আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > দেশপ্রেম নিহত হয়নি, আহত হয়েছে

দেশপ্রেম নিহত হয়নি, আহত হয়েছে

দেশপ্রেম

দেশ বলতে কেবল ভূমি বোঝায় না, ভূমি তো বোঝাবেই, কিন্তু দেশ ভূমির চেয়েও বড়, অনেক অনেক বড়। কেননা, দেশে মানুষ আছে, মানুষ থাকে এবং সে জন্যই দেশ অমন তাৎপর্যপূর্ণ। দেশপ্রেম বলতে আসলে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বোঝায়। আমাদের এই দেশপ্রেম বারবার পরীক্ষা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। একাত্তরের কথা আমরা ঘুরে ঘুরে বলি। কেননা, চরম একটা পরীক্ষা তখনই হয়েছে। তার আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে, কিন্তু একাত্তরে যেমনটা হয়েছে বাঙালির জন্য দেশপ্রেমের পরীক্ষা, তেমনটি আর কখনো হয়নি। হানাদাররা সব দেশপ্রেমিক মানুষকেই সেদিন প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছিল, অপেক্ষাটা ছিল আদেশ কার্যকর করবার মাত্র। স্বাধীনতার পর দক্ষিণপন্থী একটি বাংলা দৈনিক লিখেছিল_ কমিউনিস্টদের আণ্ডাবাচ্চাসমেত খুঁজে বের করতে হবে, একাত্তর সালে চরম দক্ষিণপন্থী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শিশু-বৃদ্ধ সব দেশপ্রেমিকেরই খোঁজ করছিল, কুকুরের মতো, গন্ধ শুঁকে শুঁকে। সন্দেহভাজন যাকেই পেয়েছে, হত্যা করেছে। কিন্তু ওই চরম নির্যাতনেও দেশপ্রেম নিহত হয়নি। নিহত হবে কী, উল্টো শক্তিশালী হয়েছে, অগ্নিপরীক্ষিত ইস্পাতের মতো। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বহু মানুষ সেদিন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে সম্মত হয়নি, বরং ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে দিতে বুক পেতে দিয়েছে গুলিতে নিহত হওয়ার জন্য।

অমনভাবে পরীক্ষিত যে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুগের পর যুগ ধরে যে লড়ছিল, স্বাধীনতার পর এখন দেখছি তার ভীষণ দুর্দশা। স্বাধীনতার পর ক্রমাগত আঘাত পেয়েছে, পেয়ে পেয়ে বেশ কাতর হয়ে পড়ে রয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, একটি লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছিল, লক্ষ্যে পেঁৗছে দেখে সে আক্রান্ত, বিপদগ্রস্ত। এর অর্থ কী? স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে তাই কি দেশপ্রেমের এই নিবীর্য অবস্থা? মোটেই তা নয়। ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তি তো অনেক দূরের কথা, সে তো সহজে আসে না, আসার পরও বোঝা যায় যে আসেনি। একটা শ্রেণী আছে, যারা ক্ষমতায় যায় এবং অপচয় করে, পাচার করে দেয় সম্পদ। দেশকে উৎপাদনকারী হতে দেয় না, করে রাখে ব্যবসানির্ভর, যাতে তাদের সুবিধা হয়, কমিশন পায়। স্বাধীনতা এদেরই। আর এই স্বাধীনতার হাতেই দেশপ্রেম আহত হয়েছে, নিহত যে হয়নি, সেটা আমাদের কপালের জোর। এসব বিলাসী ক্ষমতাধররা সবাই আত্মপ্রেমিক, এদের মধ্যে দেশপ্রেমের নামগন্ধ নেই। ইতিহাসের মস্তবড় পরিহাস এটা যে পরাধীনতার কালে আমরা দেশপ্রেমিক ছিলাম, স্বাধীনতার পর উপক্রম হলো তাকে হারবার। অনেক কাল আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশের ২০০ বছর, পাকিস্তানের ২৪ বছর, সেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হব, আশা ছিল, ছিল ভরসা, স্বাধীনতার পর দেখা গেল মার খেয়েছে দেশপ্রেম স্বয়ং। দেশপ্রেম এবং আত্মপ্রেম পরস্পর বিরুদ্ধ বটে। কিন্তু প্রকৃত ও আলোকিত দেশপ্রেমের সঙ্গে আত্মপ্রেমের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী নয়। কেননা, ব্যক্তির মুক্তি তো আসলে সমষ্টির মুক্তির মধ্যে নিহিত। একা কোন মানুষটা কবে স্বাধীন হয়েছে? দ্বীপে যে থাকে, অথবা বনবাসে, তার তুলনায় পরাধীন আর কে? দেবতা ও পশুর কথা আলাদা, স্বাভাবিক মানুষ স্বাধীন হয় সমাজের ভেতরে থেকেই এবং সমাজ যদি নষ্ট হয় তবে ব্যক্তি কী করে স্বাধীন হবে? যে পুকুরের পানি গেছে পচে, সেখানে কোন মাছটা নিরাপদ? পরাধীনতার যুগে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছি। ব্রিটিশের রাষ্ট্র আমাদের শত্রু ছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু ছিল, কিন্তু বাংলাদেশি রাষ্ট্র? সেও কি শত্রু? শত্রু না হোক, এ রাষ্ট্র জনগণকে প্রকৃত স্বাধীনতা দিচ্ছে না_এটা ঠিক। পাকিস্তান আমলে বৈরী রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল মুসলিম লীগ, বিপক্ষে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই রাষ্ট্রের পক্ষে, অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পক্ষে। কিন্তু জনগণের পক্ষে কে?

আরো পড়ুন:  সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়তে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষার গুরুত্ব

পাকিস্তানের পক্ষে লোকে একদিন জিন্দাবাদ দিয়েছিল, নইলে সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো কী করে? সেদিন বিপক্ষে ছিল কংগ্রেস, পক্ষে মুসলিম লীগ। লোকে ভাবল, পাকিস্তান এলে তাদের জন্য স্বাধীনতা আসবে। পাকিস্তানের পক্ষে তাই ভোট পড়েছিল শতকরা ৯৭ ভাগ। সেই ভোট দেশপ্রেমের। কিন্তু দেখা গেল যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রক্ষা করল না, স্বাধীনতা চলে গেল অল্পকিছু লোকের হাতে। সাত বছর পার হতে না হতেই ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মানুষ আরো বর্ধিত হারে, এবার শতকরা ৯৮ জনই ভোট দিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিদার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। এ ভোটও দেশপ্রেমিক ভোটই। তারপর বাংলাদেশে ভোট হয়েছে, কিন্তু স্রোতের মতো মানুষ যে একদিকে এগোবে সেটা ঘটেনি। কেননা, কোনো দলকেই মানুষ প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক মনে করেনি, মনে করেছে তারা ক্ষমতার জন্য লড়ছে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুটি ঘটনা একই সঙ্গে এবং ক্রমাগত বর্ধিত মাত্রায় ঘটেছে। প্রথমটি হলো দেশপ্রেমের পতন, অপরটি বৈষম্যের বৃদ্ধি। এদের আলাদা আলাদা ব্যাপার মনে হবে, কিন্তু আসলে এরা একই বিকাশের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। আর সেই বিকাশটা হলো পুঁজিবাদের। পুঁজিবাদ ছাড়া যে বিকল্প নেই এবং ওটিই যে সবচেয়ে ভালো আদর্শ, এই বোধ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর ছিল, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের নায়করাও এই আদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। ফলে পুঁজিবাদই কায়েম হয়েছে। আর পুঁজিবাদের নিয়মই তো এটা যে সেটা বৈষম্য বৃদ্ধি করবে, ধনীকে আরো ধনী এবং গরিবকে আরো গরিব করে ছাড়বে। সেটাই ঘটেছে; স্বাধীনতা চলে গেছে ধনীদের হাতে, গরিব হয়েছে বঞ্চিত মানুষ। আর ধনী যারা, তারা তো আসলে দেশপ্রেমিক নয়, তারা অত্যন্ত স্থূল ও কদর্যরূপে আত্মপ্রেমিক বটে। দেশপ্রেম থাকা না-থাকার বাস্তবতাটা বেশ পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে যদি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই। সেখানে ভবিষ্যতের নাগরিকরা সব প্রস্তুত হচ্ছে আড়মোড়া ভেঙে। যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, তারা তো স্বদেশপ্রেমের চর্চা করবার জন্য মোটেই অঙ্গীকারবদ্ধ নয়। অনেক টাকা বিনিয়োগ করছে, সেই টাকা তুলে নেবে, মুনাফা করবে। মুনাফার এই নগদ লোভটা যে দেশপ্রেমের পৃষ্ঠপোষক নয় সে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। যারা মাদ্রাসায় পড়ছে তারাও দেশের কথাকে অগ্রাধিকার দেবে না, অন্ন চিন্তাকেই প্রধান করবে।

আরো পড়ুন:  দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতাবাদ

পুঁজিবাদ যে দেশপ্রেমবিরোধী এটা স্বতঃসিদ্ধ। বাংলাদেশ ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে, যে নির্ভরশীলতা মোটেই কমছে না, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে, ক্রমাগত।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ২রা জানুয়ারী ২০১১ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এবং সেখান থেকে সংগৃহীত। ঐ পত্রিকায় নিবন্ধটি যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, এখানেও সেভাবে দেয়া হয়েছে। কোনোরূপ পরিবর্তন করা হয়নি ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
"জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি" এবং "বাঙালীর জাতীয়তাবাদ" গ্রন্থের লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক। বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য এবং প্রগতিশীল মার্কসবাদী আন্দোলনে প্রভূত অবদান রেখে এই লেখক এখন জীবন্ত কিংবদন্তি। ২৩ জুন, ১৯৩৬ তারিখে জন্মগ্রহণ কারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page