রাজনৈতিক দল গঠন প্রসঙ্গে

বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিমান উন্নতিকামি সাম্যবাদ অভিমুখী নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রাজনৈতিক দল গঠন-এ (political party) সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। দল গঠন বলতে বোঝানো হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণের দ্বারা পরিচালিত জনগণের জন্য জনগণের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে জনগণ থাকে বিভক্ত এবং তাদের স্বার্থকে বাস্তব রূপ দেবার জন্য প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক সংগঠনের। জনগণের রাজনৈতিক সংগঠনটিকে অবশ্যই জনগণের পক্ষে রাখা চায় এবং সেজন্য রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারনা জনগণের থাকা দরকার। নতুবা জনগণের সংগঠন জনগণের উপরই জগদ্দল পাথর হিসেবে চেপে বসবে। রাজনীতি হচ্ছে শ্রেণিসমূহের মধ্যে সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে পারে জনগণের মুক্তিকামী একটি রাজনৈতিক সংগঠন।

বাংলাদেশে যত রকমের শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির পার্টি রয়েছে তাদের অধিকাংশেরই চেষ্টা হলো ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক সমাজ-অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা। বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের এবং শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী পার্টিগুলোর অর্থনীতিবাদী-সংস্কারবাদী কিছু মিছিল-মিটিং থাকলেও তাদের সমাজ-বৈপ্লবিক কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেই। ফলে এদেশে কোনো যথার্থ গণস্বার্থ রক্ষাকারী পার্টি এখনো গড়ে ওঠেনি। এদেশের শক্তিশালী জনগণের শত্রু পার্টিগুলি জনগণের শক্তিতে বলশালী নয়, তাদের শক্তি মূলত সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদসামন্তবাদের কাছ থেকে পাওয়া।

গণস্বার্থ রক্ষাকারী একটি দৃঢ় সংগঠিত পার্টি আপনা থেকেই আবির্ভূত হবে না। অর্থনীতিবাদী, নৈরাজ্যবাদী, সংশোধনবাদী এবং স্বতঃস্ফূর্ততাবাদী কার্যক্রম থেকে একটি বৈপ্লবিক পার্টিকে রক্ষা করতে হবে। বৈপ্লবিক পার্টির কাজ একদিকে পুঁজিবাদীদের শ্রেণির পার্টি থেকে যেমন নিজেদের পার্থক্যরেখা তৈরি করা তেমনি তাদের আরেকটি কাজ হচ্ছে বিপ্লববিরোধীদের থেকে নিজেদের পার্থক্যরেখা নির্দিষ্ট করা। একটি ঐক্যবদ্ধ পার্টির ঐক্যের কার্যক্রম কিরূপ হতে পারে সে সম্পর্কে ভি. আই. লেনিন লিখেছেন,

“ঐক্যবদ্ধ হবার আগে, এবং যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি সেজন্যে, সবার আগে আমাদের অবশ্যই বিভেদের রেখাটিকে স্পষ্ট ও ঋজুভাবে টেনে নিতে হবে।”[১]

বাংলাদেশে যে পার্টি তৈরি করতে হবে সেই পার্টিকে হতে হবে জনগণের শক্তিতে বলিয়ান জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষার সাথে পরিচালিত একটি সাম্যবাদী সমাজ-বিপ্লবের রূপকার জনগণের পার্টি।[২] বিপ্লব করতে হলে, সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধন করতে হলে বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দল দরকার। এই প্রসঙ্গে মাও সেতুং লিখেছেন,

“যদি বিপ্লব করতে হয়, তাহলে অবশ্যই একটা বিপ্লবি পার্টি থাকতে হবে। একটা বিপ্লবি পার্টি ছাড়া, মার্কসবাদী- লেনিনবাদী বিপ্লবি তত্ত্বে এবং বিপ্লবি রীতিতে গড়ে উঠা একটা বিপ্লবি পার্টি ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণি ও ব্যাপক জনসাধারণকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহি কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্বদান করা অসম্ভব।”[৩]  

এরকম একটি শক্তিশালী বৈপ্লবিক পার্টি যারা নির্মাণ করতে চান তারা পার্টির রণনীতি ও রণকৌশল ঠিক করবেন। কেননা, ‘নীতি এবং কৌশলই হচ্ছে পার্টির প্রাণ, সকল স্তরের নেতৃস্থানীয় কমরেডদের অবশ্যই এদের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে এবং হাজার কারণেও তাদের অমনোযোগি হওয়া উচিত নয়।’[৪] নীতিই পার্টিকে প্রাণশক্তিতে ভরপুর করে তোলে। এই নীতি নির্ধারিত হয় দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। মাও সেতুং আরো লিখেছেন,

“একটি মহান বিপ্লবি আন্দোলনের পথনির্দেশকারী রাজনৈতিক পার্টির কাছে যদি বিপ্লবী তত্ব না থাকে, ইতিহাসের জ্ঞান না থাকে এবং বাস্তব আন্দোলনের গভীর উপলব্ধি না থাকে, তাহলে তার পক্ষে বিজয়লাভ অসম্ভব।”[৫]  

জনগণের মুক্তিকামী রাজনৈতিক দলটি জনগণ ও গণশত্রুর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা নির্ধারণ করবে। বর্তমানে জনগণ বলতে দেশের কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও তাদের পক্ষে দেশপ্রেমিক সকল শক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে বুঝতে হবে; যেমন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীকে বুঝতে হবে এবং গণশত্রু বলতে বুঝতে হবে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দেশিয় দালাল রাজনীতিবিদ আমলা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, জনগণের সম্পদের লুটেরাগোষ্ঠী, জনগণের শোষক ও নির্যাতকেরা। ‘জনগণ’ ও ‘গণশত্রু’র ধারনাকে সময়, অবস্থা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতা হবেন এদেশের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনগণকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রগতিশীল করার জন্য শ্রমিক ও কৃষক। সেই শ্রমিক ও কৃষকগণই নেতা হবেন এবং তারা এদেশের জলে-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এদেশের মানুষকে মর্যাদাবান সমৃদ্ধশালী করবার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রত্যয়ী হবেন। রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ যেমন দলকে গঠন করবেন তেমনি দল গঠিত হবে দলের সকল সদস্য ও কর্মীর কর্ম ও উদ্যোগে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ প্রতিটি অঙ্গ সংগঠন ও ইউনিটের নেতা দলিয় সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। দলের কাউন্সিল নির্দিষ্ট সময় অন্তর অনুষ্ঠিত হবে।  

আরো পড়ুন:  বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা

দলের লিখিত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ও কর্মনীতি থাকবে এবং তা সময়ের সাথে সাথে সময়োপযোগী করতে হবে। দলের উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে জনগণের সামনে উপস্থাপন ও প্রচার করতে হবে। দল কাজ করবে লিখিত ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে। প্রতিটি দলের গঠনতন্ত্র, গঠন কাঠামো, নীতিমালা ও কর্মসূচি জনগণের কাছে সহজলভ্য করে দিতে হবে। দলকে আদর্শনিষ্ঠ সুশৃঙ্খল ও আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। দলকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষী হতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের পর কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীরা দলের ঐক্য বজায় রেখে বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে প্রকাশ্য জনসভাসহ সর্বত্র দলের কর্মকাণ্ড ও কর্মনীতির আলোচনা ও সমালোচনা করতে পারবেন। প্রতিটি দলের নেতাকে জনগণের, সাংবাদিকের বা যে কোনো ব্যক্তির যে কোনো প্রশ্নের জবাব জনসভায় বা সাংবাদিক সম্মেলনে বা যে কোনো স্থানে করার স্বাধীনতা দিতে হবে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদকে দলের অভ্যন্তরে ও জনগণের ভেতরে অনুশীলন করতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উদারতাবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে; তবে গণশত্রু, শোষক, নির্যাতক, অপরাধীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।[৬]

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. অমল দাশগুপ্ত, কমরেড লেনিন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, এনবিএ প্রথম সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা ৭৮

২. বিপ্লবী পার্টি প্রসঙ্গে জানতে আপনারা পড়ুন আমার রচিত ২০১৫ সালে ভাষাপ্রকাশ ঢাকা থেকে প্রকাশিত সমাজতন্ত্র গ্রন্থের ৬৯-৭৫ পৃষ্ঠার প্রবন্ধ, কমিউনিস্ট পার্টি কি ও কেন?

৩. মাও সেতুং, সারা দুনিয়ার বিপ্লবি শক্তি এক হও, সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, নভেম্বর, ১৯৪৮, সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, পিকিং, প্রথম প্রকাশ,  ১৯৬৮ পৃষ্ঠা ১-২।

৪. মাও সেতুং, পূর্বোক্ত, পরিস্থিতি সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি, ২০ মার্চ, ১৯৪৮, পৃষ্ঠা ৮।

৫. মাও সেতুং, পূর্বোক্ত, জাতীয় যুদ্ধে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির স্থান, অক্টোবর, ১৯৩৮, পৃষ্ঠা ৪।

আরো পড়ুন:  রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে

৬. প্রবন্ধটি আমার [অনুপ সাদি] সম্পাদিত ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গ্রন্থে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রাণকাকলিতে ১৩ জুলাই, ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত হয়। রোদ্দুরে ডট কমে প্রকাশের সময় পরিবর্ধন করা হয়েছে। রচনাকাল জুন-জুলাই, ২০১০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!