আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > দ্বৈত ক্ষমতা

দ্বৈত ক্ষমতা

প্রত্যেকটি বিপ্লবেরই মূল প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি উপলব্ধ না হলে বিপ্লবে সজ্ঞান অংশগ্রহণ সম্ভবপর হতে পারে না, বিপ্লব পরিচালনার তো কথাই ওঠে না।

আমাদের বিপ্লব সৃষ্টি করেছে দ্বৈত ক্ষমতা, এই হলো তার খুবই লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এই ঘটনাটিকে সর্বাগ্রে উপলব্ধি করতে হবে: এটা না বুঝলে আমরা এগোতে পারি না। আমাদের জানতে হবেই কী করে সম্পূরণ আর সংশোধন করতে হয় সাবেক “সূত্ৰগুলিকে”, যেমন বলশেভিকবাদের “সূত্রকে”, কেননা মোটের উপর সঠিক দেখা গেলেও সেগুলির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পৃথক প্রতিপন্ন হয়েছে। দ্বৈত ক্ষমতার কথা আগে কেউ ভাবে নি, ভাবতে পারতও না ।

এই দ্বৈত ক্ষমতাটা কী ? বুর্জোয়াদের সরকার, সাময়িক সরকারের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আরেকটা সরকার, সেটা এখন অবধি দুর্বল, প্রারম্ভিক, কিন্তু নিঃসন্দেহে একটা সরকার, যার প্রকৃত অস্তিত্ব রয়েছে, বাড়ছে – শ্রমিক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলি।

এই অন্যতর সরকারটির শ্রেণীগত সংযুতি কী? এটা প্রলেতারিয়েত এবং (সৈনিকের উর্দি-পরা) কৃষকদের নিয়ে গঠিত। এই সরকারের রাজনৈতিক প্রকৃতিটা কী? এটা বৈপ্লবিক একনায়কত্ব, অর্থাৎ কোনো কেন্দ্রীকৃত রাষ্ট্রক্ষমতার বিধিবদ্ধ একটা আইনের ভিত্তিতে নয়, সরাসরি বৈপ্লবিক দখলের ভিত্তিতে, নিচ থেকে জনগণের সরাসরি উদ্যমের ভিত্তিতে স্থাপিত ক্ষমতা। ইউরোপ আর আমেরিকার অগ্রসর দেশগুলিতে এখনো প্রাধান্যশালী সাধারণত বিদ্যমান ক্ষমতা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন রকমের। এই পরিস্থিতিটাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হচ্ছে, এটা নিয়ে যথেষ্ট ভেবে দেখা হয় না প্রায়ই, অথচ এটাই ব্যাপারটার সারমর্ম। এই ক্ষমতা ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের মতো একই ধরনের। এই ধরনটার মৌলিক বিশেষত্বগুলি হলো: ১) ক্ষমতার উৎপত্তিস্থল নয়। পার্লামেন্টে আগে আলোচিত এবং পাস করা আইন, সেটা হলো নিচ থেকে, নিজ নিজ এলাকাগুলি থেকে জনগণের সরাসরি উদ্যম। — চলতি কথায় বললে, সরাসরি “দখল”; ২) জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জনগণের বিরুদ্ধে নিযুক্ত পুলিস আর ফৌজের বদলে সমগ্র জনগণের সরাসরি অস্ত্রসজ্জা; এমন ক্ষমতাধীন রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখে সশস্ত্র শ্রমিক আর কৃষকেরা নিজেরাই, সশস্ত্ৰ জনগণ নিজেরাই; ৩) আধিকারিকবর্গ, আমলাতন্ত্রের জায়গায় অনুরুপভাবে স্থাপিত হয় জনগণের নিজেদের সরাসরি কর্তৃত্ব, কিংবা অন্ততপক্ষে তাদের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ; তারা হয়ে পড়ে নির্বাচিত কর্মকতা, শুধু তাই নয়, অধিকন্তু জনগণের প্রথম দাবি অনুসারে অপসারণীয়; তারা সাদাসিধে এজেণ্টে পরিণত হয়; চড়া, বুর্জোয়া হারে পারিশ্রমিক-দেওয়া বিশেষ-সংযোগপ্রাপ্ত ‘চাকর’-দল থেকে তারা হয়ে দাঁড়ায় বিশেষ ‘কৃত্যক বিভাগের’ কর্মী, যাদের পারিশ্রমিক একজন সুযোগ্য শ্রমিকের সাধারণ মাইনে থেকে বেশি নয়।

আরো পড়ুন:  শ্রম হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রতিমুহুর্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক

এটা, একমাত্র এটাই হলো বিশেষ ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে প্যারিস কমিউনের সারমর্ম। এই সারমর্মটাকে ভুলে গেছেন কিংবা বিকৃত করছেন প্লেখানভরা (ডাহা জাতিদন্তীরা যারা মার্কসবাদের প্রতি বেইমান), কাউটস্কিরা (মধ্যস্থলের’ লোকেরা, যারা জাতিদম্ভবাদ আর মার্কসবাদের মধ্যে দোদুল্যমান) এবং সাধারণভাবে সেই সমস্ত সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট, সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি, ইত্যাদি, ইত্যাদিরা যারা এখন কর্তব্যক্তি।

ফাঁকা বুলি, এড়ানোর কায়দা, ফন্দিফিকির দিয়ে তারা পার পেতে চেষ্টা করছে; বিপ্লব সম্বন্ধে তারা পরস্পরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে হাজার বার, কিন্তু শ্রমিক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলি কী বটে সেটা বিবেচনা করতে তারা নারাজ। যে-পরিমাণে এই সোভিয়েতগুলি বিদ্যমান, যে-পরিমাণে সেগুলি একটা ক্ষমতা, তাতে রাশিয়ায় আমাদের রয়েছে প্যারিস কমিউন ধরনের একটি রাষ্ট্ৰ, এই স্পষ্ট সত্যটাকে মানতে তারা নারাজ ।

“যে-পরিমাণে” কথাটার উপর আমি জোর দিয়েছি তার কারণ এটা একটা প্রারম্ভিক ক্ষমতা মাত্র। বুর্জোয়া সাময়িক সরকারের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে এবং একপ্রস্ত বাস্তব ছাড়-সুবিধা দিয়ে এটা নিজেই বুর্জোয়াদের কাছে বিভিন্ন অবস্থান সমর্পণ করেছে এবং সমর্পণ করছে।

কেন? সেটা কি চাখেইজে, সেরেতোলি, স্তেকলোভ অ্যান্ড কোং ভুল করছে বলে? বাজে কথা। এমনটা ভাবতে পারে শুধু কোনো কুপমণ্ডকে — কোনো মার্কসবাদী নয়। কারণটা হলো প্রলেতারিয়ান আর কৃষকদের অপ্রতুল শ্রেণিচেতনা এবং সংগঠন। আমি যাদের নাম উল্লেখ করেছি সেই নেতাদের “ভুল” রয়েছে তাদের পেটি-বুর্জোয়া মতাবস্থানে, এই ঘটনার মধ্যে যে, শ্রমিকদের চিন্তা স্পষ্ট করার বদলে তারা সেটাকে ঝাপসা করে দিচ্ছে; পেটি-বুর্জোয়া মোহগুলো কাটিয়ে দেবার বদলে তারা সেগুলোকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, মানুষকে বুর্জোয়া প্রভাব মুক্ত করারা বদলে তারা সেই প্রভাবটাকে আর জোরালো করছে।

এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত কেন আমাদের কমরেডরাও এত বেশি ভুল করেন ‘সাদাসিধে করে’ এই প্রশ্নটা তোলার সময়ে: সাময়িক সরকারটাকে কি উচ্ছেদ করা চাই অবিলম্বে?

আমার উত্তর হলো: ১) এটাকে উচ্ছেদ করা চাই, কেননা এটা চক্রতান্ত্রিক [oligarchic], বুর্জোয়া সরকার, জনগণের সরকার নয়, তাই এটা শান্তি, রুটি কিংবা পূর্ণ স্বাধীনতার ব্যবস্থা করতে অপারগ; ২) এটাকে ঠিক এখন উচ্ছেদ করা যায় না, কেননা এটাকে ক্ষমতাসীন রাখা হচ্ছে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির সঙ্গে এবং প্রথমত মুখ্য সোভিয়েত পেত্রগ্রাদ সোভিয়েতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ, আনুষ্ঠানিক আর যথার্থ চুক্তির সাহায্যে; ৩) সাধারণভাবে, এটাকে মামুলি উপায়ে উচ্ছেদ করা যায় না, কেননা এটা দাঁড়িয়ে রয়েছে বুর্জোয়াদের প্রতি দ্বিতীয় সরকারের – শ্রমিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের — ‘সমর্থনের’ উপর, আর এই সরকার হলো সম্ভাব্য একমাত্র বৈপ্লবিক সরকার, যেটা সরাসরি প্রকাশ করে শ্রমিক আর কৃষকদের অধিকাংশের চিন্তা আর সংকল্প। শ্রমিক, খেতমুজর, কৃষক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং উন্নত ধরনের কোনো সরকার মানবজাতি এখনো স্থির করে নি এবং আমরা এখনো জানি না।

আরো পড়ুন:  যুদ্ধ ও বিপ্লব

ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে হলে শ্রেণীসচেতন শ্রমিকদের নিজেদের পক্ষে টেনে আনতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে। জনগণের বিরুদ্ধে যতকাল বলপ্রয়োগ হচ্ছে না তখন ক্ষমতায় পৌছবার অন্য কোনো পথ নেই। আমরা ব্লাঙ্কিবাদী নই, আমরা সংখ্যালঘু অংশের ক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী নই। আমরা মার্কসবাদী, আমরা পেটি বুর্জোয়া প্রমত্তার বিরুদ্ধে, জাতিদম্ভবাদ-প্রতিরক্ষাপন্থা, বুলি কপচানি আর বুর্জোয়াদের প্রতি মুখাপেক্ষিতার বিরুদ্ধে প্রলেতারীয় শ্রেণি-সংগ্রামের সপক্ষে।

আসুন আমরা গড়ি প্রলেতারীয় কমিউনিস্ট পার্টি; বলশেভিকবাদের শ্ৰেষ্ঠ অনুগামীরা ইতিমধ্যে সেটার উপাদানগুলি সৃষ্টি করেছেন; আসুন আমরা আমাদের সদস্যশ্রেণিকে সমবেত করি প্রলেতারীয় শ্রেণিগত কাজকর্মের জন্য, তাহলে প্রলেতারিয়ানদের মধ্য থেকে, সবচেয়ে গরিব কৃষকদের মধ্য থেকে ক্রমেই আরও বেশি সংখ্যায় মানুষে আমাদের পক্ষে সারবন্দি হবে। কেননা বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিদিনই ওইসব ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের, চাখেইজেদের, সেরেতোলিদের, স্তেকলোভদের এবং অন্যান্যের, ‘সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারিদের’, এমন কি আরও বিশুদ্ধ জাতের পেটি বুর্জোয়াদের, ইত্যাদি, ইত্যাদির মোহগুলোকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেবে।

বুর্জোয়ারা দাঁড়িয়েছে বুর্জোয়াদের একচ্ছত্র ক্ষমতার পক্ষে।

শ্রেণিসচেতন শ্রমিকেরা দাঁড়িয়েছে শ্রমিক, খেতমুজর, কৃষক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির একচ্ছত্র ক্ষমতার পক্ষে — যে-একচ্ছত্র ক্ষমতা সম্ভব হয় হঠকারী কাৰ্যকলাপ দিয়ে নয়, প্রলেতারিয়ানদের চিন্তা স্পষ্ট করার সাহায্যে, তাদের বুর্জোয়াদের প্রভাব থেকে মুক্ত করার সাহায্যে।

পেটি বুর্জোয়ারা — সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারিরা, ইত্যাদি, ইত্যাদি — দোদুল্যমান এবং ফলত তারা স্পষ্টতা এবং মুক্তি ব্যাহত করে।

এই হলো বিভিন্ন শক্তির যথাৰ্থ, শ্রেণিগত বিন্যাস, যা আমাদের কাজগুলিকে নির্ধারণ করছে।

২৮ নং “প্রাভদা’, ৯ এপ্রিল, ১৯১৭
৩১ খন্ড, ১৪৫-১৪৮ পঃ

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (এপ্রিল ২২, ১৮৭০ – জানুয়ারি ২১, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page