যুদ্ধ ও বিপ্লব

মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি

*** পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদি ব্যবস্থা হচ্ছে “অস্তগামি, যা শেষ নিশ্বাঃস নিচ্ছে এবং যা যে কোনো মূহুর্তে মারা যাবে।” অন্যদিকে কমিউনিজম ও কমিউনিস্ট সামাজিক ব্যবস্থা সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশাল ঢেউ ও বজ্রের মতো এবং এগুলো রয়েছে তাদের জীবনের চমৎকার সুচনায়। ওয়াং হুং ওয়েন কর্তৃক কেন্দ্রিয় শিক্ষা ক্লাসের রিপোর্টে উদ্ধৃত (১৯৭৪)

*** এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, চিনে বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শতকরা নব্বই ভাগের চেয়ে বেশি জনগণ শেষ পর্যন্ত মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সমর্থন করবেন। বর্তমান পৃথিবীতে এখনও বহু লোক আছেন যারা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, সংশোধনবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানের দ্বারা ভুলপথে চালিত হচ্ছেন, যারা এখনও জাগরিত হননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটু একটু করে তারা জাগরিত হবেন, তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সমর্থন করবেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সত্য; একে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। জনগণ বিপ্লব চান, বিশ্ববিপ্লব শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। ১৯৬২; বর্ধিত কেন্দ্রিয় কর্মী সম্মেলনে আলোচনা।

*** বর্তমান মুহূর্তে বহু জায়গায় আছে চিনবিরোধি, যা দেখে মনে হয় যেন আমরা বিচ্ছিন্ন। বাস্তবে তারা চিনবিরোধি কারণ তারা চিনের প্রভাবকে ভয় পায়, মাও সেতুং-এর চিন্তাধারাকে ভয় পায় এবং মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ভয় পায়। তারা তাদের নিজেদের দেশের জনগণকে দাবিয়ে রাখা এবং তাদের শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষকে বিপথে চালানোর জন্য চিনকে বিরোধিতা করে। এই চিন বিরোধিতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সংশোধনবাদের দ্বারা যৌথভাবে পরিকল্পিত। এটা প্রমাণ করে যে, আমরা বিচ্ছিন্ন নই, বরং বিশ্ব জুড়ে আমাদের প্রভাব ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। যতই তারা চিনকে বিরোধিতা করবে, ততই তারা জনগণের বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে। এইসব দেশের জনগণ বোঝেন যে চিনের পথ হচ্ছে বিপ্লবের পথ। চিনকে শুধু বিশ্ববিপ্লবের রাজনৈতিক কেন্দ্র হলেই চলবে না। একে বিশ্ববিপ্লবের সামরিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্রও অবশ্যই হতে হবে। ১৯৬৭; মাও সেতুং সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে বিশ্লেষণ করলেন।  

আরো পড়ুন:  সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব

*** বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, দুটি সম্ভাবনা রয়েছেঃ হয় যুদ্ধ বিপ্লবকে ডেকে আনবে, অথবা বিপ্লব যুদ্ধকে ঠেকাবে। ১৯৬৪; ৯ম পার্টি কংগ্রেসে উদ্ধৃত। 

*** মার্কিনী পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলে চিনা জনগণ ভীত হবেন না। আমাদের দেশের জনসংখ্যা হচ্ছে ৬০ কোটি, আর এলাকা হচ্ছে ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক বোমার ছোট্ট সঞ্চয় দিয়ে চিনা জনগণকে ধ্বংস করতে পারে না। এমনকি মার্কিন পারমাণবিক বোমা যদি এমন শক্তিশালীও হতো যে, চিনে নিক্ষিপ্ত হলে সেগুলো পৃথিবীর মধ্য দিয়ে সোজা একটা গর্ত সৃষ্টি করে ফেলতো, বা এমনকি পৃথিবীটাকে উড়িয়ে দিত, তাহলে তাও সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের জন্য তেমন কিছু ঘটনা হতও না; যদিও তা সৌরজগতের জন্য একটা বড় ঘটনা হতে পারতো।

আমাদের একটা কথা ছিল, জোয়ার ও রাইফেল। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা হচ্ছে প্লেন ও পারমাণবিক বোমা। যাহোক, যুক্তরাষ্ট্র তার প্লেন+পারমানবিক বোমা দিয়ে চিনের বিরুদ্ধে আগ্রাসি যুদ্ধ চালায় তাহলে চিন তার জোয়ার ও রাইফেল নিয়ে, নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হবে। সারা বিশ্বের জনগণ আমাদেরকে সমর্থন করবেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে জার, রাশিয়ার জমিদার ও পুঁজিপতিরা উৎখাত হয়েছিল; ২য় বিশ্বযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে চিয়াং কাইশেক ও জমিদাররা চিনে উৎখাত হয়েছিল এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ ও এশিয়ার আরো কতকগুলো দেশ মুক্ত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধায়, এবং আট দশ বছর চালায়, তাহলে ফল হবে এই যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও অন্যান্য সহযোগী দেশগুলোতে শাসকশ্রেণীরা উৎখাত হয়ে যাবে এবং বিশ্বের বেশিরভাগই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন দেশে রূপান্তরিত হবে। বিশ্বযুদ্ধ যুদ্ধোন্মাদদের পক্ষে নয়, বরং সকল দেশেই কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবি জনগণের পক্ষেই শেষ হয়। যদি যুদ্ধোন্মাদরা যুদ্ধ বাধায়, তাহলে আমাদেরকে তারা বিপ্লব সাধনের জন্য বা “ধ্বংসাত্মক তৎপরতা”য় নিয়োজিত থাকার জন্য দোষারোপ করতে অবশ্যই পারবে না, যা তারা সর্বদাই বলে থাকে। তারা যদি যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে, তাহলে তারা এ পৃথিবীতে একটু বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি তারা যুদ্ধ বাধাবে তত দ্রুত তারা পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে মুছে যাবে। তারপর একটি জনগণের জাতিপুঞ্জ গঠিত হবে, হয়তো সাংহাইতে, বা ইউরোপের কোনো অথবা এটা নিউইয়র্কেও হতে পারে, তবে মার্কিনী যুদ্ধোন্মাদরা বিলুপ্ত হলে পরে। ১৯৫৫; চিনা জনগণকে পারমাণবিক বোমা দিয়ে ভীত করা যাবে না।    

আরো পড়ুন:  যুদ্ধের সমস্যা ও কারণ সংক্রান্ত আলোচনা হচ্ছে যুদ্ধের প্রেষণা তত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনা

*** কোনো মহান বিপ্লবকে অবশ্যই গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটা একটা নিয়ম; এবং যুদ্ধের ক্ষতিই শুধু দেখা ভালটা না দেখা হচ্ছে একতরফা মতভঙ্গি। যুদ্ধের ধ্বংসকারিতা সম্পর্কে একতরফাভাবে বললে জনগণের বিপ্লবে কোনো লাভই হবে না। ১৯৬১-৬২; সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির উপর নোট।

*** আমরা সর্বদাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে একটা কাগুজে বাঘ মনে করেছি। দুঃখের বিষয় যে, একটি মাত্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই আছে; এমনকি তাদের যদি ১০টিও থাকতো তাতেও আমাদের সমস্যা হতও না। আজ হোক, কাল হোক, তা ধ্বংস হবেই।

পিকিং-এর জাপানীরা আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন আমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য। আমি বললামঃ আপনারা একটা ভাল কাজই করেছিলেন। বিশেষভাবে আপনাদের চিন আক্রমণ ও চিনের অর্ধেকের বেশি দখলের কারণেই আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হই এবং পিকিং-এ আসতে পারি। আমরা যখন ইয়েনানে ছিলাম, তখন ভাবতাম কবে আমরা মেইলানফ্যাং ও চেংইয়ান চিউ-এর অপেরা দেখতে পাবো। কেউ কেউ ভাবতো তারা তাদের জীবনে আর কখনো সুযোগ পাবে না। যাহোক, আমরা অপেরাগুলো দেখতে পারলাম। বিপ্লবি পরিস্থিতি দ্রুত পরিপক্ক হয়ে উঠছিল। সাত বছরে সমগ্র পার্টি ঐক্যবদ্ধ হলো এবং চিয়াং কাইশেককে উৎখাত করলো। ১৯৫৮; ৮ম পার্টি কংগ্রেসের ২য় অধিবেশনে ২য় ভাষণ।

*** প্রতিটি জিনিসই পরিবর্তিত হয়। বড় ক্ষয়িষ্ণু শক্তিগুলো, ছোট কিন্তু নবজন্মলাভকারি শক্তিসমূহের জন্য স্থান ছেড়ে দেবে। ছোট শক্তিগুলো বড় শক্তিতে রূপান্তরিত হবে, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এই রূপান্তর চান। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদি শক্তিও বড় থেকে ছোটতে রূপান্তরিত হবে। কারণ আমেরিকান জনগণও তাদের সরকারের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে একটি কাগুজে বাঘ (১৯৫৬)

*** চিনের নেতৃত্ব যদি ভবিষ্যতে শোধনবাদিদের দখলে চলে যায় তাহলে সকল দেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদিদের উচিত হবে দৃঢ়তার সাথে তাদের মুখোশ উন্মোচন ও প্রতিরোধ করা এবং চিনের মেহনতি মানুষ ও জনগণকে সেই শোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে সাহায্য করা। ‘চিনের কমিউনিস্ট পার্টির নিকট চিলির বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির খোলা চিঠিতে’তে উদ্ধৃত; ১৯৬৫  

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

Leave a Comment

error: Content is protected !!