আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > মেহনতি ও শোষিত মানুষের অধিকার ঘোষণা

মেহনতি ও শোষিত মানুষের অধিকার ঘোষণা

সংবিধান সভার সিদ্ধান্ত:[১]

১. ক) রাশিয়া এতদ্বারা শ্রমিক, সৈনিক এবং কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতসমূহের প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষিত হলো। কেন্দ্রীয় আর স্থানিক সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত হলো এইসব সোভিয়েতের হাতে।

খ) স্বাধীন জাতিসমূহের অবাধ সম্মিলনের নীতি অনুসারে সোভিয়েত জাতীয় প্রজাতন্ত্রগুলির ফেডারেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো রাশিয়া সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র।

২. মানুষের উপর মানুষের যাবতীয় শোষণ লোপ করা, সমাজের শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণভাবে দূর করা, শোষকদের প্রতিরোধ নির্মমভাবে দমন করা, সমাজের সমাজতান্ত্রিক সংগঠন কায়েম করা এবং সমস্ত দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় ঘটানোই এটার মূল লক্ষ্য, তাই সংবিধান সভার আরও সিদ্ধান্ত:

ক) ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা এতদ্দারা লোপ হলো। সমস্ত ঘরবাড়ি, খামারের সরঞ্জাম এবং কৃষি-উৎপাদনের অন্যান্য আনুষঙ্গিক বস্তু সমেত সমস্ত ভূমি সমগ্র মেহনতী জনগণের সম্পত্তি বলে ঘোষিত হলো।

খ) শোষকদের উপর মেহনতী জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য এবং কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে ও উৎপাদন আর পরিবহণের অন্যান্য উপকরণ পুরোপুরি শ্রমিক-কৃষক রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করার একটা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোচ্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ [২] সংক্রান্ত আইন দুটো এতদ্দারা অনুমোদিত হলো।

গ) পুঁজির জোয়াল থেকে জনগণের মুক্তির একটা পূর্বশর্ত হিসেবে সমস্ত ব্যাংককে শ্রমিক-কৃষক রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণতকরণ এতদ্দারা অনুমোদিত হলো।

ঘ) সমাজের পরজীবী অংশগুলোকে লোপ করার জন্য এতদ্দারা সর্বজনীন শ্রমবাধ্যতা চালু হলো।

ঙ) এতদ্দারা মেহনতী জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং শোষকদের ক্ষমতা পুনঃস্থাপনের সমস্ত সম্ভাবনা দূর করার জন্য মেহনতি জনগণের অস্ত্রসজ্জা, শ্রমিক আর কৃষকদের সমাজতান্ত্রিক লাল ফৌজ গঠন এবং বিত্তবান শ্রেণিগুলোর পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের আইন জারি হলো।

৩. ক) পাপিষ্ঠতম এই যুদ্ধে পৃথিবীটাকে রক্তাপ্লুত করেছে ফিনান্স-পুঁজি আর সাম্রাজ্যবাদ, তাদের কবল থেকে বিশ্বজনকে ছিনিয়ে নেবার দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করে সংবিধান সভা সর্বান্তঃকরণে অনুমোদন করছে সোভিয়েত রাজের অনুসৃত কর্ম নীতি: গোপন সন্ধিচুক্তিগুলো বর্জন, যুদ্ধে সৈন্যবাহিনীগুলোয় শ্রমিক আর কৃষকদের সঙ্গে ব্যাপকতম সৌভ্রাত্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন, যেমন করে হোক বৈপ্লবিক উপায়ে জাতিসমূহের মধ্যে গণতান্ত্রিক শান্তিস্থাপন — রাজ্যগ্রাস আর খেসারত ছাড়া এবং জাতিসমূহের অবাধ আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে শান্তি।

খ) একই লক্ষ্য অনুসারে সংবিধান সভা বুর্জোয়া সভ্যতার বর্বর কর্মনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছে — যা এশিয়ায়, সাধারণভাবে উপনিবেশগুলিতে এবং ক্ষুদ্র দেশগুলিতে কোটি কোটি মেহনতী মানুষেকে দাসদশাগ্রস্ত করে মুষ্টিমেয় বাছা বাছা জাতিতে শোষকদের সমৃদ্ধি সৃষ্টি করেছে।

জন-কমিসার পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত ফিনল্যান্ডের পূর্ণ স্বাধীনতা, পারস্য থেকে সৈন্যাপসরণ শুরু, আর্মেনিয়ার আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা [৩] – এই কর্মনীতিতে স্বাগত জানাচ্ছে সংবিধান সভা।

গ) জার, ভূস্বামী আর বুর্জোয়াদের বিভিন্ন সরকারের গ্রহণ-করা ঋণগুলোকে নাকচ করার সোভিয়েত আইনটিকে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং, ফিনান্স-পুঁজির উপর প্রথম আঘাত বলে সংবিধান সভা বিবেচনা করছে এবং পুঁজির জোয়ালের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিক অভ্যুত্থান ঘটা অবধি সোভিয়েত রাজ এই পথে অবিচলিতভাবে চলবে বলে দৃঢ়বিশ্বাস প্রকাশ করছে।

৪. অক্টোবর বিপ্লবের আগে, যখন জনগণ একযোগে শোষকদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবার অবস্থায় ছিলো না, শোষকদের শ্রেণীগত বিশেষাধিকারের সপক্ষে তাদের পূর্ন প্রতিরোধ-শক্তির পরিচয় পায় নি, সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার কাজে তখনো কার্যক্ষেত্রে লেগে যায় নি, এমন সময়ে রচিত পাটি প্রার্থী তালিকাগুলোর ভিত্তিতে নির্বাচিত সংবিধান সভা মনে করছে যে, সোভিয়েত রাজের বিরুদ্ধে, এমন কি আনুষ্ঠানিকভাবেও দাঁড়ালে সেটা তার খুব বড় ভুল হবে।

মুলত সংবিধান সভার বিবেচনায়, জনগণ যখন চূড়ান্ত লড়াই চালাচ্ছে তাদের শোষকদের বিরুদ্ধে, তখন কোনো শাসনসংস্থায় শোষকদের কোনো স্থান থাকতে পারে না। ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়া চাই পুরোপুরি এবং একমাত্র মেহনতী জনগণের হাতে এবং তাদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি শ্রমিক, সৈনিক এবং কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির হাতে।

আরো পড়ুন:  মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ইতিহাস সমাজের অবস্থা, শর্ত ও সম্পর্কের অন্তর্ভেদ করার বিশ্লেষণী পদ্ধতি

সোভিয়েত রাজকে এবং জন-কমিসার পরিষদের ডিক্রিগুলিকে সমৰ্থন করে সংবিধান সভা মনে করছে, সমাজের সমাজতান্ত্ৰিক পুনঃনির্মাণ কাজের মুলনীতিগলি স্থির করাতেই তার নিজস্ব কাজ সীমাবদ্ধ।

এই সঙ্গে, রাশিয়ায় সমস্ত জাতির মেহনতী শ্রেণিগুলির যথাৰ্থ অবাধ আর স্বতঃপ্রবৃত্ত, কাজেই আরও বেশি মজবুত আর সুস্থিত সম্মিলনী গড়তে সচেষ্ট হয়ে সংবিধান সভা রাশিয়ার সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির ফেডারেশনের মুলনীতিগুলি ধাৰ্য্য করায় নিজ কাজ সীমাবদ্ধ রাখছে, আর প্রত্যেকটি জাতির শ্রমিক এবং কৃষকেরা ফেডারেল সরকারে আর অন্যান্য ফেডারেল সোভিয়েত প্ৰতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে চায় কিনা, চাইলে সেটা কোনো শর্তে, তা তাদের নিজ নিজ ক্ষমতাপ্রাপ্ত সোভিয়েতগুলির কংগ্রেসে স্বাধীনভাবে স্থির করার দায়িত্ব তাদের উপর ছেড়ে দিচ্ছে।

টীকাসমূহঃ

(১) “মেহনতী ও শোষিত মানুষের অধিকারের ঘোষণাটি” অনুমোদনের জন্য সারা রাশিয়া কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশনে পেশ করা হয়। কিন্তু সভার প্রতিবিপ্লবী সংখ্যাগুরুরা এর আলোচনা বাতিল করে দেয়।

২৫ জানুয়ারি সোভিয়েতগুলির তৃতীয় সারা-রাশিয়া কংগ্রেস ‘ঘোষণাটি’ অনুমোদন করলে অতঃপর তা সোভিয়েত সংবিধানের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

(২) ‘সবোচ্চ জাতীয় অৰ্থনৈতিক পরিষদ সংক্রান্ত ডিক্রি’ ১৯১৭ সালের ৫ (১৮) ডিসেম্বর সারা-রাশিয়া কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটি কর্তৃক গৃহীত ও প্রকাশিত হয়।

সর্বোচ্চ জাতীয় অৰ্থনৈতিক পরিষদ ছিলো সোভিয়েত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বৃহদায়তন শিল্প রাষ্ট্ৰায়ত্ত হওয়ার পর এটি রাষ্ট্ৰীয় শিল্পের প্রশাসনিক সংস্থা হয়ে ওঠে।

(৩) ১৯১৭ সালের ১৮(৩১) ডিসেম্বর জন-কমিসার পরিষদ ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্ৰীয় স্বাধীনতার একটি ডিক্ৰি অনুমোদন করে। ডিক্রিটির একটি কপি স্বয়ং ভ. ই. লেনিন ফিনিস প্রতিনিধিদের নেতা, প্রধানমন্ত্রী প. এ. সভিনহুভূদকে দেন।

১৯১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর (১৯১৮ সালের ১ জানায়ারি) সোভিয়েত সরকার পারস্য সরকারকে জারের পাঠানো সেখানে মোতায়েন রুশ সৈন্যদের প্রত্যাহারের জন্য একটি সাধারণ পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব দেয়।

১৯১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর ( ১৯১৮ সালের ১১ জানুয়ারি) জন-কমিসার পরিষদ আর্মেনীয় জনগণের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ডিক্রিটি অনুমোদন করে।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্র হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ

১৯১৮ সালের ৩ (১৬) জানুয়ারির মধ্যে লিখিত, ৩৫ খণ্ড ২২১-২৩ পৃঃ

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (এপ্রিল ২২, ১৮৭০ – জানুয়ারি ২১, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page