প্রতিফলিত হয় এবং এই প্রক্রিয়া ধারণার দ্বন্দ্বের গতিকে গঠন করে, চিন্তার বিকাশকে সামনে ঠেলে দেয় এবং অবিরামভাবে মানুষের চিন্তার সমস্যাগুলোর সমাধান করে।

পার্টির ভিতরে নিরন্তর বিভিন্ন রকমের চিন্তাধারার বৈপরীত্য ও সংগ্রাম ঘটতে থাকে। এ হচ্ছে পার্টির ভিতরে সমাজের শ্রেণিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্বের এবং নতুন ও পুরাতনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। পার্টির ভিতরে যদি কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে এবং তা সমাধান করার জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম না থাকে, তাহলে পার্টির জীবন শেষ হয়ে যাবে।

সুতরাং এটা ইতিমধ্যে পরিষ্কার যে, গতির সরল রূপেই হোক বা গতির জটিল রূপেই হোক, বস্তুগত ব্যাপারেই হোক বা মতাদর্শগত ব্যাপারেই হোক দ্বন্দ্ব সর্বজনীনভাবে বিদ্যমান এবং সকল প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান। কিন্তু প্রত্যেক প্রক্রিয়ার প্রারম্ভিক স্তরেও কি দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকে। প্রত্যেকটি একক বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি বিপরীতের গতি বিদ্যমান থাকে?

দেবোরিন সম্প্রদায়ের সমালোচনা করে লেখা সোভিয়েত দার্শনিকদের নিবন্ধগুলো থেকে দেখা যায় যে, ঐ সম্প্রদায়ের মতে, প্রক্রিয়ার শুরুতে নয় বরং যখন তা একটি নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত হয় কেবল তখনই দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করে। যদি তাই হত, তাহলে ঐ স্তরের পূর্বে প্রক্রিয়াটির বিকাশের কারণ অভ্যন্তরীণ হত না, হত বাহ্যিক। দেবোরিন এইভাবে অধিবিদ্যার বাহ্যিক কারণের ও যান্ত্রিকতার তত্ত্বে প্রত্যাবর্তন করেছেন। মূর্ত সমস্যার বিশ্লেষণে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করে দেবোরিন সম্প্রদায় সোভিয়েত ইউনিয়নে বিরাজমান অবস্থায় কুলাক ও সাধারণ কৃষকদের মধ্যে কেবল পার্থক্য দেখেন, দ্বন্দ্ব দেখেন না, এবং বুখারিনের সঙ্গে সর্বতোভাবে একমত হয়ে যান। ফরাসি বিপ্লবের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁরা বলেন যে, অনুরূপভাবে বিপ্লবের পূর্বে শ্রমিক, কৃষক ও বুর্জোয়াদের নিয়ে গঠিত তৃতীয় এস্টেটের মধ্যে শুধু পার্থক্য ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল না। দেবোরিন সম্প্রদায়ের এসব মত মার্কসবাদবিরোধী। তাঁরা বোঝেন না যে, প্রত্যেক পার্থক্যের মধ্যেই রয়েছে দ্বন্দ্ব এবং পার্থক্যই হচ্ছে দ্বন্দ্ব। শ্রমিক ও পুঁজিপতি শ্রেণি দুটির জন্ম থেকেই শ্রম ও পুঁজির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, শুধু প্রথমে এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠেনি। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নে বিরাজমান সামাজিক অবস্থাতেও শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে দৃঢ় মৈত্রী স্থাপিত হয়েছে এবং সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদ অগ্রগতির পথে ক্রমে এই দ্বন্দ্বের সমাধান হয়ে যাবে। এটি দ্বন্দ্বের চরিত্রে পার্থক্যের প্রশ্ন, দ্বন্দ্বের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির প্রশ্ন নয়। দ্বন্দ্ব সর্বজনীন ও অনাপেক্ষিক এবং এটা সকল বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান এবং সকল প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রবহমান।

আরো পড়ুন:  আমাদের বিপ্লবের কথা

নতুন প্রক্রিয়ার আবির্ভাব দ্বারা কি বোঝায়? যখন পুরাতন একত্ব ও তার গঠনকারী বিপরীত উপাদানসমষ্টির স্থলে আসে এক নতুন একত্ব ও তার গঠনকারী বিপরীত উপাদানসমষ্টি তখন পুরাতন প্রক্রিয়ার স্থলে শুরু হয় এক নতুন প্রক্রিয়া। পুরাতন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় এবং নতুন প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। নতুন প্রক্রিয়ায় নিহিত থাকে নতুন দ্বন্দ্ব এবং এই নতুন প্রক্রিয়া দ্বন্দ্বের বিকাশের নিজস্ব ইতিহাসের সূচনা করে।

 লেনিন যেমনটি দেখিয়েছেন, সকল বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে বিপরীতের গতি বিদ্যমান থাকে, সে সম্বন্ধে মার্কস তাঁর “ক্যাপিটাল” গ্রন্থে এক আদর্শ বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছেন। যে কোনো বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়াকে পর্যালোচনা করতে হলে এই পদ্ধতি অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে। লেনিন নিজেও সঠিকভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে গেছেন এবং তাঁর সব রচনায় তা অনুসরণ করেছেন।

“মার্কস তাঁর ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে প্রথমে বিশ্লেষণ করেছেন বুর্জোয়া (পণ্য) সমাজের সবচেয়ে সরল, সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে মৌলিক, সবচেয়ে সর্বজনীন, সবচেয়ে প্রাত্যহিক সম্পর্কটির, কোটি কোটি বার দেখা দিচ্ছে এমন সম্পর্কটির, অর্থাৎ পণ্য বিনিময়ের। এই অতি সরল দৃশ্যমান ঘটনাটিতেই (বুর্জোয়া সমাজের এই ‘জীবকোষ’টিতে) বিশ্লেষণ আধুনিক সমাজের সকল দ্বন্দ্বকে (বা সকল দ্বন্দ্বের বীজকে) উদ্ঘাটন করে। পরবর্তী ব্যাখ্যা আমাদের দেখিয়ে দেয় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এইসব দ্বন্দ্বের এবং এই সমাজের আলাদা আলাদা অংশের যোগফলের বিকাশ (বৃদ্ধি ও গতি উভয়ই)।”

এর পর লেনিন আরও বলেছেন: “সাধারণভাবে দ্বন্দ্ববাদকে ব্যাখ্যার (বা পর্যালোচনার) পদ্ধতি এরূপই হতে হবে।”[৯]

চীনের কমিউনিস্টদের অবশ্যই এই পদ্ধতি শিখতে হবে; কেবল তাহলেই তাঁরা সঠিকভাবে চীনের বিপ্লবের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করতে এবং বিপ্লবের ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সক্ষম হবেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!