আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > রাজনীতি > শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন প্রসঙ্গে

শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন প্রসঙ্গে

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির লণ্ডন সম্মেলনে ১৮৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রদত্ত বক্তৃতার সাংবাদিক-লিখিত শ্রুতিলিপি অনুসারে[১]

রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বা আন্দোলন থেকে বিরত থাকা অসম্ভব। রাজনীতি-নিরপেক্ষ সংবাদপত্রও প্রতিদিন রাজনৈতিক ব্যাপারে যোগ দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একমাত্র প্রশ্ন হলো, কীভাবে এবং কী ধরনের রাজনীতিতে যোগ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আমাদের পক্ষে রাজনীতি থেকে বিরত থাকা অসম্ভব। বর্তমানে অধিকাংশ দেশে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি রাজনৈতিক পার্টি হিসেবে কাজ করে চলেছে, আর রাজনীতি থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে আমরা সেইসব পার্টির সর্বনাশ সাধনে প্রস্তুত নই। জীবন্ত অভিজ্ঞতা, বর্তমান গভর্নমেন্টগুলির রাজনৈতিক উৎপীড়ন শ্রমিকদের বাধ্য করে রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে, তা তারা সেটা চাক বা না-চাক, এবং তা রাজনৈতিক অথবা সামাজিক যে-কোনো উদ্দেশ্যসাধনে হোক না কেন। এই শ্রমিকদের কাছে রাজনীতি থেকে বিরত থাকার কথা প্রচার করার অর্থই হলো তাদের বুর্জোয়া রাজনীতির পরে ফেলে দেয়। প্যারিস কমিউন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরদিন সকাল থেকেই প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক আন্দোলন সাধারণ নিয়মে পর্যবসিত হয়েছে, ফলত রাজনীতি থেকে বিরত থাকা হয়ে দাঁড়িয়েছে একেবারেই অবান্তর।

আমরা শ্রেণীসমূহের বিলোপ ঘটাতে চাই। কিন্তু তা করার উপায় কী: এর একমাত্র উপায় প্রলেতারিয়েতের পক্ষে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এখন প্রত্যেকটি লোক এই সবকিছু মেনে নেয়া সত্ত্বেও আমাদের তবু বলা হচ্ছে রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামাতে। রাজনীতি-নিরপেক্ষরা বলছে তার নাকি বিপ্লবী, এমনকি বিশেষ উৎকর্ষের জোরেই বিপ্লবী তারা। অথচ বিপ্লব হলো গিয়ে এক সর্বোচ্চ স্তরের রাজনৈতিক কর্ম এবং যারা বিপ্লব চায় তারা ওই বিপ্লবকে সফল করে তোলার উপায়াদিও অবলম্বন না-করতে চেয়ে পারে না, অর্থাৎ রাজনৈতিক আন্দোলন না-চেয়ে পারে না তারা। কেননা এই রাজনৈতিক আন্দোলনই বিপ্লবের জমি তৈরি করে এবং শ্রমিকদের সেই বৈপ্লবিক প্রশিক্ষণ দেয়, যে-প্রশিক্ষণ না-থাকলে যুদ্ধের পরদিন সকালেই শ্রমিকরা ফাভর ও পিয়াদের হাতে প্রতারিত হতে বাধ্য। আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি। শ্রমিক পার্টিকে কোনো বুর্জোয়া পর্টির লেজুড় হলে চলবে না কখনও। তাকে হতে হবে স্বাধীন ও স্বনির্ভর এবং তার নিজস্ব লক্ষ্য ও নিজস্ব রাজনীতি থাকা দরকার।

আরো পড়ুন:  শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে ৫ সংগঠনের বিক্ষোভ

রাজনৈতিক স্বাধীনতাসমূহ, সভা-সমিতির অনুষ্ঠান ও সংঘ গঠনের অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা — এগুলি হলো আমাদের হাতিয়ার। আমরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব ও রাজনীতি থেকে বিরত থাকব, যখন না কেউ আমাদের হাত থেকে ওই হাতিয়ারগুলি কেড়ে নিতে চেষ্টা করছে? বলা হচ্ছে যে আমাদের তরফে রাজনীতির ক্রিয়াকলাপে রত থাকার অর্থ হচ্ছে বর্তমান ব্যবস্থাকে আমাদের মেনে নেয়ার সামিল। আমি বলি, ব্যাপারটা ঠিক উলটো। যতক্ষণ এই বর্তমান ব্যবস্থা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার যুগিয়ে দিচ্ছে আমাদের হাতে, ততক্ষণ আমাদের পক্ষ থেকে সেগুলিকে ব্যবহার করলে মোটেই এটা বোঝায় না যে আমরা বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছি।

The Communist International পত্রিকার ১৯৩৪ সালের ২৯ নং সংখ্যায় প্রথম সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত এবং ফরাসি ভাষার পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী মুদ্রিত।[২]

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. প্রথম আন্তর্জাতিকের লণ্ডন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পরে আন্তর্জাতিকের সদস্যদের ওপর যে-সময়ে কঠোর দমনপীড়ন শুরু হয় সেই সময়ে এই সম্মেলনটি আহুত হওয়ার ফলে সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের সংখা কিছুটা হ্রাস পায়। সম্মেলনে যোগ দেন ভোটদানের অধিকার সহ ২২ জন প্রতিনিধি এবং বক্তব্য উপস্থাপনার অধিকারসহ কিন্তু ভোটদানের অধিকারবঞ্চিত অরও ১০ জন অতিরিক্ত প্রতিনিধি। যে-সমস্ত দেশ সম্মেলনে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে পারে নি তাদের প্রতিনিধিত্ব করেন সাধারণ পরিষদের চিঠিপত্র আদানপ্রদানের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকবৃন্দ। এইভাবে মার্কস প্রতিনিধিত্ব করেন জার্মানির আর এঙ্গেলস ইতালির।

প্রলেতারীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্যে মার্কস ও এঙ্গেলস যে-সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন তখন, লণ্ডন সম্মেলন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই সম্মেলন থেকে ‘শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন’ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিকের হেগ কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই প্রস্তাবের প্রধান অংশটি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির সাধারণ নিয়মাবলীর অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রলেতারীয় পার্টির বই, গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশলগত ও সংগঠন সংক্রান্ত নীতি লণ্ডন সম্মেলনের বিভিন্ন প্রস্তাবে সেই প্রথম দৃঢ়ভাবে সূত্রবদ্ধ হয় আর এগুলি একই সঙ্গে সংকীর্ণতাবাদ ও সংস্কারবাদের ওপর মারাত্মক আঘাত হানে। নৈরাজ্যবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে প্রলেতারীয় দলগত আনুগত্যের নীতিগুলিকে তুলে ধরার ব্যাপারে লন্ডন সম্মেলন এক প্রধান ভূমিকা পালন করে।

আরো পড়ুন:  কংগ্রেস সােসালিস্ট পার্টি ছিলো ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে একটি সমাজতান্ত্রিক দল

২. লেখাটি প্রগতি প্রকাশন মস্কো ১৯৮১ থেকে ১২ খণ্ডে প্রকাশিত মার্কস-এঙ্গেলস রচনা সংকলনের ষষ্ঠ খণ্ডের ১৩৪-৫ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে।

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ - ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান বিপ্লবী, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে “পবিত্র পরিবার” (১৮৪৪), “ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা” (১৮৪৫) “এ্যান্টি-ডুরিং” (১৮৭৮) “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা (১৮৮৩), “পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” (১৮৮৪) প্রভৃতি। ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page