শ্রমিক কমরেড ভাইয়েরা, চলুন শেষ নিষ্পত্তির লড়াইয়ে!

সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র বাইরের ও ভেতরের উভয় শত্রুকেই পরাস্ত করবে। শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে দেখা গেছে উত্থানের জোয়ার যা নিশ্চিত করছে বিজয়। আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি পশ্চিম ইউরোপে বিপ্লবী অগ্নিকাণ্ডের স্ফুলিঙ্গ ও বিস্ফোরণ কত ঘন ঘন ঘটছে, আর এসব আমাদের এই নিশ্চয়তায় অনুপ্রাণিত করছে যে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লব বেশি দূরে নয়।

বর্তমানে রুশ সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বহিঃশত্রু হলো ব্রিটিশ, ফ্রান্স, জাপান ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এই শত্রু এখন রাশিয়ায় আক্রমণ চালাচ্ছে, আমাদের ভূমি সে দখল করেছে, সে আখাঙ্গেল দখল করেছে এবং (ফরাসী সংবাদপত্রে যদি বিশ্বাস করতে হয়) সে ভ্লাদিভস্তক থেকে নিকোলস্ক-উসুরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই শত্রু চেকোস্লোভাক বাহিনীর জেনারেল ও অফিসারদের উৎকোচ দিয়ে কিনে নিয়েছে। এই শত্রু জার্মানির ফেব্রুয়ারি মাসের হিংস্র ও সর্বগ্রাসী আক্রমণের মতো একই আক্রমণ শান্তিপূর্ণ রাশিয়ার ওপর চালাচ্ছে, তফাৎ শুধু এই যে ব্রিটিশ ও জাপানীদের শুধু রুশ ভূমি দখল আর লুটপাট করাই দরকার নয়, “ফ্রন্ট পুনঃস্থাপনের” জন্য, অর্থাৎ জার্মানি ও ব্রিটেনের মধ্যে (সহজ করে বললে ডাকাতি) সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে রাশিয়াকে আবার টেনে আনার জন্য সোভিয়েত সরকারের উচ্ছেদও দরকার। ব্রিটিশ ও জাপানী পুঁজিপতিরা রাশিয়ায় জমিদার ও পুঁজিপতিদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চায় যাতে যুদ্ধে দখলকৃত লুটের মালামাল তাদের সাথে একত্রে ভাগাভাগি করা যায়; যাতে রুশ শ্রমিক ও কৃষকদের ইঙ্গ-ফরাসী পুঁজির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা যায়, যাতে তাদের কাছ থেকে শত শত কোটির ঋণের বাবদে সুদ নিঙড়ে নেওয়া যায়, এবং যাতে আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে আগুন জ্বলে ওঠে তা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেই আগুন নিবিয়ে ফেলা যায়।

রাশিয়াকে দখল করার ও বশীভূত করার মতো যথেষ্ট শক্তি ব্রিটিশ ও জাপানী সাম্রাজ্যবাদী জানোয়ারদের নেই। এমনকি প্রতিবেশী জার্মানিও এই কাজ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, যা ইউক্রেনে তার “পরীক্ষায়” দেখা গেছে। ব্রিটিশ ও জাপানীরা আমাদের অতর্কিতে দখল করার ভরসা করেছিল। সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। পেত্রগ্রাদের শ্রমিকরা, তাদের পরেই মস্কোর শ্রমিকেরা, মস্কোর পরেই সমগ্র কেন্দ্রীয় শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকেরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে, আরও একরোখা সাহসী হয়ে, ক্রমেই বেশি বেশি সংখ্যায়, আরও বেশি আত্মত্যাগ করে জেগে উঠেছে। আর এটাই হলো আমাদের বিজয়ের গ্যারান্টি।

ব্রিটিশ ও জাপানী পুঁজিবাদী শ্বাপদেরা শান্তিপূর্ণ রাশিয়ার ওপর তাদের আক্রমণ চালাতে গিয়ে সোভিয়েত সরকারের অভ্যন্তরীণ শত্রুদের সঙ্গে জোট বাঁধারও আশা করেছিল। এই অভ্যন্তরীণ শত্রু কে তা আমরা ভালোই জানি। এরা হলো পুঁজিপতি, জমিদার, কুলাক, তাদের পুত্রপুঙ্গবেরা, শ্রমিক ও যে মেহনতী কৃষক তাদের সহযোগী গ্রামবাসীদের রক্ত চুষে খায় না, তারা ক্ষমতাসীন হওয়ায় এরা আক্রোশপরায়ন হয়ে পড়েছে।

আরো পড়ুন:  কৃষক প্রতিনিধিদের কংগ্রেস

কুলাক বিদ্রোহের ঢেউ রাশিয়ায় বয়ে চলেছে। কুলাকরা সোভিয়েত সরকারকে বিষের মতো ঘৃণা করে, তারা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের টুঁটি টিপে মারতে চায়, তাদের কচুকাটা করতে তারা প্রস্তুত। আমরা ভালোই জানি যে কুলাকরা যদি জয়ী হতে পারে তাহলে তারা জমিদার ও পুঁজিপতিদের সঙ্গে জোট বেঁধে শ্রমিকদের জন্য পুনরায় কয়েদখাটুনির ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে, ৮ ঘন্টা কর্মদিবস বাতিল করবে, কলকারখানা আবারও পুঁজিপতিদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তারা নির্মমভাবে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে হত্যার তাণ্ডবলীলা চালাবে।

আগেকার সমস্ত ইউরোপীয় বিপ্লবে ঘটনা এমনটাই ঘটেছে, যখন শ্রমিকদের দুর্বলতার ফলে কুলাকদের পক্ষে প্রজাতন্ত্র থেকে আবার রাজতন্ত্রে ফেরা, মেহনতীদের ক্ষমতা থেকে আবার শোষক, ধনী ও পরজীবীদের স্বৈরাচারী শাসনে ফেরা সম্ভব হয়েছে। আমার চোখের সামনে লাতভিয়া, ফিনল্যান্ড, ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় তাই ঘটেছে। সর্বত্রই কুলাকরা অশ্রুতপূর্ব রক্তপিপাসায় তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। সর্বত্রই তারা তাদের নিজ দেশের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিদেশি পুঁজিপতিদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এই কাজই করেছে এবং করছে কাদেত, দক্ষিণপন্থী সো, রে., মেনশেভিকরা: শুধু “চেকোস্লোভাকিয়ায়” তাদের উজ্জ্বল কীর্তি স্মরণ করলেই হলো। বামপন্থী সো. রে.-রা তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা ও মেরুদণ্ডহীনতা নিয়ে এই পথই নিয়েছে, এটাই তারা করেছে মস্কোয় বিদ্রোহ ঘটিয়ে, ইয়ারোস্লাভলে শ্বেতরক্ষীদের, কাজানে চেকোস্লোভাক ও শ্বেতকায়দের সাহায্য করে। খামোখাই এই বামপন্থী সো, রে.-রা কেরেনস্কি এবং তার সহযোগী বন্ধু ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের বাহাবা পায়নি।

এখানে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কুলাকরা সোভিয়েত সরকারের গোঁড়া শত্রু। হয় কুলাকরা ব্যাপক সাধারণ শ্রমিককে কচুকাটা করবে, নয় শ্রমিকেরা লুঠেরা সংখ্যাল্প কুলাকদের বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করবে, যে কুলাকরা মেহনতী মানুষের সরকারের বিরোধী। এক্ষেত্রে কোনো মধ্যপন্থা থাকতে পারে না। শান্তি হবার নয়: জমিদার, জার আর পাদ্রীদের সঙ্গে কলহ করলেও কুলাকদের পক্ষে তা মিটিয়ে নেওয়া সহজ, এমনকি অতি সহজ, কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে কখনই নয়।

সেই কারণেই কুলাকদের বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা বলছি শেষ নিস্পত্তির লড়াই। এর মানে এই নয় যে কুলাকদের বিদ্রোহ বারবার ঘটতে পারবে না, অথবা সোভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি পুঁজিবাদের বারবার আক্রমণ ঘটতে পারবে না। শেষ লড়াই কথাটার অর্থ এই যে শোষক শ্রেণিগুলির মধ্যে যারা শেষ অবশেষ ও সর্বাধিক সংখ্যক তারা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

আরো পড়ুন:  আত্মনির্ভরতা ও কঠোর সংগ্রাম

কুলাকরা হচ্ছে সবচেয়ে বর্বর, নির্দয়, বন্য শোষক, অন্যান্য দেশের ইতিহাসে তারা জমিদার, জার, পাদ্রী ও পুঁজিপতিদের ক্ষমতা ফিরিয়ে এনেছে একাধিকবার। জমিদার আর পুঁজিপতিদের তুলনায় কুলাকদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাহলেও জনগণের কাছে তারা সংখ্যাল্প।

দস্যুরা রাশিয়ার কাছ থেকে ইউক্রেন ও অন্যান্য এলাকা দখলে নেবার আগেকার রাশিয়ার অবস্থা ধরা যাক, তখন কৃষক পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি। এই দেড় কোটির মধ্যে নিশ্চয় প্রায় এক কোটিই ছিলো গরিব কৃষক পরিবার, যারা তাদের শ্রমশক্তি বেচে, অথবা ধনীদের কাছে বাঁধা গোলামী করে, অথবা উদ্বৃত্ত শস্যের অভাবে এবং যুদ্ধের চাপে সবচেয়ে নিঃসম্বল হয়ে জীবনধারণ করত। অন্তত ৩০ লাখকে ধরা যায় মাঝারি কৃষক পরিবার হিসেবে আর বড়ো জোর ২০ লাখের কিছু বেশি ছিলো কুলাক, ধনী কৃষক ও শস্যের চোরাকারবারী। যুদ্ধের সময়ে এই রক্তচোষারা জনসাধারণের অভাব-অনটন থেকে লাভ উঠিয়েছে, শস্য এবং অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যের দাম চড়িয়ে তারা হাজার হাজার, লাখ লাখ রুবল জমিয়েছে। এই মাকড়সার দল যুদ্ধের সময় দুর্দশাগ্রস্ত কৃষক ও ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের ঘাড় ভেঙে নিজেরা মেদবহুল হয়েছে। এই জোঁকেরা শ্রমজীবী মানুষের রক্ত শুষেছে, শহরে আর কলকারখানায় শ্রমিকেরা যত উপোস দিয়েছে এরা তত ধনী হয়েছে। এই রক্তপিচাশ বাদুড়েরা জমিদারের ভূসম্পত্তি নিজেদের দখলে নিয়েছে এবং নিচ্ছে আর এভাবে গরিব কৃষকদের তারা বারবার গোলাম বানাচ্ছে। 

এই কুলাকদের বিরুদ্ধে চাই নির্মম যুদ্ধ! তাদের মৃত্যু চাই! এদের রক্ষা করে যেসব পার্টি—দক্ষিণপন্থী সো. রে., মেনশেভিক এবং বর্তমানের বামপন্থী সো. রে, পার্টি তাদের প্রতি বিতৃষ্ণা, ঘৃণা! নিজ দেশের মেহনতীদের বিরুদ্ধে যারা বিদেশের পুঁজিপতিদের সাথে জোট বেঁধেছে, লৌহদৃঢ় হস্তে সেই কুলাকদের অভ্যুত্থান দমন করতে হবে শ্রমিকদের।

গ্রামের গরিব কৃষকদের অজ্ঞতা, অনৈক্য ও বিক্ষিপ্ততাকে কাজে লাগাচ্ছে কুলাকেরা। তারা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলছে, শস্যের চোরাবাজারি থেকে মাঝে মাঝে তারা “বেঁচে থাকবার জন্য” শতখানেক রুবল দিয়ে (এক্ষেত্রে তারা কয়েক হাজার রুবল গরিবদের কাছ থেকে লুটে নেয়) কিনে নেয় এদের। কুলাকেরা মাঝারি কৃষকদের তাদের স্বপক্ষে টানার চেষ্টা করছে, মাঝে মাঝে তাতে তারা সফলও হচ্ছে।

কিন্তু শ্রমিকরা কেন মাঝারি কৃষকদের সাথে গোলমাল করবে, এখানে তার কোনো কারণই নেই। কুলাকদের সঙ্গে শ্রমিকরা মিটমাট করে নিতে পারে না, কিন্তু মাঝারি কষকদের সঙ্গে সে বোঝাপড়ার উপায় খুঁজতে সে পারে এবং খুঁজছে। শ্রমিক সরকার, অর্থাৎ বলশেভিক সরকার কথায় নয় কাজে এর প্রমাণ দেখিয়েছে।

আরো পড়ুন:  ভারতে অভ্যুত্থান

আমরা এর প্রমাণ দিয়েছি “জমির জাতীয়করণ” আইন গ্রহণ করে এবং কঠোর ভাবে তা কার্যকর করে। এই আইনে মাঝারি কৃষকের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির কাছে অনেক ছাড় দেওয়া হয়েছে।

আমরা এর প্রমাণ দিয়েছি শস্যের দাম (এই সেদিন) তিনগুণ[১] করে, কেননা আমরা পুরোপুরি বুঝেছি যে মাঝারি কৃষকের আয় প্রায়ই উৎপাদিত দ্রব্যাদির বর্তমান দামের সমানুপাতিক নয় এবং তা বাড়ানো উচিত।

প্রত্যেক সচেতন শ্রমিক মাঝারি কৃষকের কাছে এটা ব্যাখ্যা করে বুঝাবে এবং ধৈর্য ধরে একাগ্রভাবে লেগে থেকে বারবার তাকে দেখাবে যে জার, জমিদার ও পুঁজিপতিদের সরকারের চেয়ে সমাজতন্ত্র তার পক্ষে অশেষ লাভজনক।

শ্রমিক সরকার মাঝারি কৃষককে কখনও আহত করেনি এবং করবেও না। কিন্তু জার, জমিদার, পুঁজিপতি ও কুলাকদের সরকার মাঝারি কৃষককে সব সময় শুধু আহতই করেনি, তার টুঁটি চেপে ধরেছে, লুণ্ঠন করেছে এবং তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছে। বিনা ব্যতিক্রমে সমস্ত দেশের জন্য এটা সত্য, রাশিয়াও যার অন্তর্ভুক্ত।

শ্রেণি-সচেতন শ্রমিকদের কর্মসূচি হলো—গরিব কৃষকদের সাথে ঘনিষ্ঠ জোট গঠন এবং তার সাথে সম্পূর্ণ মিলে যাওয়া; মাঝারি কৃষককে ছাড় দেওয়া এবং তার সাথে সমঝোতা করা; কুলাকদের নির্মমভাবে দমন করা, যারা রক্তচোষা বাদুড়, জনগণের লুঠেরা এবং চোরাবাজারি, যারা দুর্ভিক্ষের সুযোগে জনগণের কাছ থেকে মুনাফা তোলে। এই হলো শ্রমিক শ্রেণির কর্মসূচি

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. ১৯১৮-এর ৬ আগস্টে গণ কমিশার পরিষদ কর্তৃক জারি করা “১৯১৮ সালের ফসলের বাঁধা দর” ডিক্রির কথা বলা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্র কর্তৃক সংগ্রহীত শস্যের দাম তিন গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

২. ভি. ই. লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, ২৮তম খণ্ড, প্রগ্রেস পাবলিশার্স, মস্কো ১৯৭২, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃঃ ৫৩-৫৭, লেখা হয় ১৯১৮-এর আগস্টের প্রথম দিকে, প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫-এর ১৭ জানুয়ারি, মস্কো। রোদ্দুরেতে প্রকাশিত বাংলা অনুবাদটি শেখর রহিম কর্তৃক অনূদিত লেনিনের নির্বাচিত রচনাসংগ্রহ-৪ শ্রাবণ, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, পৃষ্ঠা ৩৪১-৩৪৫ থেকে নেয়া।

Leave a Comment

error: Content is protected !!