দ্বন্দ্ব সম্পর্কে

৩. দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা

সকল বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব বিদ্যমান এবং প্রত্যেক বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রবহমান। এটাই হচ্ছে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা ও অনাপেক্ষিকতা যা আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এখন আমরা দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা ও আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে আললাচনা করব।

এই সমস্যাটি কয়েকটিকে পর্যায়ে পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রথমত, পদার্থের গতির প্রত্যেক রূপের মধ্যে দ্বন্দ্বের নিজস্ব বিশিষ্টতা রয়েছে। পদার্থ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান হচ্ছে পদার্থের গতির রূপগুলো সম্পর্কে জ্ঞান, কারণ গতিশীল পদার্থ ছাড়া বিশ্বে অন্য কিছুই নেই এবং এই গতিকে অবশ্যই কোনো রূপ পরিগ্রহ করতে হবে। পদার্থের গতির প্রত্যেক রূপ বিচার করার সময়ে, ঐ রূপের সঙ্গে গতির অন্যান্য রূপের যে সব বিষয়ে মিল রয়েছে তা লক্ষ্য করতে হবে। কিন্তু যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়, যেহেতু এর দ্বারাই বস্তু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি গঠিত, তা হলো এই যে, পদার্থের এইরূপ গতির বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে হবে, অর্থাৎ ঐ রূপের সঙ্গে গতির অন্যান্য রূপের গুণগত পার্থক্য লক্ষ্য করতে হবে। তা করলেই কেবল আমরা বস্তুসমূহের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারব। গতির যে কোনো রূপের মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে তার নিজস্ব বিশেষ দ্বন্দ্ব। এই বিশেষ দ্বন্দ্ব বিশেষ মর্ম গঠন করে যা একটা বস্তুকে অপর বস্তু থেকে পৃথক করে। এটা হচ্ছে বিশ্বের বস্তুসমূহের বহু বৈচিত্র্যের অভ্যন্তরীণ কারণ বা বলা যেতে পারে ভিত্তি। প্রকৃতিতে গতির অনেক রূপ আছে, যান্ত্রিক গতি, শব্দ, আলো, তাপ, বিদ্যুৎ, বিয়োজন ও সংযোজন প্রভৃতি। পদার্থের এই সমস্ত গতির রূপই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, এবং আবার মর্মের দিক দিয়ে পরস্পর থেকে আলাদা। পদার্থের প্রত্যেক গতির রূপের বিশেষ মর্ম নির্ধারিত হয় তার নিজস্ব বিশেষ দ্বন্দ্ব দ্বারা। কেবল প্রকৃতির বেলায় নয় বরং সমাজ সংক্রান্ত ও মতাদর্শগত ব্যাপারেও এটা সত্য। প্রতিটি সামাজিক রূপ ও প্রতিটি মতাদর্শগত রূপের রয়েছে নিজস্ব বিশেষ দ্বন্দ্ব এবং বিশেষ মর্ম।

পর্যালোচনার নিজস্ব বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত বিশেষ দ্বন্দ্বের ভিত্তিতেই বিভিন্ন বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য টানা হয়। এইভাবে, দৃশ্যমান ঘটনার কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষ কোনো দ্বন্দ্ব বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট শাখার পর্যালোচনার বিষয়বস্তু। যেমন, গণিতে ধনরাশি ও ঋণরাশি; বলবিদ্যায় ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া; পদার্থবিদ্যায় ধন-বিদ্যুৎ ও ঋণ-বিদ্যুৎ; রসায়নে বিয়োজন ও সংযোজন; সমাজবিজ্ঞানে উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদনসম্পর্ক, শ্রেণির সঙ্গে শ্রেণির সংগ্রাম; রণবিজ্ঞানে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা; এবং দর্শনে ভাববাদ ও বস্তুবাদ, আধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গি ও দ্বন্দ্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি—এ সবই হচ্ছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিচার্য বিষয়, কেননা প্রত্যেক শাখার রয়েছে বিশেষ দ্বন্দ্ব ও বিশেষ মর্ম। অবশ্য, দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলে বস্তুর গতি বা বিকাশের সর্বজনীন কারণ বা সর্বজনীন ভিত্তি আবিষ্কার করার কোনো উপায় আমাদের থাকে না। পক্ষান্তরে, দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা পর্যালোচনা না করলে আমাদের পক্ষে একটি বস্তুর বিশেষ সারমর্মকে—যা অন্যান্য বস্তু থেকে তাকে পৃথক করে—নির্ণয় করার কোনো উপায় থাকে না এবং বস্তুর গতি বা বিকাশের বিশেষ কারণ বা বিশেষ ভিত্তি আবিষ্কার করার কোনো উপায় থাকে না, উপায় থাকে না একটি বস্তুকে অন্যটি থেকে আলাদা করার বা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলোর সীমানা নির্দেশ করার।

মানুষের জ্ঞানের গতির পর্যায়ক্রম সম্পর্কে বলা যায়, সর্বদাই স্বতন্ত্র ও বিশেষ বস্তুর জ্ঞান থেকে সাধারণভাবে সকল বস্তুর জ্ঞানে একটা ক্রমান্বয়িক বিকাশ রয়েছে। মানুষ বহু বিভিন্ন বস্তুর বিশেষ সারমর্ম সম্পর্কে জ্ঞানলাভের পরেই কেবল সাধারণ সংজ্ঞার দিকে অগ্রসর হতে এবং বস্তুসমূহের অভিন্ন মর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। এই অভিন্ন মর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের পরে মানুষ এটাকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহার করে যেসব মূর্ত বস্তু এখনও পর্যালোচনা করা হয়নি অথবা পুংখানুপুংখরূপে পর্যালোচনা করা হয়নি, সেগুলো পর্যালোচনা করার এবং সেগুলোর বিশেষ মর্ম আবিষ্কার করার কাজে অগ্রসর হয়; কেবল এইভাবেই মানুষ ঐ বস্তুসমূহের অভিন্ন মর্ম সম্পর্কে নিজের জ্ঞানকে বাড়াতে, সমৃদ্ধ করতে ও বিকশিত করতে পারে এবং এরূপ জ্ঞানের বিবর্ণ বা শিলীভূত হওয়াকে রোধ করতে পারে। জ্ঞানের প্রক্রিয়া এই দুটি: একটি, বিশেষ থেকে সাধারণে; এবং অপরটি, সাধারণ থেকে বিশেষে। এইভাবে জ্ঞানার্জন-প্রক্রিয়া সর্বদাই চক্রাকারে আবর্তিত হয় এবং প্রত্যেক চক্র (যতক্ষণ বৈজ্ঞানিক পন্থা কঠোরভাবে অনুসৃত হয়) মানবিক জ্ঞানকে এক ধাপ উঁচুতে এগিয়ে দেয় এবং এভাবে অধিক থেকে অধিকতর গভীর করে তোলে। এ ব্যাপারে আমাদের মতান্ধতাবাদীরা যেখানে ভুল করেন তা হচ্ছে এই যে, একদিকে, তাঁরা বোঝেন না যে, দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতাকে এবং বস্তুসমূহের অভিন্ন সারমর্মকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারার আগে দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতাকে পর্যালোচনা করতে হবে এবং প্রত্যেকটি বস্তুর বিশেষ সারমর্মকে জানতে হবে; অপরদিকে, তাঁরা বোঝেন না যে, বস্তুর অভিন্ন সারমর্ম বোঝার পরে, আমাদের আরও অগ্রসর হয়ে যেসব মূর্ত বস্তু পুংখানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করা হয়নি বা সবেমাত্র উদ্ভূত হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। আমাদের মতান্ধতাবাদীরা হাড়ে হাড়ে অলস। তাঁরা ধৈর্য সহকারে মূর্তবস্তুর পর্যালোচনা করতে নারাজ, তাঁরা সাধারণ সত্যগুলোকে শূন্যতার মধ্য থেকে উদ্ভূত বলে গণ্য করেন এবং সেগুলোকে শুধুমাত্র বিমূর্ত অবোধ্য সূত্রে পরিণত করেন, এবং তার ফলে যে স্বাভাবিক পর্যায়ক্রম দ্বারা মানুষ সত্যকে জানতে পারে তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং উল্টে দেন। বিশেষ থেকে সাধারণে এবং তারপর সাধারণ থেকে বিশেষে—মানবিক জ্ঞানের এই দুটি প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক সংযোগও তাঁরা বোঝেন না এবং মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্ব তাঁরা আদৌ বোঝেন না।

কেবল পদার্থের গতির রূপসমূহের প্রত্যেকটি বৃহৎ ব্যবস্থার বিশেষ দ্বন্দ্বকে এবং তার দ্বারা নির্ধারিত মর্মকেই নয়, পরন্তু পদার্থের গতির প্রত্যেকটি রূপের বিকাশের দীর্ঘ ধারায় প্রত্যেক প্রক্রিয়ার বিশেষ দ্বন্দ্বকে এবং সারমর্মকেও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গতির প্রত্যেকটি রূপে বিকাশের প্রত্যেকটি বাস্তব (কাল্পনিক নয়) প্রক্রিয়া, গুণগতভাবে পৃথক। আমাদের পর্যালোচনায় এই বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে এবং এখান থেকেই শুরু করতে হবে।

গুণগতভাবে ভিন্ন দ্বন্দ্বসমূহের সমাধান কেবলমাত্র গুণগতভাবে ভিন্ন পদ্ধতির দ্বারাই করা যেতে পারে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, সর্বহারা শ্রেণি ও বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পদ্ধতির দ্বারা মীমাংসা করা হয়; ব্যাপক জনসাধারণ ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পদ্ধতির দ্বারা মীমাংসা করা হয়; উপনিবেশসমূহ ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব জাতীয় বিপ্লবী যুদ্ধের পদ্ধতির দ্বারা মীমাংসা করা হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব কৃষির যৌথীকরণ ও যন্ত্রায়ণ পদ্ধতির দ্বারা সমাধান করা হয়; কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরকার দ্বন্দ্ব সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার পদ্ধতির দ্বারা মীমাংসা করা হয়; সমাজের ও প্রকৃতির মধ্যকার দ্বন্দ্ব উৎপাদনশক্তির বিকাশ সাধনের দ্বারা মীমাংসা করা হয়। প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হয়, পুরোনো প্রক্রিয়া ও পুরোনো দ্বন্দ্ব বিলীন হয়ে যায়, নতুন প্রক্রিয়া ও নতুন দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে এবং দ্বন্দ্বসমূহের মীমাংসার পদ্ধতিও তদনুযায়ী ভিন্ন হয়। রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব যে দ্বন্দ্বের সমাধান করে এবং অক্টোবর বিপ্লব যে দ্বন্দ্বের সমাধান করে তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে, পার্থক্য আছে তাদের সমাধানের পদ্ধতির মধ্যেও। ভিন্ন দ্বন্দ্বের মীমাংসার জন্য ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছে এমন একটা মূলনীতি যা মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অবশ্যই কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মতান্ধতাবাদীরা এই মূলনীতি মেনে চলেন না; তাঁরা বোঝেন না যে, বিভিন্ন প্রকারের বিপ্লবে অবস্থার পার্থক্য ঘটে এবং এজন্য এও বোঝেন না যে, ভিন্ন দ্বন্দ্বের মীমাংসার জন্য ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োগ করা দরকার। পক্ষান্তরে, যেটাকে তাঁরা অপরিবর্তনীয় সূত্র বলে কল্পনা করেন সেটাকেই ব্যতিক্রমহীনভাবে অবলম্বন করেন এবং সর্বত্র নির্বিচারে প্রয়োগ করেন, এটা কেবল বিপ্লবের বিপত্তিই ঘটায় বা যা সুষ্ঠুভাবে সমাপ্ত হতে পারত তাকে তালগোল পাকিয়ে শোচনীয়ভাবে জটিল করে তোলে।

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্টদের পার্টি বিষয়ক ধারণায় দুই লাইনের সংগ্রাম নাকি এক প্রস্তরীভূত পার্টি?

কোন বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্বসমূহের সমগ্রতায় ও পারস্পরিক সংযোগে দ্বন্দ্বসমূহের বিশিষ্টতাকে উদঘাটন করার জন্য, অর্থাৎ ঐ প্রক্রিয়ার মর্মকে উদঘাটন করার জন্য, ঐ প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্বসমূহের সব দিকের বিশিষ্টতাকে উদঘাটন করা প্রয়োজন; অন্যথায় ঐ প্রক্রিয়ার সারমর্মকে উদঘাটন করা অসম্ভব হবে। তার পর্যালোচনায়ও আমাদের গভীরভাবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

কোনো বড় বস্তু বা বিষয়ের বিকাশের ধারায় বহু দ্বন্দ্ব থাকে। যেমন, চীনের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল, সেখানে চীনের সমাজের সকল নিপীড়িত শ্রেণি এবং সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ব্যাপক জনসাধারণ এবং সামন্তব্যবস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্ব, সর্বহারা শ্রেণি এবং বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব, একদিকে কৃষক শ্রেণি ও শহুরে পাতি বুর্জোয়া শ্রেণি এবং অন্যদিকে বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিদ্যমান রয়েছে। শুধু যে এইসব দ্বন্দ্বের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব বিশিষ্টতা থাকে এবং একইভাবে তাদেরকে মোকাবিলা করা যায় না তাই নয়, প্রত্যেক দ্বন্দ্বের দুটি দিকের প্রত্যেকটিরও নিজস্ব বিশিষ্টতা থাকে এবং একইভাবে তাদেরকে মোকাবিলা করা যায় না। আমরা যারা চীন বিপ্লবে নিয়োজিত রয়েছি, তাদের কেবল দ্বন্দ্বগুলোর সমগ্রতায় অর্থাৎ পারস্পরিক সংযোগে দ্বন্দ্বগুলোর বিশিষ্টতাকে বুঝলেই চলবে না, পরন্তু, প্রত্যেক দ্বন্দ্বের দুটি দিককেই পর্যালোচনা করতে হবে; সমগ্রতাকে বুঝতে হলে এছাড়া পথ নেই। যখন আমরা একটি দ্বন্দ্বের প্রত্যেকটি দিককে জানার কথা বলি, তখন আমরা প্রত্যেকটি দিক কোন নির্দিষ্ট অবস্থান অধিকার করে, প্রত্যেকটি দিক তার বিপরীতের সঙ্গে পরস্পর নির্ভরশীল ও প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে কোন মূর্ত রূপ পরিগ্রহ করে, এবং দিক দুটির পরস্পর নির্ভরশীল ও প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ভেঙ্গে পড়ার পরে প্রত্যেকটি দিক তার বিপরীতের সঙ্গে সংগ্রামে কোন মূর্ত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করে তা জানার কথাই বলি। এই সমস্ত সমস্যার পর্যালোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেনিন যখন বলেছিলেন, মার্কসবাদের একান্ত সারবস্তু এবং মার্কসবাদের জীবন্ত আত্মা হচ্ছে মূর্ত অবস্থাসমূহের মূর্ত বিশ্লেষণ[১০]—তখন তিনি ঠিক একথাটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। আমাদের মতান্ধতাবাদীরা লেনিনের শিক্ষাকে লংঘন করেছেন; তাঁরা কখনও কোনো কিছুকে মূর্তভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য মাথা ঘামান না; তাঁদের লেখায় ও বক্তৃতায় তাঁরা সর্বদাই অর্থহীন ও শূন্যগর্ভ একঘেঁয়ে রচনার কায়দা অবলম্বন করেন, তা করে তাঁরা আমাদের পার্টিতে কাজের অতি মন্দ রীতি সৃষ্টি করেন।

সমস্যার পর্যালোচনার ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই আত্মমুখিতা, একদেশদর্শিতা ও খোলস সর্বস্বতা ছাড়তে হবে। যাকে আত্মমুখিতা বলে, তা হলো সমস্যাকে বাস্তবভাবে না দেখা, অর্থাৎ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে সমস্যাকে না দেখা। আমার “অনুশীলন সম্পর্কে” শীর্ষক প্রবন্ধে এই বিষয় নিয়ে আমি আলোচনা করেছি। একদেশদর্শিতার অর্থ হচ্ছে সমস্যাকে সব দিক থেকে না দেখা। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কেবল চীনকে বোঝা জাপানকে নয়, কেবল কমিউনিস্ট পার্টিকে বোঝা কুওমিনতাঙকে নয়, কেবল সর্বহারা শ্রেণিকে বোঝা বুর্জোয়া শ্রেণিকে নয়, কেবল কৃষককে বোঝা জমিদারকে নয়, কেবল অনুকূল অবস্থাগুলোকে বোঝা প্রতিকূল অবস্থাগুলোকে নয়, কেবল অতীতকে বোঝা ভবিষ্যৎকে নয়, কেবল অংশকে বোঝা সমগ্রকে নয়, কেবল ত্রুটিকে বোঝা সাফল্যকে নয়, কেবল ফরিয়াদিকে বোঝ আসামিকে নয়, কেবল গোপন বিপ্লবী কাজকে বোঝা প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজকে নয়, ইত্যাদি। এক কথায়, এর অর্থ একটা দ্বন্দ্বের উভয় দিকের বৈশিষ্ট্যগুলোকে না বোঝা। একটা সমস্যাকে একদেশদর্শীভাবে দেখা বলতে আমরা এটাই বোঝাতে চাই। অথবা বলা যায় যে, শুধু অংশ-বিশেষকে দেখা, সমগ্রকে না দেখা; শুধু বৃক্ষগুলোকেই দেখা, অরণ্যকে না দেখা। এইভাবে কোনো দ্বন্দ্বের সমাধানের পদ্ধতি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, অসম্ভব বিপ্লবী কর্তব্য সম্পন্ন করা, অসম্ভব অর্পিত কাজ সুষ্ঠুভাবে করা, অসম্ভব পার্টির অভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত সংগ্রামকে সঠিকভাবে বিকশিত করে তোলা। সামরিক ব্যাপার প্রসঙ্গে সুন জি যখন বলেছিলেন, “শত্রুকে জানুন, আর নিজেকে জানুন; তাহলে এক শ বার যুদ্ধ করলেও পরাজিত হওয়ার ভয় থাকবে না,”[১১] তিনি তখন যুদ্ধরত দুটি পক্ষের কথা বলেছিলেন। থাং রাজবংশের আমলে ওয়েই চেং যখন বলেছিলেন, “উভয় পক্ষকে শুনলে আপনি জ্ঞানালোক-প্রাপ্ত হবেন, এক পক্ষকে বিশ্বাস করলে অজ্ঞান তিমিরে ডুববেন”,[১২] —তখন তিনিও একদেশদর্শিতার ভুল ধরতে পেরেই একথা বলেছিলেন। কিন্তু আমাদের কমরেডরা প্রায়শই একতরফাভাবে সমস্যাকে দেখে থাকেন, আর তাই প্রায়ই তাঁরা অপ্রত্যাশিত বাধার মধ্যে পড়েন। “শুই হু চুয়ান” (“জলাবিলের বীরনায়কগণ”) উপন্যাসটিতে সোং চিয়াং তিনবার চু গ্রাম আক্রমণ করেন[১৩], প্রথম দু’বার তিনি পরাজিত হন, কারণ স্থানীয় অবস্থা সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল না এবং তিনি ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। পরে তিনি তাঁর পদ্ধতি পরিবর্তন করেন। প্রথমে তিনি অবস্থা সম্পর্কে তদন্ত করেন, এবং রাস্তাগুলোর গোলকধাঁধার সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন, তার পর লি হু ও চু গ্রামের মৈত্রী ভঙ্গ করেন এবং বিদেশী গল্পের ট্রয়ের ঘোড়ার মত ফন্দি ব্যবহার করে ওঁত পেতে থাকার উদ্দেশ্যে শত্রুশিবিরে ছদ্মবেশে নিজের লোক পাঠান, এবং তৃতীয়বার তিনি যুদ্ধে বিজয়ী হন। “শুই হু চুয়ান” উপন্যাসটিতে বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববাদের অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যার মধ্যে চু গ্রামের উপর তিনবার আক্রমণের অণুকাহিনীটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। লেনিন বলেন,

“কোনো বস্তুকে সত্যি সত্যি জানার জন্য অবশ্যই তার সব দিক, তার সব সংযোগ ও ‘মধ্যস্থতাকে’ গভীরভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং সেগুলোর পর্যালোচনা করতে হবে। কোনো দিনই এটাকে আমরা সম্পূর্ণভাবে অর্জন করব না; কিন্তু সর্বতোমুখিতার দাবি আমাদেরকে ভুল ও আড়ষ্টতা থেকে রক্ষা করবে।[১৪]

তাঁর কথাগুলো আমাদের স্মরণ রাখা উচিত। খোলসসর্বস্ব হবার অর্থ হলো দ্বন্দ্বের সামগ্রিকতা ও দ্বন্দ্বের বিভিন্ন দিকের বৈশিষ্ট্যগুলোর বিচার না করা, কোনো বস্তুর গভীরে গিয়ে পুংখানুপুংখভাবে দ্বন্দ্বের বৈশিষ্ট্যকে পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা, শুধু দূর থেকে দেখা এবং স্থূলভাবে দ্বন্দ্বের পরিলেখটি দেখার পর তক্ষুণি দ্বন্দ্ব মীমাংসার চেষ্টা করা (প্রশ্নের জবাব দেওয়া, বিতর্কের মীমাংসা করা, কার্য চালনা অথবা যুদ্ধ পরিচালনা করা)। এইভাবে কাজ করলে বিভ্রাট ঘটতে বাধ্য। চীনের মতান্ধতাবাদী ও অভিজ্ঞতাবাদী কমরেডদের ভুল করার কারণ তাঁদের বস্তুকে দেখার আত্মমুখী, একদেশদর্শী ও খোলসর্বস্ব পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত। একদেশদর্শিতা ও খোলসর্বস্বতাও হচ্ছে একপ্রকার আত্মমুখিতা, কারণ সমস্ত বাস্তব জিনিসই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে পরস্পর সংযুক্ত এবং অভ্যন্তরীণ বিধি-নিয়মের দ্বারা পরিচালিত, কিন্তু এই অবস্থাগুলো যথার্থভাবে প্রতিফলিত করবার দায়িত্ব গ্রহণের বদলে কিছু লোক সেগুলোকে একতরফা ও ভাসাভাসাভাবে দেখেন, এবং না সেগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগকে জানেন, না সেগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়মাবলীকে বোঝেন। সেজন্য তাদের পদ্ধতি হচ্ছে আত্মমুখিতাবাদী।

আমাদের শুধু কোনো বস্তুর বিকাশের সমগ্র প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্বগুলোর গতিতে তাদের পারস্পরিক সংযোগ ও তাদের প্রত্যেকটি দিকের অবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলোকে লক্ষ্য করলেই চলবে না, উপরন্তু বিকাশের প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি স্তরের বৈশিষ্ট্যগুলোকেও আমাদের লক্ষ্য করতে হবে।

কোনো বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় মূল দ্বন্দ্ব এবং ঐ দ্বন্দ্ব দ্বারা নির্ণীত প্রক্রিয়ার মর্ম, প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিলুপ্ত হবে না; কিন্তু বস্তুর বিকাশের একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বিকাশের প্রত্যেক স্তরে অবস্থা সাধারণত পৃথক হয়। এর কারণ এই যে, একটা বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় মূল দ্বন্দ্বের প্রকৃতি এবং প্রক্রিয়ার সারমর্ম অপরিবর্তিত থেকে গেলেও, ঐ দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এক স্তর থেকে আরেক স্তরে অতিক্রমণের সাথে মূল দ্বন্দ্বটি ক্রমান্বয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তা ছাড়া, মূল দ্বন্দ্ব দ্বারা নির্ণীত বা প্রভাবিত বহু সংখ্যক ছোটো-বড় দ্বন্দ্বের মধ্যে কতগুলো তীব্রতর হয়, কতগুলো অস্থায়ীভাবে বা আংশিকভাবে মীমাংসিত বা উপশান্ত হয়, এবং কতগুলো নতুন দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করে; এজন্য প্রক্রিয়া স্তরসমূহ দ্বারা চিহ্নিত। যদি লোকেরা একটা বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় স্তরসমূহের প্রতি মনোযোগ না দেয়, তাহলে তারা তার দ্বন্দ্বগুলোর যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না।

আরো পড়ুন:  সারবস্তু ও রূপ প্রসঙ্গে

দৃষ্টান্তস্বরূপ, যখন অবাধ প্রতিযোগিতার যুগের ধনতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হলো, তখন মূল দ্বন্দ্বে লিপ্ত শ্রেণি দুটির—যথা সর্বহারা শ্রেণি ও বুর্জোয়া শ্রেণির প্রকৃতিতে এবং সমাজের ধনতান্ত্রিক মর্মে কোনো পরিবর্তন হলো না; যা হোক, এই দুটি শ্রেণির দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠল, একচেটিয়া পুঁজি ও অ-একচেটিয়া পুঁজির দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করল, প্রভু-দেশগুলো ও তাদের উপনিবেশগুলোর দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠল, অসম বিকাশের ফলে ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বিশেষ তীব্র হয়ে দেখা দিল, এবং এইভাবে ধনতন্ত্রের বিশেষ স্তর সাম্রাজ্যবাদী স্তরের সৃষ্টি হলো। লেনিনবাদকে যে সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ বলা হয় তার কারণ, লেনিন ও স্তালিন ঠিকভাবে এই দ্বন্দ্বগুলোর ব্যাখ্যা করেছেন এবং এই দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসার জন্য ঠিকভাবে সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্ব ও কৌশল প্রণয়ন করেছেন।

১৯১১ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যার শুরু চীনের সেই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রক্রিয়াটি পরীক্ষা করলেও কতকগুলো বিশেষ স্তর চোখে পড়বে। বিশেষ করে, বুর্জোয়া নেতৃত্বের পর্যায়কালের বিপ্লব এবং সর্বহারা নেতৃত্বের পর্যায়কালের বিপ্লব দুটি বিরাট পার্থক্য-বিশিষ্ট ঐতিহাসিক স্তর। অন্যকথায়, সর্বহারা নেতৃত্ব বিপ্লবের চেহারাকে মৌলিকভাবে পাল্টে দিয়েছে, শ্রেণি–সম্পর্কের নতুন বিন্যাস ঘটিয়েছে, কৃষক বিপ্লবে এক বিপুল জোয়ার এনেছে, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবকে সম্পূর্ণতা দান করেছে এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, ইত্যাদি। বিপ্লব যখন বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন ছিল, তখন এর কিছুই সম্ভব ছিলো না। যদিও সামগ্রিকভাবে ঐ প্রক্রিয়ার মূল দ্বন্দ্বের প্রকৃতিতে, অর্থাৎ প্রক্রিয়ার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রকৃতিতে (যার বিপরীত হচ্ছে আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক প্রকৃতি) কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, তথাপি বিশ বছরে ঐ প্রক্রিয়া কয়েকটি স্তর অতিক্রম করেছে; এই দীর্ঘ সময়কালে অনেক বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে—১৯১১ সালের বিপ্লবের ব্যর্থতা ও উত্তরাঞ্চলীয় সমরনায়কদের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রথম জাতীয় যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা ও ১৯২৪-২৭ সালের বিপ্লব, যুক্তফ্রন্টের ভাঙ্গন ও বুর্জোয়াদের প্রতিবিপ্লবের পক্ষে যোগদান, নতুন সমরনায়কদের যুদ্ধ, ভূমি-বিপ্লবের যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় জাতীয় যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা ও জাপান-বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধ ইত্যাদি। এই স্তরগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত, যেমন, কতগুলো দ্বন্দ্বের তীব্র হয়ে ওঠা (দৃষ্টান্তস্বরূপ, ভূমি-বিপ্লবী যুদ্ধ ও উত্তর-পূর্বের চারটি প্রদেশের ওপর জাপ-আক্রমণ), কতগুলো দ্বন্দ্বের আংশিক বা সাময়িক মীমাংসা (দৃষ্টান্তস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলীয় সমরনায়কদের ধ্বংস সাধন ও আমাদের দ্বারা জমিদারদের জমির বাজেয়াপ্তকরণ) এবং কতগুলো দ্বন্দ্বের পুনরায় আবির্ভাব (দৃষ্টান্তস্বরূপ, নতুন সমরনায়কদের মধ্যকার সংগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলে আমাদের বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলো হারানোর পর জমিদারদের দ্বারা জমির পুনর্দখল) ইত্যাদি।

কোনো বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ার প্রত্যেক স্তরে দ্বন্দগুলোর বিশিষ্টতা পর্যালোচনা করতে হলে, আমাদের শুধু তাদের সংযোগে বা তাদের সমগ্রতায় দেখলে চলবে না, প্রত্যেক দ্বন্দ্বের দুটি দিককেও পরীক্ষা করতে হবে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, কুওমিনতাঙ ও কমিউনিস্ট পার্টির কথা ধরুন। একটা দিককে, কুওমিনতাঙকে নেওয়া যাক। প্রথম যুক্তফ্রন্টের পর্যায়কালে, কুওমিনতাঙ রাশিয়ার সাথে মৈত্রী, কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সহযোগিতা ও কৃষক-শ্রমিকদের সাহায্য করা—সান ইয়াৎসেনের তিন মহান কর্মনীতি কার্যকর করেছিল। এজন্য সেটা ছিল বিপ্লবী ও প্রাণবান এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির একটা মৈত্রী। ১৯২৭ সাল থেকে কুওমিনতাঙ বিপরীতের দিকে মুখ ফেরায় এবং জমিদার ও বড় বুর্জোয়াদের প্রতিক্রিয়াশীল জোটে পরিণত হয়। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে সীআন ঘটনার পর, গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানোর এবং জাপ–সাম্রাজ্যবাদকে সম্মিলিতভাবে বাধা দানের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সাথে মৈত্রীর দিকে এর আরেকটা পরিবর্তন শুরু হয়। এই ছিল তিন স্তরে কুওমিনতাঙের বৈশিষ্ট্য। অবশ্য, নানা ধরনের কারণ থেকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো উদ্ভূত হয়েছে। এখন অন্য দিকটির অর্থাৎ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কথা ধরা যাক। প্রথম যুক্তফ্রন্টের পর্যায়কালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ছিল তার শৈশবাবস্থায়। এই পার্টি ১৯২৪-২৭ সালের বিপ্লবে সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিল, কিন্তু বিপ্লবের চরিত্র, করণীয় কাজ ও পদ্ধতিগুলো বোঝার ব্যাপারে এর অপরিপক্কতা প্রকাশ পেয়েছিল এবং সেজন্যই ঐ বিপ্লবের শেষের দিকে ছেন তু সিউবাদের পক্ষে নিজেকে জাহির করা ও বিপ্লবের পরাজয় ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। ১৯২৭ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি আবার সাহসের সঙ্গে ভূমি-বিপ্লবী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় এবং বিপ্লবী সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলো সৃষ্টি করে; কিন্তু হঠকারিতামূলক ভুল করে বসার ফলে সেনাবাহিনী ও ঘাঁটি এলাকাগুলোর বিপুল ক্ষতি হয়। ১৯৩৫ সাল থেকে পার্টি ঐ ভুলগুলো সংশোধন করেছে এবং জাপানকে প্রতিরোধ করার জন্য নতুন যুক্তফ্রন্টকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। এই মহান সংগ্রাম এখন বিকাশ লাভ করছে। বর্তমান স্তরে কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে সেই পার্টি যা দুটো বিপ্লবের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে এবং বিপুল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই হলো তিন স্তরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যগুলোও নানা ধরনের কারণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। দুই পার্টির এই বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা না করলে আমরা বিকাশের প্রত্যেকটি স্তরে দুই পার্টির বিশেষ আন্তঃসম্পর্কগুলোকে বুঝতে পারব না, যথা—একটা যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্টের ভাঙ্গন এবং আরেকটা যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা। পার্টি দুটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার জন্য যা আরও মৌলিক তা হচ্ছে পাটি দুটির শ্রেণিভিত্তি এবং এর ফলে প্রত্যেকটি পার্টি ও অন্য শক্তিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়কালে উদ্ভূত দ্বন্দুগুলো পরীক্ষা করা। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কমিউনিস্ট পার্টির সাথে প্রথম মৈত্রীর পর্যায়কালে কুওমিনতাঙের একদিকে ছিল বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং এজন্য কুওমিনতাঙ ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী; অন্যদিকে ছিল দেশের ব্যাপক জনসাধারণের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, — যদিও মুখে মুখে কুওমিনতাঙ মেহনতী জনগণকে অনেক সুবিধাদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খুবই নগণ্য সুবিধা দিয়েছে বা কিছুই দেয়নি। কমিউনিস্ট-বিরোধী যুদ্ধ চালানোর সময়ে, ব্যাপক জনসাধারণের বিরুদ্ধে কুওমিনতাঙ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের সাথে সহযোগিতা করেছিল এবং বিপ্লবে ব্যাপক জনসাধারণ যে সমস্ত সুবিধা অর্জন করেছিল সেগুলো নির্মূল করে দিয়েছিল এবং তার ফলে জনগণের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব তীব্র করে তুলেছিল। জাপ-বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে জাপ–সাম্রাজ্যবাদের সাথে কুওমিনতাঙের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং সে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সহযোগিতা চায়, কিন্তু একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ও তাদের উপর তার অত্যাচার শিথিল করতে চায় না। কমিউনিস্ট পার্টি সম্বন্ধে বলা যায়, এই পার্টি সর্বদাই, প্রত্যেক পর্যায়কালে, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসাধারণের সঙ্গে থেকেছে; কিন্তু জাপ-বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়কালে, কমিউনিস্ট পার্টি কুওমিনতাঙ ও দেশীয় সামন্তশক্তিগুলোর প্রতি নরম নীতি গ্রহণ করেছে, কারণ কুওমিনতাঙ জাপানকে প্রতিরোধ করার পক্ষে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। উপরিউক্ত পরিস্থিতির ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, পার্টি দুটির মধ্যে কখনও মৈত্রী, আবার কখনও সংগ্রাম এবং এমনকি মৈত্রীর সময়েও একই সাথে মৈত্রী ও সংগ্রামের জটিল অবস্থা বিদ্যমান থেকেছে। যদি আমরা দ্বন্দ্বের এইসব দিকের বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা না করি, তাহলে আমরা প্রত্যেকটি পার্টির সাথে অন্য শক্তিগুলোর সম্পর্কই শুধু নয়, দুটো পার্টির মধ্যকার সম্পর্কটিও বুঝতে ব্যর্থ হব।

আরো পড়ুন:  ফয়েরবাখ সম্বন্ধে থিসিসসমূহ

এভাবে এটা দেখা যাচ্ছে যে, যে কোনো প্রকারের দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা পর্যালোচনায়—পদার্থের গতির প্রত্যেক রূপের দ্বন্দ্ব, বিকাশের প্রত্যেক প্রক্রিয়ায় গতির প্রত্যেক রূপের দ্বন্দ্ব, প্রতিটি বিকাশের প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্বের প্রতিটি দিক, প্রত্যেক বিকাশের স্তরে প্রত্যেক বিকাশের প্রক্রিয়ার দ্বন্দ্ব এবং প্রত্যেক বিকাশের স্তরে দ্বন্দ্বের প্রতিটি দিক—এইসব দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা পর্যালোচনায় আমাদের অবশ্যই আত্মমুখী ও খামখেয়ালি হওয়া চলবে না, বরং সেই বিশিষ্টতাকে মূর্তভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। মূর্ত বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে লেনিনের কথা: মূর্ত অবস্থাসমূহের মূর্ত বিশ্লেষণ।

মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম এই ধরনের মূর্ত বিশ্লেষণের চমৎকার এক আদর্শ আমাদের সামনে তুলে ধরেন।

মার্কস ও এঙ্গেলস যখন বস্তুর মধ্যে দ্বন্দ্বের নিয়মকে সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পর্যালোচনায় প্রয়োগ করলেন, তখন তাঁরা আবিষ্কার করলেন উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে, শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্বকে এবং ঐ দ্বন্দ্বগুলো থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ওপরকাঠামোর রাজনীতি আর মতাদর্শ ইত্যাদি) মধ্যকার দ্বন্দ্বকে; এবং আবিষ্কার করলেন কিভাবে এসব দ্বন্দ্ব বিভিন্ন প্রকারের শ্রেণিসমাজে বিভিন্ন প্রকার সমাজবিপ্লবের জন্ম দেয়।

মার্কস ধনতান্ত্রিক সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর পর্যালোচনায় এই নিয়মকে প্রয়োগ করে আবিষ্কার করলেন যে, এই সমাজের মূল দ্বন্দ্ব হচ্ছে উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র এবং মালিকানার ব্যক্তিগত চরিত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এককভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদনের সংগঠিত চরিত্র এবং সমগ্রভাবে সমাজে উৎপাদনের অসংগঠিত চরিত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মধ্যে ঐ দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করে। শ্রেণিসম্পর্কের দিক দিয়ে এটা আত্মপ্রকাশ করে বুর্জোয়া শ্রেণি ও সর্বহারা শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্বে।

যেহেতু বস্তুসমূহের বিস্তার অত্যন্ত বিরাট এবং তাদের বিকাশ অনন্ত, সেহেতু যা এক প্রসঙ্গে সর্বজনীন, অন্য প্রসঙ্গে তা-ই বিশেষ; বিপরীতভাবে, যা এক প্রসঙ্গে বিশেষ তা-ই অন্য প্রসঙ্গে সর্বজনীন। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র ও উৎপাদনের উপকরণগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যকার দ্বন্দ্ব যেখানেই ধনতন্ত্র বিদ্যমান ও বিকাশমান এমন সমস্ত দেশেই সাধারণভাবে রয়েছে, ধনতন্ত্রের পক্ষে এ হচ্ছে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা। কিন্তু ধনতন্ত্রের এই দ্বন্দ্ব শ্রেণিসমাজের সাধারণ বিকাশের একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্তরের ব্যাপার মাত্র, সাধারণ শ্রেণিসমাজে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যকার দ্বন্দ্বের পক্ষে এ হচ্ছে দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা। যা হোক, ধনতান্ত্রিক সমাজের এসব দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কস সাধারণ শ্রেণিসমাজে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতার আরও গভীর, আরও পর্যাপ্ত এবং আরও সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

যেহেতু বিশেষ সর্বজনীনের সঙ্গে সংযুক্ত এবং যেহেতু দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা এবং সর্বজনীনতা উভয়ই সকল বস্তুর মধ্যে অন্তর্নিহিত, বিশিষ্টতার মধ্যে সর্বজনীনতা বিদ্যমান, সেহেতু কোনো বস্তুকে পর্যালোচনা করার সময় আমাদের উচিত বিশিষ্টতা ও সর্বজনীনতা উভয়কেই ও তাদের আন্তঃসংযোগকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করা, ঐ বস্তুর ভিতরকার বিশিষ্টতা ও সর্বজনীনতাকে এবং তাদের আন্তঃসংযোগকেও আবিষ্কার করা এবং ঐ বস্তুর সঙ্গে বাইরের নানা বস্তুর আন্তঃসংযোগকে আবিষ্কার করা। স্তালিন যখন তাঁর বিখ্যাত রচনা “লেনিনবাদের ভিত্তি”-তে লেনিনবাদের ঐতিহাসিক উৎসগুলো ব্যাখ্যা করেন, তখন তিনি, যে-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে লেনিনবাদের উৎপত্তি হয়েছে তা বিশ্লেষণ করেন, সাম্রাজ্যবাদের অধীনে ধনতন্ত্রের যে দ্বন্দ্বগুলো তাদের চরমে পৌঁছেছে সেগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং কিভাবে এই দ্বন্দ্বগুলো সর্বহারা বিপ্লবকে অবিলম্বে করণীয় বিষয়ে পরিণত করেছে ও ধনতন্ত্রের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত হানার জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করেছে তা দেখান। উপরন্তু, কেন রাশিয়া লেনিনবাদের সূতিকাগৃহে পরিণত হলো, কেন জারের রাশিয়া সাম্রাজ্যবাদের সকল দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো এবং কেন রাশিয়ার সর্বহারার পক্ষে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সর্বহারার অগ্রগামী বাহিনী হওয়া সম্ভব হলো তার কারণসমূহ বিশ্লেষণ করেন। এইভাবে স্তালিন সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা বিশ্লেষণ করে দেখান, কেন লেনিনবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ; এবং একই সাথে ঐ সাধারণ দ্বন্দ্বের মধ্যে জারতন্ত্রী রুশ সাম্রাজ্যবাদের বিশিষ্টতা বিশ্লেষণ করে দেখান কেন রাশিয়া সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্ব ও রণকৌশলের জন্মভূমিতে পরিণত হলো এবং কিভাবে এই বিশিষ্টতার মধ্যে দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা নিহিত রয়েছে। দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা ও সর্বজনীনতা এবং তাদের আন্তঃসংযোগকে বোঝার জন্য স্তালিনের বিশ্লেষণ আমাদের একটা আদর্শ প্রদান করেছে।

বস্তুগত ধারণালব্ধ ব্যাপার পর্যালোচনার দ্বন্দ্ববাদ ব্যবহারের প্রশ্নে, মার্কস ও এঙ্গেলস এবং অনুরূপভাবে লেনিন ও স্তালিন কোনোভাবেই আত্মমুখী ও খামখেয়ালি না হওয়ার জন্য, বরং বস্তুগত প্রকৃত গতির মূর্ত শর্তগুলো থেকে এসব ধারণালব্ধ ব্যাপারের মূর্ত দ্বন্দ্বগুলোকে, প্রত্যেক দ্বন্দ্বের প্রত্যেকটি দিকের মূর্ত অবস্থানকে এবং দ্বন্দ্বগুলোর মূর্ত আন্তঃসংযোগগুলোকে আবিষ্কার করার জন্য সর্বদাই নির্দেশ দিয়েছেন। পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই মনোভাব আমাদের মতান্ধতাবাদীদের নেই এবং এজন্য তাঁরা কখনও সঠিক কিছুকে পান না। তাঁদের ব্যর্থতা থেকে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে এবং এই মনোভাব—যা পর্যালোচনার জন্য একমাত্র সঠিক মনোভাব—অর্জন করতে শিখতে হবে।

দ্বন্দ্বের সর্বজনীনতা ও বিশিষ্টতার মধ্যকার সম্পর্ক হচ্ছে দ্বন্দ্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যকার সম্পর্ক। প্রথমটি বলতে বুঝতে হবে, সকল প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব বিদ্যমান এবং প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রবহমান, গতি, বস্তু, প্রক্রিয়া ও চিন্তা—সবই হচ্ছে দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করার অর্থ সবকিছুকেই অস্বীকার করা। সকল সময় ও সকল দেশের জন্য এটা সর্বজনীন সত্য, যার মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম নেই। এজন্যই দ্বন্দ্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্য, অনাপেক্ষিকতা। কিন্তু এই সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই নিহিত; স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছাড়া কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। যদি সকল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলা হতো, তাহলে সাধারণ বৈশিষ্ট্য কোথায় থাকত? প্রত্যেকটি দ্বন্দ্ব বিশেষ বলেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়। সকল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য শর্তসাপেক্ষভাবে ও অস্থায়ীভাবে বিদ্যমান থাকে, এবং এজন্য তা আপেক্ষিক।

সাধারণ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে, অনাপেক্ষিকতা ও আপেক্ষিকতা সম্পর্কে এই সত্য হচ্ছে বস্তুসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমস্যার কেন্দ্রীয় মর্ম; এটা না বোঝা দ্বন্দ্ববাদকে পরিহার করার শামিল।

Leave a Comment

error: Content is protected !!