আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > আমাদের বিপ্লবের কথা

আমাদের বিপ্লবের কথা

(ন. সুখানভের মন্তব্য প্রসঙ্গে)

১.

বিপ্লব প্রসঙ্গে সুখানভের মন্তব্যগুলোর ওপর এই কয়দিন চোখ বুলিয়ে দেখছিলাম। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সমস্ত নায়কদের মতোই আমাদের সমস্ত পেটি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের পুঁথিবীগীশি। তারা যে অসাধারণ ভীরু সেকথা ছেড়ে দিলেও, জার্মান নিদর্শন থেকে ন্যুনতম বিচ্যুতির কথা উঠলেই তাদের সেরা লোকেরাও যে কুণ্ঠিত হয়ে পড়ে, গোটা বিপ্লব ধরেই যথেস্ট প্রদর্শিত সমস্ত পেটি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের এই বৈশিষ্ট্যের কথা না তুললেও, চোখে পড়ে তাদের অতীতের দাসসুলভ অনুকরণ।

সবাই এরা নিজেদের বলে মার্কসবাদী। কিন্তু, মার্কসবাদকে তারা বোঝে অসম্ভব মাত্রার এক পুঁথিবাগীশী ধরনে। একেবারেই তারা বোঝে নি মার্কসবাদের চুড়ান্ত জিনিসটা : অর্থাৎ তার বৈপ্লবিক দ্বান্দ্বিকতা। বিপ্লবের মুহূর্তে দরকার সর্বাধিক নমনীয়তা(১), মার্কসের এই সরাসরি উক্তিটা পর্যন্ত তারা একেবারে বোঝে নি এবং মার্কস তাঁর পত্রাবলীতে, মনে হয় ১৮৫৬ সালের কথা, শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে(২) বিপ্লবী পরিস্থিতি গড়ে তুলতে পারে, জার্মানিতে এমন এক কৃষক যুদ্ধকে যুক্ত করার ওপর যে-আস্থা প্রকাশ করেছিলেন, এমন কি সেটা লক্ষ্য করে নি, এই সোজাসাজি উক্তিটাও তারা এড়িয়ে গিয়ে গরম পায়েসের কাছে বেড়ালের মতো কেবলি ঘুরপাক খায়।

তাদের সমস্ত আচরণেই তারা নিজেদের উদ্ঘাটিত করে ভীরু সংস্কারবাদী হিসেবে, যারা বুর্জোয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন তো দূরের কথা, তার কাছ থেকে একটু সরে আসতেও ভয় পায়, অথচ সেইসঙ্গে সেই কাপুরুষতাকে চাপা দেয় অফুরন্ত বুলি ও হামবড়াই দিয়ে। কিন্তু, এমন কি বিশুদ্ধ তত্ত্বের দিক থেকেও এদের সকলের ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে তাদের পক্ষ থেকে মার্কসবাদের নিম্নোক্ত যুক্তিটি বোঝার পরিপূর্ণ অক্ষমতা; এতদিন পর্যন্ত তারা পশ্চিম ইউরোপে পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিকাশের সুনির্দিষ্ট একটি পথ দেখে এসেছে; এই পথটা যে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব কেবল mutatis mutandis,(৩) কিন্তু কিছু সংশোধন না নিয়ে নয় (বিশ্ব ইতিহাসের সাধারণ গতির দিক থেকে যা একেবারেই নগণ্য), সেটা এরা কল্পনা করতেও পারে না।

প্রথমত — বিপ্লবটা প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। তেমন বিপ্লবে ঠিক যুদ্ধের ওপরেই নির্ভরশীল কতকগুলি নতুন দিক বা রুপভেদ প্রকাশ পাওয়ার কথা। কেননা, বিশ্বে এর আগে কখনো এমন অবস্থায় এমন যুদ্ধ ঘটে নি। আজো পর্যন্ত আমরা দেখছি যে, এই যুদ্ধের পর সমৃদ্ধতম দেশগুলির বুর্জোয়ারা তাদের ‘স্বাভাবিক’ বুর্জোয়া -সম্পর্ক সুস্থির করে তুলতে পারছে না, আর আমাদের সংস্কারবাদীরা, বিপ্লবীর ভেক নেওয়া পেটি বুর্জোয়ারা ভেবেছে ও ভাবছে সেই স্বাভাবিক বুর্জোয়া-সম্পর্কই শেষসীমা (তাকে অতিক্রম করা যায় না), তাতে আবার এই ‘স্বাভাবিককে’ তারা বোঝে চুড়ান্ত ছক-বাঁধা সংকীর্ণ অর্থে।

আরো পড়ুন:  সমাজ হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপের উৎপাদন

দ্বিতীয়ত — এই কথাটা তাদের কাছে একেবারেই অবোধ্য যে, সমগ্র-বিশ্ব ইতিহাসের বিকাশে সাধারণ একটা নিয়মবদ্ধতা থাকলেও তাতে করে সেই বিকাশের, হয় রূপে নয় পরম্পরায়, স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসুচক এক-একটা পর্ব নাকচ হয়ে যায় না, বরং সেটাকেই ধরে নিতে হয়। তাদের মাথায়, দৃষ্টান্তস্বরূপ, এমনকি এটুকুও ঢোকে না যে, সভ্যদেশ ও এই যুদ্ধে প্রথম চূড়ান্তরূপে সভ্যতায় আকর্ষিত দেশগুলির, সমস্ত প্রাচ্য, অ-ইউরোপীয় দেশগুলির সীমান্তবর্তী দেশ রাশিয়া তাই এমন কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ফোটাতে সমর্থ ও বাধ্য, যা বিশ্ববিকাশের সাধারণ ধারানুসারী হলেও পশ্চিম ইউরোপীয় দেশের সমস্ত প্রাক্তন বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লবকে পৃথক করে তোলে এবং প্রাচ্যদেশে সেই বিপ্লবের উত্তরণে কিছু, কিছু, আংশিক অভিনবত্ব দান করে।

যেমন, আমরা সমাজতন্ত্রের মাত্রায় পরিণত হয়ে উঠি নি, ওদের নানাবিধ ‘পণ্ডিত’ মহাশয়দের উক্তিমতো সমাজতন্ত্রের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক পূর্ব শর্ত আমাদের নেই, এই যে-যুক্তিটা ওরা পশ্চিম-ইউরোপীয় সোশ্যাল ডেমোক্রাসির বিকাশের সময় মুখস্থ করে নিয়েছিল, সেটা একেবারেই ছকবাঁধা। অথচ কারোরই নিজের কাছে এই প্রশ্ন করার খেয়াল হচ্ছে না; কিন্তু প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে যে-ধরনের বিপ্লবী পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল তার সম্মুখীন হয়ে জনগণ কি তার অবস্থার নিরুপায়তার চাপে এমন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না, যাতে নিজের জন্য সভ্যতার পরবর্তী বিকাশের মতো এমন কিছু শর্ত লাভের যেমনই হোক কিছু সুযোগ আছে যা খুব স্বাভাবিক নয়?

‘উৎপাদন -শক্তির যে উচ্চ বিকাশে সমাজতন্ত্র সম্ভব, সেটা রাশিয়া অর্জন করে নি।’ এই প্রতিপাদ্যটায় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সমস্ত নায়ক এবং অবশ্যই সুখানভ সত্যিই যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছেন। এই তর্কাতীত প্রতিপাদ্যটাকে তারা হাজার ঢঙে চর্বিতচর্বণ করেছে এবং তাদের ধারণা হচ্ছে যে, আমাদের বিপ্লবের মূল্যায়নে এটাই চরম কথা।

কিন্তু পরিস্থিতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে যদি রাশিয়া পতিত হয় প্রথমত, বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী এমন এক যুদ্ধে যাতে পশ্চিম ইউরোপের কিছুটা প্রভাবশালী সমস্ত দেশই জড়িত, যদি তার বিকাশকে এনে দেয় ধুমায়মান এবং অংশত ইতিমধ্যেই সূচিত প্রাচ্য বিপ্লবগুলির সীমান্তে, এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে ১৮৫৬ সালে প্রাশিয়ার সম্ভবপর এক পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে মার্কসের মতো এক ‘মার্কসবাদী’ শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে ‘কৃষক যুদ্ধের’ যে-জোট বন্ধনের কথা লিখেছিলেন, তা কার্যকর করতে আমরা পারছি, তাহলে?

আরো পড়ুন:  সমর শিল্প বুর্জোয়ার শ্রেণিগত আধিপত্য সুদৃঢ়করণ ও সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের শক্তি

পরিস্থিতির পরিপূর্ণ নিরুপায়তায় শ্রমিক-কৃষকদের শক্তিকে দশগুণ বাড়িয়ে তুলে যদি সভ্যতার মূল পূর্বশর্ত গঠনের জন্য অন্য রকম একটা উৎক্রমণের সুযোগ দিয়ে থাকে, যা অন্যান্য পশ্চিম-ইউরোপীয় রাষ্ট্রগলি থেকে স্বতন্ত্ৰ? বিশ্ব-ইতিহাসের বিকাশের সাধারণ ধারা কি তাতে বদলে যাচ্ছে? বিশ্ব-ইতিহাসের সাধারণ গতিধারায় যারা এসে পড়ছে ও পড়েছে তেমন প্রতিটি রাষ্ট্রের মূল শ্রেণীগুলির মূল সম্পর্কপাত কি তাতে বদলে যাচ্ছে?

সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য যদি সংস্কৃতির একটা নির্দিষ্ট মাত্রা দরকার হয়, (যদিও অবশ্য সেই সুনিদিষ্ট ‘সাংস্কৃতিক মাত্রাটি’ ঠিক কী তা কেউ বলতে পারে না, কেননা পশ্চিম-ইউরোপীয় প্রতিটি রাষ্ট্রেই তা বিভিন্ন), তাহলে আগে বিপ্লবী উপায়ে সেই সুনিদিষ্ট মাত্রাটির পূর্বশর্ত অর্জনের কাজটা শুরু করে, পরে শ্রমিক-কৃষক ক্ষমতা ও সোভিয়েত ব্যবস্থার ভিত্তিতে অন্য জাতিদের নাগাল ধরার জন্য এগুনো চলবে না কেন?

১৬ জানুয়ারি, ১৯২৩

.

আপনারা বলেছেন সমাজতন্ত্র গড়ার জন্য সভ্যতা দরকার। খুবই ভাল কথা। কিন্তু কেনই বা আমরা জমিদার বিতাড়ন ও রুশ পুঁজিপতি বিতাড়ন – সভ্যতার এই ধরনের পূর্বশর্ত আগে গড়ে পরে সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করতে পারি না? কোন পুঁথিতে আপনারা পড়েছেন যে, সাধারণ ঐতিহাসিক পরম্পরার এই ধরনের অদলবদল অমার্জনীয় অথবা অসম্ভব?

মনে পড়ছে, নেপোলিয়ন লিখেছিলেন, “On s’engage et puis… on voit’, স্বচ্ছন্দ রুশ তর্জমায় তার মানে: “প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে নামা যাক, তারপর দেখা যাবে’। আমরাও ১৯১৭ সালের অক্টোবরে একটা গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে নেমেছি, এবং তারপর ব্রেস্ত শান্তি অথবা নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতি, প্রভৃতি বিকাশের খুঁটিনাটিও দেখেছি (বিশ্ব-ইতিহাসের দৃষ্টি থেকে এগুলো নিঃসন্দেহেই খুঁটিনাটি)। বর্তমানে আর কোন সন্দেহ নেই যে, মূলত আমরা জিতেছি।

সুখানাভের দক্ষিনে দন্ডায়মান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটদের কথা ছেড়েই দিলাম, আমাদের সুখানভদেরও একথা স্বপ্নেও মনে হয় না যে, এছাড়া আদপেই বিপ্লব ঘটা সম্ভব নয়। আমাদের ইউরোপীয় কূপমণ্ডুকদের স্বপ্নেও মনে হয় না যে, জনসংখ্যায় অপরিসীম সমৃদ্ধ এবং সামাজিক পরিস্থিতির বৈচিত্র্যে অপরিসীম বিভিন্ন প্রাচ্য দেশগুলির ভবিষ্যৎ বিপ্লব নিঃসন্দেহেই রুশ বিপ্লবের চেয়ে অনেক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলবে।

আরো পড়ুন:  অনিয়মিত যুদ্ধ তৎপরতা হচ্ছে রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় কার্যকর্তাদের মধ্যে চালিত সহিংস লড়াই

কাউটস্কির কায়দায় লেখা একটা পাঠ্যপুস্তক স্বকালে খুবই হিতকর বস্তু ছিল বৈকি। কিন্তু যতই হোক সেই পাঠ্যপুস্তকে পরবর্তী বিশ্ব-ইতিহাস বিকাশের সবকিছু রূপই ধরে দেওয়া হয়েছে, এই ধারণা বর্জনের সময় হয়েছে। যারা তা ভাবে তাদের নির্বোধ ঘোষণা করাই হবে সময়োচিত। (৪)

১৭ জানুয়ারি, ১৯২৩

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ

১. মার্কসের ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ বইটিতে ‘অতি নমনীয় রাজনৈতিক সংস্থা’ হিসেবে বর্ণিত প্যারিস কমিউন এবং ১৮৭১ সালের ১২ এপ্রিল ল কুগেলমানের কাছে লিখিত মার্কসের চিঠিতে উল্লেখিত প্যারিসবাসীর ‘অতি নমনীয় চরিত্রের’ প্রশংসা সম্ভবত লেনিন এখানে মনে করছেন।

২.  লেনিন এখানে কার্ল মার্কস কর্তৃক ১৮৫৬ সালের ১৬ এপ্রিল ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসকে লিখিত চিঠির নিম্নোক্ত লাইনগুলোর কথা বলছেনঃ ‘জার্মানির পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করবে কৃষক যুদ্ধের দ্বিতীয় একটি সংস্করণ কর্তৃক প্রলেতারিয় বিপ্লবে মদদদানের সম্ভাবনার উপর। তাহলেই এটা হবে চমতকার … …’।

৩. উপযুক্ত অদলবদল সহ। — সম্পাদক

৪. লেনিন লিখিত এই প্রবন্ধটি প্রগতি প্রকাশন মস্কো ১৯৮৬ কর্তৃক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বক্তৃতা ও প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থের ৫৭৭-৫৮০ পৃষ্ঠা থেকে সংকলিত।

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (এপ্রিল ২২, ১৮৭০ – জানুয়ারি ২১, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page